"ভূতের সঙ্গে লড়াই"- উপন্যাস- সমাজের মাথায় এখনো ভূত চেেপে বসে আছে। এক গাম্য ছেলে ভূতে সঙ্গে লড়াইতে জয়ী হয়েছিল, তার কাহিনী।
লেখক পরিচিতি
করুণাকর প্রধান ১৯৫০
এ পশ্চিম মেদিনীপুরের এগরার অদুরে এক প্রত্যন্ত গ্রামে এক চাষী পরিবারে জন্ম গ্রহন
করেন । পিতI ঁহরিহর প্রধান ও মাতা লীলাবতী প্রধান। মনস্তত্ব নিয়ে কলেজ জীবন শেষ করে কলকাতায় সরকারী
চাকরীতে নিযুক্ত হন। বর্তমান কলকাতার স্থায়ী বাসিন্দা। স্কুল থেকেই সাহিত্যের প্র্রতি
প্রগাঢ় ভালোবাসা। চাকরী জীবনে তাঁর লেখালেখি শুরু। কবিতা, গল্প, উপন্যাস লেখা তাঁর
সখ। মনে যেসব কথা গুনগুন করে তাই তিনি লিখে ফেলেন। সময়াভাবে এইগুলো প্রকাশিত হয়ে ছিল
না। অবসরের পর তিনি এই কাজে হাত দেন। তাঁর লেখায় সমাজের বিভিন্ন দিক উন্মোচিত হয়েছে
যেটা নিবিড় ও গভীর পর্যবেক্ষনের পরিচয় দেয়। এছাড়া জীবন দর্শন, মনস্তাত্বিক বিশ্লেষন,
ঈশ্বর সমন্ধিয় ব্যাখ্যা আলোচিত হয়েছে।
প্রথম
পরিচ্ছেদ
গ্রামের নাম মকুন্দপুর। মেদিনীপুর
জেলার দক্ষিন প্রান্তে উড়িষ্যার উত্তরে এক অজ গ্রাম। সেই সময় মেদিনীপুর জেলা বিভক্ত
হয় নি। আজ থেকে প্রায় পঁচাত্তর বছর আগের কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে। ব্রিটিশ
যুদ্ধকালীন নীতি, কৃষিনির্ভর অর্থব্যবস্থা
ও
দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি গ্রামের অর্থনীতি ছিল সংকটপূর্ণ। অধিকাংশ গ্রামের মানুষ দারিদ্র
সীমার বহু নীচে বাস করতো। অভাব অনটন তাদের বারমাস্যা। ১৯৪২ সালে অক্টোবর মাসে এক বিধ্বংসী
ঘৃর্ণিঝড়ে জনজীবন বিপর্যস্ত। চারদিকে হাহাকার।গ্রামের সকলে নিম্নবিত্ত চাষী। চাষাবাদ
একমাত্র জীবিকা। নুন আনতে পান্তা ফুরায়। মাঠে রোদ বৃষ্টি ঝড়ে কাজ করায় প্রায় লোকেরা
শীর্ণকায় ও কলো। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। সহিংস ও অহিংস আন্দোলনের ফসলই আমাদের
স্বাধীনতা। এইসব ঘটনার তাপ উত্তাপ গ্রামে লাগে নি। সভ্যতার এক টুকরো আলো ও গ্রামে ঢুকে
নি । অধিকাংশ গ্রামবাসী অশিক্ষিত। গ্রামে কারোও রেডিও, সাইকেল, টর্চ ও ঘড়ি কিছুই ছিল না। বাইরের কোনো খবর গ্রামে পৌঁচাতো
না। গ্রামবাসীরা কাজেই ব্যস্ত থাকতো দিনরাত। বাস রাস্তা ছিল দশ মাইল দুরে। বাসে করে
কোথাও যেতে হলে দশ মাইল পায়ে হেঁটেই যেতে হতো। বৃষ্টিকালে রাস্তাগুলো থাকতো হাঁটুর
উপর কাদা ভর্তি। লোকজন তাই গামছাই ব্যবহার করতো। জুতোর তো প্রশ্নই ছিল না। গ্রামে ছিল
একটি মাত্র পাঠশালা। সকালে পনের কুড়ি জন বাচ্চা পড়াশুনা করতে যেত, দুপুরের আগেই ছুটি
হয়ে যেত। মেয়েদের পড়শুনার চল ছিল না। মেয়েরা এগারো বছর হলে তার পাত্র খোঁজা শুরু হতো।
তেরো মধ্যে বিয়ে দিতে হতো।
এই
গ্রামের দুই বন্ধু কালু ও ভোলা। বয়স নয় দশ হবে। এরা ছিল হরিহর আত্মা। এরা ডাঙ্গুলী
মার্বেল খেলতো, পাঠশালায় যেত, বাড়ী ও মাঠের কাজও করতে হতো। কালুর গায়ের রঙ কালো, মাথায়
ঝাঁকড়া চুল, ছপ্ছিপে সাহসী। যে কোনো গাছে উঠতে ওস্তাদ। বড় বড় গাছে উঠে পাখির বাসা থেকে
ছানা এনে বাড়িত পুষতো। আর ভোলা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। একটু নাদুস নুদুস, ভীতু
কিন্তু ধীর স্থির চিন্তাশীল। এই অঞ্চলে কথ্যভাষা ছিল ওড়িয়া বাংলা মেশানো।
গ্রামে সকলে দরিদ্র হলেও দুটো
জিনিসের অভাব ছিল না, মাছ ও ফল। গাছ থেকে তুলে আনা পাকা ফলের স্বাদ আলাদা। আম, পেয়ারা,
আতা, কামরাঙা, বেল, আমড়া, তেঁতুলু তাল, নারকেল, চালতা, ডুমুর আরো কত কি। গ্রামের প্রচুর
জাম গাছ ছিল। জাম সাইজে ছোটো কিন্তু গাছ ভর্তি হয়ে যেত। মানুষরা জাম তেমন খেতো না।
কালু কয়েক বার গাছে ভালো ভালো জাম পেড়ে নিয়ে আসতো, ওরা দুজনে নুন ও লঙ্কা মাখিয়ে। পাখি
যা খেত খেত কিন্তু বেশীর ভাগ মাটিতে ঝরে পড়ে মাটির রঙ পরিবর্তন করে দেয়। বৃষ্টি আরম্ভ
হলে অসংখ্য চারা গাছ মাটির উপরে উঁকি দেয় কিন্তু একটাও বাঁচে না। প্রাকৃতিক নির্বাচনে
হেরে গিয়ে বিলীন যায়। সব জাম গাছের সব চারা বড়ো হতো তবে বছর কুড়ি পরে পৃথিবীটা শুধু
জাম গাছেই ভরে যেত। খেজুর গাছগুলোতে চারদিক ভরে যেত। যখন গেলে গাছের নীচে পাকা পাওয়া
যাবেই না হয় লগি দিয়ে খোঁচা দিলে ঝরঝর্ করে পাকা খেজুর ঝরে পড়তো। এই সমন্ধে একটি গল্প
প্রচলিত আছে। এক গ্রামে এক অলস ব্যক্তি বাস করতো। সে কোনো কাজ না করে কোনো মুখের খাবার
জোগাড় করতো। একদিন তার খেজুর খেতে ইচ্ছা হলো। সে গাছের নীচে উপরদিকে হাঁ করে শুয়ে পড়লো।
সে জানতো গাছ থেকে পাকা খেজুর মুখে পড়বেই এবং সে বিনা পরিশ্রমে খেজুর খেতে পাবে। সে
অনেক ক্ষন হাঁ করে শুয়ে থাকলো। চারদিকে খেজুর পড়ছে কিন্তু তার মুখে পড়ছে না। হঠাৎ একটি
খেজুর পড়ে তার গোঁফে আটকে গেল। অনেক ক্ষন শুয়ে থেকেও খজুরটা মুখে এলো না। এমন সময় একজন
লোক যা্চ্ছিল। লোকটি খেজুরটাকে মুখে ঠেলে দিতে অনুরোধ করায় লোকটি পা দিয়ে খেজুর মুখে
সরিয়ে দিল।আর মাছ সারা বছরই পাওয়া যেত। শীতের দুমাস গেলেই মাঠ, পুকুর ও খালের জল শুকোতে
আরম্ভ করতো। ওখানে সব রকম মাছই পাওয়া যেত। মাঠের জল শুকাতে আরম্ভ হলে মাছগুলো পুকুর
খালে চলে যেত। ধরার পর যা থেকে যেত বৃষ্টি আরম্ভ হলে মাঠ জলে ভরে যেত এবং মাছগুলো ডিম
দিতে মাঠে চলে যেত। এইভাবে সারা বছর বিভিন্ন উপকরণ ও পদ্ধতির দ্বারা পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া
যেত। ভোলার মায়ের হাতে পাতুরি খেতে ভালো লাগতো। কলা পাতায় কাঁচা মাছ দিয়ে হয় তেঁতুল
বা আমসি না সরসা বাটা দিয়ে বেঁধে কাঠের আগুনে ডুকিয়ে দেওয়া হতো। এই পাতুরি দুতিন দিন
রেখে খাওয়া যেত।
একদিন
ভোলা সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠে বাইরে এসেছে।
কালু হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বললো “শুনিচু, কালি রাতিরে পরানের মা মরি যাইচি। কিছিক্ষন
পরে পুড়তে নেই যিব, চল, মড়া পুড়া দেখতে যিবা।“ ভোলার ভুতে বড়ই ভয়। মায়ের কাছে রাতে
শোয়ার সময় রাত গভির হলে সে ক্যাঁচর ক্যাঁচর এক শব্দ শুনতে পেত। শব্দটা তাদের বাড়ীর
পশ্চিম পাশে একটা পুকুর ছিল, সেখান থেকে আসতো। সে মায়ের বুকের মধ্যে ডুকে মাকে জিজ্ঞাসা
করতো “এ শব্দটা কি? মা বলতো “ পুখুরি দু ধাররে যে দুইটা বড় বেল গছ অছি, সেই গছরে ব্রহ্মদৈত্য
অছি। রাতি বেশী হেনে দুই গছরে দুই গুড় রখি দোল খায়। তু পুখুরি পাশকু মুটে যিবু নাহি।“
ভোলা আরও ভয় পেয়ে মায়ের গায়ে সেঁটে যেত। সেই সময় একটা শিয়াল হুক্কা হুয়া ডেকে উঠতো।
সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যে যত শিয়াল তারস্বরে ডাকা আরম্ভ করতো। মা বলতো “শুই যা, রাতি দুই
প্রহর হেলা।“ শিয়াল প্রতি পহর শেষে ডাকে। ভোলার
কিছুতেই ঘুম আসে না। সে ভাবে শিয়াল কি করে জানে প্রহর শেষ হওয়ার কথা। সে শুনেছে, দিন
চার প্রহর ও রাত চার প্রহর। তার মনে আসে, কয়েক বছর আগে তার কাকার ছেলে “দীনু” ঐ পুকুরে
ডুবে মরেছে। তাহলে ব্রহ্মদৈতি তাকে নিয়ে গেছে।
পরের দিন সে কালুকে জিজ্ঞাসা
করে “ব্রহ্মদৈতি কথা জানু”
কালু বলে ব্রাহ্মণ মরার পর
ব্রহ্মদৈত্য হয়। তারা বেল গাছে থাকে। কাউকে একলা পেলে মেরে তার কাছে নিয়ে রাখে।
কালু ও ভোলা ছুটলো পরানের বাড়ী।
গ্রামের অনেক লোক জড় হয়েছে। তখনকার সময় বিপদ হলে সকলে সাহায্যে এগিয়ে আসতো। কিছু লোক
আমগাছ কাটছে। মড়া পুড়াতে আমাগাছই লাগতো কারন এইগাছ কাঁচা অবস্থায় ভালো জ্বলে। মৃতদেহ
ঘরের বাইরে নিয়ে এসে শোয়ানো হয়েছে। পরানের বাবা চুপ করে বসে। পরান মায়ের পাশে বসে কিন্তু
তার চোখ দিয়ে জল ঝরেই চলেছে। আত্মীয়সজ্জন মহিলারা চিৎকার করে কেঁদেই চলেছে । চার পাঁচজন
লোক মৃতদেহ বহন করার জন্য বাঁশ কেটে খাটের মতো তৈরি করছে। এক মহিলা বাইরের উনুনে খড়
জ্বেলে খই ভাজচ্ছে। মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার সামনে খই ছড়িয়ে ছড়িয়ে যাওয়ার রীতি। দুই একজন
মহিলা পরানের মার সিঁথিতে মোটা সিদুর দিচ্ছে ও পায়ে মোটা আলতা দিচ্ছে। এয়ো স্ত্রী মরলে
এটাই ছিল রীতি। খোল করতাল নিয়ে কীর্তনদল হরিনাম করচ্ছে।
ভোলার এই পরিস্থিতিতে বেশ ভয়
ভয় করচ্ছে। সে কালুকে বলল “ চ খাই আসি”
কালু বলল “ যা তু খাই আয়, মোর
ভুখ নাই, মু এইঠি অছি”।
ভোলা ফিরে এসে দেখল শ্মশাণে
নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় চলচ্ছে। অনেক লোক এসে গেছে। তার মধ্যে আঠ দশ জন তাদের বয়সের ছেলে
ও আছে। এদের দেখে ভোলার মনে কিছুটা সাহস বাড়লো। প্রথমে কীর্তনদল চললো। তার পিছনে একজন
খই ছড়াতে ছড়াতে গেল। এদের পিছনে চারজন লোক বাঁশে কাঁধে নিয়ে যাচ্ছে। মুখে ‘বল হরি,
হরি বল’। তার পিছনে পরান নুতন গামছা পরে চলেছে। সবশেষে জনতা। মেয়েদের শ্মশাণে যেতে
দেওয়া হতো না। শ্মশান ছিল গ্রামে দক্ষিনে প্রায় মাইল খানেক দুরে এক পুকুরের পাড়ে। ওখানে
পৌঁচে মাটি কেটে চুল্লি তৈরি করে কিছু কাঠ দিয়ে মৃতদেহ রাখা হলো এবং তার উপর আরও কাঠ
দিয়ে ধুনো ছড়ানো হলো। পরান জ্বলন্ত খড়ের আঁটি নিয়ে তিন বার চুল্লিকে প্রদক্ষিন করে
মাথার কাছে আগুন ধরিয়ে হাঁউ মাউ করে কাঁদতে আরম্ভ করলো। হঠাৎ ভোলার মায়ের কথা মনে এল।
যদি তার মা মরে যায়। তার মনটা হু হু করতে লাগলো। মা মারা গেলে সে কি করে থাকবে? সে
ভেবেই পেল না। ভোলাতো জানে না, পৃথিবীতে কত মা হারা শিশু আছে। তার মায়ের কাছে যাওয়ায়
মন আকুলি বিকুলি করতে লাগলো। সে কালুকে বললো “ চল ঘরকু যাই, মা খুজু থিবে।“ আগুন দাউ
দাউ জ্বলছে। ওরা ঘরের দিকে রওনা হল। রাস্তায় কালু ভোলাকে বললো দশ দিনের দিন রাতে সব
শ্মশাণ যাত্রীকে পরানের বাড়ীতে খেতে হবে। সেই রাতে ভুতকে খাওয়ার দেওয়া হয়।
রাতে শোওয়ার সময় মাকে জিজ্ঞাসা
করে “ মনষ মরি যায় কেনে?”
“ বুড়া হই গলে মরি যায়। কেহি
কেহি রোগোরে বা দুর্ঘটনারে মরে।“
“মরার পরে কি ভুত হয়?”
“ ভুত খায় কিস ?”
সারাদির পরিশ্রমের পর ভোলার
মায়ের বেশ ঘুম পেয়েছে। সে আর কথা বলতে পারছে না। তাই বললো “ রাতি হেলা নি, শুই যা।
পুরুষরা যেমন বাড়ীর বাইরে কাজ কর্ম করতো কিন্তু মেয়েদের বাড়ীর কাজের সাথে বাইরের কাজ
ও করতে হতো। ভোরে উঠে ধান
সেদ্ধ করে শুকানো, বাড়ী ঘর ছাঁট দেওয়া, গোয়াল থেকে গরু বার করে গোয়াল পরিষ্কার করা,
দুধ দোওয়া তারপর রান্না করা, খেতে দেওয়া, নিজে খেয়ে আসতে আসতে বিকাল গড়িয়ে যায়। তারপর
জঙ্গলে গিয়ে শুকনো পাতা ও জালানি সংগ্রহ করে রাতের রান্না। এত পরিশ্রমের পর বিছানা
ধরলে চোখ জুড়িয়ে আসে।
মা বললো “ রাতি হলানি শুই যা, মোতে ভোরে উঠতে হব”। বলেই সে
ঘুমিয়ে পড়লো।
ভোলার চোখে ঘুম নেই। তার মাথায় নানান্ প্রশ্নের ঢেউ উঠছে
কিন্তু উত্তর খুঁজে পায় না। সে ভাবে মানুষ মরে গেলে, আত্মা দেহ ছেড়ে যায়। কত কত আত্মা
দেহ ছেড়েছে। তারা কি আবার দেহ ধারন করে না এক সঙ্গে মিশে পরিবেশে ঘুরে বেড়ায় ? আত্মা
তো বাতাসের মতো। জলে নুতন জল ঢাললে মিশে যায়। তাহলে আত্মা আলাদা আলাদা থাকে কি করে
? শুধু মানুষ মরলে ভুত হয় কেন ? আমাদের চারপাশে কত কত প্রাণী আছে যেমন পশু, পাখি, কীট
পতঙ্গ। তবে মশা, মাছি, আরশোলা মরলেও ভুত হবে। এ সব ভুতের কথা শোনা যায় না। ভোলা তখনই
ক্যাঁচর
ক্যাঁচর শব্দটা শুনতে পেল। ভয়ে মাকে জড়িয়ে শুয়ে গেল।
এর মধ্যে পরান তার মায়ের শ্রাদ্ধের
দিন রাতে খেতে যেতে বলেছে। ভোলার ও যাওয়ার ইচ্ছা আছে। সে দেখতে চায় প্রেতকে খাওয়ার
ব্যাপারটা। জ্ঞান হওয়া থেকে এসব দেখে নি। সন্ধ্যার হতে সে পরানের বাড়ীতে গিয়ে হাজির
হলো। দেখলো দুটো হ্যাজাক জ্বালানো হয়েছে। গ্রামের প্রায় বাড়ী থেকে আনাজ আসেছে। কেউ
কুমড়ো, কেউ আবার লাউ, যার বাড়ীতে যা হয় তাই দিয়ে যায়। যেহেতু অধিকাংশ লোক গরীব তাই
এই ভাবে একে অপরকে সাহায্য করতো। একটা সামাজিক বন্ধন ছিল। তখন রান্নার লোক ভাড়ায় আনতে
হতো না। পাড়া প্রতিবেশীরা মিলে মিশে সব কাজ করতো। মেয়েরা আনাজ কাটত, বাটনা বাটতো। কালু
ছাড়া তাদের বয়সী কিছু ছেলেও ছিল। রান্না প্রায় শেষ। প্রেতকে খাবার না দেওয়া অব্ধি এখানে
খাওয়া শুরু হবে না। দুপুরে ব্রাহ্মণ ভোজন হয়ে গেছে, দই, মুড়ি ও গুড়। কিছুক্ষন পরে প্রেতের
জন্য খাবারের আয়োজন আরম্ভ হলো। একটা নুতন মাটির হাঁড়িতে ভাত ও বিভিন্ন রকমের তরকারী,
পায়েস, পিঠে হাঁড়িতে সাজনো হলো। ওদিন সকালে পরানের মাথা মুন্ডন করা হয়েছে।পরান নুতন
গামছা পরে একটা দা কোমরে গুঁজে, মাথায় হাঁড়ি নিয়ে যেতে শুরু করলো। পিছনে কিছু লোকেরা
চললো। ভোলা ও কালুরা ও তাদের সঙ্গে চললো। পরানের বাড়ীর সামনে কিছু দুরে একটি বাগান
ছিল। ঐখানে সামান্য জায়গা পরিষ্কার করে গোবর লেপা হয়ে রাখা ছিল। পরান ঔ খানে মাথা থেকে
হাঁড়ি নামালো। কলাপাতা পেতে ভাত ও অন্যান্য রান্না সাজিয়ে দিল। মাটি দিয়ে প্রদীপ রাখার
পিলসুজ তৈরি করে তার উপর প্রদীপ বসিয়ে জ্বালিয়ে দিল এবং সাষ্টাঙ্গ প্রনাম করে পিছনে
ফিরে ঘরের দিকে চললো। ভোলা, কালু ও চার পাঁচ জন কিছুটা দূরে অন্ধকারে গোপনে থেকে ভুতের
খাওয়া দেখতে লাগলো। কিছুটা সময় পরে ওরা দেখলো প্রদীপের আলো অদৃশ্য হচ্ছে আবার দেখা
যাচ্ছে। একজন ফিসফিস্ করে বললো “ প্রেত আসিছি ও ঘুরুচি । এবারে খাইতে বসিব”। তারপর
প্রদীপের আলো আর দেখা গেল না। কে একজন বললো “এবারে খাউচি” কিছুক্ষন পরে আবার আলো দেখা
গেল। তাহলে প্রেত খাবার খেয়ে চলে গেলা। তারা পরানের বাড়ী ফিরে আসে। বাড়ীর বাইরে মাটিতে
হাঁটু মুড়ে লাইন দিয়ে সকলে বসে গেল। একজন কলাপাতা সকলের সামনে দিয়ে গেল, আর একজন নুন।
তারপর ভাত, জলের মতো ডাল, শাকভাজা, কুমড়ো ঘন্ট ও লাউ, তেঁতুল ও গুড় দিয়ে চাটনি।
ভোলা বাড়ী ফিরে মায়ের পাশে
শুয়ে পড়লো। মাকে আজ প্রশ্ন করল না। তার মাথায় একটি চিন্তা চলছে, ভুত কি সত্যি খাবার
খায় ? এই একদিন খেয়ে আর কোনোদিন খেতে দরকার হয় না। সত্যি কি ভুত, ব্রহ্মদৈত্যি আছে
? অনেক ভেবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারলো না। ভাবতে ভাবতে তার কখন ঘুম এসে গেছে জানতে
পারে না। পরের দিন থেকে নিত্য নৈমিত্তিক ভাবে দিন গড়িয়ে গড়িয়ে চললো। ভোলার মাথা থেকে
ভুত আস্তে আস্তে উবে গেল।
ভোলা পড়াশুনায় গুরুমশাই তার
প্রংশসাও করেন। বলেন “ ও সুযোগ পেলে জীবনে উন্নতি করবে” ভোলা ও চায় পড়াশুনা করতে। ভোলা
সময় পেলে পড়তে বসে । মন দিয়ে বইগুলোর অর্থ হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করে। কালুর মতো সারাদিন
হৈ হৈ করে ঘুরে বেড়ায় না। ভোলার কৌতুহলী মন সবকিছু গভীরে গিয়ে বিষয়টা জানতে চায়। এ বছর ভোলা ৪র্থ শ্রেণীর শেষ পরীক্ষা দেবে। এই পরীক্ষা পাস
করলে ৫ম শ্রেণীতে ভর্ত্তি হতে হয়। গ্রামের প্রায় দশ মাইল দুরে ৫ম থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত
একটি বিদ্যালয় ছিল। ভোলা পরীক্ষার জন্য আদা জল খেয়ে পড়ছে। শুধু বিকালা একটু খেলতে বেরোয়।
খেলার মাঠে কালুর সঙ্গে দেখা হয়।
একদিন কালু ভোলাকে বললো “ জানিচু পরানের বৌকু ভুত ধরছি। আজ
গুণিন আসিচি” ভুত ধরা যে কি ভোলা জানে না। তাই কৌতুহলী মন ব্যাপার কি জানতে ইচ্ছা করলো।
কালু ও সে পরানের বাড়ীর দিকে ছুটলো। গিয়ে দেখলো উঠানে পরানের বৌ আলু থালু হয়ে বসে আছে
। তার চুল চারদিকে ছড়ানো। কিছু মহিলা তার পাশে বসে। গুণিন লাল কাপড় পরে হাতে সরসে নিয়ে
কি যেন গুন গুন করছে এবং যেই সরসে তার দিকে ছুড়েছে, বৌটি কেঁকিয়ে উঠে বললে আরম্ভ করলো।
“মু যিবি নি, মু তো মোর ঘরকু আসিছি”। গুণিন উঁচু গলায় জিজ্ঞাসা করলো। তুই এই বৌকে ধরলি
কেন ? বৌটা বললো “ মু তো তেঁতুল গছরে থিলি। ইয়ে একলা আসু থিলা, মু তা সাথর চালি আসিছি”।
গুণিন বলে “ঠিক আছে, এখন ছেড়ে চলে যা”। সে যেতে নারাজ। গুণিন একটা ঝাঁটা আনতে বললো।
কেউ একজন গোয়াল থেকে ঝাঁটা এনে দিল। গুণিন ঝাঁটা ধরে পেটাতে ও মন্ত্র আউড়াতে আরম্ভ
করলো।কয়েকটা ঘা দিতেই বৌটা বলতে লাগলো “ যাউচি যাউচি” গুণিন বললো “যাওয়ার সময় একটা নিশানা রেখে যাবি। সঙ্গে সঙ্গে
বৌটা অজ্ঞান হয়ে গেল এবং ঘরের সামনে এক জাম গাছের কাঁচা ডাল ভেঙ্গে নীচে পড়লো। গুণিন
বললো “যাক্ চলে যেছে। ও একটু পরে সুস্থ হয়ে যাবে। কয়েকদিন ওকে সাবধানে রাখবে। ইতিমধ্যে
বৌটা স্বাভাবিক ভাবে উঠে বসলো এবং বিহ্বলভাবে চারদিকে তাকাতে লাগলো যেন বুঝতে পারছিল
না কেন এত লোক জড় হয়েছে।
ভোলা বাড়ীতে গিয়ে
পড়ার চেষ্টা করলো কিন্তু কিছুতে মন বসাতে পারলো না। সে জানে মন না দিয়ে পড়লে সে পড়ার
কোনো মানে হয় না। পড়ার বিষয় মাথায় না গেলে কোনো লাভ নেই। তাই সে খেয়ে শুতে চলে গেল।আজও
মাকে কিছু জিজ্ঞাসা করল না। চুপ করে শুয়ে ভাবতে লাগলো ভুত লাগার কথা। পরের দিন পাঠশালায়
গিয়ে গুরুমশাইকে জিজ্ঞাসা করলো “ভুত কি মানুষকে ধরে ?” গুরুমশাই হেসে বলেন “ না রে,
ভুত বলে কিছু নেই। এটা ভয় থেকেই আসে। খুব ভয় পেলে এক মানসিক অসুখ হয়। তাকে কুসস্কারগ্রস্ত
লোকেরা ভুত ধরা বলে”। গুরুমশায় ভোলার জানার আকাঙ্খা দেখে খুব খুশি হলেন। ভোলা মাথায়
অনেক প্রশ্ন। কি্ন্তু সে আর কিছু প্রশ্ন করলো না।
সময় গড়িয়ে চললো কালের পথে। ভোলা পরীক্ষায় খুব ভালো ফল করেছে
এবং মাধ্যমিক স্কুলে ভর্ত্তি হয়েছে। তার ভালো ফলের জন্য স্কুলে বেতন লাগে না উপরন্তু
মাসে দশ টাকা বৃত্তি পায়। এই টাকায় স্কুল বোড়িং
খরচ চালানো সুবিধা হয়। ছুটিতে বাড়ী গেলে কালুর সঙ্গে দেখা হয় । একবার গ্রীষ্মের ছুটিতে
বাড়ী এসেছে। এই সময় এক সকালে কালু এসে জানালো যে একটা লোক গলায় দড়ি দিয়ে পুকুরের বটগাছে
ঝুলছে।পুলিশে খবর গেছে, তারা আসচ্ছে। ভোলার মনে পড়লো সেই পুকুরের কথা। তারা গরু চরাতে
নিয়ে গেলে ঐ পুকুরের পাড়ে গাছের ছায়ায় খেলা করতো। বেশ দুরে দুরে কয়েকটা গ্রাম ও মাঝখানে
পুকুরটি। রাতে ওখানে কেউ কিছু করে কারও টের পাওয়ার কথা নয়। কারা হয়তো এই লোকটা নিয়ে
মেরে ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে। সকালে চাষীরা চাষ করতে মাঠে এসে লোকটাকে দেখতে পেয়েছে। পুলিশ
মৃতদেহ নিয়ে চলে যায়। ভোলাও বাড়ী ফিরে আসে। ভোলা জানতে চায় সত্যি কি ভুত বলে কিছু আছে
? সে এখন বড় হয়েছে। সে অনেকদিন রাতে স্কুল থেকে অন্ধকারে বাড়ী ফিরেছে। পথে জঙ্গল ও
ফাঁকা মাঠ আছে। প্রথম প্রথম গা ছমছম করতো। এখন আর ভয় করে না। সে তো কোনোদিন ভুত দেখেনি।
কই শহরে তো ভুত থাকে না। এইতো সেদিন কে জন বলছিল নিশিভুতের কথা। নিশিভুত গভীর রাতে
চেনা গলায় তিন বার নাম ধরে ডাকে। তিনবারের মধ্যে যদি সে সাড়া দেয়, তাকে মেরে ফেলে।
বছর খানেক পরে ভোলা তখন বাড়ীতে ছিল। গ্রামে সেই সময় অনেকে
কিছু বাড়তি পয়সার জন্য অধিক পরিশ্রম করতো। ভোলার মা ধান সেদ্ধ করে চাল তৈরী করতেন।
ধান বিক্রির চেয়ে চাল বিক্রি করলে কিছু পয়সা বেশী পাওয়া যেত, ও ভুষিটা গরুর খাদ্য হিসাবে
ব্যবহার হতো। ঐ চাল ভোলার বাবা বাঁকে করে প্রায় সাত মাইল দুরে গঞ্জে গিয়ে বিক্রি করতেন।
তিনি দুপুরের আগে ভাত খেয়ে বের হয়ে চাল বিক্রি করে সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরতেন।
গঞ্জে যাওয়ায় পথ ঐ পুকুর ধার দিয়ে ছিল। সেদিন আগের মতো গঞ্জে গেছেন। সন্ধ্যা গিয়ে রাত
হলো। তিনি না ফেরায়, ভোলার মা দুঃশ্চিন্তায় পড়লেন। ভোলা হেরোকিন নিয়ে পাড়ার দুজন লোক নিয়ে রাস্তা ধরে এগোতে
লাগলো। ফাঁকা মাঠে গিয়ে দেখলো চারদিকে নিকষ অন্ধকার। সেই সময় কৃষ্ণপক্ষের শেষের দিকের
রাত ছিল। শ্মশানটায় কিছু আলো জ্বলছে নিভছে। যত রাত হচ্ছে রাতের ভয়াভয়তা বাড়ছে। চারদিক
খাঁ খাঁ করচ্ছে। মনে হচ্ছে রাত বিরাট হাঁ করে গিলতে আসচ্ছে। আকাশে তারাগুলো মিটি মিটি
হাসছে I পাশাপাশি কারা যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুরে দুরে গ্রামে আলো নিভে গেছে। তখন গ্রামের
মানুষরা তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়তেন। পুকুরটার কাছাকাছি আসতে পুকুরের গাছে এক পেঁচা ডেকে
উঠলো। চারদিকে শিয়াল ডাকতে শুরু করল। ভোলা বুঝতে পারলো, রাত দুপ্রহর হলো। ভোলা নিস্তব্ধতা
ভেঙ্গে “বাবা” “বাবা” চিৎকার করতে করতে এগোতে লাগলো। হঠাৎ তারা দেখলো কে যেন টলতে টলতে
তাদের দিকে আসছে। কাছে আসতে দেখা গেল, ভোলার বাবা। ক্লান্ত, বিপর্যস্ত, ঘেমে নেয়ে একশেষ।
ভয়ার্ত চোখ, চলার মতো শক্তি নেই। কোনো রকম ধরে ধরে বাড়ী নিয়ে যাওয়া হলো। তাঁকে জল বাতাস
করলে একটু সুস্থ বোধ করলেন I ভোলার মা একগ্লাস গরম দুধ দিতে, তিনি কথা বলতে পারলেন।
ততক্ষনে গ্রামের লোক জড়ো হয়েছে। ভোলার বাবা যা বললো তাতে উপস্থিত সকলের ভয়ে মুখ ফ্যাকাসে
হয়ে গেল। তিনি বলেন গঞ্জে চাল বিক্রি হতে দেরী হয়। সন্ধ্যার পর পর তিনি গঞ্জ থেকে বের
হন। অন্ধকার ক্রমে ঘনিয়ে আসছে । তিনি জোরে চলতে লাগলেন। পুকুরের কাছাকাছি এসে গেছেন
বুঝলেন। কিন্তু তারপর তিনি চলছেন তো চলছেন,
বাড়ী আসছে না।সকলে বলাবলি করলো এটা কানাভুতের কাজ। সে অন্ধকারে পথ ভুলিয়ে পথিকে ঘোরাতে
থাকে। পথিক যখন ক্লান্ত হয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়, তাকে মেরে ফেলে। পরের দিন গ্রামের জড়ো
হয়ে সিধান্ত নিল, পুকুরটাকে সুদ্ধ করতে হবে। একদিন পর গুণিন ডাকা হলো। গুণিন পুকুরের
পাড়ে যজ্ঞ করলেন। “ব্যটা এখানে ভুত হয়ে আছে” তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন। ঠিক্
আছে, এর ব্যবস্থা করছি”। এই বলে তিনি একটা লোহার বড় পেরেক নিয়ে মন্ত্র বলতে বলতে সম্পুর্ণ
গেঁথে দিয়ে বললেন “ একে এই গাছে আটকে দিয়েছি, এখান থেকে বেরোতে পারবে না । লক্ষ্য রাখবে
কেউ যেন পেরেকটা তুলে না ফেলে। ভোলা বাড়ী ফিরে এলো। সে ভাবতে লাগলো সত্যি কি ভুত বলে
কিছু আছে। ভোলা রাতে মায়ের কাছে ঘুমায় না। সেদিন রাতে ঘুমাতে ঘুমাতে এই ব্যাপারে অনেক চিন্তা করেও সিন্ধান্ত নিতে পারলো না। পরের দিন
স্কুল বোড়িং এ চলে গেল।
ভোলা স্কুল বোড়িংএ গিয়েও তার শান্তি নেই। সে জানতে চায় আ্ত্মা
কি, মরার পর আত্মা ভুত হয়ে থাকে কিনা ।
সে স্কুল গ্রন্থাগার থেকে শরীরবিদ্যা, পদার্থ বিদ্যা, দর্শন
প্রভৃতি সময় পেলে পড়লো। শেষে সে যা বুঝলো যে অজ্ঞতা ও বহুদিনের সংস্কারের ফল। প্রকৃত
বিদ্যা অর্জন দ্বারা একে দুর করা যায়।ব্রহ্মান্ডে সব কিছু শক্তির দরকার। আমাদের পৃথিবী
সৌরশক্তির দ্বারা চলে।সূর্য কোটি কোটি বছর আলো দিচ্ছে, এ শক্তি কোথা থেকে পায়? সূর্যে
প্রচুর পরিমানে হাইড্রোজেন পরমাণু থাকে। প্রচন্ড চাপে নিউল্কীয় সংযোজন বিক্রিয়ায় হিলিয়াম
পরমাণুতে পরিণত ও এরদ্বারা অসীম শক্তি নির্গত হয়। পৃথিবীতে শক্তির একমাত্র উৎস। যে
কোনোকে ক্রিয়াশীল করতে হলে শক্তির প্রয়োজন। রেলগাড়ী কয়লা না দিলে এটা মৃতবৎ হয়ে যায়।
আবার কয়লা দিলে চলতে আরম্ভ করে। বলা যায় কয়লার তাপশক্তি রেলগাড়ীর আত্মা। এর ভিতরে যে
যন্ত্রাংশ থাকে, তা খারাপ হলে তাকে সারানোর বিদ্যা মানুষ রপ্ত করেছে। তাই রেলগাড়ী মরে
গেলে তাকে জ্যান্ত করতে পারা যায়।
মানবদেহের শক্তির প্রধান উৎস হল আমরা যে খাবার খাই। কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও চর্বি। কিন্তু এটি প্রধানত খাদ্যের কার্বোহাইড্রেট উপাদান যা বিপাকীয় ক্রিয়াকলাপ দ্বারা ভেঙে যায় এবং অবশেষে গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয় যা কোষগুলিতে যায়। কোষে শক্তি উৎপাদনের কারখানা
আছে। অক্সিজেন, জল ও গ্লুকোজ রক্ত বাহিত হয়ে কোষে কোষে যায় ও শক্তি তৈরী হয়। উৎপাদিত
শক্তির দ্বারা সমস্ত জীব সচল থাকে। শক্তি উৎপাদনে জড়িত অঙ্গ খারাপ হলে জীব বাঁচে না।
কিছু কিছু অঙ্গকে ঔষধ বা শল্যবিদ্যা দ্বারা ঠিক করতে মানুষ সমর্থ হয়েছে।
জীব মরে গেলে কোন অঙ্গ কাজ করে না । তার জীবনী শক্তি
থাকে না। জীবনী শক্তি যদি তরঙ্গ হয় তবে মিশে যাবে বৃহৎ তরঙ্গের সঙ্গে। কোনো শক্তিই
ধ্বংস হয় না সৃষ্টি হয় না। এই জীবনী শক্তিকে আত্মা বলা হয়। ভোলা সিন্ধান্ত নেয় ভুত
বলে কিছু হয় না, এটা ভ্রম মাত্র।
এই রকম হাজারো কুসংস্কার মাটির বহু নীচে শিকড় গেড়ে বসে
আছে। এর মূল শুদ্ধ উপড়ে না ফেললে নানাভাবে আমাদের ভয় ও দুর্দশার সম্মুখীন হতে হবে।
গ্রামের দিকে সবচেয়ে ক্ষতিকারকের মধ্যে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া, মেয়েদের না পড়িয়ে
ঘরে বসিয়ে রাখা, অল্প বয়সে বিধবা হলে আবার বিয়ে না দেওয়া, সাপে কাটলে বা কোনো রোগ হলে
ওঝা বা গুণিণকে ডাকা, ঠিকুজী কুষ্টি মেনে চলা ইত্যাদি
২য় পরিচ্ছেদ
গ্রামে প্রায় সকলে বেশী রকমের আস্তিক। ঠাকুর দেবতাকে যেমন
ভয় করে তেমনই ভক্তিও করে। যত ঠূাকুর পৃথিবীতে আছেন, সকলে এই গ্রামে এসে জড়ো হয়েছেন।
গাছের নীচে পাথরকে ভক্তি ভাবে পূজো করে, মানত করে। গাছের তলায় চন্ডী আছেন, মনসা আছেন,
শীতলাও আছেন আর আছেন ধর্মঠাকুর। সারা বছর ঘরে ছোট ছোট পূজাঅর্চা লেগে থাকে। লক্ষ্মী
পূজা প্রত্যেক ঘরে বৃহস্পতিবার হয়ই, মাঝে মাঝে নারায়ণ পূজো করা হয়। সবচেয়ে হাস্যকর
কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে চাঁদকে খাবার দিয়ে পূজা করা হতো। একটি কলাপাতায় খই, নারকেল
নাড়ু, কল আর তালের শাঁস দিয়ে প্রনাম করা হতো। পাড়ার বাচ্চারা সব লুকিয়ে থাকতো, যেই
ভোগ দেওয়া হয়ে যেত চাঁদ খাওয়ার আগে বাচ্চারা ছোঁ মেরে সব নিয়ে পালাতো। আর হতো ষষ্ঠী
পূজো। ষষ্ঠী
দেবীকে
শিশুদের
কল্যাণদাতা
ও
রক্ষাকর্তা বলে মনে করা হতো। কারো ঘরে সন্তান জন্মালে
একুশ দিনে ষষ্ঠী পূজো করা হতো এবং সারা রাত ষষ্ঠীমঙ্গল গান হতো। এই
দিনে
প্রথম
মায়ে-ছায়ে
স্নান
করার
বিধি।
কবিকঙ্কণ
মুকুন্দরাম
চক্রবর্তীর
চন্ডীমঙ্গল
কাব্যেও মা
ষষ্ঠী
কথা
উল্লেখ আছে। প্রধানত মহিলারাই সারা রাত ধরে গান শুনতেন।
গ্রামের তিন চারজন মিলে ষষ্ঠীমঙ্গল গান করতেন আর দুজন বাজনা বাজাতেন।
গ্রামের মধ্যিখানে একটি শিবমন্দির ছিল। বছরে দুটি উৎসব হতো, শিব চতুর্দশী ও
চড়ক। শিব চতুর্দশীর দিন মেয়ে ও মহিলারা উপোস করে লাইন দিয়ে শিবলিঙ্গের উপর জল ঢালেন।
গ্রামের মাইল দুরে এক শিব মন্দির আছে। এই মন্দিরের ঠাকুর খুব জ্রাগত।সারা বছর বহু পুরুষ
মহিলা মন্দিরে গিয়ে নানা কামনা করে হত্যে দেন। অনেকে ঠাকুরের আদেশ পেয়ে মনোকামনা পুরন
হয়েছে। ঘটনা না রটনা কেউ যাচাই করে না।
গ্রামে শিবু দে নামক এক যুবক বাস করেন। শিবু কাকার শরীর শক্ত পোক্ত । কাজ কর্মে
বেশ পারাদর্শী। বয়স ত্রিশ বত্রিশ হবে। শিবু কাকার বছর পাঁচেক আগে বিয়ে হয়েছে
। বিয়ের সময় চাঁপা কাকীমার বয়স ছিল বারো। ইতিমধ্যে শিবু কাকার বাবা মা মারা গেছেন।
মা একটি দুঃখ নিয়ে মারা গেছেন কিন্তু তিনি
নাতি নাতনির মুখ দেখে যেতে পারলেন না।
“কিরে শিবু, মু কি নাতির মুহ ন দেখি মরি যবি” মা অনেক বার শিবুকে বলেছেন। শিবু
কথা কানে নেয় না কিন্তু চাঁপা কাকীমার মনে একটি চাপা দুঃখ ছিল। কাউকে বলতো না, গুমরে
গুমরে মরতো। হয়ভো তার বাপের বাড়ীতে আলোচনা হতো। গ্রামে দিকে য বিবাহিত মহিলার বাচ্চা
হতো না, তাকে অন্যান্যরা হেয় চোখে দেখতো। তার মুখ দেখে কাজে বেরলে সে কাজ হয় না। এই
মহিলাদের অপয়া মনে করা হতো একদিন সকালে উঠে শিবু কাকা চাঁপা কাকীমাকে ঘরে দেখতে পেল
না। পাড়ায় পরে গ্রামে খুঁজে কোথাও পাওয়া গেল না। শিবু কাকা দমে গেল না। সে চুপি চুপি
কোথায় যেন বেরিয়ে গেল। সে সটান গিয়ে উপস্থিত হলো ঔ শিব মন্দিরে। গিয়ে মহিলা হত্যেকারীদের
মধ্যে চাঁপা কাকীমাকে দেখতে পায় এবং গ্রামে ফিরে জানালো চাঁপা কাকীমা পাওয়া গেছে। সকলে
হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো। পাঁচদিন পর চাঁপা কাকীমা ফিরে এল। মন খুব খুশি খুশি। কি হলো, কাউকে
বলছে না। মন্দিরে যওয়ার সময় কাউকে বলা যায় না, ফিরে এসে কি হলো বলা যাবে না। মন্দিরে
হত্যে দিতে বেশীর ভাগ মহিলারাই যেতেন। প্রথমদিন থেকে উপোস থেকে হত্যে দিতে হতো। শুধুমাত্র
চরণামৃত খেয়েই দিন কাটাতে হতো। এর ফলে শরীর ক্রমাগত দুর্বল হতে থাকে এবং সঙ্গে সঙ্গে
মনও দুর্বল হতে থাকে। এক চিন্তায় থাকার জন্য মন একাগ্র হয়। কারো কারো মন অবচেতন স্তরে
পৌঁচায়। এর প্রভাবে স্ব্প্নবৎ কিছু উপলব্ধি হয়। এটাকে বাবার আদেশ মনে করা হয়। কারো
কারো ক্ষেত্রে ঘটেও যায়।
গ্রামে যদিও কোনো বৈষ্ণব বাস করতেন না কিন্তু গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষ্ণ ও
চৈতন্যদেবের ভক্ত। গ্রামবাসীরা গরীব হওয়া সত্ত্বেও তারা চাঁদা দিয়ে বছরে কার্ত্তিক
মাসে দুদিন ধরে কীর্তনের ব্যবস্থা করা হয়। এ দিন গ্রামে ভক্তির প্লাবন আসে। নারী পুরুষের
কপালে তিলক আঁকা। কার্ত্তিক মাসকে ধর্মমাস বলে মান্য করা হতো। মহিলারা গোটা মাস নিরামিষ
খান। বছরে প্রত্যেকদিন তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালানো হতো কিন্তু কার্ত্তিক মাসে প্রদীপ
জ্বালানোর বিশেষ ব্যবস্থা হতো। একে স্বর্গদীপ বলা হতো। তুলসী তলাতে একটি লম্বা বাঁশ
মাটিতে গভীর করে পুঁতে দেওয়া হতো। বাঁশের ডগায় একটি আঁকশি বাধা হতো। একটি শক্ত দড়ি
নীচ থেকে আঁকশির ভিতর দিয়ে ঘুরিয়ে আবার নীচ পর্যন্ত নামিয়ে দড়ির শেষে একটি শিকা লাগানো
হতো। ঐ শিকাতে এক নুতন চাল বাটার সাদা রং মাখানো ও সিঁদুর লাগানো হাঁড়ি রাখা হতো। প্রত্যেক
দিন সন্ধ্যা নামলে হাঁড়িতে জ্বলন্ত প্রদীপ
রেখে উপরে তুলে দেওয়া হতো। এতে নাকি যারা মরে স্বর্গে গেছেন তাঁদের আত্মার শান্তি কামনায়
জ্বলন্ত প্রদীপ স্বর্গের দিকে তুলে দেওয়া হতো। ভোলা ভেবে পায় না পৃথিবী থেকে আলো স্বর্গে
যেতে পারে কি ?
ভোলা তখন নবম শ্রেণীতে পড়ে। কীর্তন উপলক্ষে বাড়ী এসেছে। যথারীতি কীর্তন শুরু
হলো। খোল করতাল বাজানো ও গান করার দুটি দল তৈরী হয়েছে। একটি দল ছয় ঘন্টা করে কীর্তন
করেন তারপর ওরা বিশ্রাম নেয় ও অন্য দল কীর্তন করতে থাকেন। কীর্তন আরম্ভ হওয়ার সকালে
ভোলা গিয়ে সেখানে হাজির হয়। গিয়ে দেখে একটি
মঞ্চ তৈরী হয়েছে। মঞ্চের চারকোনে কলাগাছ বাঁধা। তিনদিক রঙিন নুতন সস্তা শাড়ী দিয়ে ঘেরা
হয়েছে। গাঁদাফুলের মন্ডপ সুন্দর সাজানো। মাঝখানে চৈতন্যদেবের ছয়হাত বিশিষ্ট কাঠের বিগ্রহ।
বিগ্রহের পাশে নামাবলী গায়ে এক বৈষ্ণব পুজো করছেন। ছয় হাত দেখে ভোলা একটু অবাক হলো,
ভোলার জানার আগ্রহই নুতন কিছু জানতে চায়, মনযোগ দিয়ে শুনে মনে রাখে। সে ঠাকুর মশাইকে
জিজ্ঞাসা করলো “ চৈতন্যদেবের ছয় হাত কেন ?”
“ এই বিগ্রহকে ষড়ভুজ বলা হয়। এই রূপ গৌরাঙ্গ চৈতন্য
মহাপ্রভুর
একটি
দিব্যরূপ।
এই
দিব্যরূপের
মধ্যে
শ্রীরামের
ধনুর্বাণ,
সন্ন্যাসগ্রহণরূপী শ্রীচৈতন্যের দণ্ড ও
কমণ্ডলু
ও
বংশীবাদনরত
শ্রীকৃষ্ণের
সমন্বয়
ঘটেছে।
এই
দিব্যরূপটি
চৈতন্যচরিতামৃত ও চৈতন্যভাগবত অনুযায়ী
যথাক্রমে
শ্রীবাস
নবদ্বীপে
এবং
বাসুদেব
সার্বভৌম
নীলাচলে
দর্শন
করেছিলেন কারন ত্রেতা যুগের শ্রী শ্রী রামচন্দ্র ও
দ্বাপরের শ্রীকৃষ্ণ কলি যুগে শ্রীচৈতন্য হয়ে জন্মেছিলেন।“
ভোলা আরো কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল তখন ঠাকুর মশাই বললেন “খোকা তুমি বিকালা
এসো, তোমার প্রশ্নের উত্তর দেবো, এখন পূজো হচ্ছে তো”।
ভোলা লক্ষ্য করলো, ঠাকুর মশাই নম্র, ভদ্র, মাটির মানুষ কিন্তু জ্ঞানী। ভোলার
পড়া কালীদাস রায়ের লেখা “ত্রিরত্ন” কবিতাটি মনে পড়লো।
“তরু হতে
যেবা সহিষ্ণু, তৃণ হতে দীনতর
সেই বৈষ্ণব,-জয়গৌরব ভাবে না কভু বড়ো।“
মঞ্চের সামনে
মোটা করে খড় পাতানো। এর উপর তিনজন খোল ও কাঁসর বাজাচ্ছেন আর একজন কীর্তন গান করছেন।
গান হচ্ছে :
“একবার কৃঞ্চ নাম নিলে যত পাপ
হরে
জীবের
কি সাধ্য আছে তত পাপ করে
তোমরা
কৃষ্ণ ভজ তোমরা কৃষ্ণ ভজ “
ভোলার
কীর্তন শুনতে খুব ভালো লাগে। এ বছর নুতন এক অনুষ্টান সংযোজন হয়েছে। ওখানে কালু ও এই
বয়সের ছেলেরা জড়ো হয়েছে। এরা সকলে স্কুলছুট, কাছাকাছি কোনো মাধ্যমিক স্কুল নেই বলে
ওরা পড়াশুনা ছেড়ে দিয়েছে। এতে সংসারে আর একজন কাজের লোক পাওয়া যায়। সংসার একটু সচ্ছল
হয়। এই বাচ্চা বয়স থেকে ওরা সমস্ত কাজ করে। মাঠে লাঙ্গল করে, বীজ বোনে, পাকা ধান কাটে।
ভোলা ভাবে শিক্ষা আলোক বর্ত্তিকার মতো মানুষকে জীবনে আঁধার পথে আলো দেখিয়ে সামনে এগোতে
সাহায্য করে। সরকারের প্রধান কাজ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করা। দেশ
স্বাধীন হয়ে অনেকদিন হলো কিন্তু কোনো সরকার ঠিকমতো কাজ করছে না। গ্রামের মহিলা স্নান
আসতে শুরু করছে, মাথায় বিশাল ঘোমটা টানা। এটই রেওয়াজ, বাড়ীর বাইরে গেলে বা বাড়ীতে কোনো
পুরুষ মানুষ গেলে মহিলাদের ঘোমটা দিতে হতো।
কালু ভোলাকে কিছু বলছিল কিন্তু হরি সংকীর্তেনের আওয়াজে ভোলা ভালো করে শুনতে
পাচ্ছিল না। তাই তারা একটু দুরে গেলে কালু বললো,
“এবারে
পরশু দিন কতিরু তিন দিন কৃষ্ণযাত্রা হব”
“কৃষ্ণযাত্রা
কিস রে ?”
“রাধাকৃষ্ণ
জীবনী লেই যাত্রা হয়, শুনুছি রাধা ও কৃষ্ণ দুই জনই ঝিয়”।
“
কেউটু আসুছি ?”
“
পরান কাকা তার শশুর ঘর যাইথিলে, সেঠি এই যাত্রা হউথিলা, সিয়ে বায়না করি দেইচন”।
ভোলা
ভাবছে, এ আবার কেমন যাত্রা, মেয়েরা ও অভিনয় করে। তাদের গ্রামেও যাত্রা হয়। গ্রামের
কিশোর যুবক পৌঢ়রা অভিনয় করে। এখানে মহিলা চরিত্র ও পুরুষরাই করে। ওর মধ্যে এক উত্তেজনা
খেলতে থাকে কারন মেয়েরাও অভিনয় করছে এটা ও ভাবতেও পারচ্ছে না। যখন মেয়েরা প্রায় ঘরে
বন্দি থাকে বিশেষত অবিবাহিত মেয়েরা লজ্জায় কথাই বলে না, তখন মেয়েরা যে অভিনয় করছে তাতে
সমাজ এগোচ্ছে। সে এই অভিনয় দেখার জন্য উৎগ্রীব হয়ে উঠলো।
তারা
আবার মন্ডপে ফিরে এলো। ক্রমাগত ভীড় বাড়ছে। ভোলা দেখলো সেন খুড়িমাকে তাঁর প্রতিবেশী
কাকীমা ধরে ধরে নিয়ে আসছেন। তাঁর স্বামী প্রায় বছর দশেক আগে মারা গেছেন। তাঁদের কোনো
সন্তানাদি ছিল না। সেন জেঠু এক সকালে মাইল ছয়েক দুরে তাঁর এক কুটুম বাড়ী গিয়েছিলেন।
সে সময় বড় রাস্তাও ছিল না যানবাহনও না। লোকেরা
হেঁটেই যাতায়াত করতো আর যে মহিলাদের সদ্য বিয়ে হতো তারা শশুরবাড়ী থেকে বাপের
বাড়ী বা বাপের বাড়ী থেকে শশুরবাড়ী পালকীতে যাতায়াত করতো। সেন জেঠু কাজ শেষ করে বেরতে
সন্ধ্যা হয়ে যায়। বাড়ী ফেরার পথে এক শ্মাশান পড়ে। শ্মশানের ধারে এক জঙ্গল আছে। সেদিন
ম্লান জ্যোংস্না আলোকিত রাত। আলো আঁধারে একা পথ চলেছেন। একটি গ্রামের পর বিরাট মাঠ
পার হতে হতো। সন্ধ্যার পর মাঠ জনশূণ্য হয়ে যেত। সেন খুড়ো বাড়ী ফিরে খুড়ি মা বলেছিলেন
“মু ঘরকু আসুথিলি। শ্মশান ধার দিই আসিবা বেলে দেখিলি গটে লম্বা হেই ধপধবে শাড়ী পঁহরি
বনকু চালি গলা, মতে ভয়বি লাগি থিলা।‘
খুড়ি
মা বলছিল “ হউ, তুমে খাইকি রাম নাম করি শুই যাও”
সেন
খুড়ো সেই যে শুলো সকালে আর উঠলো না। সকলে বললো “শ্মাশান ভুত মারি দেইচি” ভোলা তখন ছোট
ছিল তাই রটনাকে ঘটনা বলে বিশ্বাস করেছিল। এখন ভোলা এই ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করে একে
ভুতের কাজ বলে বিশ্বাস করে না। মৃত্যুর কারন অন্য হতে পারে। তখন মরে গেলে ডাক্তার না
থাকায় মৃত্যুর কারন ধরা যেত না।
ভোলার
রবীন্দ্র্নাথ ঠাকুরের কবিতা মনে এলো:-
“ যেথা তুচ্ছ আচারের মরু-বালু-রাশি
বিচারের স্রোতঃপথ ফেলে নাই গ্রাসি “-
·
খুড়ি মা
সেই থেকে একাই থাকেন। প্রথম প্রথম খুড়িমা একা একা রান্না করতেন। এখন পাড়া প্রতিবেশী
ওঁর ভার নিয়েছে। গ্রামের প্রায় পরিবার পাশাপাশি থাকে। কারো বসতের চারপাশে প্রচীর তো
ছিল না এমন কি বেড়াও থাকতো না। অধিকাংশ পরিবার ছিল যৌথ পরিবার। চার পাঁচ ভাই একসঙ্গে
ও এক বাড়ীতে থাকতো।যৌথ পরিবারে অনেক
সুবিধা ছিল। মনে একাকত্ব আসার কোনো সুযোগ ছিল না। হৈ হৈ বা ঝগড়া করে দিন কেটে যেত।
সংসারের দুঃখ কষ্ট বিপদ সকলে ভাগ করে নিত। যে কোনো ব্যাপারে গ্রামের লোকরা
সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত। গ্রামের যে কেউ যে কোনো বাড়ীতে অবাধে যেতে পারতো।
সকালে বা সন্ধ্যায় গেলে দই ও অন্যান্য সহযোগে মুড়ি আর দুপুরে গেলে ভাত খাওনোর পর পান
দেওয়া হতো। এক ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ
সম্পর্ক ছিল।
এই
কীর্তন গ্রামের সকলকে আন্দোলিত করতো। সারাদিন কীর্তন তন্ময় হয়ে শোনায় গ্রামবাসীরা দৈনন্দিন
দুঃখ কষ্ট ভুলে এক নুতন অনুপ্রেরনায় উজ্জীবিত হতো। ভক্তির তন্ময়তার এক উপযোগিতা আছে।
ভক্তি একটি যোগ। জ্ঞানযোগ, কর্মযোগ, রাজযোগ করতে অসমর্থ হলে ভক্তিযোগ অনুশীলনের দ্বারা শারীরিক, মানসিক
এবং
আধ্যাত্মিক
উপকার
আসতে
পারে। গ্রামবাসীরা অশিক্ষিত তাই ভক্তিই তাদের সরল
ও সহজ পথ এবং এতে পাপ পুণ্যের পরিষ্কার ধারনা মনে গেঁথে থাকে। প্রতিদিনের ভক্তি হল
একটি
আধ্যাত্মিক
শৃঙ্খলা
যা
আমাদের
সত্য ও
জীবনের
ঝড়ের
মাঝে
প্রতিদিনের
আশ্রয়
হিসেবে
কাজ
করে। ভোলার সংস্কৃত স্যার ক্লাসে একদিন বলেছিলেন
“শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ আরম্ভের আগে
বলেছিলেন সকল ধর্ম পরিত্যাগ করে শুধু ঈশ্বরের শরণাগত হলে তিনি সমস্ত পাপ মুক্ত করবেন।
ঈশ্বরের প্রতি প্রকৃত ভক্তি থাকলে সে পাপ কর্ম করতে বিরত থাকে”। হয়তো এই জন্যই গ্রামবাসীরা দুষ্কর্ম করতে সাহস করে না।
ভোলা প্রায় দুপুর পর্যন্ত কীর্তন শুনলো। তারপর বাড়ী
গিয়ে মধ্যাহ্ণ ভোজন করে আবার মন্ডপে হাজির হলো। তখন কীর্তনের অন্য দল গান করছে –
“ভজ গৌরাঙ্গ কহ গৌরাঙ্গ লহ গৌরাঙ্গের নাম রে
যে জন গৌরাঙ্গ ভজে সে হয় আমার প্রাণ রে “।
বিষয়ে বলি শোন। বৈষ্ণব দর্শনের
মূল
কথা
আত্মার
সাথে
পরমাত্মার
মিলন
এবং
এই
একাত্মতারকিছুক্ষন পর সে ঠাকুর মশায়ের কাছে গেল। সকালের পুজো হয়ে গেছে
আবার সন্ধ্যায় পূজো ও আরতি হবে। ঠাকুর মশাই ভোলাকে স্স্নেহে বললেন “এসো বাবা আমার কাছে বসো। তোমার এই বয়সে জানার
আকাঙ্খা দেখে আমার খুব আনন্দ হয়েছে। আমি বৈষ্ণব
জন্য যে
পথ হয় তা
হলো,
কেবলমাত্র
প্রেম
ও
ভক্তি
এবং
সম্পূর্ণরূপে
অহিংসা অবলম্বন করা । বৈষ্ণব দর্শনে
পরমাত্মার
উপাসনার
জন্য
সকল
প্রকার
জাগতিক
গুন
বর্জন
করে
নির্গুণ
হয়ে
পরমাত্মার
সাথে
একাত্ম
হওয়ার
উপদেশ
রয়েছে। রাস পূর্ণিমা একটি
স্বর্গীয়
উদযাপন
যা
বৈষ্ণব
ঐতিহ্যে
অপরিসীম
তাৎপর্য
বহন
করে।
কার্তিক
মাসের
পূর্ণিমার
রাতে
এই
উৎসব
পালিত
হয়। রাস পূর্ণিমা একটি আনন্দদায়ক উপলক্ষ
যা
বৃন্দাবনের
পবিত্র
ভূমিতে
গোপীদের
সাথে
ভগবান
কৃষ্ণের
ঐশ্বরিক
নৃত্যকে
চিহ্নিত
করে। এই ষড়ভুজ বিগ্রহ হলেন তিন অবতার-শ্রীরাম, শ্রীকৃষ্ণ
ও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভূর মিলিত রুপ । ভগবান ত্রেতা যুগে রাম অবতার, দ্বাপরে কৃষ্ণ অবতার
ও কলিযুগে চৈতন্য অবতারে আবির্ভূত হয়েছেন।“
আত্মা ও পরমাত্মা কি ?
“ সহজ কথায় বললে ঈশ্বরের শক্তিই পরমাত্মা ও প্রত্যেক জীবের মধ্যে শক্তির যে
অংশ থাকে তাকে জীবাত্মা বলে।“
“ এই দুই শক্তির কি করে মিলন সম্ভব ?”
“ কেন ? ধর, তোমার পুকুর থেকে একটি বোতলে জল তুলে আনলে, জল তখন বোতলের জল হয়ে
গেল। দুদিন পরে বোতলের জল পুকুরে ঢেলে দিলে। সেই জল পুকুরের জলে মিলে গেল। বোতলের জল
পুকুরে জলে মিশে যাওয়ার আগে কিছু কাজ করতে হয়। বোতলকে পুকুর পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়।
বোতলের ছিপি খুলে পুকুরে ঢালতে হয়। কিছু কর্ম না করলে তার প্রতিকর্ম পাওয়া যায় না।
ঈশ্বরে ভক্তি হলে মন নির্মল ও একাগ্র হয়। মনের শক্তি বহু গুণ বেড়ে যায়। পরমাত্মার
ও জীবাত্মার মিলনে হলে জীব মুক্ত হয়ে যায় “।
“ঈশ্বর এক কিন্তু প্রকৃতি অনেক রাধা ও গোপীরা
পরমাত্মার ও জীবাত্মার মিলনেই মোক্ষকে ধরা
মোক্ষ হল মায়া এবং অজ্ঞানতা
হতে
মুক্তিলাভ
ঈশ্বরপ্রেমের
দ্বারা আসে প্রকৃত জ্ঞানের উত্তাপ
প্রেমাবতার
চৈতন্যের আবির্ভাবে পায় সম্পুর্ণতা
সারা ভারতে
ছড়াল ভক্তি ও প্রেমের ভাব কথা II”
ভোলার আরও কিছু জিজ্ঞাসার ছিল কিন্তু ঠাকুর মশাই পুজোর কাজে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায়
ভোলা আর সুযোগ পেল না। দেখতে দেখতে কৃষ্ণযাত্রার দিন এসে গেল।
দুপুরের আগেই যাত্রার কুশীলবরা এসে গেল। গ্রামের একজনের বাড়ীতে ওদের থাকার ব্যবস্থা
হয়েছে। ভোলা সন্ধ্যের পরেই খাওয়াদেওয়া শেষ করে মন্ডপে হাজির হলো। সেখানে দেখলো চারটা
খুঁটি পুঁতে সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। কালু ও এসে গেছে। দুজনে মিলে সাজঘরের দিকে গেল।
ত্রিপল টাঙিয়ে সাজঘর করা হয়েছে।
ওরা উঁকি দিয়ে দেখলো, সত্যিই তিনজন মহিলাকে সাজানো হচ্ছে। একজন বয়স্কা আর দুজন অল্প
বয়সের। দুজনের মধ্যে একজনের বয়স চৌদ্দের মতো হবে। পরমা সুন্দরী। দুধে আলতা গায়ের রঙ।
মুখশ্রী অতীব আকর্শনীয়। মাথার চুল বেশ ঘন ও লম্বা। মুখে কি এক যাদু আছে। চোখ দুটি টানা
টানা।গন্ডদেশ সুডোল। কথা বলার সময় একটা মোহনীয় হাসির রেখা ঠোঁটে কোনে ফুটে উটে। সে
যেন সমস্ত দুঃখ কষ্ট মনে চেপে রেখে হাসতে পারে।
দুঃখ কষ্ট ওকে স্পর্শ করতে পারে না।বোধহয় এই মেয়েটি রাধা হবে। ভোলার মনে হলো এই মেয়েটি
তার অনেক দিনের চেনা। ভোলার চোখ মেয়েটা থেকে সরতেই চায় না।
·
অন্য
মেয়েটির বয়স পনের কি ষোল হবে। গায়ের রং শ্যামল বর্ণ। মাথার চুল কোঁকড়ানো ও ঘাড় পর্যন্ত
। সামান্য লম্বা। অন্য মহিলা বয়ষ্কা। ভোলা ওখানে আটকে আছে দেখে কালু তার হাত ধরে টানতে
টানতে মন্দির প্রাঙ্গনে নিয়ে গেল। ভোলার কিন্তু মন পড়ে আছে। সে ভাবছে তার এমনটা হলো
কেন। এ কি বয়সের দোষ না পূর্বজন্মের কোনো সম্পর্ক আছে ? ভোলা আবার পূর্বজন্ম ও পরজন্ম
বিশ্বাস করে না । তবে বয়সের জন্য হয়েছে। সে সুকান্ত ভট্টাচার্যের বিখ্যাত কবিতা ” আঠারো
বছর বয়স “ মনে পড়লো। সতের আঠারো বয়ঃসন্ধির কাল। এই কবিতা পড়াতে গিয়ে বাংলা স্যার এই
বয়সের বৈশিষ্টের কথা আলোচনা করেছিলেন। বয়ঃসন্ধিকাল সেই
ক্রান্তিকালকে বোঝায় যখন একটি ছেলে বা মেয়ের মধ্যে
মানসিক
ও
সামাজিক
পরিবর্তন
ঘটে।
শরীর এই সময় প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে রূপান্তরিত হয় এবং প্রজননের সক্ষমতা লাভ
করে। বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে-মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন খুব দ্রুত ঘটে। এই সময় ছেলে ও মেয়ে উভয়ের মধ্যে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি শারীরিক ও মানসিক আকর্ষণ তৈরি হয় ও প্রেমের
সম্বন্ধ গড়তে চায়। এটা স্বাভাবিক, শরীরে হরমোনের প্রভাবে নানান পরিবর্তন হয়।
তবে ভোলা বুঝতে পারে না কেন এক বিশেষের প্রতি প্রথম দেখাতে আকর্ষিত হয়।“প্রথম
দর্শনে প্রেম” এর কথা শুনেছে। প্রথম দেখায় কিন্তু ভালোলাগা বা আকর্ষণ হয়, প্রেম হয়
না। প্রেমের সম্পর্ক দীর্ঘকালীন মানসিক বন্ধন। প্রথম ভালোলাগার পর যদি যোগাযোগ
বাড়তে থাকে তবে প্রেমে পরিণত হয়। তবে প্রথম দেখায় একজন ভালোলাগে কেন ? ভোলার মনে
হয় প্রত্যেকের মনে একটি ভালোলাগার চেহারা অবচেতন মনে সুপ্ত ভাবে থাকে, সেই চেহারা
সঙ্গে সামনের চেহারার মিল হলে আকর্ষিত হয়। এ এক প্রকার আবেগ। আবেগ এমন একটি মানসিক অবস্থা যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে উদ্ভূত হয় এবং এটি শারীরিক ও মানসিক উভয় অবস্থাকে প্রভাবিত করে।
ভোলা ও কালু সামনের সারিতে
বসার জায়গা করে বসে গেল যাতে ঐ মেয়েকে ভালো ভাবে দেখতে পায়।ভোলা কালু পাশাপাশি বসলো।
সকলে জড় হতে লাগলো। আজকার পালার নাম “ মাথুর”।যাত্রাপালা শুরু হলো। ভোলা অপেক্ষায় বসে
আছে ঐ মেয়েটা কখন আসবে। প্রথমে বয়স্কা মহিলা “বৃন্দা” গান করতে করতে মঞ্চে প্রবেশ করে
“গৌরচন্দ্রিকা” গান করলেন ।
তারপর রাধা ঢুকতেই ভোলার বুকে
কে যেন এক হাতুড়ীর ঘা দিল। বুকটা ঢিপ ঢিপ করতে লাগলো। শ্রীকৃষ্ণ কংসকে বধ করতে মথুরা
গেছেন। কৃষ্ণের বিরহে রাধা দুঃখে কাতর। রাধার তৃষিত প্রাণ দিবস রজনী শ্যাম দরশন আশে আকুল। জীবন অহরহ হুতাশন প্রায় জ্বলছে। চণ্ডীদাসের লেখা বিরহ
সম্বন্ধে একটি পদ মনে এল-
“রাধার কি হৈল অন্তরের ব্যাথা |
বসিয়া বিরলে
থাকায়ে একলে
না শুনে কাহারো কথা ||
সদাই ধেয়ানে
চাহে মেঘ-পানে
না চলে নয়ান-তারা |
বিরতি আহারে
রাঙাবাস পরে
যেমত যোগিনী-পারা ||”
পালা চলাকালীন দুজনের মাঝেমধ্যে
চোখাচোখি হচ্ছে। চোখে চোখ পড়লেই ভোলার হৃৎপিণ্ডের
গতি বেড়ে যাচ্ছে। শরীর ঘেমে যাচ্ছে। এক শিহরণ শরীরে খেলা করচ্ছে। ভোলা ভাবছে এ আবার
কি রোগ রে বাবা। এমন হচ্ছে কেন ? ও মেয়েটার কি একই রকম হচ্ছে নাকি। ভোলা কোনো বইতে
পড়েছিল, মনের এক তরঙ্গ আছে। এই তরঙ্গ গিয়ে অন্য মনে প্রতিক্রিয়া করে ? ভোলা ভেবেও কোনো
সিন্ধান্তে পৌঁচতে পারল না। যাত্রাপালা শেষ হলো। ভোলা বাড়িতে গিয়ে শুয়ে পড়লো। মাথা
ঔ মেয়েটার চিন্তা কিছুতে বেরচ্ছে না। এই সব চিন্তা করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে বুছতে
পারে নি। সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরী হলো কিন্তু মাথায় একই চিন্তা বসেই আছে। কোনোক্রমে
মুখ ধুয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো যাত্রা দল যার বাড়ীতে আছে সেখানে উপস্থিত হলো। বাড়ীর সামনে
গিয়ে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ পর ঐ মেয়েটি বেরিয়ে এসে একটু দুরে অধোবদনে দাঁড়লো। দুজনে চুপ
করে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটি কোনো কথা বলছে না, চোখও তুলছে না। ভোলার অস্বস্তি বাড়ছে। তাই
সে জিজ্ঞাসা করলো:-
“ তোমরা কোথা থেকে এসেছ ?”
“ এখান থেকে প্রায় কুড়ি মাইল
উত্তরদিকে আমাদের বাড়ী। কার্তিক মাসে পর থেকে আমরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে যাত্রা অনুষ্টান
করি “।
“ তুমি কি দলে মাসিক মাহিনায়
কাজ কর ?”
“ না। এ দলটা আমার বাবা। তিনিই
সমস্ত দেখাশুনা করেন। তিনি আমাদের সঙ্গে থাকেন :”
“ তোমাদের ওখানে মেয়েদের যাত্রায়
অভিনয়ে বাধা নেই ?”
“ আমাদের গ্রাম শহর ঘেঁসা,
তাই এ রকম কোনো বাধা নিষেধ নেই। আমাদের অবস্থা খুব ভালো নয়। এই কয় মাস এইভাবে উপার্জন
করি “
“ তোমার অভিনয় করতে ভালো লাগে
?”
“ অভ্যাস হয়ে গেছে “
এমন সময় বাড়ী থেকে ডাক শুনা
গেল “ মা মাধুরী কই গেলি “
“ বাবা ডাকছেন, আমি যাই” বলে
মেয়েটি ধীর গতিতে চলে গেল। ভোলা মেয়েটার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে ও ভাবছে ওর মধ্যে
এক মুগ্ধতা আছে । শান্ত, ধীর কথার মধ্যে এক মিষ্টতা আছে। ভোলা ভাবতে ভাবতে বাড়ীর পথে
পা বাড়ালো। মেয়েদের মধ্যে যদি মেয়েলি গুণ না থাকে তবে তাকে মেয়ে বলা যায় ? ভোলা শরৎচন্দ্রের
কয়েটি উপন্যাস পড়ে ফেলেছে। মাকে কাছ দেখেছে, তাঁর স্নেহ, মমতা, ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস
ও কর্মদক্ষতা লক্ষ্য করেছে। সে বা তার বাবা অসুস্থ হলে মায়ের সেবাও তার নজর এড়ায় নি।
সৃষ্টিকর্ত্তা পরিকল্পনা করেই ব্রহ্মান্ড তৈরী করেছেন। এতে কিছু বৈচিত্র ও ব্যাতিক্রম
থাকবেই।
বাড়ী গিয়ে ভোলা স্থির করলো
আজ বিকালা সে স্কুল বোড়ং এ চলে যাবে। আবেগকে বাড়ালে বাড়তে থাকবে। এখানে থাকলে যোগাযোগ
বাড়বে। দুরে থাকলে আবেগকে দমন করা যাবে।
৩য় পরিচ্ছেদ
সেই সময়ে প্রত্যন্ত গ্রামে বিনোদন বলে তেমন কিছু ছিল না।
মহিলা, পুরুষ, কিশোর ও কিশোরী সকলে মুখের খাবার জোগাড়ের জন্য বার ঘন্টা পরিশ্রম করে।
বিনোদনের সময় কোথায় ? কিন্তু সারা বছর ঘরে ঘরে ছোটোখাটো অনুষ্টান লেগে থাকে। তাতেই
একঘেয়েমি জীবনে একটু বৈচিত্রের বাতাস লাগে। তখন গ্রামে ইংরাজী কেলেন্ডার ব্যবহৃত হতো
না। বৈশাখ মাসের পয়লা নববর্ষ পালিত হয়। তেমন কোনো অনুষ্টান হতো না। পুকুর থেকে বড় মাছ
ধরা হতো। দু চার রকম পদ রান্না হতো। কয়েক জন বন্ধুবান্ধব আসতো। দিনটা একটু হৈচৈ করে
কাটতো।
ভাদ্র সংক্রান্তিতে মনসা পূজোর দিন পালিত হতো
'অরন্ধন'।
এই
অরন্ধনটিতে ভাদ্রের শেষদিন রেঁধে আশ্বিনে খাওয়ার চল ছিল ।
ভাদ্র সংক্রান্তির আগের দিন রান্না
করে,
সংক্রান্তিতে
মা
মনসাকে
উৎসর্গ
করে
তবে
খাওয়া
হতো।
প্রাচীন
রীতি
অনুসারে
পরের দিন
বাসি
খাবার খাওয়া হতো। আগের রাতে বিভিন্ন ভাজাভুজি,
নানা তরকারী ও ভাত হওয়ার পর ভাতে জল ও বেশী করে নারকেল কোরানো মিশিয়ে রেখে দেওয়া
হতো। এই নারকেল পান্তাভাত ভোলার খুব প্রিয় ছিল। দুটি তরকারী অবশ্য করতে হতো, সজনে
পাতার শাকভাজা ও লাউ তেঁতুলের চাটনী, একে” সাকরা” বলা হতো। পরের সকালে উনুন
পরিস্কার করে গোবর ও সাদা মাটি মিশিয়ে লেতা দেওয়া হতো।
ভোলা এখন দশম শ্রেণীতে পড়ে। সে একদিন আগে বাড়ী
এসেছে। মা সকাল সকাল স্নান করে উনুনের পরিষ্কারের কাজ করছেন। সে দিন রান্না বন্ধ
রেখে উনুনকে পূজো করতে হয়। ভোলার দিদিমা এসেছেন। আজ মামাও আসার কথা। দিদিমা নাতির
গল্প হচ্ছে।
ভোলা দিদিমাকে জিজ্ঞাসা করলো “তুমে ভুত দেখিছ ?”
দিদিমা সেকালের মানুষ, ভুতে সংস্কার তো থাকবেই। “ কেতে থর দেখিছি। সিয়ে প্রায় দুই
বরস আগে, মু রাতিরে বাহারকু যাইছি, সেদিন জ্যোৎস্না রাতি। আম ঘর ধাররে যে বন অছি,
সইঠি সাদা সাদা ধুতি পরি ঘুরুচি। মু ঘরকু আসি শুই গলি”
“আচ্ছা দিদা আজি অরন্ধন হয় কেনে ? “
“কেতে দিনরু হেয়ি আসুছি, কেনে হয় মু জানে নি “।
দিদিমা অক্ষর জ্ঞান শূণ্য। গ্রামে কেউ জানে না যে
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় অরন্ধনের ডাক দেওয়া হয়েছিল। অরন্ধন একদিকে ভালো।
মহিলারা একদিন রান্না থেকে ছুটি পান। দেখা গেল কালু আসছে। নিশ্চয় কোনো না কোনো খবর
নিয়ে আসছে। তার হাঁটু পর্যন্ত কাদায় ভর্তি। সে আঙিনায় দাঁড়িয়ে বললো “ ভজুর বাবাকু
কাল রাতিরে সাপ কামড়িছি, ওঝা আসিছি।‘ ভোলা কালুকে বল “ যা পুখরিরু গুড় ধুই আয়”
কালু চলে গেলে ভোলা ভাবতে লাগলো অশিক্ষার জন্য গ্রামাঞ্চলে কত কত কুসংস্কারকে বহন
করে চলেছে। কেউ ভাবে না এগুলো ঠিক না ভুল, যুক্তি দিয়ে বিচার করে না। যেটা চলে আসছে,
তাকে অন্ধের মতো অনুসরন করে। আষাঢ় মাস গ্রামাঞ্চলে সাপের উপদ্রব বেড়ে যায়।
কাছাকাছি কোনো হাসপাতাল নেই, তাই লোকেরা ওঝার সাহায্য নিতে বাধ্য হয়। গভীরভাবে
চিন্তা কেউ করে না।
এর মধ্যে কালু ফিরে এসেছে। মামাও এসে পৌঁচালেন।
ভোলা মামাকে হাঁটু গেড়ে প্রনাম করলো। দেখাখেখি কালু ও প্রনাম করলো। কেউ বড়রা
বাড়ীতে এলে প্রনাম করার রীতি। এরপর তার পা ধোয়ার জন্য একটি চৌকি, এক বালতি জল ও গামছা, একটি ঘটি দেওয়া
হয়। পা ধোয়ার সময় ঘটিতে জল নিয়ে পায়ে ঢেলে দিতে হয়। তারপর গামছা দিয়ে মুছে দিতে
হয়। ভোলা তাই করলো। সেই সময় “ অতিথি দেবো ভব”। অতিথিকে খুব সম্মান করা হতো।
ভোলার মা উনুন পূজো পর মনসা পুজো করে এলেন। ভোলার
বাড়ীর উত্তরদিকে চৌহদ্দির কাছে এক ফণী মনসার গাছ ছিল। সেই গাছকে মনসা বলে পূজা করা
হতো। সাপের ভয় থেকে রক্ষা পেতে মনসার পূজা হতো কিন্তু ভোলা বুঝে পেল না এই গাছ
মনসা কি করে হলো।
ভোলা ও কালু নারকেল পান্তাভাত খাওয়ার পর কালুকে
বললো সাপেকাটা লোকের বাড়ী যাওয়ার কথা। তারা ভজুর বাড়ী গিয়ে দেখলো কয়েকজন লোক
দাঁড়িয়ে। উঠানে ওঝা তার চিকিৎসা করছে। ভোলা ব্যাপারটা ভালো ভাবে পর্যবেক্ষন করলো।
তারপর ওঝাকে সাপে কাটা জায়গাটা দেখাতে বললো। জায়গাটা ভালো দেখে বুঝলো ওখানে চারটি
দাঁতের দাগ রয়েছে। সে জোরে জোরে বললো “ভয়র কিছি নাই। যে সাপ কামড়িছি তার বিষ নাই”।
ভোলা বইতে পড়েছে বিষধর সাপ কামড়ালে দুটি দাঁতের স্পষ্ট ও গভীর দাগ দেখা যায়। এখানে
তেমন কিছু নেই। বিষধর কামড়ের অন্য লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। বিষধর সাপ কামড়ালে ওঝার
কিছু করার থাকে না। বইতে অনেক কিছু জানার বিষয় থাকে কিন্তু অনেকে পড়ে, কেউ মনে
রাখে না তাই প্রয়োগ করতে পারে না। এমন কেন হয় ভোলা জানে না। এর মধ্যে রোগী উঠে
বসেছে। এতক্ষণ সাপের কামড়ের জন্য মরায় ভয়ে মুষড়ে পড়েছিল।
এরপর আশ্বিন মাসের শেষদিন অর্থাৎ সংক্রান্তির দিনে একটি প্রথা পালিত হতো৷ এইসময় ধানগাছে ফসল আসার সময়, ধানগাছে ফুল হয়, ধানগাছ গর্ভবতী হয়। আর ধানের ভেতরের অংশটি একেবারে দুধের মতো থাকে। যেটি পরবর্তী পর্যায়ে চালে পরিণত হয়। এই নরম মিষ্টি দুধ অংশটি পোকামাকড়ের খুব প্রিয়। ফলে ধানের উপর পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে যায়। এরা ধানের দুধ অংশটি শুষে নেয়। ধানের পুষ্টি হয় না। ধান থেকে চাল পাওয়া যায় না, সব আগড়া হয়ে যায়। ফলে কৃষকের সর্বনাশ। কৃষক পরিবারগুলি দুঃখের সীমা থাকে না।
ফসল বাঁচাতে কৃষকরা এক টোটকা অবলম্বন করতেন। কৃষকরা ধান গাছকে পোকার আক্র্রমন থেকে রক্ষা করতে এই পদ্ধতি
অবলম্বন করতেন। আশ্বিনের মাস শেষের আগের দিনে নল গাছ কেটে আনা হত। চাষীরা নিম, কালমেঘ, তুলসী, ওল, আদা, ভেট , বয়েড়া, মানকচু, চাল কুমড়ো খাড়া, নটে খাড়া, কেতকী, বেলপাতা, শশা গাছ ইত্যাদি, দশ বার রকমের ভেষজ খুব ছোটো ছোটো করে কুচি করতেন। তারপর আতপ চাল মিশিয়ে নেওয়া হত। এরপর ঐ মিশ্রণটিকে বড় পাতায় দিয়ে মুড়ে নলগাছে পাট দিয়ে বাঁধা হতো। বাঁধার সময় মুখে কোনো কথা বলা যেত না। সারা গ্রামের চাষীরা রাত জেগে যে যার বাড়ীর উঠোনে নল বাঁধার কাজ করতো। সংক্রান্তির দিন ভোরে সূর্যের আলো ফোটার আগেই এই মিশ্রণবাঁধা নলগুলে নিয়ে জমিতে ঈশান কোণে পুঁতে দেওয়া হত। বলতে হতো :-
“নল পড়িল ভুঁয়ে
যা শনি তু উত্তর মুয়ে।”
ও
“এতে অছি সরিষা কাঁকুড়ি নাড়ি
যা রে পুক ধানকু ছাড়ি ।
এতে অছি শুকতা
ধান ফলিবো মুকতা ।
এতে অছি কেঁউ
ধান হব সাত বেঁউ” ।
এতে আছে হলদি
ধান ফলবে জলদি ।
এতে আছে ওল
মহাদেবের ধ্যান করে বল হরিবোল।“
কীটনাশক ঔষধ বা রাসায়নিক সারের আবির্ভাব ঘটেনি। কীটপতঙ্গের হাত থেকে ফসল কে রক্ষা করার জন্য এই পদ্ধতিটি তৈরি করা হত, এটি তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ যুক্ত ছিল যে পোকামাকড় সহজেই আর ফসলের এলাকায় আসত না। ভোলা ও অনেক বার নল বেঁধেছে ও নল পুঁততে
গিয়েছে। খুব সকালে না খেয়ে নুতন কাপড় পরে নলগোছাকে পূজা করে জমিতে যেতে হতো। সেদিন
ঘরে পায়েস বা চাল সিদ্ধ হতো। চালের সঙ্গে ছোলা, গোটা মুগ, বাড়ীর জমিতে ফলানো
সোয়াবিন ও নারিকেল কুচি দিয়ে চাল সেদ্ধ করা হতো। অপুর্ব এর স্বাদ।
এই গ্রামে সর্বজনীন পূজা বলে কিছু হতো না। শুধু জমিদার বাড়ীতে ধুমধাম করে কালীপূজা
হতো। জমিাদার তেমন বড় জমিদার নয়। গ্রামে সকলের চেয়ে কিছু জমিজমা বেশী ছিল। তাই সকলে
তাঁকে জমিদার ভাবতো। নাম বটকৃষ্ণ সামন্ত। বড়ই সজ্জন মানুষ। বয়স ৪৭/৪৮ হবে। তাঁর একটি
মাত্র সন্তান। সে শহরে থেকে পড়াশুনা করছে। সামন্ত বাবুই গ্রামের মাথা। তিনি গ্রামে
বিবাদ বা কোথাও গন্ডোগোলের সমাধা করেন। গ্রামে পঞ্চায়েত ছিল। তবে সদস্যরা নির্বাচিত
নয়, মনোনিত। সামন্তবাবুই অন্য সদস্যের মনোনিত করতেন। মাসে দুতিন বার মহাদেব মন্দিরে
সভা বসতো। গ্রামের সুবিধা অসুবিধা আলোচনা হতো ও সমাধান করা হতো। গ্রামের সকলে এই সিদ্ধান্ত
একবাক্যে মেনে নিত।
গ্রামে একটি বড় উৎসব, তাঁর বাড়ীর কালী পূজো। তাঁর
বাড়ী মাটির দুমহলা। তাঁর দালানে পনেরো দিন আগে থেকে ঠাকুর তৈরী হতে আরম্ভ হতো। কচি
কাঁচারা ঠাকুর তৈরী করা দেখতে জড়ো হতো। ভোলাও আগে অনেক বার গেছে। কিভাবে খড় দিয়ে
কাঠামো তৈরী হয়, তারপর মাটি দেওয়া হয়। শুকালে রঙ পড়ে। গ্রামের মধ্যে চারদিকে জল ও
মাঝখানে একটি ছোট্ট একটি দ্বীপ। সেখানে মা
মঙ্গলার ছোট মন্দির। মন্দির বলতে ছয় ফুট মাটির দেওয়ায় দিয়ে ঘেরা ও খড়ের ছাউনি।তার
ভিতরে একটি মাটির উঁচু স্থান। তাতে একটি পাথর বাসানো। গোটা পাথরটা সিঁদুর মাখনো। মা নাকি খুবই জাগ্রত।
আকুলভালে তাঁর কাছে যে প্রকৃত প্রার্থনা
করে, তিনি তাঁর মনস্কামনা পুরন করেন। গ্রামে কান পাতলে মায়ের প্রভাব কতটা বোঝা
যায়। ভোলা ও মায়ের কাছে বিভিন্ন কামনা করে।
ভোলার একটি সত্য ঘটনার অভিজ্ঞতা আছে। বছর দুয়েক
আগে ভোলা মা পুকুর ঘাটে বাসন মাজছিলেন, সেই সময় মায়ের বিয়ের আংটিটি জলে পড়ে যায়।
অনেক খোঁজ করেও হদিস পাওয়া যায় না। ভোলার মায়ের মন খারাপ । সোনার পরিমান কমই ছিল
কিন্তু এক গরীবদের ঘরে এইটুকু সোনাই মহার্ঘ, আংটিটি বিয়ের একমাত্র সোনার নিদর্শণ।
দু তিন পর ভোলার মা স্নান করে ভোলাকে বলেছিলেন মায়ের কাছে যাচ্ছেন । বেশ কিছুক্ষন
পরে ফিরে এসে তিনি পুকুরে নামেন। কিছুক্ষন পরে তিনি চিৎকার করে উটলেন “পাইছি. জয়
মা মঙ্গলা”। ভোলা সেই সময় এ বিষয়ে কোনো
চিন্তা করে নি। পরে এই ব্যাপারে চিন্তা করেছে ও বিভিন্ন বই পড়েছে।
প্রার্থনা করার মূল্য পৃথিবীর সব ধর্ম সম্প্রদায় মান্যতা দেয়। এর রহস্য ব্যাপারে
স্বামী বিবেকানন্দের কথায় বলা যায় যে মনের ক্ষমতা অসাধারন। একাগ্র মনে প্রার্থনা
করলে এটা অবচেতন স্তরে পৌঁছালে এই প্রার্থনা পুরুন হয়। মনের তিনটি ভাগ রয়েছে।
সচেতন, অবচেতন ও অতিচেতন । মনের উপর স্তর সচেতন, তারপর অবচেতন ও শেষে অতিচেতন।
মনকে সাগরে ভাসমান বরফ খন্ডের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। সাগরে যখন এক বরফ খণ্ড ভেসে
থাকে। তার নয় অংশের এক অংশ দেখা যায়। আঠ অংশ জলের ভিতরে থাকে। বরফের উপরিভাগ সচেতন
মন, জলের ভিতর অংশটি অবচেতন। সমুদ্রের জলই অতিচেতন। অতিচেতন মনই সকলের মনের সমষ্টি
বা ঈশ্বরের মন। সচেতন মনের তরঙ্গ আছে । কোনো ইচ্ছা অবচেতন মনে পৌঁছে দিতে পারলে,
সেটা সফল হয়। কারন অবচেতন মনের সঙ্গে অতিচেতনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকে। মন একাগ্র হলেই অবচেতন মনে যাওয়া যেতে পারে। মন
বড়ই চঞ্চল। তাকে একাগ্র করা কঠিন কিন্তু অতি ভক্তি বা অতি ভয়ে মন অবচেতনে চলে যায়।
তখনই অলৌকিক ঘটনা ঘটে। কেউ ভুত দেখে, আবার কেউ দেবতা দেখে। মনের শক্তি অবচেতন মনে
লুকিয়ে থাকে।
কালী পূজোর দিন মঙ্গলা মায়ের সামনে জোড়া পাঁঠা বলি দেওয়া হতো। অনেক দিনের রীতি।
কালী পূজোর সকাল এক প্রহরের মধ্যে স্নান করে, কিছু না খেয়ে গ্রামের মানুষজন মন্দিরে
জড়ো হয়। পূজো ও অঞ্জলীর পর বলি হতো। পাঁঠাদুটোকে স্নান করিয়ে মায়ের সিন্দুর পরানো হতো।
একটিকে বলি কাঠে দিয়ে একজন পিছনের পা দুটো টেনে ধরে রাখতো। যে বলি দিত, তার মালকোঁচা
মারা, কোমরে গামছা বাঁধা, কপালে সিঁদুর, চোখ দুটি জবাফুলের মতো রাঙা। জল্লাদের মতো
দেখতে। গ্রামে একটি রটনা আছে যে বলি দেয়, তার সেদিন মায়ের ভর হয়। বলি দেওয়ার আগে ঢাক ঢোল কাঁসি বাজতে আরম্ভ হয় ও লোকেরা ‘মা’ ‘মা’ বলে
চিৎকার করতে থাকে এবং নিরীহ জীবের শেষ আর্তনাদ এই কোলাহলে ডুবে যায়। হাতের খড্গ নিমিষে উপরে ওঠে সজোরে নামে, ও বলির কাটা মাথা ও গলা থেকে বেরনো রক্ত মাটি তে ভেসে যায়। তখন আর একটি ছাগ কাছে দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকে। তারপর
বলি প্রদত্ত মাংস গ্রামের প্রত্যেক বাড়ী বন্টন হয়। ভোলা বলি দেখতে যেত না এবং মাংসও
খেত না। ছাগদের দেখে ভোলার বড়ই করুণা হতো। তার বিবেকানন্দের বাণী মনে পড়তো যে সব জীবেই
ঈশ্বর থাকেন। ভোলার মন বলতো এ প্রথা বন্ধ হওয়া দরকার। আগে কত না নিষ্ঠুর প্রথা
ছিল। তার মধ্যে সতী দাহ প্রথা সব চেয়ে হৃদয় বিদারক। কত না অভাগিনীকে স্বামীর চিতায়
জ্যান্ত অবস্থায় পুড়ে মরতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। কুঁড়ি থেকে ফোটার আগে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যেতে হতো।
রাজা রামমোহন রায় অনেক লড়াই করে এই প্রথা বন্ধ করেছিলেন। আর একটা ছিল কৌলিন্য প্রথা।
কুলীন ব্রাহ্মণ মেয়েকে কুলীন ব্রাহ্মণ পাত্রকেই বিয়ে দিতো। কুলীন পাত্রের অভাবে পনেরো
কুড়িটি বিয়ে করতো বুড়ো হয়ে মরার আগে পর্যন্ত বিয়ে করে যেত। এ মারা যাওয়ার সেই সব মেয়েদের
অসহনীয় জীবন কাটাতে হতো সমাজে অনেক প্রথা নির্মূল হয়েছে। এখনো অনেক বাকী। প্রকৃত শিক্ষার আলো ছড়িয়ে না পড়লে এ কুসংস্কারের অক্টোপাস
থেকে মুক্তি নেই।
এ বছর ভোলা পুজোর ছুটিতে বাড়ী এসেছে। তার এখন একটু সাহস বেড়েছে। তাই
সে সিন্ধান্ত নিয়েছে বলি দেখবে এবং ভর হলে কি হয় জানবে। দেখতে দেখতে কালী পুজোর
দিন এসে গেল। কালী পুজোর আগের দিন শোনা গেল যিনি বলি দিতেন তিনি খুব অসুস্থ ।
সামন্ত বাবু কয়েক জনের সঙ্গে আলোচনা করে আর একজনকে নিয়োগ করেন এবং আগের লোকের কাছে
পাঠানো হয়েছে আদব কায়দা শিক্ষা নেওয়ার জন্য। পরের
দিন যথারীতি পুজো আরম্ভ হলো। ভোলাও স্নান করে হাজির হয়েছে । গিয়ে দেখে বহু
লোক জমা হয়েছে। দুটি ছাগ খুঁটিতে বাঁধা। সামন্তবাবু এসে চেয়ারে বসে। ভোলাকে দেখে
বলেন “পড়াশুনা কেমন চলছে ? দেখ বাবু তুমি গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করবে তো ? তোমার
দিকে গ্রাম শুদ্ধ লোক তাকিয়ে আছে”। ভোলা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো। ঢাক ঢোল কাঁসি বাজছে। দেখতে দেখতে বলি দেওয়ার জ্ন্য
নিয়োজিত বিশু কাকা এসে গেল। সে লাল কাপড় মালকোঁচা করে পরেছে, মাথায় লাল কাপড়
বাঁধা। বিশু কাকাকে ভোলা ছোটো থেকে চেনে। বিশু কাকা একটু লম্বা, ছিপ্ ছিপে, মায়ায়
ঝাঁকড়া চুল। একটা বড় গোঁফ আছে। ছোটোরা ওকে দেখলে ভয়ে ছুটে পালায়। একটু বেশী সাহসী।
ভোলা ভাবলো সামন্ত বাবুর পছন্দ আছে। সে সাপ মারতে ওস্তাদ। সাপ দেখলে ওর ডাক পড়তো।
ভোলার মনে পড়ে সে যখন ছোটো
তার পাশের বাড়ীতে একবার রাতে এক গোখরা কুঁড়েঘরের মধ্যে দেখা গেল গোল হয়ে পড়ে আছে।
সাপটা বেশ বড়। দেওয়াল সেঁটিয়ে কন্ডলি দিয়ে পড়ে আছে ঐ ঘরের মাটির দেওয়ালে বেশ বড় বড়
ফাটল, কেউ লাঠি চালাতে সাহস পাচ্ছে না যদি ফাটলে ডুকে পড়ে। লোক মুখে প্রায় শোনা
যায় সাপকে আঘাত করলে সে যদি বেঁচে চলে যায় তবে সে এর প্রতিশোধ নেয়। এ ছাড়া লম্ফের
আলোয় ভালো করে দেখাও যাচ্ছে না। তাই কেউ কাছে যেতে পেল না। তখন একজন বিশু কাকাকে
খবর দিল। বিশু কাকা এসে দেখলো সাপটা বেয়াড়া জায়গায় আছে, লাটি চালানো যাবে না। তাই
সে লাঠি দিয়ে আলতো ভাবে সাপ টোকা দেষ। সাপটা তড়িৎ গতিতে এক ফাটলে ঢুকতে আরম্ভ
করলো। বিশু কাকা লাফিয়ে তার লেজটা ধরলো ও একজনকে বললো সে সাপটাকে টেনে আনার সঙ্গে
সঙ্গে লাঠি দিয়ে জোরে সাপের মাঝে আঘাত
করতে। তাহলে সাপটার মেরুদন্ড ভেঙে যাবে ও নড়াচড়া করতে পারবে না। লোকটা শক্ত লাটি
নিয়ে পাশে দাঁড়ালো। বিশু কাকা সাপটার লেজ ধরে টানতে লাগলো। যেই সাপটা পুরোটা
বেরিয়ে এল, লোকটা সজোরে লাঠি চালালো। ভাগ্যিস আঘাতটা ঠিক জায়গায় পড়েছিল, না হলে কি
যে হতো ভাবা যায় না। সাপটাকে মেরে পুড়িয়ে দেওয়া হলো। গ্রামে সাপ মারলে পুড়িয়ে
দেওয়া হয় কারন ফাঁকা জায়গায় ফেলে দিলে বাতাস লেগে যদি বেঁচে যায় তবে প্রতিশোধ নিতে
ছাড়বে না।
আজ বিশু কাকাকে একটু অন্য রকম লাগছে । চোখ দুটি
লাল, মনে হচ্ছে নেশা করেছে। পূজোর পর পুষ্পাঞ্জলী হয়ে গেল। বিশু কাকা আজ কেমন গুম
মেরে আছে। সেও পুষ্পাঞ্জলী দিল। তার মাথায় সিঁদুর দেওয়া হলো। একজন একটা ছাগ নিয়ে
এসে হাঁড়িকাঠে ঢোকালো। ছাগটা ম্যাঁ ম্যাঁ ভীব্র আর্তনাদ করছে। সমবেত জনতা “মা মঙ্গলার
জয়” ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত। ঢাক ঢোল কাঁসির সংমিশ্রণে বলির ঘটনা দেখার জন্য সকলে উৎগ্রীব। বলির সময় কোনো মহিলা ও শিশুকে মন্দিরে
আসতে দেওয়া হতো না। বিশু কাকা খড়্গ দুহাতে ধরে হাঁড়িকাঠের পাশে দাঁড়িয়ে বলির জন্য
প্রস্তুত। ভোলা বিশু কাকার দিকে ভালো ভাবে লক্ষ্য করে দেখলো তার হাত দুটি একটু
কাঁপছে। ঠাকুর মশাই মায়ের সামনে থেকে বেরিয়ে এসে বলি দেওয়ার ঈঙ্গিত করলেন। বিশু
কাকার খড়্গ উপরে উঠে ছাগের ঘাড়ে পড়লো কিন্তু সকলে ভীত হয়ে দেখলো ছাগ গলা থেকে
দ্বিখন্ডিত হয় নি। অর্ধেকটা কেটে সামনের দিকে ঝুলে আছে এবং সামনের দিকে ফিনকি দিয়ে
রক্ত ছুটছে। বিশুকাকা মাটিতে পড়ে থরথর করে কাঁপছে। সে একটি ভয়াবহ দৃশ্য । জনতা বিস্ময়ে বিহ্বল।
সামন্ত বাবু বিশু কাকার কাছে
এসে চিৎকার করে বললেন “ ওরে কেউ বিশুর চোখে মুখে জল দে।“
কেউ কেউ ছুটে এসে জল দিল ও বাতাস করতে থাকলো। আর
একটি ছাগকে বলি দেওয়া হলো না। সকলে আতঙ্কিত। সকলে ভাবচ্ছে কিছু একটা অঘটন ঘটবে।
এদিকে বিশু কাকা চোখ খুলছে। কিছুক্ষণ পরে বিশু কাকা উঠে মাথা নীচু করে চুপ করে
বসে।
সামন্ত বাবু বিশু কাকাকে জিজ্ঞাসা করলেন “ বিশু কি হয়েছিল খুলে বল তো
?”
বিশু কাকা ধীরে ধীরে বলতে আরম্ভ করলো। “ মু তো রানা দা কতকি যাই
থিলি। রানা দা মতে কহিথিলা সকালে ন খাই গা ধুইতে তারাপর কিছি ভাঙ খাই নিতে। ভাঙও
সে মোতে দেই থিলা। সকালা গা ধুয়ে খালি পেটরে ভাঙ খাই থিলি। মু তো কেভে ভাঙ খাই
নাহি। নিশা খুব বেশী হয়ি যাই থিলা। মোর আঁখি প্রায় আন্ধকার হেই যাই থিলা। মোর দেহ
থরু থুলা। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে সে অধোবদনে চুপ করে বসে রইল।
গ্রামবাসীদের মুখে কোনো কথা নেই। সকলে ভীত, একটা অঘটন কল্পনায় । ভোলা
বুঝতে পারলো, ভর হওয়ার রহস্যই ভাঁঙ। সে ভাবলো বলি প্রথাকে বন্ধ করার সুযোগ। সমস্ত
ঘটনার পিছনে বৈজ্ঞানিক কারন থাকে। যে কোনো ঘটনা অলৌকিক হতে পারে না। ঘটনাটা
পুঙ্খানুপঙ্খ অনুসন্ধান করলে কারন পাওয়া যাবেই। কোনো এক বইতে ভোলা পড়ে ছিল “Ex
nihilo nihil fit” । এটা বৈজ্ঞানিক সত্য। কুসংস্কারগ্রস্ত মনে চিন্তা করলে প্রকৃত
কারণ পাওয়া যায় না। শিক্ষার দ্বারা মনকে স্বচ্ছ করতে হয়।
ভোলা ধীরে ধীরে সামন্ত বাবুর
কাছে গিয়ে বললো “ এই ঘটনার মধ্যে কোনো অস্বাভিকতা নেই। আগে যে দিত, তার ভাঙ খাওয়ার
অভ্যাস ছিল তাই কাজটা গুছিয়ে করতে পারতো কিন্তু বিশু কাকু আজই প্রথম ভাঙ খেয়েছে।
বোধ হয় একটু বেশী মা্ত্রায় খেয়েছে, নুতন
বলি দিচ্ছে তাই মনে ভয়ও ছিল এবং নেশা চড়ে যাওয়ায় অপ্রকৃস্থ হয়ে গিয়েছিল”।
সামন্ত বাবু গভীর চিন্তা করতে করতে বললেন “ সবই তো বুঝলাম কিন্তু এখন
করা যায় কি ?”
“ কাকু আমি বলি কি, বলি প্র্থা বন্ধ করে দেন । মা কখনো সন্তানের বলি
চায় না। বিবেকানন্দ বলেছেন “জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর”। তিনি নিরাকার ও এক শক্তি। হিন্দু ধর্মে
বহু দেবদেবীর ধারনা আছে। কিন্তু ইসলাম, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান ধর্মে এই দেবদেবী নেই।
বিভিন্ন ধর্মে বিভিন্ন সংস্কার আছে। যে গুলো সত্যি, সব ধর্ম তাকে মান্যতা দেবে।
আমি একটা বইতে পড়েছিলাম ষড়রিপুকে বলি দিতে হয়। কাকু, অন্য ছাগটার বলি দেন না ও
যেটার অর্ধ বলি হয়েছে, যারা চায় তারা এর মাংস খেয়ে নিক। আপনি ঘোষনা করে দেন এবার
থেকে বলি বন্ধ।“
সামন্ত বাবু কিছু একটা চিন্তা করলেন তারপর জনতার উদ্দেশ্যে বললেন “
ভোলার কথা সকলে শুনলে, তোমরা কি বল ?”
জনতার মধ্য থেকে যাদব জেঠু বলেন “মাও তাই চান, তা না হলেৃ এসব ঘটনা
হতো না।“
সকলে বলে উঠলো
“ ঠিক, ঠিক “। তবুও জনতার চোখ থেকে আতঙ্ক গেল না । শুধু ভোলার মন খুশিতে ভরে গেল। ভোলা ভাবছে যে সে একটা কুসংস্কার
বন্ধ করা গেছে। একনো কুসংস্কার ভুতের সঙ্গে অনেক লড়াই করতে হবে। অযথা মানুষের মনে নানান্
অন্ধ বিশ্বাস বাসা বেঁধে আছে। পূজা শেষ হতে সকলে ঘরে ফিরে গেল। রাতে আবার সামন্ত বাবুর
বাড়ীতে কালী পূজো। সেখানে সকলে যাবে। সারা রাত থেকে সকালে ভোগ খেয়ে বাড়ী ফিরবে। কিন্তু
মাস খানেক ধরে আলোচনা হতেই থাকলো “ মা বলি নিলেন না কেন ?”
সেই থেকে আর বলি হয় না।
৪র্থ পরিচ্ছেদ
কার্তিক মাস থেকে গ্রামে এক ছন্দ আসে। এই মাস ধর্ম মাস। বিভিন্ন
ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলে ঘরে ঘরে। কারো কারো ঘরে শ্রীমৎভাগবত পাঠও হয়। গ্রামের কারোর হাতে
বিশেষ কিছু কাজ থাকে না। অগ্রহায়ন মাসে নুতন ধান আসবে ঘরে। যে যেমন পারে নবান্ন অনুষ্ঠান
করবে। বিশেষত লোকে হরি সংকীর্তনের জন্য অপেক্ষা করে থাকে। কার্ত্তিক মাস বিশ্রামের
মাস। অগ্রহায়ন মাসে ধান কাটা ও ঘরে তোলার সময়। সকাল থেকে অধিক রাত পর্যন্ত ধান সংগ্রহের
কাজ চলে। জমিতে একটি ফসল ‘আমন ধান ‘ই হয়।
পৌষ মাস এলেই খেজুরের রস ও নলেন গুড়ের গন্ধে গ্রাম শুদ্ধ
ম ম করতো। ভোলাকে তার বাবা ধান তোলার কাজে সাহায্য করার জন্য বাড়ীতে থাকতে বলেছিলেন।
তাই সে অগ্রহায়ন মাসের মধ্যিখানে বাড়ী এসেছে। যদিও এ বছর তার মাধ্যমিক পরীক্ষা তবু
তার তেমন কোনো ভয় নেই, সে সারা বছর মন দিয়ে পড়াশুনা করে, পরীক্ষার সময় রাত জেগে পড়তে
হয় না। শিক্ষার একটা আয়দা আছে, যে এই কায়দা রপ্ত করতে পারে তাকে পরীক্ষার চিন্তার দরকার
হয় না। প্রথম থেকে যেকোনো বিষয় মনোযোগ দিয়ে পড়তে হয়। মন বড়ই চঞ্চল, মন চঞ্চল থাকলে
সাধনা হয় না। মনকে একাগ্র না করে পড়লে সেই বিষয় মস্তিষ্কে যায় না তাই মনে রাখা ও প্রয়োগ
করা কঠিন হয়। মহাভারতে কর্ণের যে অবস্থা হয়ে ছিল। গুরু পরশুরামের অভিশাপে কার্যকালে
অধিগত বিদ্যা প্রয়োগ করতে পারেন নি। মন দিয়ে পড়ার পর ওই বিষয়কে নির্দিষ্ট সময়কালের
মধ্যে ঝালিয়ে নিতে হয় ও মনে মনে স্মরণ করতে হয়। এই কাজ অভ্যাস হয়ে গেলে বিদ্যা আয়ত্ব
করা সহজ হয়ে যায়। সাগর মন্থন করে যেমন নানা রত্ন পাওয়া গেছিল, সেরূপ পুস্তক মন্থন না
করলে কিছুই পাওয়া যায় না। বিষয় নিয়ে যত চিন্তা করা হবে ততই বিষয়টা সহজ হবে। মেধা ও
স্মৃতি সকলের সমান নয়। ভোলার ক্লাসে স্যার একদিন এই বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। মানুষের মধ্যে মেধা ও স্মৃতিশক্তির ভিন্নতা স্বাভাবিক, যা বিভিন্ন কারণে
হয় যেমন - জিনগত বৈশিষ্ট্য, পরিবেশ, শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে। শিক্ষা, অভিজ্ঞতা
ও সঠিক অনুশীলনের মাধ্যমে মেধা ও স্মৃতিশক্তিকে উন্নত করা যেতে পারে।
স্মৃতি,ও মেধা বাড়ানোর কৌশল হলো একাগ্রতা, নিয়মিত
অনুশীলন ও গভীর চিন্তন। এরদ্বারা মস্তিষ্কে অতিরিক্ত কোষ তৈরী হয়।স্মৃতি আর মেধা নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। মেধা বা বুদ্ধিমত্তাকেও
সঠিক শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও প্রেরণার দ্বারা উন্নত করা যায়।
একদিন খুব ভোরে এসে কালু বলে “খেজুর রস খাবু ?”
খেজুর রসের কথা বলতে ভোলার ছোট বেলার কথা মনে পড়লো।
সে তখন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়তো। সে, কালু ও মাধু খুব ভোরে উঠে রস চুরি করে খেত। গ্রামের
বাইরে একটি পুকুর আছে। অন্যান্য গাছের সঙ্গে অনেকগুলো খেজুরগাছও আছে। গ্রামের এক শিউলি
সন্ধ্যায় গাছে কলসি বেঁধে দিয়ে আসতো। এরা পরের দিন ভোরে পুকুরের পাড়ে গিয়ে পুকুর থেকে
শাপলা ডাঁটা নিয়ে খেজুর গাছে উঠে ডাঁটার একদিক
কলসির মধ্যে ফেলে দিত ও অন্যদিক দিয়ে শুষে রস খেয়ে বাড়ী এসে ঘুমিয়ে যেত। একদিন ওরা
রস খেতে গেছে। সেদিন ঘন কুয়াশা, কাছের জিনিস ভালো ভাবে দেখা যাচ্ছে না। ওরা যথারীতি
গাছে উঠে রস খাচ্ছে। হঠাৎ জোরে একটা শব্দ হলো সঙ্গে সঙ্গে খনখনে গলায় বলে উঠলো “এঠি
এসব কিয়ে রে, মু যাউচি রক্ত চুষি খামি” যেই শোনা মাধু ভয়ে গাছ থেকে নীচে পড়লো। ভোলা
ও কালু নেমে দেখলো মাধুর শরীর রক্তাক্ত, খেজুর গাছের কাটা ডাল লেগে কয়েক জায়গায় গভীর
ক্ষত। ওরা কি করবে ভাবছে। এমন সময় দেখলো কুয়াশার মধ্য দিয়ে ভুতের মতো কে একজন ওদের
দিকে আসছে। ওদের ভয়ে গলা শুকিয়ে গেছে এবং ওরা কাঁপতে শুরু করছে। কাছে আসতে দেখা গেল
ওই শিউলি।
“ ও তুমে মেনে রস খাউ থাউ না ? মু তো ভয় দেখিয়েইতে
এইটা করি থিলি, ইয়ে গছরু খসি পড়িব কিয়ে জানে ?”
সে তখন তাড়াতাড়ি রক্ত বন্ধ করার জন্য মাঠে পাওয়া যায়
এক রকম ঔষধি ঘাস ছিড়ে হাতে দলে রসটা কাটা জায়গাগুলোতে লাগিয়ে দিল ও মাধুকে তুলে বাড়ী
পৌঁচে দিল। সেইদিন থেকে আর তারা রস চুরি করতে যায় নি। তাই রস খাওয়ার কথা বলতে সে যাবে
না বললো।
“ না রে, মো ঘরে রস অছি, খাবু তো লেই আসিবি”
“ঠিক অছি, লেই আয়”
কালু রস নিয়ে এল। ভোলা রস খেয়ে দেখলো রসের স্বাদ এখনোও
ঠিক মতো আসে নি। যত শীত পড়বে ততই এর স্বাদ ও গন্ধ উন্নত হবে। ধান তোলার কাজ আরম্ভ হয়ে
গেছে। বাবার সঙ্গে ভোলাও মাঠে যায়। প্রথম পাকা ধানগাছ কাস্তে দিয়ে কেটে আঁটি তৈরী করে
ফেলে রাখা হয়। আঁটি শুকালে সন্ধ্যার পর বাঁধা হয় এবং বাঁকে বা মাথায় করে এনে গাদা করে
রাখা হয়। সেদিন সন্ধ্যার পর আঁটি বাঁধা হচ্ছে।
বেশ কিছু চাষী মাঠে আছেন। আকাশে চাঁদ না থাকায়
মাঠ অন্ধকার। তবু অন্ধকারে থাকলে চোখ খাপ খাওয়ে নেয় এবং অন্ধকারে কিছুটা দেখা যায়।
শীতকালে সাপ শীতঘুমে থাকে বলে চাষীরা মাঠে নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারে।
ভোলা সেদিন মাঠে বাবার সঙ্গে ছিল। এক প্রহরের শিয়ালের
ডাক কিছু আগে হয়ে গেছে। ভোলা দেখলো মাঠের দুরে দুরে এক আলো দেখা যাচ্ছে, আলো জ্বলচ্ছে আবার নিভে যাচ্ছে । আবার অন্য জায়গায়
দেখা যাচ্ছে। আগে ভোলা এই আলো দেখেছে। লোকে বলে এই আলো ভুতের ভালো। এখন ভোলা জানে এই
আলোকে “আলেয়া” বলে। মাঠে যেখানে জলা জায়গা থাকে, সেখানে মার্শ নামে এক রকম গ্যাস নির্গত হয় এবং বাতাসের সংস্পর্শে
জ্বলে ওঠে। আলেয়া কোনো ভৌতিক
ব্যাপার
নয়।
তবুও
গ্রাম
বাংলার
অধিকাংশ
মানুষ
বিশ্বাস
করে
এটি
অশরীরীদের
কাজ।
রাতের মাঠে দুই ধরনের শিয়াল দেখা যেত, শিয়াল ও খেঁকশিয়াল। খেঁকশিয়াল আকারে ছোটো কিন্তু লেজ বেশ মোটা ও লোমোশ।
রাতের আঁধারে ঘুরে বেড়ানো শিয়ালেরা কাঁকড়া শিকার করে এক অদ্ভুত কৌশলে। জলার ধারে থাকা কাঁকড়ার গর্ত খুঁজে বের করে এর ভেতরে লেজ ঢুকিয়ে বসে থাকে। কাঁকড়া লোমশ লেজটাকে শত্রু মনে করে ছিপকাঠির মতো শক্ত হাত দিয়ে চেপে ধরে। আর ঠিক তখনই শিয়াল তার লেজটাকে দ্রুত কাঁকড়াসহ গর্ত থেকে বাইরে বের করে নিয়ে আসে। তারপর লেজ ঝাঁকিয়ে ওটাকে মাটিতে ফেলে মজা করে খায়। খেঁকশিয়ালের সবচেয়ে চোখে পড়ার মত অঙ্গটি হল এর বড় ঝাঁকড়া লেজ। লেজ ধূসর ও লেজের উপরিভাগ লালচে। লেজের আগা কালো। এরা সর্বভুক
প্রাণী। মাঠে ধেড়ে ইঁদুর যারা ধান খায় শিয়ালের প্রিয় খাদ্য।
ধানের কাজ প্রায় শেষ। মা ভোলাকে আর চার পাঁচ দিন
থেকে যেতে বললেন। পৌষে নলেন গুড় দিয়ে নানান ধরনের পিঠে হয়। যেমন দুধপুলি, নকশী পিঠা, ঝিনুক পিঠা, ক্ষীরকুলি, পাটিসাপটা,
ছাঁচপিটা, নারকেল ও নলেন গুড়ের পুর দিয়ে ভাপানো পিঠা ইত্যাদি । পিঠের মরসুম দুটি,
একটি শ্রাবন-ভাদ্র মাসে তালের পিঠে। ভোলার মা তালের মন্ড ও চালের গুড়ো মিসিয়ে সাদা
ধোসার মতো এক পিঠে তৈরী করেন। এ পিঠে কিন্তু ধোসার মতো শক্ত নয়, তুলে তুলে নরম। এ
পিঠে যে খাবে জীবনে ভুলবে না। সেদিন বিকালা পিঠে হচ্ছে। ভোলা কালুকে পিঠে খাওয়ার
জন্য ডেকেছে। কালু বিকালা এসেছে। মায়ের পিঠে তৈরী। নলেন গুড়ের গন্ধ বাড়ী মধ্যে
ঘুরছে। ভোলা ও কালু পিঠে খাচ্ছে।
“ঘরে
ঘরে পিঠাপুলির তৈরীতে করে গমগম
হৈমন্তিক
ধানগুঁড়ো ও খেঁজুরগুড়ের সঙ্গম I
নিয়ে
আসে স্বর্গের অমৃতের নান্দনিক স্বাদ
আবালবৃদ্ধবনিতা
মেতে ওঠে কেউ নয় বাদ I
নানা
রকমের পিঠাপুলির মাসভর সমারোহ
শীতকাল
জুড়ে চলে ঐতিহ্য উৎসব অহরহ I
পাটিসাপটা,,ভাপাপিঠার
নাই কোনো তুলনা
নলেনগুড়
পায়েস ক্ষীরমুরলী বছরভর ভুলি না I
কলাপিঠা
চন্দ্রপুলি দুধপুলি জিভে আনে জল
নকশি পিঠা পোড়াপিঠা বাঙলার
রসলো ফসল”II
খেতে খেতে কালু
বললো “ হারুকাকার ঝিয়কু ভুত লাগচি। তার বয়স তেরো চৌদ্দ হব। সকালে তার খিঁচুনি শুরু
হয়, হাত গুড় পথর হেই যাই থিলা, মুহ দিই ফেন বাহারুথিলা, আউ দাঁত লাগ যাই থিলা। গটে
গুণি আসি থিাল, কিছি করি পারিলা নাহি।
বিকালা আউ গটে গুণি আসিব”।
ভোলা বললো “ হউ খাই সারি যিবা। ভুত বলি কিছি
নাহি, সবু কুসংস্কার, কিছি রুগ হেই থিব”।
খাওয়া শেষ করে দুজনে হারু কাকুর বাড়ীতে গিয়ে
দেখলো মেয়েটা দাওয়ায় শুয়ে আছে এবং এর পাশে এক গুণিণ বসে। কিছু প্রতিবেশী মহিলা জড়ো
হয়েছে। ভোলা গুণিণের পাশে বসে জিজ্ঞাসা করলো কি হয়েছে।
গুণিণ বললো “ বাবা, এ ভুত সাধারন নয়, এ বড় কঠিন
ভুত”।
“আচ্ছা, আপনি তো ভুত বিশারদ, কত রকম ভুত আছে
বলবেন?”
তিনি বলে চললেন “ তোমার ভয় করবে নাতো? এই সব
অঞ্চলে যে সব ভুত দেখতে পাওয়া যায়, সেগুলো হলো- শাঁকচুন্নি, চোরাচুন্নি, পেঁচাপেঁচি,
মেছোভূত,
দেও,
নিশি,
পেত্নী,
কানাভুলো
ভূত,
মামদো
ভূত,
ব্রহ্মদৈত্য
ইত্যাদি। মৃত্যুর সময় অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে বা দুর্ঘটনা, রোগে মারা গেলে ভুত হয়ে পৃথিবীতে
ঘুরে বেড়ায়। খুব সাঙ্ঘাতিক ভূত পেঁচাপেঁচি।
মানুষের মাংস ওদের খুব প্রিয়। এই মেয়েটিকে এই পেঁচাপেঁচিই ধরেছে। তবে ভয়ের কিছু নেই,
আমি এই রকম কত ভুতকে সোজা করেছি । দেখছ না আমাকে দেখে চুপচাপ পড়ে আছে”।
ভোলার কোথায় পড়া একটি কবিতা মনে পড়লো-
ভুত পেত্নি দৈত্যদানা শাঁকচুন্নির অনেক ছানা
গেছোভুত গাছে থাকে মেছোভুত মাছ খায় রাতে
নিশি ভুত যদি ডাকে নাম ধরে
যাকে ডাকে সে যায় পরপারে
ব্রহ্মদৈতি পৈতে
পরে চোরাচুন্নি রাতে চুরি করে
জলে থাকতো দেও
ভুত দেখতে সে বড়ই কিম্ভূত
জলের মধ্যে যদি
পায় মানুষকে সে ডুবিয়ে খায়
মামদো ভুতের লম্বা
হাত ওদের থাকে বড় বড় দাঁত
স্কন্ধকাটার নেইকো
মাথা তবু ওরা বলতে পারে কথা
কেনোভুত মাঠে বেড়ায় মানুষকে সে পথ ভুলায়”I ”
“
ভোলা উঠে কাকীমার কাছে গেল। ঘটনা ও লক্ষণ শুনে তার মনে পড়লো জীববিজ্ঞানের স্যার
ক্লাসে একবার মৃগী রোগের কথা আলোচনা করেছিলেন। এই রোগের প্রথম দিকে গ্রামাঞ্চলে ভুতে
ধরেছে মনে করা হয়। প্রথমে খিচুনি দিয়ে শুরু হয়।
খিঁচুনি হলে হঠাৎ
করে
চেতনা
হ্রাস,
অস্বাভাবিক
ঝাঁকুনি দাঁতে দাঁত লেগে যাত্তয়া বা
অন্য
কোনো
অস্বাভাবিক
আচরণ দেখা
দিতে
পারে। বারবার খিঁচুনির ঘটনাকে মৃগীরোগ বলা হয়, যা একটি স্নায়বিক রোগ। এই লক্ষন দেখা দিলে সর্বপ্রথম
রোগীর চারদিকে ভিড় না করা, রোগীকে চেপে না ধরা, মুখ খুলতে জোর না করা ও রোগীকে
ফাঁকা জায়গায় রাখাই বিধেয়। ভোলা কাকীমাকে বললো যে মেয়ের একটি রোগ হয়েছে। গুণিণ
কিছু করতে পারবে না। শহরে গিয়ে ডাক্তার দেখাতে হবে।ভালো হয়ে যাবে, কিছু চিন্তা
করবেন না ।
এরপর ভোলা স্কুল বোড়িং এ ফিরে যায়। তাকে আবার
চৈত্র মাসের শেষ দিন একদিন হলেও আসতে হবে। চৈত্র মাসের শেষদিন গ্রামের সবচেয়ে বড়
উৎসব “চড়ক” হয়। ভোলা চড়কের আগের দিন বাড়ী এসেছে। ঐ দিন বিকাল থেকে শিব মন্দির
প্রাঙ্গনে ছোটো একটি মেলা বসে। মেলায় সস্তার জামা কাপড়, হাতে তৈরী লোহার জিনিস,
নানা রকমের তেলেভাজা, ভিজানো ছোলাভাজা ও বিড়ি বিক্রি হয় । গ্রামে চায়ের চল ছিল না। সাতদিন আগে থেকে আঠ দশ জন
গ্রামবাসী ভক্ত হতেন। তাদের সহজে চিহ্নিত করা সহজ ছিল। ওঁদের কাঁধে সাদা একগাছা
সুতো ঝুলতো আর যিনি প্রধান ভক্ত তাঁর গলায় অর্ধেক সাদা সুতো ও অর্ধেক লাল সুতো
ঝুলতো। ওঁকে পাঠভক্ত বলা হতো ও ওঁর কথা সব ভক্তদের মান্য করতে হতো। সব ভক্তের হাতে
একটি বেতের লাঠি থাকে। ভক্তরা এই কয় দিন নিরামিশ ও দিনে একবার আহার করেন। ঐ দিন
দুপুরে বাঁশের পালকির মতো একটি কাঠামো তৈরী হয়। তাতে রঙিন কাগজ ও নানা রঙের ফুল
দিয়ে সাজানো হয়। বিকালা শিবঠাকুরের তিনকোনা পতাকা নিয়ে ছেলে ও যুবকরা গ্রামের
চারধার ফেরি করার পর পুকুর পাড়ে জড়ো হয়। আস্তে আস্তে গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা
পুকুরের ধারে জড়ো হতে থাকে। ভক্তদের মধ্য থেকে চার পাঁচজন ও গ্রামের তিন চার জন
যুবক লোহার তৈরী হাতার মতো যার ধরার দিকে
ছুঁচের মতো ছুঁচালো, কোমরের দুধারে চামড়াতে গেঁথে দেওয়া হয় ও এক ফুটের মতো দুটি
ত্রিশূল তার নীচের ছুঁচালো দিকটা জিভে গেঁথে দেওয়া হয়। ত্রিশূলের তিনটি ফলাতে ফুল
গেঁথে কপালে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়। দুপাশের দুটি হাতাকে জড়ো করে তার মধ্যে
শুকনো আম ও চন্দন কাঠ দিয়ে আগুন ধরানো হয়। ঐ দুটি বাঁ হাতে ধরে ডান হাতে ধুনো
ছিটাতে ছিটতে ও নাচ করতে করতে মন্দিরে যাওয়া হয় । সন্ধ্যার পর পর কিছু বাজি পুড়ানো
হতো। পুকুর থেকে শিব মন্দির পর্যন্ত প্রায় অর্ধ ক্রোশ রাস্তা শোভাযাত্রা করে যাওয়া
হয়। কাঁটা মারার হয়ে গেলে শোভাযাত্রা আরম্ভ হতো।
প্রথমে সাজানো পালকীর চারদিক জলন্ত প্রদীপ দেওয়া
হয়। এর দুদিকে দুটি বাঁশ বেঁধে চারজন শক্ত সমর্থ যুবক কাঁধে নিয়ে শোভাযাত্রার
প্রথমে নাচতে নাচতে ধীরে এগোতো। তারপর পৈতাধারী ভক্তরা থাকতেন। তাদের পিছনে বান
শলাকাধারীরা আগুনে ধুনো ছিটাতে ছিটাতে নেচে নেচে এগোতো। নাচের ধকলে জিভের
ত্রিশূলের ছুচালো দিকটা জিভের নীচে বেরিয়ে আসতো ও জিব থেকে ক্রমাগত লালা বেরিয়ে
নীচে গড়িয়ে পড়তো। ওদের পিছনে ঢোল. খোল ও কাঁশর বাজনাদার গান করতে করতে যেত। সবার
পিছনে সমবেত জনতা শিবের উদ্দেশে জয়ধ্বনী করতে করতে চলতো।
কিশোর কিশোরদের মেলামেশা বা গল্প করা সমাজে ভালো
চোখে দেখা হতো না কিন্তু ঐ দিনের জন্যে কোনো বাধা থাকতো না। এত ভীড়ের মধ্যে ওরা
গল্প গুজব, হাসি তামাসা করে মনের সাধ পুরন করত। প্রায় ঘন্টা দেড়েক পর শিবমন্দির
প্রাঙ্গনে পৌঁচে মন্দিরকে তিনবার প্রদক্ষিন করা হতো। এবারে শলাকা খোলার পর ওরা
মন্দিরের সামনে ধুলোতে গড়াগড়ি দেয় ও ওদের ঘনঘন মঞ্চামৃত খায়ানো হয়। আশ্চর্যের
ব্যাপার ওরা যখন স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন
তাদের কোমরের দুধারে ও জিভে কাঁটা ফোটার কোনো চিহ্ন থাকে না। ওদের কাউকে কষ্ট হয়েছে
কিনা জিজ্ঞাসা করলে, সে বলতো তার কি হয়েছে যে কষ্ট হবে। গ্রামের সকলে বলে শলাকা
গাঁথার পর তাদের উপর শিবঠাকুরের ভর হয় তাই তারা কিছু বুঝতে পারে না। ভোলা একথা এখন
বিশ্বাস করে না। তার মনে হয় যারা শলাকা মারে তারা সারাদিন উপোস থাকে এবং বিকালা
সিদ্ধিটিদ্ধি খায় তাই অপকৃতিস্থ থাকে।
এরপর চড়কগাছে দোলা আরম্ভ হয়। ঐ দিন সকালা একটি
বেশ লম্বা গাছের গুড়ি শক্ত করে মাটিতে পোতা হয়, তার উপরে একটি গরুগাড়ির চাকার মতো
একটি চাকা লাগানো থাকে ও একটি লম্বা দড়ি চাকা থেকে মাটি পর্যন্ত ঝোলানো থাকে।
চাকাতে পাঁচ ছয়টা ছোটো ছোটো শক্ত দড়ি বেঁধে ও দড়ির নীচে ছোটো ছোটো বাঁশ বাঁধা
থাকে। এই গাছকে চড়ক গাছ বলে। ঐ বাঁশে বসলে নীচে একজন দড়ি ধরে ঘোরে । তার ফলে উপরের
লোকগুলো বনবন করে ঘোরে।
এ বছর যথারীতি শোভাযাত্রা এসে মন্দির প্রাঙ্গনে
আসার পর শলাকা খোলা হলো। সকলে কিছুক্ষণের মধ্যে প্রকৃতিস্থ হয়ে গেল। মাত্র একজন
গড়াগড়ি খাচ্ছে আর আবোল তাবোল বকচ্ছে। ভক্তরা পঞ্চামৃত খাওয়াচ্ছে ও গায়ে ডালচ্ছে।
লোকজন তার চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে শিবঠাকুরের জয়ধ্বনী দিচ্ছে। ভোলা ভাবচ্ছে এ কি
তামাসা করচ্ছে নাকি। যাইহোক বেশ খানিকটা পরে সে স্বাভাবিক হয়ে গেল। লোকজন চড়ক
গাছের চারদিকে জড়ো হলো। এ বারে কালুও গাছে ঘুরবে। সে এক নুতন গামছা পরেছে, অপর
একটি মাথায় বেঁধেছে। গোটা কপাল চন্দনে ভর্তি। কালুর সঙ্গে সঙ্গে আরও পাঁচজন
চড়কগাছে উঠলো। নীচে আলোআঁধরি পরিবেশ। ভোলা মুখ তুলে দেখছে। হঠাৎ পাশ থেকে সুরালো মিষ্টি
সুরে বললো “ ভোলাদা কবে এলে ?”
ভোলা পাশে ফিরে দেখলো এক শাড়ী
পরা মেয়ে পাশে দাঁড়িয়ে। বয়স তেরো বা চৌদ্দ হবে। মাঝারি গড়ন। টুকটুকে ফর্সা মাথার চুল
অসাধারণ ঘন ও লম্বা। রাধার সৌন্দর্য আর এই মেয়ের সৌন্দর্য আলাদা । রাধা ছিপছিপে শান্ত,
শিষ্ট সাধিকা ও দুঃখ কষ্ট সহিষ্ণু আর এই মেয়েটার
সামান্য মেদবহুল, রুপের চটক আছে, বনের হরিণীর মতো চঞ্চল, চোখের দ্বারা অনেক কথা বলতে
পারে।
“তুই সহদেব কাকার মেয়ে মাধবী
না, অনেক দিন আগে দেখেছিলাম, বেশ বড় হয়ে গেছিস্।
“তাহলে মনে আছে দেখছি, গ্রামের
তুমি তো হিরো, সকলের মুখে তোমার নাম। অনেকদিন তোমার সঙ্গে দেখা করবো ভাবচ্ছি কিন্তু
সুযোগ আর পাই না। ছোটবেলায় তোমার সাথে কত না খেলা করেছি। পুকুরের পাড়ে কত দিন দোল খেয়েছি।
যাক্ সে কথা, তোমার পড়াশুনা কেমন চলছে ?”
“ চেষ্টা তো করছি, দেখি কি
হয়।“
“ কি নিয়ে পড়বে, ঠিক করেছ
?”
“ তেমন কিছু ভাবিনি, ইচ্ছা
আছে ডাক্তারী পড়ার “
“ তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে
“।
ভোলা বুঝতে পারলো মাধুরী কি
বলতে চাইছে, এখন কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে গেলে, গ্রামে তো বদনাম হবেই, তার ভবিষ্যৎ ও নষ্ট
। আবেগ এক বিষম বস্তু। প্রশয় দিলে বাড়তে থাকে। মারতে চাইলে মরে যায়। ভোলা তাই ওখান
ধেকে সরে যাওয়ার বাহানা করে, বলে “ মার সঙ্গে একটু দরকার আছে, দেখি কোথায় আছে “ বলেই
সে সেখান চলে যায়।
মন্দির প্রাঙ্গনের পাশে যাত্রার
জন্য সাজঘর তৈরী হয়েছে। ভোলা শুনেছে যাত্রাপালার নাম “ মহাদেবের বিয়ে “। ভোলা সাজঘরে
উঁকি দেয়। দেখতে চায় কে কি সাজছে। বহু বাচ্চা সাজঘরের চারদিকে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছে।
একজন লাটি হাতে বাচ্চাদের তাড়া করছে কিন্তু ভোলাকে কিছু বললো না বরং একটু জায়গা করে
দিল সাজঘরের দৃশ্য দেখার জন্য। ভোলা দেখলো মাধব কাকা মহাদেব হয়েছে । বেশ মানিয়ে তাকে,
এমনি মহাদেবের মতো চেহারা তার। বেশ একটা ভুঁড়ি, তাকে ছাইর মতো কিছু গোটা শরীরে মাখানো
হয়েছে। মাথায় একটি জটা পরানো হয়েছে, কোমরে বাঘছালের মতো একটি কাপড় পরানো হয়েছে। হাতে
একটি বাঁশ দিয়ে তৈরী ত্রিশূল, কাঁধে কাগজের তৈরী দুটো সাপ জড়ানো। কিন্তু দূর্গা কে
দেখতে পাচ্ছে না। বাইরের লোককে জিজ্ঞাসা করায় সে বললো “দীনু”। নাম শুনে ভোলার খুব হাসতে
ইচ্ছা করছে কিন্তু মুখে হাতে দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলো দীনুকাকা একটি মেয়ে সেজেছে। কোনো
মেয়েকে যাত্রায় অভিনয় করতে দেওয়া হতো না।পুরুষরাই মেয়ের অভিনয় করে, তা বলে দীনু কাকা;
ওর বয়স তো পঞ্চাশের বেশী, ছুতার মিস্ত্রি, ছোটো খাটো মানুষ, কোমলতার চিহ্নই নাই, ও
আবার দূর্গা । তবে দীনুকাকার কিন্তু মেয়েলি গলা তাই হয়তো এই চরিত্র দেওয়া হয়েছে। মেয়েলি
গলার উপযুক্ত পুরুষ পাওয়াও মুশকিল।
ভোলা মন্দিন প্র্রাঙ্গনে এসে
দেখলো ভীড় কমে গেছে লোকরা বাড়ী গেছে রাতের খাবার খেয়ে যাত্রা দেখতে আসবে। ভোলা দেখে
মন্দির প্রাঙ্গনের মাঝখানে চারটি বাঁশ পুঁতে শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে ও তার চারদিকে খড়
পাতানো হয়েছে। ভোলার পড়াশুনা আছে, তাকে কাল সকালা বোড়িং এ যেতে হবে তাই রাত জাগবে না
সিন্ধান্ত নিল এবং কিছুটা দেখে বাড়ী চলে যাবে।
৫ম পরিচ্ছেদ
ভোলার মাধ্যমিক পরীক্ষা হয়ে যাওযার পর বাড়ীতে আছে। পরীক্ষার
ফল তিন মাসের মধ্যে প্রকাশ হবে। ভোলার আশা ফল ভালোই হবে তারপর তাকে প্রি-ইউ কোর্সে
ভর্তি হতে হবে। প্রি-ইউতে বিজ্ঞান, কলা ও কমার্স যেকোনো একটি শাখা বেছে নিতে হয়। ভোলা
ঠিক করেছে বিজ্ঞান নিয়ে পড়বে। কিন্তু মুসকিল হলো কাছাকাছি এরকম কলেজ নেই। প্রায় পঞ্চাশ
মাইল দুরে কাঁথি শহরে যেতে হবে। সেখানে ভর্তি খরচ, বই কেনার খরচ ও থাকার খরচ জোগাড়
করতে পারবে কি করে সেই চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
কয়েকদিন পর সে মাকে সব খুলে বললো। মা বললেন-
“ বাবু, তু চিন্তা কর না, মা মঙ্গলার কৃপারে সবু ঠিক হেই
যিব। মু ভাবুচি মোর গটে সোনার বলা অছি। গটে যে বরস ঘর হেলা সেই বরস বিক্রি হই যাইচি।
আউ গটে অছি সেটা বিক্রি হেনে তোর কাম হেই যিব। মুটে চিন্তা করতে হব নি “।
ভোলার মন খারাপ হয়ে গেল। তার পড়ার জন্য মায়ের গহনা বিক্রি
করতে মন সায় দিচ্ছে না।
তখন সময়টা ছিল ফাল্গুনমাস। ঐ মাসে দোল পূর্ণিমার হোলি খেলা
হয়। গ্রামে হৈ হৈ করে রঙ নিয়ে হোলি খেলা হয় না। কোনো মহিলাও দোল খেলায় অংশ গ্রহন করেন
না। বলতে গেলে সেভাবে হোলি খেলা হয় না। মাত্র কয়েকজন খোল নিয়ে সারা গ্রাম কীর্তন করতে
করতে ঘুরে বেড়ান। তাদের কাছে থাকতো লাল রঙের গুড়ো। এগুলো আবির না সিঁদুর ঠিক বোঝা যেত
না। ওরা সামনে যাকে পেত বড় হলে পায়ে দিয়ে প্রনাম করে, ছোট হলে কপালে রঙ পরিয়ে দেয়।
দুপুরের আগে ওরা কীর্তন বন্ধ করে বাড়ী চলে যেত। কিন্তু দোল পূর্ণিমার দিন বাচ্চা বাচ্চা
ছেলেরা সন্ধ্যার পর ‘বুড়ি ঘর’ পোড়ায়। তারা বকুল ডাল কেটে মাঠের একজায়গায় কুঁড়ে ঘরের
মতো বানায়। তার উপর কুচো খড় বিছিয়ে দেয়। সন্ধ্যের পর পর এই ঘরটায় আগুন ধরিয়ে দেয়। তার
ভিতর আলু ও রাঙালু দিয়ে দেয়। আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতো,আর বাচ্চারা আগুনের চারদিকে চিৎকার
করতে করতে ঘুরতো। আগুন নিভে গেলে সেদ্ধ আলু রাঙালু খেয়ে বাড়ী চলে যেত।
· এ বছর দোল পূর্ণিমার
দিন ভোলা সকালে উঠে দাওয়ায় বসেছে। সুন্দর দক্ষিনা বাতাস বইছে। সুন্দর এক ফুলের গন্ধ
নাকে আসছে। ভোলা ভাবছে এটা কি ফুলের গন্ধ? তার বাড়ীর চারপাশে প্রচুর গাছপালা। এর মধ্যে
ফুলের গাছও আছে। বসন্তে প্রকৃতির রূপ রঙ আলাদা হয়ে যায়। সামনে একটি পলাশ গাছ, গোটা গাছ লাল ফুলে ভরে গেছে। তার
উপর উদীয়মান সূর্যের সোনালী আলো এসে পড়ছে, যেন গোটা গাছটা জ্বলছে । গাছের ডালে ডালে উঁকি দিচ্ছে নতুন পাতা, নতুন
কুঁড়ি। বসন্তের আগমনে নবপত্রপল্লবে শোভিত হয়ে উঠছে বনরাজি, ফুলের বাগান। সোনারঙের কনকচাঁপার থোকা ধরা ফুল দুটি গাছে ফুটে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে। ‘স্বর্গভোলা পারিজাতের গন্ধ এসে খ্যাপা হাওয়ায় বুকের ভিতর ভেসে ভেসে ফিরছে।’সুমধুর সুগন্ধ ভেসে আসছে বসন্তের আরেক দুর্লভ ফুল মাধবীলতা ও কাঠগোলাপ থেকে। গ্রামে এই সব নানা ধরনের ফুলের গাছ সর্বত্র দেখা যায়।
· কাছাকাছি দুতিনটা কোকিল
ডাকছে। কত ধরনের পাখির ডাক যে ভেসে আসছে তা আন্দাজ করা কঠিন। শালিকের দল, টিয়ে, ময়না,
ফিঙে, মাছরাঙা, সরালি, রবিন, দোয়েল, বুলবুলি, ঘুঘু, বসন্ত বৌরি, আরও কত কি। সকলের ডাকের
মধ্যে কোকিলের ডাক আলাদা করা যায়। তাই কোকিলকে বসন্তের দুত বলা হয় ।কোকিল মূলত বসন্তে
ডাকে কারণ এটি তাদের প্রজনন মৌসুম। পুরুষ কোকিল তার মধুর সুরের ডাক দিয়ে স্ত্রী কোকিলকে
আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে । ভোলার ৭ম শ্রণীতে পড়া যতীন্দ্রমোহন
বাগচীর
লেখা “জন্মভূমি{“কবিতাটি মনে পড়ে:
“যত
দেশের
যত
পাখী
ঐ
গাঁয়ে
কি
আছে!
ঝোপে-ঝাড়ে
বেড়ায়
উড়ে
বাসার
কাছে
কাছে;”
গ্রামে বসবাস করার অ্নেক সুবিধা আছে- বিশু্দ্ধ বাতাস শরীরে ঢুকলে প্রাণশক্তি
সঞ্চার করে তাই লোকেরা রাতদিন খাটতে পারে। এছাড়া অফুরন্ত মাছ, গাছের টাটকা ফল ও সবজি,
পাথির ডাকে ঘুমিয়ে পড়ে পাখির ডাকে জাগে। গ্রামের সকলে সহজ সরল, ধর্মভীরু, অতিথি পরায়ন,
সহমর্মী কিন্তু হাতে নগদ টাকার অভাব, শিক্ষার অভাব ও কুসংস্কারের ভুত গ্রাম্য জীবনকে
অভিশপ্ত করে তোলে। ভোলা ভাবতে ভাবতে কালু এসে হাজির।
“ ভোলা তোর মনে অছি বুড়ি ঘর
পুড়িইবা কথা। আজি সেই দিন, মাঘী পূর্ণিমা। আজ তু আম সাথরে যিবু। বহুত মজা হব।“
এই সময় মা ঘরের ভিতর থেকে
বললেন “ কালু ও তু আয়, খাইবু”
তারা দুজনে গিয়ে খেতে বসলো।
গ্রামে মুড়ি দিয়ে প্রাতরাশ হয়। প্রত্যেক বাড়ীতেই মুড়ি ভাজা হতো। মুড়ি ও ভাত ছিল গ্রামের
প্রধান খাদ্য। মা তাদের জামবাটি ভর্তি মুড়ি, ঘরে পাতা দই ও খেজুর গুড় দিয়েছেন।
খাওয়ার পর কালু বললো “ বকুল
ডাল কাটতে যাউছি, তু যিবু ?”
ভোলা বললো “ চল”
তারা গ্রামের বাহিরে গিয়ে
মাঠের রাস্তা ধরলো। ভোলা দেখলো দুরে রাস্তার ধারে মাঠে শত শত শকুন জড়ো হয়েছে। কালুকে
জিজ্ঞাসা করায় সে বলে গ্রামে নির্দিষ্ট শ্মাশান
আছে কিন্তু নির্দিষ্ট ভাগাড় নেই। গরুটরু মরলে লোকে মাঠে ফেলে দেয় আর যেখানে ফেলা হয়
সেই মাঠে ফসল ভালো হয়। ওখানে কেউ মরা গরু ফেলে গেছে। শকুনরা খুব উচুঁতে ওড়ে এবং উপর
থেকে দেখতে পায় তাদের খাদ্য কোথায় আছে। কথা বলতে বলতে তারা ভাগাড়ের কাছাকাছি এসে গেছে।
আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ভোলা দেখলো শকুন ছাড়া শিয়াল ও কুকুরও আছে। ওরা ভয়ানকভাবে লড়াই করছে
আর চেঁচাচ্ছে। ভোলা এতদিন সামনা সামনি কোনোদিন শকুন দেখে নি। দীর্ঘ চঞ্চুযুক্ত ও বিশাল আকারের পাখি। মাথা ও গলা পালকহীন । ভয়ঙ্কর,দেখলে ভয়
করে। ভোলা কালুকে বললো “মতে ভর লাগুছি”
কালু বললো “চল অন্য রাস্তায়
যিবা ”
তারা ও অনেক কচি কাঁচারা বকুল
ডাল কেটে এনে মাঠে জড়ো করলো ও সন্ধ্যার পর সকলে বুড়ির ঘর পুড়িয়ে বাড়ী ফিরে এলো।
সেদিন রাতে ঘুমিয়ে ভোলা ভাবছে
যদি পরীক্ষার ফল একটু ভালো হয় তবে পড়া চালিয়ে নিয়ে যেতে অসুবিধা হবে না। এই সময় সেই
ক্যাচর ক্যাচর শব্দটা শুনতে পেল। মনোযোগ দিয়ে বুঝতে পারলো এটা একটি নিশাচর পাখির ডাক।
এই সাধারন একটি নিশাচর পাখির ডাক থেকে এক সর্বনেশে কুসংস্কারের ভুত সৃষ্টি হয়েছে।
দেখতে দেখতে ফল প্রকাশের দিন
এসে গেল । আর পাঁচদিন পর ফল প্রকাশ হবে।
ভোলার যে একটা চাপা উত্তেজনা
নেই তা নয়। বুকটা ঢিপ ঢপি করছে, যদি ফল খারাপ হয় তবে জীবনটা মাটি। বাবা মায়ের এই বিষয়ে
কোনো দুর্ভাবনা নেই। তাদের চিন্তা বেশী পড়াশুনা করলে ভবিষ্যতে মাঠে কাজকর্ম করতে পারবে
কিনা। ফসল না ফলালে খাবে কি? তাদের এইটুকু জানা নেই যে কতলোক ফসল না ফলিয়ে আরামে দিন
নির্বাহ করা যায়।
ফল প্রকাশের দিন ভোলা স্নান
করে খাওয়া দাওয়া পর তৈরী হচ্ছে স্কুল যাবে বলে, এমন সময় দেখলো তাদের স্কুলের পিওন বাড়িত
এসে উপস্থিত।
“ আমাকে হেডস্যার পাঠিছেন
তোমাকে নিয়ে যেতে। তোমার পরীক্ষার ফল খুব ভালো হয়েছ। মেদিনীপুর জেলায় প্রথম হয়েছ। তুমি
রাতে স্কুল বোড়িং এ থাকবে কাল সকালে তোমাকে সভা করে প্রাইজ দেওয়া হবে “ কথাগুলো এক
নিঃশ্বাসে বলে গেল। ভোলা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো
তাহলে মনে হয় মায়ের গহনায় হাত দিতে হবে না। মা বললেন “ যিয়ে স্কুলরু আসিচন, তাঁকু লেই
আয়, কেতে দুররু আসিচন, কিছি খাই কি যিবে”। ভোলা জোর করে তাঁকে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল।
মা তাঁকে জামবাটিতে মুড়ি, দই, খেজুর গুড় ও নারকেল কোরানো দেয়েছেন। লোকটি মাকে বললেন
“ আপনার ছেলে রত্ন , আপনি তো মা রত্নগর্ভা। এর জন্য স্কুলের প্রত্যেক শিক্ষক গর্বিত।“
মা কিছু বুঝলেন কিনা জানা গেল না, তিনি চুপ করে থাকলেন । ভোলা ও পিওন স্কুলের দিকে
রওনা দিল। স্কুলে পৌঁচে ভোলা দেখলো সব শিক্ষক জড়ো হয়েছেন ও যারা মাধ্যমিক দিয়েছিল,
তারাও ও উপস্থিত। ভোলাকে দেখে সকলে তাকে ঘিরে
ধরলো। হেড মাস্টার মশাই বললেন “ ভোলা আমাদের
বিদ্যালয়ের গর্ব। স্কুলের ইতিহাসে এমন ফল আর কেউ করে নি। ও আমাদের বিদ্যালয়ের মুখ উজ্বল
করেছে “। ভোলাকে বললেন “ তুমি আজ স্কুল বোড়িং এ থেকে যাও । কালকে সভায় প্রাইজ নিয়ে
বাড়ী যেও।
পরের
দিন সকালা সভা শুরু হলো। জেলার কিছু সরকারী আধিকারিক উপস্থিত হয়েছেন। প্রথমে প্রধান
শিক্ষক বিদ্যালয় ও এ বছরের ফল সম্বন্ধে বিস্তারিত বললেন। তারপর মহকুমা কর্মকর্তা ভোলার
প্রশংসা করলেন এবং আরও বললেন ভোলা উচ্চ শিক্ষার যাতে অসুবিধা না হয় সরকার সেটা দেখবে।
প্রধান শিক্ষক ভাোলাকে বললেন “ তুমি এবারে সকলকে বল কিভাবে পড়াশুনা করলে ভালো ফল করা
যায় “।
ভোল
মঞ্চে উঠে কিছুটা ঘাবড়ে গেল কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে বলতে শুরু করলো। “ উপস্থিত গুরুজনদের
আমার সশ্রদ্ধ প্রনাম। আমার এই ফলের জন্য আমার বিদ্যলয়ের সমস্ত শিক্ষকের অবদান প্রচুর।
ওঁনাদের ঐকান্তিক সাহায্য ছাড়া এরকম ফল সম্ভব হতো না। ওঁদের আমার কৃতজ্ঞতা জানাই। কি
ভাবে ভালো ফল করা যায় তা আমি জানি না তবে আমি যে ভাবে পড়াশুনা করেছি সেটা বলি। সারা
বছর পড়াশুনা না করে শুধু পরীক্ষার সময় পড়লে ভালো ফল হয় না। প্রত্যেক দিনের পড়া ভালো
ভাবে রপ্ত করতে হয় এবং সমস্ত বিষয়ের এক একটি অধ্যায় মগ্ন হয়ে চিন্তা করতে হবে যতক্ষন
অধ্যায়টা পুরোপুরি আয়ত্ব না হয়। স্মৃতিতে ধরে রাখতে বারে বারে ঝালিয়ে নেওয়া দরকার ।
আগের বিষয় আয়ত্ব না হলে পরের বিষয় বুঝতে পারা অসুবিধা হয়। স্মৃতিকে বারে বারে পড়ে বাড়ানো
যায় এবং মগ্নতার সঙ্গে বিষয়কে চিন্তা করে গভীরে পৌঁচালে বুদ্ধিও বাড়ে। পড়াশুনা একরকম
সাধনা, ধ্যানমগ্ন হয়েই এগোতে হবে।“ এই বলে ভোলা বক্তব্য শেষ করলো।
প্রত্যেক
শিক্ষক বিভিন্ন বিষয়ের একটি করে বই উপহার দিলেন। ভোলার বই পড়তে ভালোবাসে তাই সে খুব
খুশি। প্রাধান শিক্ষক পিওনকে বললেন “তুমি যাও, ভোলা ছেড়ে দিয়ে এসো। ও একা এত জিনিস
নিতে পারবে না”। আর ভোলাকে বললেন কোনো অসুবিধা হলে তাঁকে জানাতে। ভোলা বাড়ী ফিরে এল।
দু
চার দিন পরে একদিন সকালা পরান কাকা তার বাড়ীতৈ এলেন ও ভোলা বললেন- “ বাবু, ততে মোর
কিছি কথা কহিবার অছি “।
“
হঁ, কাকা কুহ”
“
মো ঝিঅ এই আঠ মাস হেলা। তাকু কিয়ে শুকিবা বান
মারিচি। সিয়ে দিনকু দিনকু শুকি যাউছি। মু গুণি দেখেইলি কিন্তু কিছি হউ নাই “।
“বান
কিস কাকা ?”
“যিয়ে
মন্ত্রতন্ত্র জানে, সিয়ে মন্ত্র দেই কিছি করি দিয়ে। যাহাকু করে সিয়ে শুকি শুকি মরি
যায় ।“
“
হউ কাকা চল।“
ভোলা
যাওয়ায় সময় ভাবছে মন্ত্র দ্বারা কারো ক্ষতি করা যায় ? সে বা কেন এই বাচ্চার ক্ষতি করবে
? এটা বিশ্বাস করা যায় না। ভাবতে ভাবতে তারা পরানের বাড়ীতে এসে গেল। ভোলা দেখলো যে
বাচ্চা এক প্রায় অন্ধকার ঘরে রাখা হয়েছে। ভোলা কাকীমাকে বললো তাকে বাহিরে আনতে। শিশুটাকে
দেখে ভোলা দশম শ্রেণীতে জীবন বিজ্ঞানে পড়া রিকেট রোগের কথা মনে পড়লো। সে কাকীমাকে জিজ্ঞাসা
করলো “ ইহাকু কি খরার দেই থিল ?”
“
না, সেরকম বাহারকু আনা হয় নি। “
ভোলা
তাদের বললো “ এর গটে রুগ হেইচি, বান মারা বিশ্বাস
করা ঠিক না।গটে কাম কর, ইহাকু সকালে সুরিস তেল মাখেই খরার দিও, আউ দুধ ও অধে কদুল খুয়াও।
কাকীমাও দুধ, কদুল ও বেথুয়া শাগ বেশী বেশী খাও। মাসে পরে দেখতে হব উন্নতি হউচি কিনা।
ভয়র কিছি নাই।“
এই
বলে সে বাড়ী চলে যায়। ভর্তি হতে তাকে কলেজে যেতে হবে। মা বলে দেয়েছেন-
“
মঙ্গলে ঊষা বুধে পা,
যেথা ইচ্ছা সেথা যা ।“
তাই
সে বুধবার খুব ভোরে কলেজে রওনা হলো ঘন্টা দেড়েক পৌঁচে সে জানতে সরাসরি কলেজে যাওয়ার
বাস নেই। বাস পরিবর্তন করে যেতে হবে। কলেজে পৌঁচাতে দুপুর গড়িয়ে গেল। বিরাট মাঠের উপর
কলেজের তিন তলা টানা বিল্ডিং। সে অফিসে গেল ও একজন কর্মচারীকে বললো সে ভর্তি হতে এসেছে।
“
ঐ যে ওই টেবিলে বড়বাবু বসে, ওর কাছে যাও।“
ভোলা
ঐ টবিলে গিয়ে বললো “স্যার আমি ভর্তি হব “। বড়বাবু চোখ
না তুলে বললেন “ নাম কি ?”
“
ভোলানাথ দে”
“
ও ভোলানাথ “ বলেই তিনি চোখ তুলে তাকালেন।
“
তুমি বস “ ভোলা সামনের চেয়ারে বসলে, তিনি বললেন-
“
তোমার ব্যাপারে সরকারী সম্মতি কলেজে এসে গেছে। তোমাকে ভর্তির জন্য কোনো ফি দিতে হবে
না এবং সিলবাসের সমস্ত বই ফ্র্রিতে পাবে। তোমার এখানে থাকা খাওয়ার জন্য মাসিক বৃত্তিও
পাবে। এরপর গ্রন্থাগারে প্রচুর বই আছে, পড়তে
পার। আর ভর্তির পর অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করে যেও।”এই বলে এক টেবিলের দিকে তাকিয়ে বললেন
“ তপন একে ভর্তি করে নাও।“ ভোলা ভর্তি হওয়ার পর অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করতে গেল। অধ্যক্ষ
তাকে কলেজের মুখ যাতে উজ্জ্বল হয় সেইভাবে পড়াশুনা করতে উপদেশ দিলেন।
ভোলাকে
বাড়ী ফিরতে হবে তাই বাস রাস্তার দিকে ছুটলো । বাড়ীতে পৌঁচাতে রাত হয়ে গেল। বাড়ীতে ঢুকেই
মাকে খাবার দিতে বললো তার সকাল থেকে খাওয়া হয় নি। মা তাকে পান্তাভাত, আলু ঢেঁড়স ভাজা
ও মাছের পাতুরি দিলেন। ভোলা গোগ্রাসে খাওয়া শেষ করে শুয়ে পড়লো।
সকালে
উঠে তার একমাত্র চিন্তা কলেজের শহরে একটা সস্তায় থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে
বৃত্তির টাকায় কুলিয়ে যায়। ভোলা জানে বাড়ী থেকে টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। আর কুড়ি দিন পর
ক্লাস আরম্ভ হবে। এর মধ্যে একটা ব্যবস্থা করতে হবে। এর মধ্যে ভোলা একদিন স্কুলে গেল
খোঁজ নিতে কে কে এই কলেজে ভর্তি হয়েছে। সে জানতে পারলো আরো দুজন ছাত্র ঐ কলেজে ভর্তি
হয়েছে এবং এক শিক্ষক ঐ শহরে থাকে তাঁর জানাশুনা একজনের নাম ঠিকানা দিলেন।
ভোলা
দুই বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করে একদিন কলেজে গেল। প্রথমে স্কুলের শিক্ষক যার সঙ্গে দেখা
করতে বলেছলেন, তাঁর সঙ্গে দেখা করলো। তিনি সব শুনে বললেন “ তোমরা কিছুক্ষন পরে এসো,
আমি যোগযোগ করে দেখছি ।“
ওরা
কলেজে এল। ওরা সলেবাসের বইর তালিকা সংগ্রহ করলো। ভোলা কলেজ থেকে কিছু বই সংগ্রহ করলো।
এই ছুটির মধ্যে কিছুটা এগিয়ে রাখবে। ওরা কলেজ থেকে ঐ ভদ্রলোকের গেল। ভদ্রলোক বললেন
“ একটা ঘর পাওয়া গেছে। ভাড়া কম কিন্তু বৈদ্যুতিক আলো নেই। যদি দেখতে চাও,, দেখতে পার।“
তারা
ঘর দেখতে গেল। ঘরটা শহরের বাহিরে, পরিবেশ ভালো তাই তারা রাজী হয়ে গেল। তারপর তারা বাড়ী
ফিরে গেল।
কলেজে
ক্লাস আরম্ভ হতে দশদিন বাকি আছে। এই সময়ে কলেজ থেকে আনা বইগুলো পড়তে আরম্ভ করলো বিশেষ
করে বিজ্ঞান বিষয়ক বইগুলো। কলেজে যাওয়ার আগের দিন সে পরান কাকার বাড়ী গেল মেয়েটা কেমন
আছে জানতে। কাকীমাকে জিজ্ঞসা করে জানলো মেয়েটা অনেক ভালো আছে। ভোলা ভাবছে সে রোগটা
ঠিকই ধরেছে। রিকেট রোগকে মানুষ কালা জাদু মনে করে।
পরের
দিন বুধবার ছিল, ভোলা ভোরে বেরিয়ে পড়লো, বিশ্বাস না থাকলেও মায়ের কথা মানতেই হবে। ভোলা
সঙ্গে বেশ কিছু মুড়ি ও বিছানা জামা কাপড় নিয়ে নিল। ভাড়া ঘরে গিয়ে ঘরটা পরিষ্কার করলো।
আর দুজন আজ বা কাল আসবে।
ক্লাস
আরম্ভ হলো। ক্লাসে মেয়ের সংখ্যা খুবই অল্প। মেয়েদের অশিক্ষাও কুসংস্কারের ভুত লোকের
ঘাড়ে চেপে বসে আছে । এ ভুতকে হারাতে না পারলে দেশের উন্নতি নেই।
চারদিন
পরে নবীন বরণ উৎসব হলো। গান, আবৃত্তি ও নাচ সবই হলো। ভোলার অনুষ্টান খুব ভালোই লাগলো।
এ রকম অনুষ্টান সে কোনোদিন এর আগে দেখে ছিল না। অনুষ্টানে একটি মেয়ে নেচেছিল। ঐ মেয়েকে
ভোলার ভালো লাগলো। মেয়েটার মধ্যে এক মগ্ধতা আছে। গায়ে রং ফরসা কিন্তু দুধে আলতা নয়,
চন্দ্রবদনী, গড়ন মাঝারি, হাসি সুন্দর, মাতার চুল খুব লম্বা নয় কিন্তু ঘন।মেয়েটা কোন
ক্লাসে পড়ে ভোলা জানে না । আগে কখনো দেখেনি। ভোলা ভাবে প্রাকৃতিক নিয়ম ও সৃষ্টির কারনে
যৌবন আরম্ভ থেকে বিপরীত লিঙ্গের মধ্যে এক আকর্ষন থাকবেই। শুধু মানুষের নয়, সমস্ত জীবের
এ এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এ চিরদিন চলবে কিন্তু বিশেষ একজনের প্রতি বেশী হয় কেন সে
সিন্ধান্ত নিতে পারে নি।
পরের
দিন কলেজে আসার সময় গেটের কাছে মেয়েটার সঙ্গে দেখা। ভোলা বলে- “ কাল নাচ খুব ভালো হয়েছে।“
মেয়েটা
লজ্জা পেয়ে চুপ করে থাকলো।
“
তোমার কোন ক্লাস?”
মেয়েটা
মুখ না তুলে যেতে যেতে বললো “ প্রি ইউ প্রথম বর্ষ।“
“আমার
ও তাই, তোমাকে তো ক্লাসে দেখি নি। সকলকে এখনো চিনে উঠতে পারি নি।“ ওরা কথা বলতে বলতে
শ্রেণী কক্ষ এসে গেল।
এর
পরে কলেজে দু চার কথা হয়েছে দু জনের।
সময়
এগোতে লাগলো। ভোলা অন্য বিষয় চিন্তা না করে পড়ায় ব্যস্ত থাকলো। আর বছর দেড়েক পরে ফাইনেল
পরীক্ষা, তার সঙ্গে সে মেডিকেল জয়েন্টে বসবে। ফল তো ভালো করতেই হবে। নিজকে অনুপ্রেরণা
দেওয়ায় জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসগরের কথা মনে করে। তাঁর প্রখর মেধাশক্তি ও স্মৃতিধর
হওয়া সত্বেও রাত জেগে পড়ার জন্য টিকিতে দড়ি বেঁধে রাখতেন। কষ্ট ছাড়া কৃষ্ণ পাওয়া যায়
না। ভোলার পড়ার নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। যখন
ইচ্ছা হয়, তখনই পড়তে বসে।
“’যখনি জেগেছে চিত্ত শুনেছ বাণী,
তখনি এসেছে প্রভাত ।
যাও তোমার ব্রতপালনে ।“
সাধনা
ও কর্ত্তব্যে কোনো সময় হয় না।
সে
তার যথাসাধ্য চেষ্টা করতে লাগলো।
দেখতে
দেখতে ষান্মাসিক পরীক্ষা এসে গেল। ফল ও বেরলো । ফল দেখে ক্লাস শুদ্ধ অবাক । অধ্যক্ষ
ও অধ্যাপক ভোলার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এঁরা অনেক দিন এ রকম ফল খুব কম দেখেছেন। কলেজে ভোলার
নাম মুখে মুখে ঘুরতে লাগলো । ভোলার জেদ আরো বাড়লো। সে পড়াশুনায় সময় বাড়য়ে দিল। বাড়ী
মাঝে মাঝে একদিনের জন্য যায় বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা করে আসে।
একদিন
কলেজে ওই মেয়েটি ভোলার কাছে এসে বললো
“ তুমি তো কলেজে হিরো হয়ে গেলে “।
“
কেন ? এমন কি হলো ?”
“
তোমার রেজাল্ট নিয়ে সকলের মুখে মুখে ঘুরছে ।“
“
তাতে আমি কি করে হিরো হলাম ? আমি নিজের জন্যই পড়াশুনা করেছি।“
“
সকলে তো পড়াশুনা করে কিন্তু ভালো রেজাল্ট করতে পারে না কেন ?”
‘
এটা আমি কি করে বলবো ? হয়তো কোথাও খামতি আছে। বিষয় রপ্ত হলে বেশীর ভাগ প্রশ্নের উত্তর
দেওয়া যায়। তোমার নামটা জানা হয় নি ।“
“
আমার নাম মাধুরী বর “
“
কোথায় বাড়ী ?”
“
রামনগরের পূর্বে, সমুদ্রের কাছাকাছি “।
এ
দিকে ক্লাসের ঘন্টা পড়ল । ক্লাস আরম্ভ হবে। ওরা ক্লাসের দিকে চললো।
ক্লাসের
মধ্যেও দুজনের ঘন ঘন চোখে চোখ পড়ে । ভোলা ওর চোখের ভাষা বুঝতে পারে তাই সতর্ক থাকে।
কিছুদিন
পর ভোলা কলেজ থেকে বাড়ী ফিরছে, হঠাৎ শুনতে পেল পিছন থেকে তাকে কে ডাকছে। পিছনে ঘুরে
দেখলো, মাধুরী।
মাধুরী
কাছে এসে বললো “ তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে “।
“
বল “
“
রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা যায় নাকি ? লোকে কি ভাববে।“
“
তাহলে ?”
“
এদিকে চায়ের দোকান নেই ?”
“
আছে কিন্তু রাস্তার ধারে ষেমন হয় “
তারা
রাস্তা ধরে এগলো। সামনে একটি চা দোকান পেল। দোকানে বেশী ভিড় নেই। ওরা একটি বেঞ্চে বসলো।
ভোলা বললো বলল “ বলো”
“আরে,
বাবাঃ, তোমার বেশী সময় নষ্ট করবো না”
“
ঠিক আছে, বল না “
“
আমি এক জেলে পরিবারের মেয়ে। বাবা মাছের ব্যবসা করেন। ভাই আমার ছোট, পড়াশুনা করে। আমাদের
সমাজে বেশীর ভাগ মেয়েদের ছোটবেলায় বিয়ে হয়ে যায়। আমি পড়াশুনা করতে চাই। আমাদের বাড়ীর
পাশে এক মাধ্যমিক স্কুল আছে তাই মাধ্যমিক পাশ করতে পেরেছি। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর আমার
বিয়ে ঠিক হয়ে গেছিল। আমি লড়াই করে বিয়ে বন্ধ করেছি “।
ভোলা
বলে “ খুব ভালো করেছ। শিক্ষা তো আলো “।
“আমি আরও পড়তে চাই। তোমাকে দেখে আমার মনে হয়েছে,
তুমিই আমাকে সাহায্য করতে পারো “।
“
বলো, কি সাহায্য করতে পারি ?
“ কিভাবে পড়াশুনা করলে আমি এগোতে পারবো ? “
“
দেখ, আমি তো বিষেশজ্ঞ নই, তবে আমি যে ভাবে পড়ি সেটা তোমাকে বলতে পারি “
“
ঠিক আছে, তাই বলো, আমি চেষ্টা করে দেখবো “
“
দেখ, যে কোনো অধ্যায় প্রথম দুতিন বার একাগ্র মনে পড়তে হবে ও গভীর ভাবে চিন্তা করতে
হবে। মন্থন না করলে রত্ন পাবে না। এটা রপ্ত করে অন্য অধ্যায়ে যেতে হবে। আমাদের স্মৃতিতে
চিরস্থায়ী করতে গেলে, ওই অধ্যায় প্রথমে দশদিন, তারপর একমাস, তিন মাস, ছয়মাস ও এক বছর
অন্তর ঝালিয়ে নিতে হবে। তাই সিলেবাস একবছরের হয় “
“ও
তাই, দেখি হয় কিনা “
“
এ বারে যাই “
“
আর একটু বস না, তোমার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে “
“
আজ না আর একদিন হবে “ বলে সে উঠে বাসার দিকে পা বড়লো। তারও যে ভালো লাগছিল তা অস্কীকার
করার উপায় নেই। কিন্তু এ ভুতকে প্রশয় দিলে মাথায় ওঠে। আমাদের শরীরে ছয়টি ভুত বাস করে।
কাম, ক্রোধ, লোভ, মদ, মোহ ও মাৎসর্য। এরা আমাদের মনকে প্রভাবিত করে দুষ্কর্ম করিয়ে
নেয়। এদের মধ্যে কাম, ক্রোধ, লোভ ভুত তিনটি খুবই ভয়ঙ্কর যৌবনে কামই প্রেমের ছদ্মবেশে
আসে। কাম চরিতার্থ করতে প্রেমই টোপ। এই টোপে প্রলুব্ধ হয়ে সকলে কামের কবলে পড়ে। মুনি,
ঋষি, যোগী কেউই এর থেকে নিস্তার পান নি। ভোলার ক্লাসে বৈষ্ণব সাহিত্য পড়ানো হচ্ছে ।
বাংলার অধ্যাপক সুন্দরভাবে বৈষ্ণব সাহিত্যে প্রেম সমন্ধে আলোচনা করেছিলেন। বৈষ্ণব সাহিত্য
অনুযায়ী প্রেম পাঁচ প্রকার- শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য, মুধুর । এই সব প্রেম বা ভালোবাসা
সকল মানুষের মধ্যে দেখা যায়। এর মধ্যে মধুর প্রেম শ্রেষ্ঠ, কারন এই প্রেমে আকর্ষণ অত্যধিক
ও দুর্দমনীয় কিন্তু প্রদীপের নীচে যেমন অন্ধকার থাকে, মধুর প্রেমে আছে কলুষতা ও কলঙ্ক
। মধুর প্রেম দুই ধরনের- স্বকাম যাতে কামনা বাসনা থাকে ও নিষ্কাম যাতে কোনো প্রত্যাশা
থাকে না। শারীরিক সম্পর্কের চেয়েও
গভীর,
আধ্যাত্মিক
এবং
নিঃস্বার্থ
ভালোবাসার
প্রকাশই নিষ্কাম প্রেম বলে।
“
আত্মেন্দ্রিয় প্রীতিইচ্ছা ধরে কামনাম
কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতিইচ্ছা ধরে প্রেম নাম। “
মধুর
প্রেম শুধুমাত্র ঈশ্বরের প্রতি হতে পারে, এ প্রেম ও পূজা সমার্থক। যৌবনে বিপরীত লিঙ্গের
প্রতি যে আকর্ষন তাকে মহান বলে অভিহিত করা হয় কিন্তু এতো কামনার আবেগ থেকে উৎপত্তি
ও শারীরিক সম্পর্কের জন্য কামভুতের কারসাজি।
এই
ভুতের সঙ্গে লড়াই তো করতেই হবে। নিজেকে সংযত করতে হবে।
ভালোবাসা
তো মানুষের মধ্যে থাকবেই কিন্ত বাস্তবের মাটিতে হাঁটা উচিত। এইসব কথা ভাবতে ভাবতে তার
একটা কথা মনে এল। ও যেখানে ভাড়া থাকে সেখানে ঘরের মালিক ও আরো দুজন ভাড়া থাকেন। তার
মধ্যে একজন পবন বাবু, বয়স ছাব্বিশ বা সাতাশ হবে।মাঝারি চেহেরা, উস্ খুসকো চুল, কারো
সঙ্গে তেমন মেশেন না। মনে হয় তিন চার বছর আগে বিয়ে হয়েছে। বছর খানেক একটি ছেলে আছে।
প্রত্যেক
রাতে এই ঘর থেকে রাতে চিৎকার, চেঁচামেঁচি, নারী ও বাচ্চার কান্না গভীর রাত পর্যন্ত
শোনা যেত। ভোলা রাত জেগে পড়াশুনা করতো বলে এইসব শুনতে পেত কিন্তু তার সেভাবে অসুবিধা
হয় না কারন সে একাগ্র মনে পড়াশুনা করে বলে অন্য শব্দ কানে যায় না I কিন্তু অন্যান্যরা
এই নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিল তাই তারা ঘরের মালিকরের কাছে গিয়ে বললো “ কাকু, পবন বাবুর ঘর থেকে
প্রত্যেক রাতে ঝগড়া ঝাটি, চিৎকার চেঁচামেঁচি, কান্নাকাটির শব্দ শোনা যায়। আমাদের খুব
অসুবিধা হয়।“
কাকু
বললেন “ শোন পবনের কথা। পবনের ও ওর বৌ এর বিয়ের আগে চার পাঁচ বছরের প্রেম ছিল। জাত
এক নয় বলে মেয়ের বাড়ী থেকে এই বিয়েতে আপত্তি ছিল। মেয়েটা একবার আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল,
পবন ছাড়া ও বাঁচবে না। তারপর মেয়েটা পালিয়ে এসে মন্দিরে বিয়ে করে। বছর খানেক ঠিকঠাক
ছিল। ত।রপর শুরু হয়েছে কেত্তন। পবন নেশা করে এসে বৌটাকে পেটায়। বৌউটার তো বাপের বাড়ী
সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। ওর ওই ছোটো ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার জায়গা নেই। কাঁহাতক এসব সহ্য
করা যায় ? আমি অনেক বার ওদের বুঝিয়েছি। কোনো ফল হয় নি। এবার তাহলে কড়া কিছু করতে হবে।“
ভোলা শুনে ত থ, এ রকম আবার
হতে পারে নাকি ? ভালোবাসা এত ঠুনকো, বালির বাঁধের মতো সহজে ভেঙ্গে যায়। ভোলার এ সম্বন্ধে
কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। ভালোবাসার অনেক গল্প পড়ছে- লায়লা মজনু, সেলিম আনারকলি, এই প্রেমের
জন্য ট্রয় নগর ধ্বংস হয়েছিল। কাব্যে এই প্রেমকে আলাদা মূল্য দেওয়া হয়েছে কিন্তু বাস্তবে
মূল্যহীন। যেমন চুম্বকের বিপরীত মেরুর মধ্যে একসময় প্রচন্ড আকর্ষন থাকে, মিলিত হলে
আকর্ষন মিলিয়ে যায়। যৌবনের প্রেমও শারীরিক মিলনে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। কামাবেগের ও
পরিপক্কতা এবং প্রজ্ঞার
অভাবে অনেকে ভুল
পথে চলে যায়
যার
জন্য
পরবর্তী
জীবনে
তাদের
অনেক
বড়ো
দাম
দিতে
হয়।
ভোলা ও মাধুরীর দেখা সাক্ষাৎ ও
কথাবার্তা হয়। দুজনের দুজনকে ভাল লাগে। কিন্তু তারা কখনো সীমা লঙ্ঘন করে নি।
৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ
ভোলার প্রি ইউ পরীক্ষা ও মেডিক্যাল জয়েন্ট শেষ হয়েছে। সে
দিন দুই হলো বাড়ী এসেছে। যদি জয়েন্টে রেঙ্ক হয় তবে কোথায় পড়তে হবে সে জানে না। রেঙ্ক
অনুযায়ী কলেজ পাওয়া যাবে। আর না হলে ঐ কলেজে অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়ে পরের বছর জয়েন্টের
জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। মাধুরী ভোলাকে বলেছিল সে শিক্ষিকা হতে চায়। হয়তো সে ঐ কলেজে পড়বে।
ভোলা পরানের বাড়ী গেল তার মেয়েটা কেমন আছে জানার জন্য । বাড়ী
ঢোকার আগে পরানের সঙ্গে দেখা। সে গরুর জন্য খড় কাটছিলা ভোলাকে দেখে জিজ্ঞাসা করল-
“ ভোলা কেভে আইলু “
“ এই দিন দুই হেলা “
“ পড়া সরি গলা ?”
“ না, না, পড়ার শেষ নাহি । ইয়ে চালিব । তুম ঝিয় ভল ? “
“ হঁ, তু তাকু বঁচেই দেলু , নহেনে মরি জান্তা “
“ হউ কাক, এই অন্ধ বিশ্বাসগুলা মনরু বাহারিব কেমিতি ?”
“ এই বিশ্বাসগুলা আম বাপ গুসবাপ আমলরু চালিচি, ভল ভাবরে বুঝেইনে
আস্তে আস্তে কাটি যিব “
“ হউ, মু আসুছি কাকা “ এই বলে সে সামন্ত কাকার বাড়ীর দিকে
গেল । সামন্ত বাবু বাড়ীতেই ছিলেন । ভোলা গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করলো। সামন্ত বাবু
ভোলাকে বসতে বললেন ও পাশে বসলেন।
“ কবে এলে ভোলা ?”
“ এই দুদিন হলো”
“ তোমার পরীক্ষা কেমন হলো ?”
“ পরীক্ষা তো ভালো হয়েছে। তবে রেজাল্ট না বেরনো পর্যন্ত কিছু
বলা যাবে না।“
“ তুমি তো ডাক্তারী পড়বে স্থির করেছ ?”
“ তাই তো জয়েন্ট দিয়েছি। সিট খুব অল্প । কি হবে জানি না।“
“ডাক্তারীটা পড়া খুব দরকার। ডাক্তারের অভাবে মানুষের দুর্দশার
শেষ নেই।“
“ হ্যাঁ কাকু, শিক্ষা ও চিকিৎসার অভাবে গ্রামে কুসংস্কার
ভুত গেড়ে বসেছে। আমি আপনার কাছে এসেছি একটি প্রস্তাব নিয়ে।“
“ বল, কি প্রস্তাব।“
“ আমি তো মাস দুয়েক থাকবো। এর মধ্যে সন্ধ্যার পর মহাদেব প্রাঙ্গনে
গ্রামের লোকদের জড় করে কুসংস্কারের অপকারিতা সমন্ধে বলা যায় তাহলে কিছুটা উপকার হয়।“
“ এতো খুব ভালো প্রস্তাব।“
“ আপনার সাহায্য ছাড়া হবে না।“
“ আরে আমি তো আছি, তুমি আরম্ভ করে দাও। ভোলা তুমি যখন এসেছ
তোমাকে
একটা কথা বলার আছে।“
“ বলুন কাকু।“
“ তোমার বিপিন পাত্রের কথা মনে আছে।“.
“ হ্যঁ, উনি তো মারা গেছেন।“
এমন সময় সামন্ত কাকীমা ভেতর থেকে ডাকলেন “ একটু আসবে, দরকার
আছে।“
“ ভোলা, দু একদিনের মধ্যে একবার একবার এসো, তখন বলবো।“
“ আচ্ছা, কাকু।“
ভোলা উঠে বাড়ীর দিকে চললো। যাওয়ার সময় ভাবলো কাকু কি বলতে
চান। বিপিন কাকুর বাড়ী গ্রামের একেবারে উত্তরে, তার বাড়ী থেকে একটু দুরে কিন্তু গ্রামে
সকলের খবর সকলে রাখে। ভোলার মনে আছে বিপিন কাকুর আলসার হয়েছিল। বছর চার পাঁচের আগে
চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন। খুব অমায়িক লোক ছিলেন। শান্ত ভদ্র সরল স্বাভাবের। সকলকে
সম্মান দিয়ে কথা বলতেন। তাঁর জমিজমা ছিল না, শুধু ভিটেটুকু। তিনি দিনমজুরি করে সংসার
চালাতেন। তার বিয়ের বছর চারেক পর তাঁর এক মেয়ে হয়। তা পর থেকে তার শরীর ভলো যাচ্ছিল
না। বছর আঠ পরে তাঁর আলসার ধরা পড়ে। ঠিক মতো চিকিৎসার অভাবে একবছরের মধ্যে তিনি মারা
যান। কাকীমা ও মেয়েটি অকুল সমুদ্রে পড়ে। মেয়েটি তখন পাঠশালায় পড়ে। ভোলা শুনেছে মেয়েটা
পড়াশুনায় খুব ভালো ছিল। কেউ কেউ বলতো মেয়েটা নাকি ডাইনি, ওই তার বাবাকে খেয়েছে। ভোলা
তখন সপ্তম কি অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে ও স্কুল বোড়িং এ থাকে তাই ব্যাপারে কোনো চিন্তা ভাবনা
মাথায় আসে নি। এখন ভাবছে এক বাচ্চা মেয়ে কি ডাইনি হতে পারে ও মানুষকে খাওয়ার জন্য মেরে
ফেলতে পাবে, যত সব আজগুবি। মানুষ কতটা কুসংস্কারাছন্ন হলে ঐ সব মাথায় আসতে পারে। ওদের
এই অসময়ে সামন্ত কাকু তাদের সাহায্য করে ছিলেন। পরে পাত্র কাকীমা লোকের বাড়ীতে মুড়ি
ভেজে, ধান সেদ্ধ বা অন্যান্য কাজ করে দিন নির্বাহ করেন। মেয়েটি প্রাথমিক পরীক্ষায় খুব
ভালো করেছিলা তার আরও পড়াশুনা করার আগ্রহ ছিল কিন্তু কাছাকাছি স্কুল না থাকায় এখন ঘরেই
থাকে। ঘরের সমস্ত কাজকর্ম ও রান্নাও করে। মাকে কোনো কাজ করতে দেয় না। অবসর সময়ে যেখানে
যে বই পায় সেইসব বার বার পড়ে আয়ত্ব করার চেষ্টা করে। ঘরের বাইরে বেরোয় না। গ্রামের
সকলে এখন বলে “গুণে সরস্বতী রূপে লক্ষ্মী “। যারাই তাকে ডাইনি বলেছিল তারাই মেয়েটার
প্রশংসায় পঞ্চমুখ। মানুষের চরিত্র বোঝা বড়ই দায়, বিশেষত মেয়েদের। তারা পড়াশুনার অভাবে
বাইরের আলো দেখতে পায় না তাই বিচার বিবেচনা ছাড়া মন্তব্য করে দেয়। পাত্র কাকীমা মেয়ের
বিয়ের ব্যাপারে খুব চিন্তায় আছেন। মেয়ে বড় হয়ে গেছে, এখন পাত্র পক্ষের যা চাহিদা তা
পুরন করা অসম্ভব। যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় তারা বিয়ের খরচা ব্যবস্থা করা বামন হয়ে
চাঁদ ধরার সমান। তাই মার হয়তো বিনিদ্র রাত কাটচ্ছে।
কিন্তু সামন্ত কাকু কি বলতে চাইছেন ? ভোলা কিছুই আন্দাজ করতে
পারে না। ভোলা ঠিক করলো যে সামন্ত কাকুর সঙ্গে কাল দেখা করতে হবেই। কুসংস্কার ভুতের
সঙ্গে লড়াইর পরিকল্পনা ও বিপিন কাকুর সম্বন্ধে কি বলতে চাইছেন জানতে হবে।
ঘরে গিয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করলো “ বিপিন কাকুর কি খবর?”
“ তার বৌ লুক ঘরে কাম করি খায়। তার ঝিয় ঘরর সবু কাম করে,
ঝিয়টা দেখতে দূর্গা প্রতিমা। মুতো ভাবুচি তাকু বৌ করি আঁলিবি’”।
“ তুমে রুহ তো। পড়াশুনা করতে দেব নি “।
ভোলা ওখান থেকে চলে গেল। ভাবলো তার কানে যা এসেছে সেগুলো
সত্য। গোবরে ও পদ্ম ফুলও ফোটে । সুযোগ না পেয়ে কত প্রতিভা অকালে নষ্ট হয়ে যায়। পরের
দিন সকালা ভোলা সামন্ত বাবুর বাড়ী গেল। তাঁকে প্রনাম করে বললো “ কাকু আসতে বলেছিলেন
“।
“ হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে একটা আলোচনা আছে। এ কথা আমি কাউকে এখনো
বলি নি। সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। চল ঘরে গিয়ে বসি ।“
তারা একটি ঘরে গেলে “ ভোল বসো, তুমি জান আমার একমাত্র ছেলে
মেদিনীপুর শহরে থেকে পড়াশুনা করছিল। এবারে সে বি এ, অনার্স নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। খোকা একমাসে আগে বাড়ী এসেছিল।
সাত আঠদিন ছিল। সে কখনো বিপিনের মেয়েকে কোনোদিন দেখেছে ও তার মায়ের কাছে তার প্রশংসা
করেছে। মনে হয় তার পছন্দ হয়েছে।“
“ আপনার ছেলের বয়স কত হলো ?”
“ এইতো চব্বিশ চলছে”।
“ আর ঐ মেয়ের ?”
“ ওর পনের হবে”।
“ তারপর শোন না, আমি এমনি ওর বাড়ীতে বিপিনের স্ত্রীর সঙ্গে
দেখা করতে গেলাম। আমার ইচ্ছা মেয়েটাকে দেখি, তাকে সেই ছোটোবেলায় দেখেছিলাম। মেয়েটা
আবার বাড়ীর বাইরে বেরোয় না। দেখলাম মেয়েটা সত্যিই সুলক্ষণা ও সুন্দরী। রান্না ও ঘরের
সমস্ত কাজ জানে। সভ্য, ভদ্র ও স্থির ধীর। সে তার মনের ইচছা জানিয়েছিল। সে পড়াশুনা এগিয়ে
নিয়ে যেতে চায়। সে পাঠশালার শিক্ষকের কাছ থেকে
বিভিন্ন ক্লাসের পুরুনো বই সংগ্রহ করে বাড়ীতে পড়াশুনা করে। আমার তো পছন্দ হয়েছে। কিন্তু
সমস্যা হলো একেতো তারা নিঃস্ব অপরদিকে আমাদের থেকে জাতে কম। এই পরিস্থিতিতে আমি কাউকে
কিছু না বলতে পারছি না কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি। কি করা যায় বল তো ভোলা ?“
“ দেখুন কাকু, আপনার চিন্তা দুটি। ওরা গরীব ও জাতে আপনাদের
চেয়ে নীচু। লক্ষ্মী চঞ্চলা। কখন আসে, কখন চলে যায়। আমীর গরীব হয়, গরীব আমীর। ধন সম্পত্তি
সমাজের মানদন্ড হতে পারে না। ভগবান সমাজের প্রয়োজনে ধনী গরীব সৃষ্টি করেছেন। সকলে যদি
ধনী হতো তাহলে পরিশ্রমের কাজের কি হতো, কারা ফসল ফলাতো, কারা ধনীর অট্টালিকা তৈরী করতো,
কারা রাস্তা তৈরী করতো। মানবিকতাই মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। ঈশ্বরচন্দ্র, রামকৃষ্ণ, স্বামী
বিবেকানন্দ এরা গরীরের ঘরে জন্মেও নিজ গুণে পৃথিবীতে শ্র্রেষ্ঠ আসন পেয়েছেন। ধনী দরিদ্র
সামাজিক বন্ধনের মাপকাটি হতে পারে না।
“ যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে,
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।”
যদি জাতের কথা বলেন, হিন্দুদের মধ্যেই এত জাতিভেদ দেখা যায়।
অন্য ধর্মের মধ্যে এই নিষ্টুর প্রথা নেই। হিন্দুধর্মের নান ধরনের নিষ্টুর নিয়ম আছে।
নিষ্টুরতার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল সতীদাহ প্রথা। কতটা নৃশংস হলে এক যুবতী মেয়েকে জ্যান্ত
পুড়িয়ে মারতে পারে। ভাগ্যিস ইংরাজরা এসেছিল, নাহলে ওই ভুত ঘাড়ে বসে থাকতো। হিন্দুধর্মের
ধর্মের নামে অধর্মের জন্য কত অত্যাচারিত মানুষ অন্য ধর্ম গ্রহন করেছেন তার সঠিক ইতিহাস
অজানা।মধ্য
যুগে সবচেয়ে বেশী দলিত ও নিম্নবর্গীয় মানুষ বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিল।
আমি বিবেকানন্দের
লেখায় পড়েছিলাম প্রথম দিে হিন্দুধর্মে বর্ণপ্রথা হয়েছিল গুণ ও কর্মের ভিত্তিতে । যারা
পূজাঅর্চা করতেন ও জ্ঞানী তাদের ব্রাহ্মণ, যারা রাজকার্য ও যুদ্ধে পারাদর্শী তারা ক্ষত্রিয়,
যারা ব্যবসা করতেন তারা বৈশ্য ও যারা অন্যান্য সেবামূলক কাজ করতেন তাদের শুদ্র বলা
হতো। প্রত্যেক বর্ণের লোক আলাদা আলাদা গুণের
অধিকারী হতেন। কালক্রমে এটা জন্মগত হয়ে যায়। এখন আবার বিভিন্ন বর্ণের লোক বিভিন্ন কর্ম
করছে। যেমন সৈন্যবাহিনীতে সব বর্ণের মানুষকে দেখা যাবে এবং সব বর্ণের মানুষরা ব্যবসাও
করছে।সমাজ যেভাবে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য এবং শূদ্রের
বিভাগ করে , আমার মনে হয় এ একটি কলিযুগীয় কুসংস্কার। তাই কাকু, আমি জাতিভেদের বিরুদ্ধে
“ সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।“ স্বার্থসিদ্ধির জন্য
জাত-কুল-ধর্ম-বর্ণ তৈরী করা হয়েছে। এক দল আরেক দলকে ঘৃণা করে, পরস্পর হানাহানিতে লিপ্ত হয়ে
মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এই ব্যবস্থা মেনে নেওয়া যায় না। সব চেয়ে বড় কথা
গ্রামের সকলে মেয়েটির প্রশংসা করছে। যদিও মানুষের স্বভাব যখন তখন পালটে যায়। যাইহোক
আপনি যে দুটি বাধার কথা বললেন তার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আপনি বরং ছেলের মত স্পষ্টভাবে
নেয় এবং মেয়ের মতামত নেয় তারপর সিন্ধান্ত নেন ।“
“
তোমার কথা শুনে আমার দুশ্চিন্তা কেটে গেছে।
ছেলে তো আমার সঙ্গে সামনা সামনি এ ব্যাপারে কথা বলবে না, ওর মাকে বলবো কথা বলতে।
কি হলো তোমাকে জানাবো। ভোলা, তোমার কাকীমা এখানে দুপুরে খেয়ে যেতে বলেছেন।“
“
কাকু, আমাদের সভার ব্যবস্থা কবে করবেন ?”
“
হ্যাঁ, আমি এই চিন্তায় ছিলাম। দুএক দিনের মধ্যে করে ফেলবো।“
ভোলা
তাড়াতাড়ি খেয়ে বাড়ী ফিরলো। মাকে বলা হয় নি, মা চিন্তায় থাকবেন।
তিন
দিন পর মহাদেব মন্দির প্রাঙ্গনে
অনেকে জড় হয়েছে। সামন্ত বাবু এসেছেন।
তিনি
প্রথমে বলতে শুরু করলেন। “ তোমাদের এখানে ডেকেছি কিছু কথা বলার জন্য । আমরা কিছু কিছু
অন্ধ বিশ্বাসের কাজ করে থাকি যার ফলে আমাদের প্রচুর ক্ষতি হয়। গ্রামে অধিকাংশ লোক পড়াশুনা
তেমন ভাবে করেন না। শিক্ষার অভাবে আমরা কোনটা ভালো কোনটা মন্দ বুঝতে পারি না। মাধ্যমিক
স্কুল আমাদের গ্রাম থেকে দশ বার মাইল দুরে তাই মেয়েরা পাঠশালার পর পড়া বন্ধ করে দেয়।
আমরা চেষ্টা করবো একটা মাধ্যমিক স্কুল করা যায়। ভোলাকে তোমরা সকলে ভালো করে জান। ও
এই বছর হয়তো ডাক্তারী পড়তে ভর্ভি হবে এবং আমাদের গ্রামের নাম উজ্জ্বল করবে। ও তোমাদের
কিছু কথা বলবে। তার কথা ভালো করে শোন ও মেনে চলার চেষ্টা কর।“
ভোলা
বলতে শুরু করে “ আমি জ্ন্ম থেকে এই গ্রামে বড় হয়েছি। ছোটো বয়সে এত কিছু বুঝতাম না।
যখন থেকে বুঝতে পেরেছি তখন থেকে আমি আতঙ্কিত হয়ে দেখেছি অন্ধবিশ্বাসের ফলে আমরা নানা
বিপদে পড়ি। এই অন্ধবিশ্বাসকে কুসংস্কার বলে, একে সমাজের অভিশাপও বলা যায়। যুক্তিহীনতা আর শিক্ষার অভাব থেকেই কুসংস্কার
এর জন্ম ও আমাদের ঘাড়ে ভূতের মতো চেপে বসে আছে । যেমন কোনো অসুখ হলে মনে করি
ভুতে ধরেছে বা সাপে কাটলে আমরা ওঝা ও গুণিণের কাছে যাই, ভাক্তারের কাছে যাই না।“
এমন
সময়ে সমীর কাকু জনতার মধ্য থেকে চিৎকার করে বলেন “ তু তো তিন চারজন কু বঁচেইচু।“
ভোলা আবার বলতে শুরু করল “ এই ভুতের সঙ্গে
লড়াই করে তার হাত থেকে রেহাই পেতে হবে। সব অন্ধ বিশ্বাস যে ক্ষতি কারক তা আমি বলছি
না। আমরা মঙ্গলা মায়ের পূজা করি তা থেকে ভক্তি ভাবের উদয় হয় কিন্তু তাঁর সামনে ছাগ
বলি দেওয়া অবৈজ্ঞানিক ছিল। এ বন্ধ হওয়ায় আমাদের কিছু ক্ষতি হয়েছে কি ? ডাইনিবিদ্যা, বান
মারা, তন্ত্রমন্ত্র, ঝাঁড়ফুক, গাছে ভূত থাকে, অমবস্যার রাতে ভূত বের হয়, ভূত প্রেত, জিন ইত্যাদিকে বিশ্বাস করবেন না I মেয়েকে কম বয়সে বা বড়োর সঙ্গে
বিয়ে দিবেন না I সব মানুষই এক, জাতিভেদ প্রথা মানুষের সৃষ্টি I এই প্রথা মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে ও আমাদের
ক্ষতি করে। যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই সেসব কুসংস্কারের এই জগদ্দল পাথরটিকে মন থেকে সরানো যদিও খুব একটা সহজ কাজ নয়, তারপরেও
সর্বস্তরের মানুষদের মনের এই অন্ধকার বিশ্বাস দূরীকরণে এগিয়ে আসতে হবে। ধর্মবিশ্বাস বা ঈশ্বরবিশ্বাসের বিরোধী নন৷ কিন্তু
এই বিশ্বাসের কালোবাজারি করে যাঁরা মানুষকে ঠকান, শোষণ করেন, তাঁদের
সম্পর্কে সমাজকে সচেতন করাই তার লক্ষ্য I এমন অনেক তথাকথিত সাধুবাবা, তান্ত্রিক আছেন যাঁরা নানা
ছলচাতুরি ও কালো ম্যাজিকের ব্যবসা ফেঁদে দিব্যি থাকেন I হিন্দু নারীরা নানা উপলক্ষ্যে দিনের পর দিন উপবাস পালন করতে গিয়ে
রক্তাল্পতার শিকার হন I নিজস্ব
বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন, যদি
সেটা সমাজের বা অন্য কারোর ক্ষতির কারণ না হয় I এই লক্ষ্যে পর্যাপ্ত শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। আমরা সমস্ত অন্ধ বিশ্বাসের কথা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ধীরে ধীরে আলোচনা করবো I সামন্ত কাকু আমাদের সঙ্গে আছেন, আমরা শিক্ষার
ব্যবস্থা করবই যদি আপনারা সঙ্গে থাকেন। অন্ধবিশ্বাস রূপ ভুতের সঙ্গে লড়াইতে আমরা
জয়ী হবোই।“
সকলে
চিৎকার করে বললো “সাথরে অছি ।“
পরের
দিন বিকালা ভোলা গ্রামে ঘুরে বাড়ীতে আসতেই মা বললেন “ তোর গটে খামর চিঠি আসিছি ।”
ভোলা
খামটা খুলে দেখলো মাধুরী লিখেছে। ভোলার মনে এক আনন্দের ঢেউ খেলে গেল । “ মাধুরীর আমাকে
মনে আছে দেখছি ।“
মাধুরী
লিখেছে “ ভোলা দা, ভালো আছ নিশ্চয় । মা ও বাবাকে প্রানাম জানাবে। আমার এখানে একা একা
ভালো লাগচ্ছে না। তোমার কথা শুনতে খুব ইচ্ছা করচ্ছে। এই কয়দিনে মনে হচ্ছে অনেক যুগ
তোমাকে দেখি নি। তোমার উপদেশ মতো পড়াশুনা করায় আমার অনেক উন্নতি হয়েছে। পরীক্ষাও এতটা
ভালো হবে আশা করি নি। এরপর ও আমি যেকোনো ভাবে পড়াশুনা চালিয়ে যাব। তোমাকে বলেছি কিনা
জানি না আমি শিক্ষিকা হতে চাই।
যদি
যোগাযোগ রাখতে চাও তবে চিঠি দেবে। ঠিকানা দিলাম।
গ্রাম
– কাসেমপুর
পোষ্ট
– জামিনদা
জেলা
– পূর্ব মেদিনীপুর , ইতি, মাধুরী
চিঠি
সংক্ষিপ্ত কিন্তু ভোলা এর মধ্যে অনেক কিছু পড়তে পারচ্ছে। ওর ইচ্ছা, অভিপ্রায়, আবেগ
অভিমান সব স্পষ্ট লেখা আচ্ছে। মেয়েদের আবেগ অনেক বেশী তাই তারা স্বপ্নে ভেসে বেড়ায়।
বাস্তবের মাটি যে কত কঠিন তারা বুঝতে চায় না। ভোলা ভাবে তাকে তো আবেগে ভাসলে হবে না।
আবেগের মধ্যেই ছয় রিপু থাকে।
“ আবেগই নাচায়
মনকে তা থৈ তা থৈ
নিয়ে
ফেলে দেয় জলে অথৈ I”
সারথি বুদ্ধিকে দিয়ে আবেগকে দমন করতে হয়। তাদের বসে
না আনতে পারলে বিপদে পড়তেই হবে।
“ মন রজ্জুতে
বাঁধা ছয় রিপু অশ্ব তাহে
ক্রোধ,
লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য ও কাম
দুরন্ত
দুর্জয় দুর্দমনীয় ছয় অশ্বের এ নাম
সারথি
অনভিজ্ঞ হলে, অশ্ব বাগে থাকে না”
ভোলা
এখন ভালো ডাক্তার হতে চায়, আবেগকে প্রশয় দিতে চাইলো না তাই সে চিঠি দেবে না স্থির করলো।
দিন
সাত পর বিকাল মদন কাকু ভোলাকে বললো “ততে সামন্ত বাবু দেখা করতে কহিচন ।“
ভোলা
তার পরের দিন সকালা সামন্ত বাবুর বাড়ী গেল । সামন্ত বাবুকে প্রমান করে বললো
“ কাকু আমাকে ডেকেছেন ?”
“
বস, একটা ভালো খবর আছে । আমার ছেলে রাজী হয়েছে । তোমার কাকীমাকে নিয়ে বিপিনের বাড়ী
গিয়েছিলাম। কথা বলতে মা ও মেয়ের সেকি কান্না। বলে তারা গরীব, এই একটুখানি ভিটে ছাড়া
আর কিছু নেই। তার যতটুকু গয়না ও বাসন কোসন ছিল বিপিনের চিকিৎসায় সব বিক্রি করতে হয়েছিল। মেয়েকে যে একখানা
শাড়ী কিনে দেবে তার পয়সা ও নেই। সে ভেবেছিল মেয়ের বিয়ে আর দিতে পারবে না। আমি অনেক
করে বোঝালাম। বললাম আমরা গ্রামের সকলে আছি। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তোমাকে কিছু ভাবতে
হবে না। মেয়ে ভিতরে কোথাও ফোঁপাচ্ছিল, আমাদের সামনে এসে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলো। তোমার
কাকীমা তাকে ধরে এনে পাশে বসালেন ও চোখের জল মুছে দিলেন। কিছুক্ষণ পর আমি জিজ্ঞাসা
করলাম “ মা তোমার নাম কি ? নীচু গলায় মাথা না তুলে বলে “ভারতী পাত্র “ আমি জিজ্ঞাসা
করলাম “ভারতী মানে কি জান ?” বললো সরস্বতী ।
“তোমার
নামকরন সার্থক না ব্যর্থ ?”
কি
উত্তর দিল জান “আজ পর্যন্ত, ব্যর্থ সুযোগ পেলে সার্থক ও হতে পারে।“
আমি
বললাম “ কি রকম সুযোগ চাও ?”
সে
মাথা না তুলে বললো “ আমি তো সব ক্লাসের পুরনো বই জোগাড় করে পড়ছি। আমার মনে হয় প্রাইভেটে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিলে পাস করে যাব। এইভাবে পড়াশুনা
এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। আমার আর একটা ইচ্ছা আছে। পড়ার শেষে গ্রামে শিক্ষা বিস্তারে ব্রতী
হতে চাই। “ আমি বললাম “ ঠিক আছে, আমি দেখছি কি করা যায়।“
ভোলা
বললো “ কাকু আপনি মহান কাজ করছেন। এই কাজ করতে বুকের পাটা দরকার।“
“
ভোলা, আমি এখনো এ কথা প্রকাশ করি নি। তোমার তো এক মাস পরে ফল বেরতে আরম্ভ হবে। তুমি
ব্যস্ত থাকবে, তাবে আমার কাজটা সমাধা হবে কিকরে ?”
“
আপনি আশীর্বাদটা এর মধ্যে সেরে ফেলুন, টুকটুক করে অন্য কাজ গুছিয়ে নেয়। আমি বিয়ের সময়
যেখানে থাকি উপস্থিত থাকবো। আপনার এ কাজ সকলের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আপনি না থাকলে
এ মেয়েটার জীবন কতটা দুর্বিষহ ভাবে কাটতো চিন্তা করুন। কত মেয়ে দারিদ্রতা ও শিক্ষার
অভাবে নরকপ্রায় জীবন অতিবাহিত করে তার ইয়ত্তা নেই। “
ভোলা
মনে মনে বললো “ সৃষ্টিকর্ত্তা এই অভাগীদের পৃথিবীতে এনেছেন অসহনীয় দুঃখ কষ্ট ভোগ করার
জন্য।“
৭ম পরিচ্ছেদ
ভোলার প্রি ইউ এর ফল বেরিয়েছে । সে যেদিন কলেজে যাবে ফল জানতে
তার আগের রাতে ঘুমানোর সয়ম কিছুতেই মুঘ আসছে না। মনের মধ্যে এক আশঙ্কা ছিলই। তারপর
মাধুরীর সঙ্গে যদি দেখা হয় তবে কি বলবে ? মাধুরীর চিঠির জবাব পর্যন্ত দেয় নি । এতটা
অবজ্ঞা করা কি ঠিক হয়েছে ? নিজের স্বার্থের জন্য মাধুরীকে অবহেলা করা উচিৎ কিনা বুঝতে
পারলো না। আবার ভাবলো শুধু যদি বন্ধুত্বের সম্পর্ক হতো তবে চিন্তার ছিল না কিন্তু মধ্যে একটা প্রেমের
সুপ্ত বীজ লুকিয়ে আছে। প্রেমের কি কোনো মূল্য আছে ? প্রেম কি প্রচ্ছন্নভাবে কামনা চরিতার্থ
করার পথ ? বাস্তবে না হলেও কাব্যে, সাহিত্যে প্রেমের যশগাথা সর্বজনবিদিত। ভোলা ভাবছে
এর রহস্য কি I শারীরিক আকর্ষণ প্রাথমিক পর্যায়ে প্রেমের সৃষ্টি করে। তবে
দীর্ঘমেয়াদী হয় কিনা সন্দেহ আছে। কামনা ফুরালে প্রেমের পরিণতি হয়। চিরকালীন
সম্পর্কের জন্য মানসিক সম্পর্ক ও বোঝাপড়া বেশি জরুরি কারন শারীরির আকর্ষন ধীরে
ধীরে কমতে শুরু করে। ভোলা প্রি ইউ ক্লাসে হরমোনের ভূমিকার কথা সবিস্তারে
পড়েছে। প্রেমের অনুভূতি তৈরীতে অক্সিটোসিন হরমোন বড় ভূমিকা গ্রহন করে। তাই একে লাভ
হরমোন বলা হয়। এই হরমোন ছেলে ও মেয়েদের আলাদা আলাদা বয়স থেকে শুরু হয়। সাধারনত
বয়ঃসন্ধির পর মেয়েদের ১২-১৩ ও ছেলেদের
১৫-১৬ বয়স থেকে শরীরের পরিবর্তন শুরু হয়। স্বাভাবিক ভাবে এই বয়স থেকে মিলনস্পৃহা
দেখা দেয় ও প্রেমের উৎপত্তি হয়। এটা আমাদের আয়ত্তাধীন নয়। আপন নিয়মে পরিবর্তন হতে
থাকে। । প্রজনন জীবের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য
এরদ্বারা জীবের বংশবৃদ্ধি ও ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। প্রজননের জন্য শারীরিক
মিলন প্রয়োজন। তাই মিলনের জন্য বিপরীত লিঙ্গের আকর্ষন স্বাভাবিক। কিন্তু মনকে দৃঢ়
সংকল্প ও অভ্যাসের দ্বারা এই আবেগকে নিজের বসে রাখা যায়। মন যা চাইবে, তাই করতে
হবে এটা অন্যায় অনৈতিক। জীবনে প্রত্যেক কাজের নির্দিষ্ট সময় থাকে। তাই জীবনকে
চারভাগে ভাগ করা হয়েছে। ব্রহ্মচর্য,
গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ এবং সন্ন্যাস। ব্রহ্মচর্য কাল জ্ঞান
অর্জনের সময়। শিক্ষাকে জলাঞ্জলী দিয়ে আবেগের বসে গার্হস্থ্য জীবনে চলে যাওয়া সমীচিন
নয়। বিদ্যা অর্জনের সময় প্রেম আবেগকে দমন করাই বিধেয়।ছাত্র ছাত্রীদের সতর্ক
থাকা উচিত বলে ভোলা মনে করে। প্রেম করার জন্য জীবনে অনেক সময় পাওয়া যাবে। প্রেম মানসিক চাপ এবং সম্পর্কের
জটিলতা তৈরি করতে পারে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ভোলা
এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছে।
পরের
দিন সকালে মা বাবাকে প্রনাম করে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। কলেজে গিয়ে দেখলো অনেক
ছাত্র ছাত্রী জড়ো হয়েছে। তারা নোটিশবোর্ডের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে, ভোলা জায়গাই
পাচ্ছে না ফল কি হয়েছে দেখার। সে একটু দুরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। এই সময় এক
অধ্যাপক ঐ দিক দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ভোলা দেখে বললেন “ ভোলানাথ, তুমি আমার সঙ্গে
এসো, কথা আছে “
ভোলা তাঁর পিছন পিছন গিয়ে
স্টাফ রুমে ঢুকলো। তাকে ঢুকতে দেখে অন্যান্য অধ্যাপক বলে উঠলেন “ আরে ভোলানাথ এসে
গেছ, আমরা তোমার অপেক্ষায় ছিলাম। তুমি এই চেয়ারে বসো।“
ভোলা
সকলকে পা ছুঁয়ে প্রনাম করে বসলো। অধ্যাপকরা তার কাছাকাছি জড়ো হয়ে বসলেন। অঙ্কের
অধ্যাপক উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেল “ ভোলানাথ তো কামাল করে দিয়েছে। আমাদের কলেজে এমন
রেজাল্ট আগে কেউ কখনো করে নি। তুমি আমাদের কলেজে তো প্রথম হয়েছ, মেদিনীপুর জেলাতে
ও প্রথম হয়েছ, তোমার রাজ্যে দশের মধ্যে নাম থাকবে। আমরা সকলে তোমার জন্য গর্বিত।“
জীববিজ্ঞানের
অধ্যাপক জিজ্ঞাসা করলেন “ এরপর কি নিয়ে পড়বে ঠিক করেছ?
“আমার স্যার ডাক্তারী পড়ার ইচ্ছা আছে। আমি মেডিকেলে জয়েন্ট
দিয়েছি।“ খুব ভালো, দুতিন দিনের মধ্যে জয়েন্টের
রেজাল্ট বেরোবে, তুমি তিনদিন পর কলেজে চলে এসো, আমরা তোমাকে গাইড করে দেব। রামলাল ভোলানাথের
মার্কশিটটা বড়বাবুর কাছ থেকে এসো । ভোলানাথ অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করে যাবে।“
ভোলা মার্কশিট নিয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে করলো। তিনি বললেন “ ভোলানাথ
আমি খুব খুশি হয়েছি। তোমার স্টাইপেন্ড বাড়ানো সুপারিস করছি। যাও, বাড়ী যাও। আরো ভালো
কর।“ বেরিয়ে দেখলো ভীড় পাতলা হয়ে গেছে। মনে মনে চারদিক দেখলো মাধুরী আছে কিনা। কোথাও
দেখতে পেল না। সে নোটিশবোর্ডের কাছে গিয়ে মাধুরী নম্বর মিলিয়ে দেখলো খুব ভালো নম্বর
পেয়ে পাশ করেছে। বাড়ী ফেরার জন্য বাস রাস্তার দিকে এগলো। সকালের পর থেকে তার আর খাওয়া
হয় নি, সে ঘুগনি রুটি খেয়ে বাসে উঠলো। বাসে ভাবচ্ছে মাধুরীর সঙ্গে দেখা হয় নি ভালো
হয়েছে। দেখা হলে কথাবার্তা মান অভিমান করে বাড়ী যেতে মধ্য রাত হতো ও ওর প্রেমটা জাগিয়ে
উঠতো।। বাড়ীতে ঢুকতে মা জিজ্ঞাসা করলেন “ কিস হেলা রে, পাশ করিচু ?” “ হঁ মা, পাশ হেইচি”
“তোর সে ডাক্তর পড় হব না ?”
“ তার ফল বাহারি নি “
“ হউ, তু খাইতে আয়”
তিনদিন পরে ভোলা আবার কলেজে গেল। সে জীববিজ্ঞানের অধ্যাপকের
সঙ্গে দেখা করলো। স্যার বললেন “ ভোলানাথ, তোমার মেডিকেলে ভালো রেঙ্ক হয়েছে। মনে হয়
তুমি মেডিক্যাল কলেজে সুযোগ পেয়ে যাবে। তবে হস্টেলে থাকার ব্যবস্থা হতে দেরী হবে। তোমার
কলকাতায় থাকার কোনো জায়গা আছে ?”
“ না স্যার, আমার সে রকম জানাশোনা নেই ।“
“ তবে তুমি একটা কাজ কর। সাত আঠদিন পর মেডিকেল কলেজে যাও।
সেখানে যোগাযোগ করে জান কিভাবে ভর্তি হবে। আর আমি একটা ঠিকানা দিচ্ছি, সে মেডিকেল কলেজের
কাছে মেসে থেকে পড়াশুনা করে। ওর সঙ্গে দেখা কর। ও যদি কিছুদিন থাকার ব্যবস্থা করতে পারে।“
“ ঠিক আছে স্যার “ বলে সে বাড়ী ফিরলো।
ভোলা একটু দুশ্চিন্তায় পড়লো। সে কোনোদিন কলকাতায় যায় নি।
জানে কলকাতা পশ্চিম বঙ্গের রাজধানী। ইংরাজ আমলে ভারতের রাজধানী ছিল। শুনেছে বিরট শহর।
সেখানে একা একা গিয়ে ঠিকানা খুঁজে পাবে তো। ভোলা কিছু জামা কাপড় গুছিয়ে নিল। ষাওয়ার
আগের রাতে বাবা দুশত টাকা দিয়ে বললেন “ এটা জোগাড় করছি । সাবধানরে রহিবু।“
গ্রামে লোকের হাতে কাঁচা টাকা প্রায় থাকে না। ব্যবসা বা কেনা
বেচা কম হয়। তারপর মা পঞ্চাশ টাকা হাতে দিয়ে বললেন “ এইটা রখি থা। আউ ম পাখরে নাই।
কেতে দিনরু গটে গটে রখিথিলি।“ ভোলা মায়ের চোখে জল দেখতে পেল। তারও দুই চোখ থেকে কান্নার
বন্যা বেরিয়ে আসতে চায়। ভোলা কোনোক্রমে নিজেকে সামলালো।
পরের ভোরে ভোলা বেরিয়ে পড়লো অজানার সন্ধানে। খড়্গপুরে গিয়ে
লোকাল ট্রেনের টিকিট কেটে প্লাটফর্মে দাঁড়ালো। সে কোনদিন ট্রেন দেখে নি । অন্য লাইন
দিয়ে ট্রেন মালগাড়ী ছুটছে। ভোলা অবাক হয়ে ভাবছে আরে বাবারে, কত বড়: দেখতে দেখতে খালি
লোকাল ট্রেন এসে দাঁড়ালো। ভোলা উঠে জানলার ধারে হাওড়ার দিকে বসলো। একটা তীক্ষ্ণ হুইসেল
দিয়ে ছুটতে আরম্ভ করলো। শহরটা পেরোতে গ্রামবাংলার অপরূপ রূপ দেখে চোখের পাতা পড়ে না।
“অবারিত মাঠ, গগনললাট চুমে তব পদধূলি,
ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি।
পল্লবঘন আম্রকানন রাখালের খেলাগেহ,
স্তব্ধ অতল দিঘি কালোজল-- নিশীথশীতল স্নেহ।
বুকভরা মধু বঙ্গের বধূ জল লয়ে যায় ঘরে--
মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে।“
লাইনের ধারের জলাশয়ে পদ্মের
সমারোহ। মাঝে মাঝে গ্রামের পাশ দিয়ে ট্রেন ছুটছে লোকেরা কাজ করছে, মহিলারা কলসি করে
জল নিয়ে যাচ্ছেন। কখনো হাটের পাশ দিয়ে যাচ্ছে। “ উচ্ছে বেগুন পটল মুলো” বিক্রি হচ্ছে
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ভোলার একটি কবিতা মনে পড়লো।
“দূরে
দূরে
গ্রাম
দশ
বারোখানি
, মাঝে
একখানি
হাট
সন্ধ্যায়
সেথা
জ্বলে
না
প্রদীপ,
প্রভাতে
পড়ে
না
ঝাঁট।
বেচাকেনা
সেরে
বিকেলবেলায়
যে
যার
সবে
ঘরে
ফিরে
যায়;”
ভোলা তন্ময় হয়ে দেখছে। হঠাৎ ট্রেনের গতি মন্থর হয়ে
গেল। একটু চলে একটু দাঁড়ায়। যাত্রীরা বলছে হওড়া এসে গেছে। ধীরে ধীরী ট্রেনটি প্লাটফর্মে
দাঁড়ালো। স্রোতের মতো লোক নামতে শুরু করলো। ভোলাও নেমে অবাক। হাওড়ায় নেমে গেল ঘাবড়ে।
কত বড় ষ্টেশন তবু তিল ধারনের জায়গা নেই। লোকে লোকারণ্য্। কোনদিকে যাবে জানে না। লোকের
স্রোত যেদিকে যাচ্ছে, সে তাদের সঙ্গে চললো। এক সময় ষ্টেশনের বাইরে এসে গেল। দেখলো প্রচুর
বাস দাঁড়িয়ে। একজনকে জিজ্ঞাসা করে একটা বাসে উঠে পড়লো। টিকিট কাটার সময় কন্ডাক্টরকে
বললো “ আমি মেডিকেল কলেজে যাব, যেখানে নামতে একটু নামিয়ে দেবেন। কন্ডাক্টার মাথা নাড়লো।
সেন্ট্রাল এভিনিউ আসতে কন্ডাক্টর বললো “ এখানে নেমে রাস্তা পেরিয়ে সোজা চলে যাও “
ভোলা নেমে দেখলো গাড়ী পর গাড়ী পিঁপড়ের সারির চলছে,
পেরবে কি করে। বেশ কিছুক্ষণ পরে দুপাশে গাড়ী থেমে গেল। ভোলা এক নিঃশ্বাসে দৌড়ে রাস্তা
পেরিয়ে সোজা হেঁটে মেডিকেল কলেজে গেল। অফিসে গিয়ে জানলো যে তার যে রেঙ্ক আছে ঐ কলেজে
ভর্তি হতে পারবে। তাকে একটি ফর্ম পুরন করিয়ে ভর্তি করা হলো। পনেরোদিন পরে ক্লাস আরম্ভ
হবে। দু তিন মাসের পরে কলেজ হোস্টেলে শিট পাওয়া যাবে। ওখান থেকে বেরিয়ে কিছু খেয়ে ছেলেটির
মেস খোঁজা শুরু করলো। ছেলেটির সঙ্গে দেখা করে স্যারের কথা বললো। ছেলেটা বললো “ তুই
তো আজ ফিরতে পারবি না। আমি দেখি মেসে কেউ আজ নেই। তুই ওইখানে রাত কাটিয়ে কাল সকালা
বাড়ী ফের। আমি দেখবো দু তিন মাস কোথাও রাখা যায় কিনা।“ ভোলা তারপর দিন বাড়ী ফিরলো।
খওয়া দেৃওয়া করার পর মা জিজ্ঞাসা করলেন “ কি হেলা রে, চালিয়াইলু ?”
“
ভর্তি হেই যাইচি, কলেজ খুলতে পনের কুড়ি দিন বাকী অছি । মা লিয় তুমর পঞ্চাশ টকা, রখি
দিয়। তুমে সারা জীবন এইটিকে রখিছ। মোতে ডাক্তার হেইতে দিয়। তুমর কিছি অভাব রহিব নি।“
এরমধ্যেই
গ্রামে রটে গেছে যে সামন্ত বাবুর ছেলের সঙ্গে ভারতীর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, আশীর্বাদও
হয়ে গেছে। এই বিয়ে গ্রামের মানুষের কাছে অভিনব কারণ এ একটি অসম বিবাহ। মেয়ে দরিদ্র
নিঃস্ব ও জাতে ছোটো। আমাদের গ্রামে মিত্র,
গুহ, দত্ত, দে, রায়, দাস, পাত্র,কামিলা, বারিক, সামন্ত পদবীর লোক বাস করে। সকলেই কৃষিজীবী।
এরা চারবর্ণের মধ্যে শূদ্র বলে পরিচিত কারণ এরা ফসল ফলিয়ে উচ্চ তিন বর্ণের সেবা করেন।
কিন্তু ভাবনার বিষয় শূদ্রের মধ্যে উচ্চ নীচের ভেদাভেদ এল কি করে। আমাদের সংবিধানে
৩৬৬(২৪) অনুচ্ছেদে এদের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত আর্থসামাজিক জনগোষ্ঠী তপসিতি জাতি বলে স্বীকৃত
হয়েছে । ইংরাজ আমল থেকে এরাই নিপীড়িত নির্যাতিত হয়েছে ও হচ্ছে। এদের মধ্যে ভাগ করে
এক্যবদ্ধ হওয়ার অন্তরায় সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য এবং জাতিভেদ প্রথা শুরু হয়েছিল। ক্রমে পেশার ভিত্তিতে
জাতিভেদ আরম্ভ হয় এবং জন্মসূত্রে তা চলতে থাকে। যেমন মেথরের ছেলে মেথরই হবে সে ভিন্ন
কাজ বা বিদ্বান হলেও। একেই বর্ণের মধ্যে কিছু জাতি অন্যদের চেয়ে উচ্চ বা নিম্ন অবস্থানে
থাকতে আরম্ভ হয়। জাতিগত সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য অন্ত্যবিবাহ
বা স্ববর্ণে বিবাহের প্রথা চলতে থাকে। এই অন্ধ বিশ্বাস সমাজের প্রভূত
ক্ষতি করে আসছে।
এইরূপ জাতিভেদের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই কিন্তু
বংসানুক্রমে চলে আসা বিশ্বাস মনের গভীরে শিকড় ছড়িয়েছে। তাই সহজে মেনে নেওয়া কঠিন ছিল
কিন্তু সেইরূপ প্রতিবাদ হলো না। ভোলা ভাবলো এই বিয়ে দিয়েই ভুতের সঙ্গে লড়াই শুরু হলো।
আরও অনেক পথ এগোতে হবে।
এক
স্থানে রই এক ভাষায় কথা কই
ব্যাপৃত
রহেছি একেই কাজে।
একসাথে
খেলা করি, পাঠশালা যাই
বিভেদ
কেন সমাজের মাঝে।।
পরের
দিন সকালা ভোলা গেল সামন্ত বাবুর বাড়ী। ভোলাকে সামন্ত বাবু বললেন “ ভোলা বসো,
তোমার সঙ্গে কথা আছে।“ ভোলা বসলে তিনি বলেন “ বিয়ের দিন ধার্য হয়ে গেছে, আর
কুড়িদিন পর। তুমি তারপর কলকতা যেও। ভারতীকে আমি মাধ্যমিকের বই কিনে দিয়েছি। যতদিন
আছ ওকে একটু দেখিয়ে দাও। ফর্ম ফিলাপ হয়ে গেছে আর তিন মাস পর পরীক্ষা। আর ভারতীর
বাড়ীতে যেসব অনুষ্টান হবে,তার দেখাশুনা তুমি করবে।‘ ভোলা আগ্রাহ্নিত হয়ে বললো “ঠিক
আছে, কাকু।“
দেখতে দেখতে বিয়ের দিন এসে গেল। এর মধ্যে
ভোলা ভারতীর বাড়ী কয়েকবার গেছে তার পড়শুনা কেমন চলছে দেখার জন্য। মেয়েটির মেধা আছে, স্মৃতিশক্তি প্রখর, একাগ্র
চিত্ত, যে কোনো বিষয় দ্রুত রপ্ত করতে পারে।
গ্রামাঞ্চলে বাঙালি বিবাহ হল সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের
উদযাপন। এই আচার-অনুষ্ঠানগুলি প্রাণবন্ত আচার-অনুষ্ঠান এবং রীতিনীতির চমৎকার সংমিশ্রন । সমস্ত বাঙালি বিবাহের
আচার-অনুষ্ঠান মিলন ও ভাববিনিময়ের জন্য একটি দুর্দান্ত আনন্দের মুহূর্ত। বংশবিস্তারে নারী পুরুষের মিলন একান্ত প্রয়োজন। প্রজনন
জীবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বিবাহ একজন নারী ও একজন পুরুষের মিলিত হওয়ার ছাড়পত্র। অগ্নি
ও বিয়ের সময়ে উপস্থিত ব্যক্তিকে সাক্ষী রেখে মিলনে স্বীকৃতি দেওয়ার সামাজিক অনুষ্ঠান।
“পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা।“গ্রাম-গ্রামে পথ বলতে কিছু ছিল না। তাই গাড়ী ঘোড়ার দেখা পাওয়া যেত না। বাংলার
হাজার বছরের প্রাচীন বিয়ের ঐতিহ্য পালকি। এ বাহনে চড়া দারুণ মজা। বিয়ে উৎসবে পালকির
কদর ছিল সবচেয়ে বেশি। এই সময়ে বিয়েতে পালকিই
ছিল একমাত্র বাহন। বিয়ের জন্য পালকি ছিল খোলামেলা, নস্কা করা বিভিন্ন রঙের ও দুপাশে দুটি চেয়ার বর কনে বসার জন্য থাকতো। গ্রামীণ
আঁকা-বাঁকা মেঠো পথে, কখনও আলপথে বর-কনে পালকি চড়ে উভয়ের শ্বশুর বাড়িতে আসা-যাওয়ার
আনন্দঘন মুহূর্ত । গ্রামের পথে পালকিতে করে নববধূকে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে গাঁয়ের
সব ধরনের মহিলা ও উঠতি বয়সের চঞ্চল মেয়েরাও রাস্তার ধারে জড়ো হতো। পালকি মানুষের ঐতিহ্যবাহী
প্রাচীন বাহন ছিল। বরকে পালকিতে নিয়ে বেহারারা নির্দিষ্ট ছন্দের তালে তালে, তাল মিলিয়ে সুর করে দ্রুত গতিতে চলতো। তার সঙ্গে বরযাত্রি ও ঢোলক,
কাঁসর, কম দামের সেক্সোফোনের
মতো বাজনাদার যেত। বরযাত্রীরা পায়ে হেঁটে বরের পালকির সামনে পিছনে যেত
ও পরের দিন বর কনের সঙ্গে ফিরতো। রাত্রি যাপনের কনের বাড়ীতে করতেন। গোবর নিকানো উঠানে চারটি বাঁশ পুঁতে তৈরি হত ছাতনাতলা। হ্যাজাক লণ্ঠন জ্বেলে রাতের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হতো। একসময় বর নিয়ে বরযাত্রীর দল বিয়ের আসরে ঢুকলেই শঙ্খধ্বনির
সঙ্গে বর বরণ করা হতো । গ্রামাঞ্চলে মূলত পুরোহিতরা ঘটকালির কাজ করতেন। যজমানির সুবাদে তাঁরা বিভিন্ন গ্রামে ঘুরতেন। তাই পাত্র কিংবা পাত্রীর খোঁজখবর থাকত তাঁদের নখদর্পণে। পাত্রপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী পাত্রী কিংবা পাত্রীপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী পাত্র যোগাড়ের অন্যতম মাধ্যমই ছিলেন ওইসব ঘটকেরা। কুষ্টি মিলিয়ে রাজযোটক বিয়ে সংঘটিত করার জন্য পাত্র-পাত্রী উভয় পক্ষের কাছেই ভালো রকম পারিশ্রমিক পেতেন। বন্ধু বান্ধবকে বিয়ের
নিমন্ত্রন করতে বাড়ীর কোনো সদস্য গিয়ে সুপারি দিয়ে আসতে হতো।
মনুসিংহতায় সেকালের অবস্থা অনুসারে ৮ ( আট) রকমের বিবাহ-
পদ্ধতির বর্ণনা আছে। যেমনঃ-
১। ব্রাহ্ম বিবাহ ২। প্রজাপত্য বিবাহ ৩। আর্য্য বিবাহ ৪। দৈব বিবাহ ৫।
অসুর বিবাহ বা আসুরিক বিবাহ ৬। গন্ধর্ব
বিবাহ ৭। পিশাচ বা পৈশাচিক বিবাহ ৮। রাক্ষস বিবাহ। তখন সমাজে প্রজাপত্য বিয়েরই প্রচলন ছিল।মহাভারতে রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে
গন্ধর্ব মতে বিয়ে করছিলেন উল্লেখ আছে। বিয়ের প্রথম অনুষ্ঠান আইবুড়ো ভাত। ছেলে ও মেয়ের
বাড়ী ও আত্মীয় বাড়ীতে নুতন কাপড় পরিয়ে নানা ব্যঞ্জনসহ খাওয়ানো হতো। বিয়ের দিন ছেলে
মেয়ে দুজনে উপোস করে থাকতো ও সকালে সারা শরীরে হলুদবাটা মাখিয়ে পাঁচজন এয়োস্ত্রী মিলে
স্নান করাতো। মেয়ের বাড়ীতে সারা রাত ধরে অনুষ্ঠান চলতো।ব্রাহ্মণ ছাদনা তলায় বিয়ের আসর
বসাতেন ও নাপিত তাঁর সহযোগী থাকতেন। আমকাঠ দিয়ে যজ্ঞকুন্ড হতো। ব্রাহ্মণ বিভিন্ন মন্ত্র
পাঠ করতেন। প্রধান দুটি মন্ত্র থাকতোই:-
“ ওম শ্রীম হ্রিম ক্লীম শ্রীম ক্লীম বিশ্বেশ্বরায় নমঃ “
" যদিদং হৃদয়ং তব/তদিদং হৃদয়ং
মম"
ছাদনাতলায় প্রথমে বর কনে সামনা সামনি
বসতো Iশুভ দৃষ্টি সবচেয়ে সুন্দর বিবাহের রীতিনীতিগুলির মধ্যে
একটি, যখন বর এবং কনে
তাদের বিয়ের দিনে প্রথমবারের মতো একে অপরকে দেখেন। কনে দুইচোখে পান পাতা দিয়ে মুখ
ঢেকে রাখতো এবং পান পাতা সরিয়ে চার চোখের মিলন হতো। বর ও কনে যজ্ঞাগ্নির চারপাশে সাতবার প্রদক্ষিণ
করতো। বিশ্বাস করা হয় যে এই মুহূর্তটি সৌভাগ্য এবং সুখ বয়ে আনে। তারপর হতো
মালা বদল। তখন বর কনে পাশাপাশি
বসার সুষোগ হতো। ঐ সময় কনের বাড়ীর ছোটো ছেলেরা আড়াল থেকে বরের পিঠে ঢিল মারতো
ঢপাঢপ। তাদের কিছু টাকা দিলে ঢিল মরা বন্ধ হতো। বর কনের কপালের সিঁথিতে সিঁদুর
পরিয়ে দিত। শেষের অনুষ্ঠান খই পুড়ানো। মেয়ের ভাই বা দাদা বর কনের হাতে খই দিত,
তারা যজ্ঞ কুন্ডে উৎসর্গ করতো। ভারতীর ভাই ছিল না বলে, ভোলা এই কাজটি করছিল। বিয়ে
হতে হতে প্রায় ভোর। বর কনেকে খেতে দাওয়া হতো। খাওয়ার পর তারা ও বর কনের বন্ধুরা
বাসর জাগতে যেত। পরের দিন, নববধূর পরিবার তাকে বিদায় জানায়
যখন সে তার বরের সাথে নতুন জীবনের জন্য তার পিতামাতার বাড়ি থেকে রওনা হয়। ঐ সময়
কনে বাড়ীর ও প্রতিবেশী মহিলারা নানা কথা সুর করে উচ্চস্বরে কাঁদতে থাকেন। পুরো
পরিবেশ দুঃখ ও আনন্দের মিশ্র আবেগে ভরে
ওঠতো।
কনে যত কাঁদে তার শতগুণ
কাঁদে মা, আত্মীয় পরিজন।
মেয়ের বাড়ীর অনুষ্টান শেষ এবং শুরু হয় ছেলের বাড়ীর অনুষ্ঠান। বর বৌ ছেলের
বাড়ী পৌঁচালে প্রথম হয় বধুবরণ। ছেলের মা বা মাতৃসমান মহিলা নববধুকে কাঁসার থালায়
ধান দূর্বা প্রদীপ শঙ্খ নিয়ে বরণ করেন।পরের দিন কালরাত্রি পালন হয়। ঐদিন বর বৌর
দেখা সাক্ষাৎ করা নিষেধ তাই বৌ প্রতিবেশী কারোও বাড়ীতে সারাদিন লুকিয়ে থাকে। কার
বাড়ীতে আছে বরকে জানানো হয় না। ঐদিন বিকালে যখন বৌ স্নান করে তখন হয় কাদাখেলা।
পুকুর থেকে কাদাপাঁক তুলে একে অপরে মাখায়।এখানে বলে রাখি গ্রামে কারোও বাড়ীতে
অনুষ্ঠান তাদের বন্ধুবান্ধব আত্মীয় স্বজন তিন চার দিন আগে থেকে অনুষ্টানের শেষ
পর্যন্ত বাড়ীতেই থাকতেন। তাই প্রচুর লোক কাদা নিয়ে একে অপরের পিছনে ছোটে, ধরে কাদা
মাখায়। সেকি হৈ হুল্লোড়। কারো লুকিয়ে থাকার উপায় নেই। ঘন্টা দুয়েক পরে দেখা যায়
সকলে সারা শরীর কাদায় ভর্তি ভুতের মতো ঘুরে বেড়ায়।পরের দিন বৌভাত ও রাতে লোকজনকে
খাওয়ানো ও ফুলসজ্জা। পরের দিন থেকে অষ্টমঙ্গলা আগের দিন পর্যন্ত বিকালা বর বৌকে
নিয়ে মহিলারা কড়ি খেলা হয় । কড়ি খেলা যে কি আনন্দের হয় তা খেলা না দেখলে ভাষায়
প্রকাশ সম্ভব নয়। কড়ি খেলা বৌ এর মন খারাপ থেকে এবং সকলের সঙ্গে পরিচিত হতে
সাহায্য করে।
সমস্ত অনুষ্ঠার ভালোয় ভালোয় মিটে গেল। গ্রামের প্রায় লোক ভারতীর মাকে কিছু
কিছু সাহায্য করে কাজ সমাধা করেছে। কাজ মিটে গেলে ভোলা কলকাতা গেল।
৮ম পরিচ্ছেদ
ভোলা
কলকাতায় কিছুদিন অন্য জায়গায় থেকে কলেজ হোস্টোলে আসন পেয়ে সেখানে থাকতে গেল। হোস্টলের
নামে তার এক আতঙ্ক ছিল। সে শুনেছিল কলেজ হোস্টলে রেগিং হয়। কিন্তু সে রকম কিছু দেখলো না। তিন চার দিন পর পাঁচ
জন সিনিয়র ছাত্র্র ঘরে এসে আড্ডা দিয়ে বলে গেল তারা পরিচয় করার জন্য এসেছিল এবং কিছু
দরকার হলে তাদের জানাতে। ভোলার প্রিয় বিষয় ছিল ডাক্তারী এইটা পেয়ে সে খুব খুশি তাই
জান প্রাণ দিয়ে পড়াশুনা করচ্ছে। ছয় সাত মাস পর বাড়ী গিয়ে জেনেছে ভারতী মাধ্যমিক প্রমথ
বিভাগে পাশ করেছে ও প্র্রি ইউতে ফর্ম জমা করে দিয়েছে । সে কলা নিয়ে পড়ছে। ভোলা ভারতীর
সঙ্গে দেখা করতে গেলে সে ভোলাকে প্রনাম করে ও
নিজের দাদার মতো ব্যবহার করে। বলে “ দাদা, আমি শশুর মশাইকে বলেছি একটা স্কুল
খোলার কথা । তিনি রাজী হয়েছেন।। আমি শিক্ষার প্রসারে ব্রতী হবো।“ ভোলা বললো “ তুমি এগিয়ে যাও, আমি পাশে আছি।“
ভোলাকে কলকাতায় চার থেকে পাঁচ
বছর থাকতে হবে। এই এক বছরে প্রাণ হাঁপিয়ে উঠেছে। প্রকৃতি এখানে অদৃশ্য। সবরকম বৈষম্য
এখানে সবখানে দৃশ্যমান। যে ফুটপাতে অভুক্ত অর্ধউলঙ্গ শিশু কিশোর কিশোরী বুড়ো বুড়িি
পড়ে আছে. সেই ফুটপাতের ধারে রাজকীয় প্রাসাদ, জৌলুসের বাহার খাবারের সমারোহ। মূল্যবোধ স্নেহ, শ্রদ্ধা, ভালবাসার স্পর্শ নেই।
কোথাও নেই সবুজের চিহ্ন । কয়লা উনুনের ধোঁয়া, শব্দ, কোলাহল, কোথাও কোথাও পুঞ্জীভুত
ময়লা বৃষ্টির জলে পচে দুর্গন্ধে ভরিয়ে দিচ্ছে। ময়লার জল রাস্তায় জমে জায়গাকে নরকে পরিণত
করেছে। এক পশলা বৃষ্টিতে রাস্তা, গলি, বস্তিতে জল দাঁডিয়ে যাচ্ছে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ।
মানুষের নৈতিক, চারিত্রিক অধপতন মনকে ব্যথিত করে। অসাধু ব্যবসায়ী, চোর গুন্ডা, ঠক বাটপাড়,
নষ্ট চরিত্রের মহিলা পুরুষদের আখড়া, সহমর্মিতা, সুহানুভূতি প্রভৃতি সুকুমার বৃত্তিগুলো
মন থেকে উধাও। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে,
শহরে
যানজট
লেগেই থাকে । কথা নেই বার্তা নেই মিছলের
পর মিছিল চলছে পিলপিল, জনজীবন বিপর্যস্ত । ভোলার পড়া শেষ হলে গ্রামে ফিরে যাবে ঠিক
করেছে।
প্রায় বছর দেড়েকের পর সে বাড়ী
গেছে। পরদিন সকালা সামন্ত বাবুর বাড়ী গেল খবরাখবর নিতে। ভারতী ভোলাকে দেখে খুব খুশি।
বলে “ জান দাদা, শশুরমশাই দুবিঘা জমি দিয়েছেন স্কুল করার জন্য। গ্রামের লোকেরা তিনটা
ঘর মাটির দেওয়াল তুলে দেবে। বর্ত্তমান খড়ের চাউনি দিয়ে কাজ চালানো হবে। সরকারের স্বীকৃতি
পেলে স্কুলকে বড় করার পরিকল্পনা হবে। কি বল দাদা ?”
“ ঠিকই বলেছ। আমি ও পড়া শেষ
হওয়ার পর গ্রামে চলে আসবো। তোমাদের সঙ্গে কাজ করবো। কুসংস্কার ভুতকে তাড়াতেই হবে।“
“
দাদা, একজন বিজ্ঞানের শিক্ষক দরকার। আমার এই বছর গ্রেজুয়েশান হবে যাবে। তারপর শুরু
করে দেব।“
“
কাকু কই ?”
“
উনি গ্রামের কারোর বাড়ীতে গেছেন।“
“
ঠিক আছ, আমি এখন আসি “
ভোলা
সাতদিন পর কলকাতায় ফিরলো। তার খুব ভালো লাগছে। স্কুলটা হয়ে গেলে খুব ভালো হবে। শুধু
গ্রামের নয় পার্শ্ববর্তী গ্রামের ছেলে মেয়েরাও পড়তে পারবে। ভোলা খঙগপুরে লোকাল ধরলো।
ট্রেন যাত্রা তার বেশ আকর্ষণীয়। গ্রাম বাংলার প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ
করা যায়। প্রকৃতি আমাদের জন্য তার সৌন্দর্য সাজিয়ে অপেক্ষা করে, শুধু দেখার চোখ
চাই। খোলা জমিতে চাষবাস, মাঝে মাঝে তাল, খেজুর, কাশফুলের বন এবং অচেনা গাছের ভিড়। খোলা আকাশে কত রকম পাখি ওড়ে বেড়ায়।
‘ “ “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায়
ভালোবাসি।“
প্রকৃতির দৃশ্য দেখতে দেখতে ট্রেন মেছেদায় থামলো।
লোক নামছে উঠছে। ভোলার চোখ একটা মেয়ের মুখে আটকে গেল। মাধুরী না, এ তো মাধুরী। ভোলার
মন হঠাৎ উদাস হয়ে গেল। কতদিন ওকে দেখে নি। ভোলার কামরায় সে উঠে সামনের সিটে বসলো। ভোলার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই ভোলার শরীরে
এক বিদ্যুৎ তরঙ্গ প্রবাহিত হয়ে গেল। এই তরঙ্গের একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। ভাবলে
মানুষের মাথায় এক তরঙ্গ তৈরী হয়। যদি সেটা কারোর প্রতি ভালোবাসার তরঙ্গ হয় তবে সেটা
বাইরে বেরিয়ে ভলোবাসার মানুষের শরীরে এসে ঢোকে । একেই হয়তো টেলিপ্যাথি বলে। মাধুরী
সেই যে চোখ নামালো আর তুললো না। তার মুখে এক অভিমানে ছায়া ভোলা দেখতে পেল। অনুরাগ থাকলে
অভিমানে সৃষ্টি হয়। মাধুরী কিছুতেই মুখ তুলছে না। ভোলা ভাবছে প্রচন্ড রেগে গেছে। রাগ
ও অভিমানের মধ্যে পার্থক্য আছে। শত্রুর উপর রাগ হয় কিন্তু বন্ধুর প্রতি অভিমান। মাধুরী
মেয়েটা ভালো "মাধুরী"
শব্দের অর্থ হলো মিষ্টত্ব, কমনীয়তা,
সৌন্দর্য এবং করুণার সংমিশ্রন। এটি "মধুরা" শব্দ
থেকে এসেছে । নামের সঙ্গে ওর চারিত্রিক
বৈশিষ্ট্যের মিল আছে। সুন্দরী, কথার মধ্যে মাধুর্য আছে। দয়া, মমতার প্রতিমূর্তী ও বুদ্ধিমতী।
এতদিনের পরও ওর ভালোবাসার ভাটা পড়ে নি। আবেগ হলে উবে যেত। ভোলার মনে হয় মাধুরীর প্রতি
তার আকর্ষণ বেড়েছে। ভাবতে ভাবতে ট্রেন হাওড়া ষ্টেশনে ঢুকল। মাধুরী সারা রাস্তা মুখ
নীচু করে বসে ছিল। ট্রেনের মধ্যে মান ভঞ্জন করা চাপের ছিল। সম্স্ত যাত্রী এই নাটক উপভোগ
করতো। ভোলা ট্রেন থেকে নামলো, পিছনে পিছনে মাধুরীও নামলো। ভোলার পাশাপাশি সে হাঁটছে।
ভোলা কোনো কারণে থামলে সেও থামছে। যাতায়াতের রাস্তায় কথা বলা শোভনীয় নয়। ভোলা এসে সাধারণদের
অপেক্ষা করার ফাঁকা জায়গায় দাঁড়ালো। মাধুরীও ভোলার পাশে দাঁড়ালো। ভোলা মাধুরী চোখে
তাকাতে দেখলো, জলে পরিপূর্ণ , এখুনি ভাসিয়ে দেবে সবকিছু।
ভোলা
জিজ্ঞাসা করে “কেমন আছ ?” কোনো উত্তর নেই।
“ দেখ মাধুরী, তোমাকে এড়িয়ে
যাওয়ার ইচ্ছা আমার নেই। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিটা তোমাকে জানতে হবে। আমার মেয়ে বন্ধু
বলতে একমাত্র তুমি। আমার মনের মধ্যে তুমি আছ ও থাকবে। প্রত্যেক কাজের এক নির্দিষ্ট
সময় আছে। আমার স্থির বিশ্বাস ছিল তোমার সঙ্গে ঠিক সময়ে দেখা হবে, দেখ, তাই হলো।“
মাধুরী এ বার বলতে আরম্ভ করে
“ প্রায় আড়াই বছর হয়ে গেল, বল কেমন লাগে?”
“ কোনো শুভক্ষণের জন্য ধৈর্য
ধরত হয়। আবেগ বসত কোনো কাজ করলে পরে পস্তাতে হয়। এবার বলো কি করছ?”
“ আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে
পদার্থবিদ্যায় এম এ সি করছি “
“ বাবা, সোনার মেয়ের সোনার
ক্যারিয়ার, তোমার সঙ্গে কথাই বলা যাবে না।“
“ তোমার কিছু খবর রাখি না
মনে করেছ? তুমি কলিকাতা মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ছ।“
“ তুমি গোয়েন্দা নাকি? খবরের
সোর্স কি?”
“ ইচ্ছা থাকলে সবই হয়। জীবনবিজ্ঞানের
অধ্যাপকের কাছ থেকে জেনেছি।।“
“ আমার ব্যাপারে আগ্রহ দেখে
খুব আনন্দ পেলাম। শোনো তোমার সঙ্গে জরুরী কথা আছে। তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ে আস আমি মেডিকেল
কলেজে থাকি। এত পাশাপাশি থাকি তবুও আমাদের দেখা হয় না। এই হচ্ছে কলকাত। তুমি একটা কাজ
করবে। কলেজ হোস্টলের নীচ তলায় গিয়ে বলবে আমাকে ডেকে দিতে। তোমাকে নিয়ে আমি বেরবো এবং
একটা কোথাও নিরিবিলি জায়গায় বসে আমার জমানো কথাগুলো বলবো। তোমার আপত্তি নেই তো?”
“ আপত্তি থাকলে যাব না। এটা
ক্রমশ প্রকাশ পাবে।“ বলেই মুচকি হাসলো। এই হাসির মধ্যে অনেক কিছু লুকিয়ে আছে ভোলা বুছতে
পারলো। “সাবধানে যেও।“ এরপর তারা বাস স্ট্যান্ডের দিকে চললো।
প্রত্যেকদিন
ভোলা ভাবে আজ নিশ্চয় মাধুরী আসবে। এইভাবে প্রায় এক সপ্তাহ গেল। ভোলা ভাবলো মাধুরী আর
আসবে না, হয়তো মত পাল্টেছে। তার দুতিন পর হোস্টেল বয় এসে ভোলাকে বললো “স্যার, আপনাকে
নীচে এক দিদিমণি ডাকচ্ছেন।“ ভোলা ড্রেস করে নীচে নামতেই মাধুরীর সেই রহস্যময়ী হাসি,
বলতে চাইছে দেখ অপেক্ষা করার কত জ্বালা। তারা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়েলে গিয়ে একটা ফাঁকা
বেঞ্চে বসলো।
ভোলা বললো “ জান, আমি ভুতের সঙ্গে লড়াই করছি।“ শোনার সঙ্গে সঙ্গে
মাধুরীর মুখটা ফাকাসে হয়ে গেল। “ সে আবার কি ?” “ভয় পেও না, আমাদের গ্রামাঞ্চলে অনেক কুসংস্কার
ও অন্ধবিশ্বাসের ভুত মানুষের মাথায় বসে আছে, আমি লড়াই করে তাদের তাড়াতে চাই। আমি একা
নয়, গ্রামে আমার এক বোন আছে, ভারতী, সে ইংরাজী অনার্স নিয়ে পড়ছে। সে বিবাহিত, তার শশুরমশাই
গ্রামে এক বিদ্যালয় করছেন, মাস ছয়েকের মধ্যে ক্লাস আরম্ভ
হয়ে যাবে। তারপর সমস্ত ঘটনা খুলে বললো। তুমি কি আমাদের সৈনিক হবে ?”
“ আমাকে কি করতে হবে?”
“ তুমি আমাদের পাশে থাকবে।“
“আমি ওখানে শিক্ষকতা করতে পারবো”
“আমি পড়ার পর গ্রামেই থাকবো। তুমি শিক্ষকতা করতেই পার কিন্তু মাইনা পাবে না
যতক্ষণ স্কুলটা স্বীকৃতি পায় কিন্তু তোমার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। তোমাকে এখন
সিন্ধান্ত জানাতে হবে না। তুমি আমাদের গ্রামটা ঘুরে আসতে পার।“ “তাই হবে, তোমার সঙ্গে তোমার গ্রামে যাব। কবে নিয়ে
যাবে ?”
মাধুরীকে ভোলা তার গ্রামে
নিয়ে গিয়েছিল। তখন স্কুলের কাজ শুরু হয়ে গেছে। মাধুরী ভারতীর কাছে সাতদিন ছিল।
এরমধ্যে তাদের বন্ধুত্ব জমে উঠেছে। কলকতা ফেরার আগের দিন ভারতী ভোলাকে বললো “ দাদা
মাধুরী খুব ভালো মেয়ে। সে আমাদের স্কুলে কাজ করতে রাজি হয়েছে। দাদা, একটা কথা
বলবো, তুমি রাগ করবে নাতো। মাধুরী তোমাকে প্রচন্ড ভালবাসে। তোমার জন্যই তো এই
ধড়ধড়ে গোবিন্দপুরে থাকবে ঠিক করেছে। মেয়েরা প্রথম যাকে হৃদয় আসনে বসিয়ে দেয় তাকে
আর সরাতে পারে না। সে তার মনের কথা সামনা সামনি বলতে পারছে না।
“ আমার ওতো একেই অবস্থা।
ভাবতাম যদি কিছু মনে করে।“
“ তোমাদের ভালো ছেলেদের এই
একটা রোগ; তোমাদের বেটে খাওয়ে দিতে হয়।“
ভোলা ডাক্তারী পাস করে
গ্রামে প্রাকটিস করে, কাছের শহরেও যায়। প্রসার খুব জমে উঠেছে। মাধুরী স্কুলে
শিক্ষকতা করে। স্কুলের সরকারী স্বীকৃতি হয়ে গেছে। স্কুল বড় করার কাজ চলছে। গ্রামে
অন্ধ বিশ্বাস ধীরে ধীরে কমছে। লোকে আর গুণিণ ওঝার কাছে যায় না, ভোলার কাছে চিকিৎসা
করায়। স্কুলে প্রচুর ছেলে মেয়ে পড়াশুনা করছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার চেষ্টা
চলছে।
ইচ্ছা থাকলে উপায় এমনি আসে। লড়াই করে ভুতকেও পরাজিত
করা যায়।
********************
লেখক পরিচিতি
করুণাকর প্রধান ১৯৫০
এ পশ্চিম মেদিনীপুরের এগরার অদুরে এক প্রত্যন্ত গ্রামে এক চাষী পরিবারে জন্ম গ্রহন
করেন । পিতI ঁহরিহর প্রধান ও মাতা লীলাবতী প্রধান। মনস্তত্ব নিয়ে কলেজ জীবন শেষ করে কলকাতায় সরকারী
চাকরীতে নিযুক্ত হন। বর্তমান কলকাতার স্থায়ী বাসিন্দা। স্কুল থেকেই সাহিত্যের প্র্রতি
প্রগাঢ় ভালোবাসা। চাকরী জীবনে তাঁর লেখালেখি শুরু। কবিতা, গল্প, উপন্যাস লেখা তাঁর
সখ। মনে যেসব কথা গুনগুন করে তাই তিনি লিখে ফেলেন। সময়াভাবে এইগুলো প্রকাশিত হয়ে ছিল
না। অবসরের পর তিনি এই কাজে হাত দেন। তাঁর লেখায় সমাজের বিভিন্ন দিক উন্মোচিত হয়েছে
যেটা নিবিড় ও গভীর পর্যবেক্ষনের পরিচয় দেয়। এছাড়া জীবন দর্শন, মনস্তাত্বিক বিশ্লেষন,
ঈশ্বর সমন্ধিয় ব্যাখ্যা আলোচিত হয়েছে।
প্রথম
পরিচ্ছেদ
গ্রামের নাম মকুন্দপুর। মেদিনীপুর
জেলার দক্ষিন প্রান্তে উড়িষ্যার উত্তরে এক অজ গ্রাম। সেই সময় মেদিনীপুর জেলা বিভক্ত
হয় নি। আজ থেকে প্রায় পঁচাত্তর বছর আগের কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে। ব্রিটিশ
যুদ্ধকালীন নীতি, কৃষিনির্ভর অর্থব্যবস্থা
ও
দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি গ্রামের অর্থনীতি ছিল সংকটপূর্ণ। অধিকাংশ গ্রামের মানুষ দারিদ্র
সীমার বহু নীচে বাস করতো। অভাব অনটন তাদের বারমাস্যা। ১৯৪২ সালে অক্টোবর মাসে এক বিধ্বংসী
ঘৃর্ণিঝড়ে জনজীবন বিপর্যস্ত। চারদিকে হাহাকার।গ্রামের সকলে নিম্নবিত্ত চাষী। চাষাবাদ
একমাত্র জীবিকা। নুন আনতে পান্তা ফুরায়। মাঠে রোদ বৃষ্টি ঝড়ে কাজ করায় প্রায় লোকেরা
শীর্ণকায় ও কলো। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। সহিংস ও অহিংস আন্দোলনের ফসলই আমাদের
স্বাধীনতা। এইসব ঘটনার তাপ উত্তাপ গ্রামে লাগে নি। সভ্যতার এক টুকরো আলো ও গ্রামে ঢুকে
নি । অধিকাংশ গ্রামবাসী অশিক্ষিত। গ্রামে কারোও রেডিও, সাইকেল, টর্চ ও ঘড়ি কিছুই ছিল না। বাইরের কোনো খবর গ্রামে পৌঁচাতো
না। গ্রামবাসীরা কাজেই ব্যস্ত থাকতো দিনরাত। বাস রাস্তা ছিল দশ মাইল দুরে। বাসে করে
কোথাও যেতে হলে দশ মাইল পায়ে হেঁটেই যেতে হতো। বৃষ্টিকালে রাস্তাগুলো থাকতো হাঁটুর
উপর কাদা ভর্তি। লোকজন তাই গামছাই ব্যবহার করতো। জুতোর তো প্রশ্নই ছিল না। গ্রামে ছিল
একটি মাত্র পাঠশালা। সকালে পনের কুড়ি জন বাচ্চা পড়াশুনা করতে যেত, দুপুরের আগেই ছুটি
হয়ে যেত। মেয়েদের পড়শুনার চল ছিল না। মেয়েরা এগারো বছর হলে তার পাত্র খোঁজা শুরু হতো।
তেরো মধ্যে বিয়ে দিতে হতো।
এই
গ্রামের দুই বন্ধু কালু ও ভোলা। বয়স নয় দশ হবে। এরা ছিল হরিহর আত্মা। এরা ডাঙ্গুলী
মার্বেল খেলতো, পাঠশালায় যেত, বাড়ী ও মাঠের কাজও করতে হতো। কালুর গায়ের রঙ কালো, মাথায়
ঝাঁকড়া চুল, ছপ্ছিপে সাহসী। যে কোনো গাছে উঠতে ওস্তাদ। বড় বড় গাছে উঠে পাখির বাসা থেকে
ছানা এনে বাড়িত পুষতো। আর ভোলা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। একটু নাদুস নুদুস, ভীতু
কিন্তু ধীর স্থির চিন্তাশীল। এই অঞ্চলে কথ্যভাষা ছিল ওড়িয়া বাংলা মেশানো।
গ্রামে সকলে দরিদ্র হলেও দুটো
জিনিসের অভাব ছিল না, মাছ ও ফল। গাছ থেকে তুলে আনা পাকা ফলের স্বাদ আলাদা। আম, পেয়ারা,
আতা, কামরাঙা, বেল, আমড়া, তেঁতুলু তাল, নারকেল, চালতা, ডুমুর আরো কত কি। গ্রামের প্রচুর
জাম গাছ ছিল। জাম সাইজে ছোটো কিন্তু গাছ ভর্তি হয়ে যেত। মানুষরা জাম তেমন খেতো না।
কালু কয়েক বার গাছে ভালো ভালো জাম পেড়ে নিয়ে আসতো, ওরা দুজনে নুন ও লঙ্কা মাখিয়ে। পাখি
যা খেত খেত কিন্তু বেশীর ভাগ মাটিতে ঝরে পড়ে মাটির রঙ পরিবর্তন করে দেয়। বৃষ্টি আরম্ভ
হলে অসংখ্য চারা গাছ মাটির উপরে উঁকি দেয় কিন্তু একটাও বাঁচে না। প্রাকৃতিক নির্বাচনে
হেরে গিয়ে বিলীন যায়। সব জাম গাছের সব চারা বড়ো হতো তবে বছর কুড়ি পরে পৃথিবীটা শুধু
জাম গাছেই ভরে যেত। খেজুর গাছগুলোতে চারদিক ভরে যেত। যখন গেলে গাছের নীচে পাকা পাওয়া
যাবেই না হয় লগি দিয়ে খোঁচা দিলে ঝরঝর্ করে পাকা খেজুর ঝরে পড়তো। এই সমন্ধে একটি গল্প
প্রচলিত আছে। এক গ্রামে এক অলস ব্যক্তি বাস করতো। সে কোনো কাজ না করে কোনো মুখের খাবার
জোগাড় করতো। একদিন তার খেজুর খেতে ইচ্ছা হলো। সে গাছের নীচে উপরদিকে হাঁ করে শুয়ে পড়লো।
সে জানতো গাছ থেকে পাকা খেজুর মুখে পড়বেই এবং সে বিনা পরিশ্রমে খেজুর খেতে পাবে। সে
অনেক ক্ষন হাঁ করে শুয়ে থাকলো। চারদিকে খেজুর পড়ছে কিন্তু তার মুখে পড়ছে না। হঠাৎ একটি
খেজুর পড়ে তার গোঁফে আটকে গেল। অনেক ক্ষন শুয়ে থেকেও খজুরটা মুখে এলো না। এমন সময় একজন
লোক যা্চ্ছিল। লোকটি খেজুরটাকে মুখে ঠেলে দিতে অনুরোধ করায় লোকটি পা দিয়ে খেজুর মুখে
সরিয়ে দিল।আর মাছ সারা বছরই পাওয়া যেত। শীতের দুমাস গেলেই মাঠ, পুকুর ও খালের জল শুকোতে
আরম্ভ করতো। ওখানে সব রকম মাছই পাওয়া যেত। মাঠের জল শুকাতে আরম্ভ হলে মাছগুলো পুকুর
খালে চলে যেত। ধরার পর যা থেকে যেত বৃষ্টি আরম্ভ হলে মাঠ জলে ভরে যেত এবং মাছগুলো ডিম
দিতে মাঠে চলে যেত। এইভাবে সারা বছর বিভিন্ন উপকরণ ও পদ্ধতির দ্বারা পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া
যেত। ভোলার মায়ের হাতে পাতুরি খেতে ভালো লাগতো। কলা পাতায় কাঁচা মাছ দিয়ে হয় তেঁতুল
বা আমসি না সরসা বাটা দিয়ে বেঁধে কাঠের আগুনে ডুকিয়ে দেওয়া হতো। এই পাতুরি দুতিন দিন
রেখে খাওয়া যেত।
একদিন
ভোলা সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠে বাইরে এসেছে।
কালু হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বললো “শুনিচু, কালি রাতিরে পরানের মা মরি যাইচি। কিছিক্ষন
পরে পুড়তে নেই যিব, চল, মড়া পুড়া দেখতে যিবা।“ ভোলার ভুতে বড়ই ভয়। মায়ের কাছে রাতে
শোয়ার সময় রাত গভির হলে সে ক্যাঁচর ক্যাঁচর এক শব্দ শুনতে পেত। শব্দটা তাদের বাড়ীর
পশ্চিম পাশে একটা পুকুর ছিল, সেখান থেকে আসতো। সে মায়ের বুকের মধ্যে ডুকে মাকে জিজ্ঞাসা
করতো “এ শব্দটা কি? মা বলতো “ পুখুরি দু ধাররে যে দুইটা বড় বেল গছ অছি, সেই গছরে ব্রহ্মদৈত্য
অছি। রাতি বেশী হেনে দুই গছরে দুই গুড় রখি দোল খায়। তু পুখুরি পাশকু মুটে যিবু নাহি।“
ভোলা আরও ভয় পেয়ে মায়ের গায়ে সেঁটে যেত। সেই সময় একটা শিয়াল হুক্কা হুয়া ডেকে উঠতো।
সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যে যত শিয়াল তারস্বরে ডাকা আরম্ভ করতো। মা বলতো “শুই যা, রাতি দুই
প্রহর হেলা।“ শিয়াল প্রতি পহর শেষে ডাকে। ভোলার
কিছুতেই ঘুম আসে না। সে ভাবে শিয়াল কি করে জানে প্রহর শেষ হওয়ার কথা। সে শুনেছে, দিন
চার প্রহর ও রাত চার প্রহর। তার মনে আসে, কয়েক বছর আগে তার কাকার ছেলে “দীনু” ঐ পুকুরে
ডুবে মরেছে। তাহলে ব্রহ্মদৈতি তাকে নিয়ে গেছে।
পরের দিন সে কালুকে জিজ্ঞাসা
করে “ব্রহ্মদৈতি কথা জানু”
কালু বলে ব্রাহ্মণ মরার পর
ব্রহ্মদৈত্য হয়। তারা বেল গাছে থাকে। কাউকে একলা পেলে মেরে তার কাছে নিয়ে রাখে।
কালু ও ভোলা ছুটলো পরানের বাড়ী।
গ্রামের অনেক লোক জড় হয়েছে। তখনকার সময় বিপদ হলে সকলে সাহায্যে এগিয়ে আসতো। কিছু লোক
আমগাছ কাটছে। মড়া পুড়াতে আমাগাছই লাগতো কারন এইগাছ কাঁচা অবস্থায় ভালো জ্বলে। মৃতদেহ
ঘরের বাইরে নিয়ে এসে শোয়ানো হয়েছে। পরানের বাবা চুপ করে বসে। পরান মায়ের পাশে বসে কিন্তু
তার চোখ দিয়ে জল ঝরেই চলেছে। আত্মীয়সজ্জন মহিলারা চিৎকার করে কেঁদেই চলেছে । চার পাঁচজন
লোক মৃতদেহ বহন করার জন্য বাঁশ কেটে খাটের মতো তৈরি করছে। এক মহিলা বাইরের উনুনে খড়
জ্বেলে খই ভাজচ্ছে। মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার সামনে খই ছড়িয়ে ছড়িয়ে যাওয়ার রীতি। দুই একজন
মহিলা পরানের মার সিঁথিতে মোটা সিদুর দিচ্ছে ও পায়ে মোটা আলতা দিচ্ছে। এয়ো স্ত্রী মরলে
এটাই ছিল রীতি। খোল করতাল নিয়ে কীর্তনদল হরিনাম করচ্ছে।
ভোলার এই পরিস্থিতিতে বেশ ভয়
ভয় করচ্ছে। সে কালুকে বলল “ চ খাই আসি”
কালু বলল “ যা তু খাই আয়, মোর
ভুখ নাই, মু এইঠি অছি”।
ভোলা ফিরে এসে দেখল শ্মশাণে
নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় চলচ্ছে। অনেক লোক এসে গেছে। তার মধ্যে আঠ দশ জন তাদের বয়সের ছেলে
ও আছে। এদের দেখে ভোলার মনে কিছুটা সাহস বাড়লো। প্রথমে কীর্তনদল চললো। তার পিছনে একজন
খই ছড়াতে ছড়াতে গেল। এদের পিছনে চারজন লোক বাঁশে কাঁধে নিয়ে যাচ্ছে। মুখে ‘বল হরি,
হরি বল’। তার পিছনে পরান নুতন গামছা পরে চলেছে। সবশেষে জনতা। মেয়েদের শ্মশাণে যেতে
দেওয়া হতো না। শ্মশান ছিল গ্রামে দক্ষিনে প্রায় মাইল খানেক দুরে এক পুকুরের পাড়ে। ওখানে
পৌঁচে মাটি কেটে চুল্লি তৈরি করে কিছু কাঠ দিয়ে মৃতদেহ রাখা হলো এবং তার উপর আরও কাঠ
দিয়ে ধুনো ছড়ানো হলো। পরান জ্বলন্ত খড়ের আঁটি নিয়ে তিন বার চুল্লিকে প্রদক্ষিন করে
মাথার কাছে আগুন ধরিয়ে হাঁউ মাউ করে কাঁদতে আরম্ভ করলো। হঠাৎ ভোলার মায়ের কথা মনে এল।
যদি তার মা মরে যায়। তার মনটা হু হু করতে লাগলো। মা মারা গেলে সে কি করে থাকবে? সে
ভেবেই পেল না। ভোলাতো জানে না, পৃথিবীতে কত মা হারা শিশু আছে। তার মায়ের কাছে যাওয়ায়
মন আকুলি বিকুলি করতে লাগলো। সে কালুকে বললো “ চল ঘরকু যাই, মা খুজু থিবে।“ আগুন দাউ
দাউ জ্বলছে। ওরা ঘরের দিকে রওনা হল। রাস্তায় কালু ভোলাকে বললো দশ দিনের দিন রাতে সব
শ্মশাণ যাত্রীকে পরানের বাড়ীতে খেতে হবে। সেই রাতে ভুতকে খাওয়ার দেওয়া হয়।
রাতে শোওয়ার সময় মাকে জিজ্ঞাসা
করে “ মনষ মরি যায় কেনে?”
“ বুড়া হই গলে মরি যায়। কেহি
কেহি রোগোরে বা দুর্ঘটনারে মরে।“
“মরার পরে কি ভুত হয়?”
“ ভুত খায় কিস ?”
সারাদির পরিশ্রমের পর ভোলার
মায়ের বেশ ঘুম পেয়েছে। সে আর কথা বলতে পারছে না। তাই বললো “ রাতি হেলা নি, শুই যা।
পুরুষরা যেমন বাড়ীর বাইরে কাজ কর্ম করতো কিন্তু মেয়েদের বাড়ীর কাজের সাথে বাইরের কাজ
ও করতে হতো। ভোরে উঠে ধান
সেদ্ধ করে শুকানো, বাড়ী ঘর ছাঁট দেওয়া, গোয়াল থেকে গরু বার করে গোয়াল পরিষ্কার করা,
দুধ দোওয়া তারপর রান্না করা, খেতে দেওয়া, নিজে খেয়ে আসতে আসতে বিকাল গড়িয়ে যায়। তারপর
জঙ্গলে গিয়ে শুকনো পাতা ও জালানি সংগ্রহ করে রাতের রান্না। এত পরিশ্রমের পর বিছানা
ধরলে চোখ জুড়িয়ে আসে।
মা বললো “ রাতি হলানি শুই যা, মোতে ভোরে উঠতে হব”। বলেই সে
ঘুমিয়ে পড়লো।
ভোলার চোখে ঘুম নেই। তার মাথায় নানান্ প্রশ্নের ঢেউ উঠছে
কিন্তু উত্তর খুঁজে পায় না। সে ভাবে মানুষ মরে গেলে, আত্মা দেহ ছেড়ে যায়। কত কত আত্মা
দেহ ছেড়েছে। তারা কি আবার দেহ ধারন করে না এক সঙ্গে মিশে পরিবেশে ঘুরে বেড়ায় ? আত্মা
তো বাতাসের মতো। জলে নুতন জল ঢাললে মিশে যায়। তাহলে আত্মা আলাদা আলাদা থাকে কি করে
? শুধু মানুষ মরলে ভুত হয় কেন ? আমাদের চারপাশে কত কত প্রাণী আছে যেমন পশু, পাখি, কীট
পতঙ্গ। তবে মশা, মাছি, আরশোলা মরলেও ভুত হবে। এ সব ভুতের কথা শোনা যায় না। ভোলা তখনই
ক্যাঁচর
ক্যাঁচর শব্দটা শুনতে পেল। ভয়ে মাকে জড়িয়ে শুয়ে গেল।
এর মধ্যে পরান তার মায়ের শ্রাদ্ধের
দিন রাতে খেতে যেতে বলেছে। ভোলার ও যাওয়ার ইচ্ছা আছে। সে দেখতে চায় প্রেতকে খাওয়ার
ব্যাপারটা। জ্ঞান হওয়া থেকে এসব দেখে নি। সন্ধ্যার হতে সে পরানের বাড়ীতে গিয়ে হাজির
হলো। দেখলো দুটো হ্যাজাক জ্বালানো হয়েছে। গ্রামের প্রায় বাড়ী থেকে আনাজ আসেছে। কেউ
কুমড়ো, কেউ আবার লাউ, যার বাড়ীতে যা হয় তাই দিয়ে যায়। যেহেতু অধিকাংশ লোক গরীব তাই
এই ভাবে একে অপরকে সাহায্য করতো। একটা সামাজিক বন্ধন ছিল। তখন রান্নার লোক ভাড়ায় আনতে
হতো না। পাড়া প্রতিবেশীরা মিলে মিশে সব কাজ করতো। মেয়েরা আনাজ কাটত, বাটনা বাটতো। কালু
ছাড়া তাদের বয়সী কিছু ছেলেও ছিল। রান্না প্রায় শেষ। প্রেতকে খাবার না দেওয়া অব্ধি এখানে
খাওয়া শুরু হবে না। দুপুরে ব্রাহ্মণ ভোজন হয়ে গেছে, দই, মুড়ি ও গুড়। কিছুক্ষন পরে প্রেতের
জন্য খাবারের আয়োজন আরম্ভ হলো। একটা নুতন মাটির হাঁড়িতে ভাত ও বিভিন্ন রকমের তরকারী,
পায়েস, পিঠে হাঁড়িতে সাজনো হলো। ওদিন সকালে পরানের মাথা মুন্ডন করা হয়েছে।পরান নুতন
গামছা পরে একটা দা কোমরে গুঁজে, মাথায় হাঁড়ি নিয়ে যেতে শুরু করলো। পিছনে কিছু লোকেরা
চললো। ভোলা ও কালুরা ও তাদের সঙ্গে চললো। পরানের বাড়ীর সামনে কিছু দুরে একটি বাগান
ছিল। ঐখানে সামান্য জায়গা পরিষ্কার করে গোবর লেপা হয়ে রাখা ছিল। পরান ঔ খানে মাথা থেকে
হাঁড়ি নামালো। কলাপাতা পেতে ভাত ও অন্যান্য রান্না সাজিয়ে দিল। মাটি দিয়ে প্রদীপ রাখার
পিলসুজ তৈরি করে তার উপর প্রদীপ বসিয়ে জ্বালিয়ে দিল এবং সাষ্টাঙ্গ প্রনাম করে পিছনে
ফিরে ঘরের দিকে চললো। ভোলা, কালু ও চার পাঁচ জন কিছুটা দূরে অন্ধকারে গোপনে থেকে ভুতের
খাওয়া দেখতে লাগলো। কিছুটা সময় পরে ওরা দেখলো প্রদীপের আলো অদৃশ্য হচ্ছে আবার দেখা
যাচ্ছে। একজন ফিসফিস্ করে বললো “ প্রেত আসিছি ও ঘুরুচি । এবারে খাইতে বসিব”। তারপর
প্রদীপের আলো আর দেখা গেল না। কে একজন বললো “এবারে খাউচি” কিছুক্ষন পরে আবার আলো দেখা
গেল। তাহলে প্রেত খাবার খেয়ে চলে গেলা। তারা পরানের বাড়ী ফিরে আসে। বাড়ীর বাইরে মাটিতে
হাঁটু মুড়ে লাইন দিয়ে সকলে বসে গেল। একজন কলাপাতা সকলের সামনে দিয়ে গেল, আর একজন নুন।
তারপর ভাত, জলের মতো ডাল, শাকভাজা, কুমড়ো ঘন্ট ও লাউ, তেঁতুল ও গুড় দিয়ে চাটনি।
ভোলা বাড়ী ফিরে মায়ের পাশে
শুয়ে পড়লো। মাকে আজ প্রশ্ন করল না। তার মাথায় একটি চিন্তা চলছে, ভুত কি সত্যি খাবার
খায় ? এই একদিন খেয়ে আর কোনোদিন খেতে দরকার হয় না। সত্যি কি ভুত, ব্রহ্মদৈত্যি আছে
? অনেক ভেবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারলো না। ভাবতে ভাবতে তার কখন ঘুম এসে গেছে জানতে
পারে না। পরের দিন থেকে নিত্য নৈমিত্তিক ভাবে দিন গড়িয়ে গড়িয়ে চললো। ভোলার মাথা থেকে
ভুত আস্তে আস্তে উবে গেল।
ভোলা পড়াশুনায় গুরুমশাই তার
প্রংশসাও করেন। বলেন “ ও সুযোগ পেলে জীবনে উন্নতি করবে” ভোলা ও চায় পড়াশুনা করতে। ভোলা
সময় পেলে পড়তে বসে । মন দিয়ে বইগুলোর অর্থ হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করে। কালুর মতো সারাদিন
হৈ হৈ করে ঘুরে বেড়ায় না। ভোলার কৌতুহলী মন সবকিছু গভীরে গিয়ে বিষয়টা জানতে চায়। এ বছর ভোলা ৪র্থ শ্রেণীর শেষ পরীক্ষা দেবে। এই পরীক্ষা পাস
করলে ৫ম শ্রেণীতে ভর্ত্তি হতে হয়। গ্রামের প্রায় দশ মাইল দুরে ৫ম থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত
একটি বিদ্যালয় ছিল। ভোলা পরীক্ষার জন্য আদা জল খেয়ে পড়ছে। শুধু বিকালা একটু খেলতে বেরোয়।
খেলার মাঠে কালুর সঙ্গে দেখা হয়।
একদিন কালু ভোলাকে বললো “ জানিচু পরানের বৌকু ভুত ধরছি। আজ
গুণিন আসিচি” ভুত ধরা যে কি ভোলা জানে না। তাই কৌতুহলী মন ব্যাপার কি জানতে ইচ্ছা করলো।
কালু ও সে পরানের বাড়ীর দিকে ছুটলো। গিয়ে দেখলো উঠানে পরানের বৌ আলু থালু হয়ে বসে আছে
। তার চুল চারদিকে ছড়ানো। কিছু মহিলা তার পাশে বসে। গুণিন লাল কাপড় পরে হাতে সরসে নিয়ে
কি যেন গুন গুন করছে এবং যেই সরসে তার দিকে ছুড়েছে, বৌটি কেঁকিয়ে উঠে বললে আরম্ভ করলো।
“মু যিবি নি, মু তো মোর ঘরকু আসিছি”। গুণিন উঁচু গলায় জিজ্ঞাসা করলো। তুই এই বৌকে ধরলি
কেন ? বৌটা বললো “ মু তো তেঁতুল গছরে থিলি। ইয়ে একলা আসু থিলা, মু তা সাথর চালি আসিছি”।
গুণিন বলে “ঠিক আছে, এখন ছেড়ে চলে যা”। সে যেতে নারাজ। গুণিন একটা ঝাঁটা আনতে বললো।
কেউ একজন গোয়াল থেকে ঝাঁটা এনে দিল। গুণিন ঝাঁটা ধরে পেটাতে ও মন্ত্র আউড়াতে আরম্ভ
করলো।কয়েকটা ঘা দিতেই বৌটা বলতে লাগলো “ যাউচি যাউচি” গুণিন বললো “যাওয়ার সময় একটা নিশানা রেখে যাবি। সঙ্গে সঙ্গে
বৌটা অজ্ঞান হয়ে গেল এবং ঘরের সামনে এক জাম গাছের কাঁচা ডাল ভেঙ্গে নীচে পড়লো। গুণিন
বললো “যাক্ চলে যেছে। ও একটু পরে সুস্থ হয়ে যাবে। কয়েকদিন ওকে সাবধানে রাখবে। ইতিমধ্যে
বৌটা স্বাভাবিক ভাবে উঠে বসলো এবং বিহ্বলভাবে চারদিকে তাকাতে লাগলো যেন বুঝতে পারছিল
না কেন এত লোক জড় হয়েছে।
ভোলা বাড়ীতে গিয়ে
পড়ার চেষ্টা করলো কিন্তু কিছুতে মন বসাতে পারলো না। সে জানে মন না দিয়ে পড়লে সে পড়ার
কোনো মানে হয় না। পড়ার বিষয় মাথায় না গেলে কোনো লাভ নেই। তাই সে খেয়ে শুতে চলে গেল।আজও
মাকে কিছু জিজ্ঞাসা করল না। চুপ করে শুয়ে ভাবতে লাগলো ভুত লাগার কথা। পরের দিন পাঠশালায়
গিয়ে গুরুমশাইকে জিজ্ঞাসা করলো “ভুত কি মানুষকে ধরে ?” গুরুমশাই হেসে বলেন “ না রে,
ভুত বলে কিছু নেই। এটা ভয় থেকেই আসে। খুব ভয় পেলে এক মানসিক অসুখ হয়। তাকে কুসস্কারগ্রস্ত
লোকেরা ভুত ধরা বলে”। গুরুমশায় ভোলার জানার আকাঙ্খা দেখে খুব খুশি হলেন। ভোলা মাথায়
অনেক প্রশ্ন। কি্ন্তু সে আর কিছু প্রশ্ন করলো না।
সময় গড়িয়ে চললো কালের পথে। ভোলা পরীক্ষায় খুব ভালো ফল করেছে
এবং মাধ্যমিক স্কুলে ভর্ত্তি হয়েছে। তার ভালো ফলের জন্য স্কুলে বেতন লাগে না উপরন্তু
মাসে দশ টাকা বৃত্তি পায়। এই টাকায় স্কুল বোড়িং
খরচ চালানো সুবিধা হয়। ছুটিতে বাড়ী গেলে কালুর সঙ্গে দেখা হয় । একবার গ্রীষ্মের ছুটিতে
বাড়ী এসেছে। এই সময় এক সকালে কালু এসে জানালো যে একটা লোক গলায় দড়ি দিয়ে পুকুরের বটগাছে
ঝুলছে।পুলিশে খবর গেছে, তারা আসচ্ছে। ভোলার মনে পড়লো সেই পুকুরের কথা। তারা গরু চরাতে
নিয়ে গেলে ঐ পুকুরের পাড়ে গাছের ছায়ায় খেলা করতো। বেশ দুরে দুরে কয়েকটা গ্রাম ও মাঝখানে
পুকুরটি। রাতে ওখানে কেউ কিছু করে কারও টের পাওয়ার কথা নয়। কারা হয়তো এই লোকটা নিয়ে
মেরে ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে। সকালে চাষীরা চাষ করতে মাঠে এসে লোকটাকে দেখতে পেয়েছে। পুলিশ
মৃতদেহ নিয়ে চলে যায়। ভোলাও বাড়ী ফিরে আসে। ভোলা জানতে চায় সত্যি কি ভুত বলে কিছু আছে
? সে এখন বড় হয়েছে। সে অনেকদিন রাতে স্কুল থেকে অন্ধকারে বাড়ী ফিরেছে। পথে জঙ্গল ও
ফাঁকা মাঠ আছে। প্রথম প্রথম গা ছমছম করতো। এখন আর ভয় করে না। সে তো কোনোদিন ভুত দেখেনি।
কই শহরে তো ভুত থাকে না। এইতো সেদিন কে জন বলছিল নিশিভুতের কথা। নিশিভুত গভীর রাতে
চেনা গলায় তিন বার নাম ধরে ডাকে। তিনবারের মধ্যে যদি সে সাড়া দেয়, তাকে মেরে ফেলে।
বছর খানেক পরে ভোলা তখন বাড়ীতে ছিল। গ্রামে সেই সময় অনেকে
কিছু বাড়তি পয়সার জন্য অধিক পরিশ্রম করতো। ভোলার মা ধান সেদ্ধ করে চাল তৈরী করতেন।
ধান বিক্রির চেয়ে চাল বিক্রি করলে কিছু পয়সা বেশী পাওয়া যেত, ও ভুষিটা গরুর খাদ্য হিসাবে
ব্যবহার হতো। ঐ চাল ভোলার বাবা বাঁকে করে প্রায় সাত মাইল দুরে গঞ্জে গিয়ে বিক্রি করতেন।
তিনি দুপুরের আগে ভাত খেয়ে বের হয়ে চাল বিক্রি করে সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরতেন।
গঞ্জে যাওয়ায় পথ ঐ পুকুর ধার দিয়ে ছিল। সেদিন আগের মতো গঞ্জে গেছেন। সন্ধ্যা গিয়ে রাত
হলো। তিনি না ফেরায়, ভোলার মা দুঃশ্চিন্তায় পড়লেন। ভোলা হেরোকিন নিয়ে পাড়ার দুজন লোক নিয়ে রাস্তা ধরে এগোতে
লাগলো। ফাঁকা মাঠে গিয়ে দেখলো চারদিকে নিকষ অন্ধকার। সেই সময় কৃষ্ণপক্ষের শেষের দিকের
রাত ছিল। শ্মশানটায় কিছু আলো জ্বলছে নিভছে। যত রাত হচ্ছে রাতের ভয়াভয়তা বাড়ছে। চারদিক
খাঁ খাঁ করচ্ছে। মনে হচ্ছে রাত বিরাট হাঁ করে গিলতে আসচ্ছে। আকাশে তারাগুলো মিটি মিটি
হাসছে I পাশাপাশি কারা যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুরে দুরে গ্রামে আলো নিভে গেছে। তখন গ্রামের
মানুষরা তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়তেন। পুকুরটার কাছাকাছি আসতে পুকুরের গাছে এক পেঁচা ডেকে
উঠলো। চারদিকে শিয়াল ডাকতে শুরু করল। ভোলা বুঝতে পারলো, রাত দুপ্রহর হলো। ভোলা নিস্তব্ধতা
ভেঙ্গে “বাবা” “বাবা” চিৎকার করতে করতে এগোতে লাগলো। হঠাৎ তারা দেখলো কে যেন টলতে টলতে
তাদের দিকে আসছে। কাছে আসতে দেখা গেল, ভোলার বাবা। ক্লান্ত, বিপর্যস্ত, ঘেমে নেয়ে একশেষ।
ভয়ার্ত চোখ, চলার মতো শক্তি নেই। কোনো রকম ধরে ধরে বাড়ী নিয়ে যাওয়া হলো। তাঁকে জল বাতাস
করলে একটু সুস্থ বোধ করলেন I ভোলার মা একগ্লাস গরম দুধ দিতে, তিনি কথা বলতে পারলেন।
ততক্ষনে গ্রামের লোক জড়ো হয়েছে। ভোলার বাবা যা বললো তাতে উপস্থিত সকলের ভয়ে মুখ ফ্যাকাসে
হয়ে গেল। তিনি বলেন গঞ্জে চাল বিক্রি হতে দেরী হয়। সন্ধ্যার পর পর তিনি গঞ্জ থেকে বের
হন। অন্ধকার ক্রমে ঘনিয়ে আসছে । তিনি জোরে চলতে লাগলেন। পুকুরের কাছাকাছি এসে গেছেন
বুঝলেন। কিন্তু তারপর তিনি চলছেন তো চলছেন,
বাড়ী আসছে না।সকলে বলাবলি করলো এটা কানাভুতের কাজ। সে অন্ধকারে পথ ভুলিয়ে পথিকে ঘোরাতে
থাকে। পথিক যখন ক্লান্ত হয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়, তাকে মেরে ফেলে। পরের দিন গ্রামের জড়ো
হয়ে সিধান্ত নিল, পুকুরটাকে সুদ্ধ করতে হবে। একদিন পর গুণিন ডাকা হলো। গুণিন পুকুরের
পাড়ে যজ্ঞ করলেন। “ব্যটা এখানে ভুত হয়ে আছে” তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন। ঠিক্
আছে, এর ব্যবস্থা করছি”। এই বলে তিনি একটা লোহার বড় পেরেক নিয়ে মন্ত্র বলতে বলতে সম্পুর্ণ
গেঁথে দিয়ে বললেন “ একে এই গাছে আটকে দিয়েছি, এখান থেকে বেরোতে পারবে না । লক্ষ্য রাখবে
কেউ যেন পেরেকটা তুলে না ফেলে। ভোলা বাড়ী ফিরে এলো। সে ভাবতে লাগলো সত্যি কি ভুত বলে
কিছু আছে। ভোলা রাতে মায়ের কাছে ঘুমায় না। সেদিন রাতে ঘুমাতে ঘুমাতে এই ব্যাপারে অনেক চিন্তা করেও সিন্ধান্ত নিতে পারলো না। পরের দিন
স্কুল বোড়িং এ চলে গেল।
ভোলা স্কুল বোড়িংএ গিয়েও তার শান্তি নেই। সে জানতে চায় আ্ত্মা
কি, মরার পর আত্মা ভুত হয়ে থাকে কিনা ।
সে স্কুল গ্রন্থাগার থেকে শরীরবিদ্যা, পদার্থ বিদ্যা, দর্শন
প্রভৃতি সময় পেলে পড়লো। শেষে সে যা বুঝলো যে অজ্ঞতা ও বহুদিনের সংস্কারের ফল। প্রকৃত
বিদ্যা অর্জন দ্বারা একে দুর করা যায়।ব্রহ্মান্ডে সব কিছু শক্তির দরকার। আমাদের পৃথিবী
সৌরশক্তির দ্বারা চলে।সূর্য কোটি কোটি বছর আলো দিচ্ছে, এ শক্তি কোথা থেকে পায়? সূর্যে
প্রচুর পরিমানে হাইড্রোজেন পরমাণু থাকে। প্রচন্ড চাপে নিউল্কীয় সংযোজন বিক্রিয়ায় হিলিয়াম
পরমাণুতে পরিণত ও এরদ্বারা অসীম শক্তি নির্গত হয়। পৃথিবীতে শক্তির একমাত্র উৎস। যে
কোনোকে ক্রিয়াশীল করতে হলে শক্তির প্রয়োজন। রেলগাড়ী কয়লা না দিলে এটা মৃতবৎ হয়ে যায়।
আবার কয়লা দিলে চলতে আরম্ভ করে। বলা যায় কয়লার তাপশক্তি রেলগাড়ীর আত্মা। এর ভিতরে যে
যন্ত্রাংশ থাকে, তা খারাপ হলে তাকে সারানোর বিদ্যা মানুষ রপ্ত করেছে। তাই রেলগাড়ী মরে
গেলে তাকে জ্যান্ত করতে পারা যায়।
মানবদেহের শক্তির প্রধান উৎস হল আমরা যে খাবার খাই। কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও চর্বি। কিন্তু এটি প্রধানত খাদ্যের কার্বোহাইড্রেট উপাদান যা বিপাকীয় ক্রিয়াকলাপ দ্বারা ভেঙে যায় এবং অবশেষে গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয় যা কোষগুলিতে যায়। কোষে শক্তি উৎপাদনের কারখানা
আছে। অক্সিজেন, জল ও গ্লুকোজ রক্ত বাহিত হয়ে কোষে কোষে যায় ও শক্তি তৈরী হয়। উৎপাদিত
শক্তির দ্বারা সমস্ত জীব সচল থাকে। শক্তি উৎপাদনে জড়িত অঙ্গ খারাপ হলে জীব বাঁচে না।
কিছু কিছু অঙ্গকে ঔষধ বা শল্যবিদ্যা দ্বারা ঠিক করতে মানুষ সমর্থ হয়েছে।
জীব মরে গেলে কোন অঙ্গ কাজ করে না । তার জীবনী শক্তি
থাকে না। জীবনী শক্তি যদি তরঙ্গ হয় তবে মিশে যাবে বৃহৎ তরঙ্গের সঙ্গে। কোনো শক্তিই
ধ্বংস হয় না সৃষ্টি হয় না। এই জীবনী শক্তিকে আত্মা বলা হয়। ভোলা সিন্ধান্ত নেয় ভুত
বলে কিছু হয় না, এটা ভ্রম মাত্র।
এই রকম হাজারো কুসংস্কার মাটির বহু নীচে শিকড় গেড়ে বসে
আছে। এর মূল শুদ্ধ উপড়ে না ফেললে নানাভাবে আমাদের ভয় ও দুর্দশার সম্মুখীন হতে হবে।
গ্রামের দিকে সবচেয়ে ক্ষতিকারকের মধ্যে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া, মেয়েদের না পড়িয়ে
ঘরে বসিয়ে রাখা, অল্প বয়সে বিধবা হলে আবার বিয়ে না দেওয়া, সাপে কাটলে বা কোনো রোগ হলে
ওঝা বা গুণিণকে ডাকা, ঠিকুজী কুষ্টি মেনে চলা ইত্যাদি
২য় পরিচ্ছেদ
গ্রামে প্রায় সকলে বেশী রকমের আস্তিক। ঠাকুর দেবতাকে যেমন
ভয় করে তেমনই ভক্তিও করে। যত ঠূাকুর পৃথিবীতে আছেন, সকলে এই গ্রামে এসে জড়ো হয়েছেন।
গাছের নীচে পাথরকে ভক্তি ভাবে পূজো করে, মানত করে। গাছের তলায় চন্ডী আছেন, মনসা আছেন,
শীতলাও আছেন আর আছেন ধর্মঠাকুর। সারা বছর ঘরে ছোট ছোট পূজাঅর্চা লেগে থাকে। লক্ষ্মী
পূজা প্রত্যেক ঘরে বৃহস্পতিবার হয়ই, মাঝে মাঝে নারায়ণ পূজো করা হয়। সবচেয়ে হাস্যকর
কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে চাঁদকে খাবার দিয়ে পূজা করা হতো। একটি কলাপাতায় খই, নারকেল
নাড়ু, কল আর তালের শাঁস দিয়ে প্রনাম করা হতো। পাড়ার বাচ্চারা সব লুকিয়ে থাকতো, যেই
ভোগ দেওয়া হয়ে যেত চাঁদ খাওয়ার আগে বাচ্চারা ছোঁ মেরে সব নিয়ে পালাতো। আর হতো ষষ্ঠী
পূজো। ষষ্ঠী
দেবীকে
শিশুদের
কল্যাণদাতা
ও
রক্ষাকর্তা বলে মনে করা হতো। কারো ঘরে সন্তান জন্মালে
একুশ দিনে ষষ্ঠী পূজো করা হতো এবং সারা রাত ষষ্ঠীমঙ্গল গান হতো। এই
দিনে
প্রথম
মায়ে-ছায়ে
স্নান
করার
বিধি।
কবিকঙ্কণ
মুকুন্দরাম
চক্রবর্তীর
চন্ডীমঙ্গল
কাব্যেও মা
ষষ্ঠী
কথা
উল্লেখ আছে। প্রধানত মহিলারাই সারা রাত ধরে গান শুনতেন।
গ্রামের তিন চারজন মিলে ষষ্ঠীমঙ্গল গান করতেন আর দুজন বাজনা বাজাতেন।
গ্রামের মধ্যিখানে একটি শিবমন্দির ছিল। বছরে দুটি উৎসব হতো, শিব চতুর্দশী ও
চড়ক। শিব চতুর্দশীর দিন মেয়ে ও মহিলারা উপোস করে লাইন দিয়ে শিবলিঙ্গের উপর জল ঢালেন।
গ্রামের মাইল দুরে এক শিব মন্দির আছে। এই মন্দিরের ঠাকুর খুব জ্রাগত।সারা বছর বহু পুরুষ
মহিলা মন্দিরে গিয়ে নানা কামনা করে হত্যে দেন। অনেকে ঠাকুরের আদেশ পেয়ে মনোকামনা পুরন
হয়েছে। ঘটনা না রটনা কেউ যাচাই করে না।
গ্রামে শিবু দে নামক এক যুবক বাস করেন। শিবু কাকার শরীর শক্ত পোক্ত । কাজ কর্মে
বেশ পারাদর্শী। বয়স ত্রিশ বত্রিশ হবে। শিবু কাকার বছর পাঁচেক আগে বিয়ে হয়েছে
। বিয়ের সময় চাঁপা কাকীমার বয়স ছিল বারো। ইতিমধ্যে শিবু কাকার বাবা মা মারা গেছেন।
মা একটি দুঃখ নিয়ে মারা গেছেন কিন্তু তিনি
নাতি নাতনির মুখ দেখে যেতে পারলেন না।
“কিরে শিবু, মু কি নাতির মুহ ন দেখি মরি যবি” মা অনেক বার শিবুকে বলেছেন। শিবু
কথা কানে নেয় না কিন্তু চাঁপা কাকীমার মনে একটি চাপা দুঃখ ছিল। কাউকে বলতো না, গুমরে
গুমরে মরতো। হয়ভো তার বাপের বাড়ীতে আলোচনা হতো। গ্রামে দিকে য বিবাহিত মহিলার বাচ্চা
হতো না, তাকে অন্যান্যরা হেয় চোখে দেখতো। তার মুখ দেখে কাজে বেরলে সে কাজ হয় না। এই
মহিলাদের অপয়া মনে করা হতো একদিন সকালে উঠে শিবু কাকা চাঁপা কাকীমাকে ঘরে দেখতে পেল
না। পাড়ায় পরে গ্রামে খুঁজে কোথাও পাওয়া গেল না। শিবু কাকা দমে গেল না। সে চুপি চুপি
কোথায় যেন বেরিয়ে গেল। সে সটান গিয়ে উপস্থিত হলো ঔ শিব মন্দিরে। গিয়ে মহিলা হত্যেকারীদের
মধ্যে চাঁপা কাকীমাকে দেখতে পায় এবং গ্রামে ফিরে জানালো চাঁপা কাকীমা পাওয়া গেছে। সকলে
হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো। পাঁচদিন পর চাঁপা কাকীমা ফিরে এল। মন খুব খুশি খুশি। কি হলো, কাউকে
বলছে না। মন্দিরে যওয়ার সময় কাউকে বলা যায় না, ফিরে এসে কি হলো বলা যাবে না। মন্দিরে
হত্যে দিতে বেশীর ভাগ মহিলারাই যেতেন। প্রথমদিন থেকে উপোস থেকে হত্যে দিতে হতো। শুধুমাত্র
চরণামৃত খেয়েই দিন কাটাতে হতো। এর ফলে শরীর ক্রমাগত দুর্বল হতে থাকে এবং সঙ্গে সঙ্গে
মনও দুর্বল হতে থাকে। এক চিন্তায় থাকার জন্য মন একাগ্র হয়। কারো কারো মন অবচেতন স্তরে
পৌঁচায়। এর প্রভাবে স্ব্প্নবৎ কিছু উপলব্ধি হয়। এটাকে বাবার আদেশ মনে করা হয়। কারো
কারো ক্ষেত্রে ঘটেও যায়।
গ্রামে যদিও কোনো বৈষ্ণব বাস করতেন না কিন্তু গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষ্ণ ও
চৈতন্যদেবের ভক্ত। গ্রামবাসীরা গরীব হওয়া সত্ত্বেও তারা চাঁদা দিয়ে বছরে কার্ত্তিক
মাসে দুদিন ধরে কীর্তনের ব্যবস্থা করা হয়। এ দিন গ্রামে ভক্তির প্লাবন আসে। নারী পুরুষের
কপালে তিলক আঁকা। কার্ত্তিক মাসকে ধর্মমাস বলে মান্য করা হতো। মহিলারা গোটা মাস নিরামিষ
খান। বছরে প্রত্যেকদিন তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালানো হতো কিন্তু কার্ত্তিক মাসে প্রদীপ
জ্বালানোর বিশেষ ব্যবস্থা হতো। একে স্বর্গদীপ বলা হতো। তুলসী তলাতে একটি লম্বা বাঁশ
মাটিতে গভীর করে পুঁতে দেওয়া হতো। বাঁশের ডগায় একটি আঁকশি বাধা হতো। একটি শক্ত দড়ি
নীচ থেকে আঁকশির ভিতর দিয়ে ঘুরিয়ে আবার নীচ পর্যন্ত নামিয়ে দড়ির শেষে একটি শিকা লাগানো
হতো। ঐ শিকাতে এক নুতন চাল বাটার সাদা রং মাখানো ও সিঁদুর লাগানো হাঁড়ি রাখা হতো। প্রত্যেক
দিন সন্ধ্যা নামলে হাঁড়িতে জ্বলন্ত প্রদীপ
রেখে উপরে তুলে দেওয়া হতো। এতে নাকি যারা মরে স্বর্গে গেছেন তাঁদের আত্মার শান্তি কামনায়
জ্বলন্ত প্রদীপ স্বর্গের দিকে তুলে দেওয়া হতো। ভোলা ভেবে পায় না পৃথিবী থেকে আলো স্বর্গে
যেতে পারে কি ?
ভোলা তখন নবম শ্রেণীতে পড়ে। কীর্তন উপলক্ষে বাড়ী এসেছে। যথারীতি কীর্তন শুরু
হলো। খোল করতাল বাজানো ও গান করার দুটি দল তৈরী হয়েছে। একটি দল ছয় ঘন্টা করে কীর্তন
করেন তারপর ওরা বিশ্রাম নেয় ও অন্য দল কীর্তন করতে থাকেন। কীর্তন আরম্ভ হওয়ার সকালে
ভোলা গিয়ে সেখানে হাজির হয়। গিয়ে দেখে একটি
মঞ্চ তৈরী হয়েছে। মঞ্চের চারকোনে কলাগাছ বাঁধা। তিনদিক রঙিন নুতন সস্তা শাড়ী দিয়ে ঘেরা
হয়েছে। গাঁদাফুলের মন্ডপ সুন্দর সাজানো। মাঝখানে চৈতন্যদেবের ছয়হাত বিশিষ্ট কাঠের বিগ্রহ।
বিগ্রহের পাশে নামাবলী গায়ে এক বৈষ্ণব পুজো করছেন। ছয় হাত দেখে ভোলা একটু অবাক হলো,
ভোলার জানার আগ্রহই নুতন কিছু জানতে চায়, মনযোগ দিয়ে শুনে মনে রাখে। সে ঠাকুর মশাইকে
জিজ্ঞাসা করলো “ চৈতন্যদেবের ছয় হাত কেন ?”
“ এই বিগ্রহকে ষড়ভুজ বলা হয়। এই রূপ গৌরাঙ্গ চৈতন্য
মহাপ্রভুর
একটি
দিব্যরূপ।
এই
দিব্যরূপের
মধ্যে
শ্রীরামের
ধনুর্বাণ,
সন্ন্যাসগ্রহণরূপী শ্রীচৈতন্যের দণ্ড ও
কমণ্ডলু
ও
বংশীবাদনরত
শ্রীকৃষ্ণের
সমন্বয়
ঘটেছে।
এই
দিব্যরূপটি
চৈতন্যচরিতামৃত ও চৈতন্যভাগবত অনুযায়ী
যথাক্রমে
শ্রীবাস
নবদ্বীপে
এবং
বাসুদেব
সার্বভৌম
নীলাচলে
দর্শন
করেছিলেন কারন ত্রেতা যুগের শ্রী শ্রী রামচন্দ্র ও
দ্বাপরের শ্রীকৃষ্ণ কলি যুগে শ্রীচৈতন্য হয়ে জন্মেছিলেন।“
ভোলা আরো কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল তখন ঠাকুর মশাই বললেন “খোকা তুমি বিকালা
এসো, তোমার প্রশ্নের উত্তর দেবো, এখন পূজো হচ্ছে তো”।
ভোলা লক্ষ্য করলো, ঠাকুর মশাই নম্র, ভদ্র, মাটির মানুষ কিন্তু জ্ঞানী। ভোলার
পড়া কালীদাস রায়ের লেখা “ত্রিরত্ন” কবিতাটি মনে পড়লো।
“তরু হতে
যেবা সহিষ্ণু, তৃণ হতে দীনতর
সেই বৈষ্ণব,-জয়গৌরব ভাবে না কভু বড়ো।“
মঞ্চের সামনে
মোটা করে খড় পাতানো। এর উপর তিনজন খোল ও কাঁসর বাজাচ্ছেন আর একজন কীর্তন গান করছেন।
গান হচ্ছে :
“একবার কৃঞ্চ নাম নিলে যত পাপ
হরে
জীবের
কি সাধ্য আছে তত পাপ করে
তোমরা
কৃষ্ণ ভজ তোমরা কৃষ্ণ ভজ “
ভোলার
কীর্তন শুনতে খুব ভালো লাগে। এ বছর নুতন এক অনুষ্টান সংযোজন হয়েছে। ওখানে কালু ও এই
বয়সের ছেলেরা জড়ো হয়েছে। এরা সকলে স্কুলছুট, কাছাকাছি কোনো মাধ্যমিক স্কুল নেই বলে
ওরা পড়াশুনা ছেড়ে দিয়েছে। এতে সংসারে আর একজন কাজের লোক পাওয়া যায়। সংসার একটু সচ্ছল
হয়। এই বাচ্চা বয়স থেকে ওরা সমস্ত কাজ করে। মাঠে লাঙ্গল করে, বীজ বোনে, পাকা ধান কাটে।
ভোলা ভাবে শিক্ষা আলোক বর্ত্তিকার মতো মানুষকে জীবনে আঁধার পথে আলো দেখিয়ে সামনে এগোতে
সাহায্য করে। সরকারের প্রধান কাজ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করা। দেশ
স্বাধীন হয়ে অনেকদিন হলো কিন্তু কোনো সরকার ঠিকমতো কাজ করছে না। গ্রামের মহিলা স্নান
আসতে শুরু করছে, মাথায় বিশাল ঘোমটা টানা। এটই রেওয়াজ, বাড়ীর বাইরে গেলে বা বাড়ীতে কোনো
পুরুষ মানুষ গেলে মহিলাদের ঘোমটা দিতে হতো।
কালু ভোলাকে কিছু বলছিল কিন্তু হরি সংকীর্তেনের আওয়াজে ভোলা ভালো করে শুনতে
পাচ্ছিল না। তাই তারা একটু দুরে গেলে কালু বললো,
“এবারে
পরশু দিন কতিরু তিন দিন কৃষ্ণযাত্রা হব”
“কৃষ্ণযাত্রা
কিস রে ?”
“রাধাকৃষ্ণ
জীবনী লেই যাত্রা হয়, শুনুছি রাধা ও কৃষ্ণ দুই জনই ঝিয়”।
“
কেউটু আসুছি ?”
“
পরান কাকা তার শশুর ঘর যাইথিলে, সেঠি এই যাত্রা হউথিলা, সিয়ে বায়না করি দেইচন”।
ভোলা
ভাবছে, এ আবার কেমন যাত্রা, মেয়েরা ও অভিনয় করে। তাদের গ্রামেও যাত্রা হয়। গ্রামের
কিশোর যুবক পৌঢ়রা অভিনয় করে। এখানে মহিলা চরিত্র ও পুরুষরাই করে। ওর মধ্যে এক উত্তেজনা
খেলতে থাকে কারন মেয়েরাও অভিনয় করছে এটা ও ভাবতেও পারচ্ছে না। যখন মেয়েরা প্রায় ঘরে
বন্দি থাকে বিশেষত অবিবাহিত মেয়েরা লজ্জায় কথাই বলে না, তখন মেয়েরা যে অভিনয় করছে তাতে
সমাজ এগোচ্ছে। সে এই অভিনয় দেখার জন্য উৎগ্রীব হয়ে উঠলো।
তারা
আবার মন্ডপে ফিরে এলো। ক্রমাগত ভীড় বাড়ছে। ভোলা দেখলো সেন খুড়িমাকে তাঁর প্রতিবেশী
কাকীমা ধরে ধরে নিয়ে আসছেন। তাঁর স্বামী প্রায় বছর দশেক আগে মারা গেছেন। তাঁদের কোনো
সন্তানাদি ছিল না। সেন জেঠু এক সকালে মাইল ছয়েক দুরে তাঁর এক কুটুম বাড়ী গিয়েছিলেন।
সে সময় বড় রাস্তাও ছিল না যানবাহনও না। লোকেরা
হেঁটেই যাতায়াত করতো আর যে মহিলাদের সদ্য বিয়ে হতো তারা শশুরবাড়ী থেকে বাপের
বাড়ী বা বাপের বাড়ী থেকে শশুরবাড়ী পালকীতে যাতায়াত করতো। সেন জেঠু কাজ শেষ করে বেরতে
সন্ধ্যা হয়ে যায়। বাড়ী ফেরার পথে এক শ্মাশান পড়ে। শ্মশানের ধারে এক জঙ্গল আছে। সেদিন
ম্লান জ্যোংস্না আলোকিত রাত। আলো আঁধারে একা পথ চলেছেন। একটি গ্রামের পর বিরাট মাঠ
পার হতে হতো। সন্ধ্যার পর মাঠ জনশূণ্য হয়ে যেত। সেন খুড়ো বাড়ী ফিরে খুড়ি মা বলেছিলেন
“মু ঘরকু আসুথিলি। শ্মশান ধার দিই আসিবা বেলে দেখিলি গটে লম্বা হেই ধপধবে শাড়ী পঁহরি
বনকু চালি গলা, মতে ভয়বি লাগি থিলা।‘
খুড়ি
মা বলছিল “ হউ, তুমে খাইকি রাম নাম করি শুই যাও”
সেন
খুড়ো সেই যে শুলো সকালে আর উঠলো না। সকলে বললো “শ্মাশান ভুত মারি দেইচি” ভোলা তখন ছোট
ছিল তাই রটনাকে ঘটনা বলে বিশ্বাস করেছিল। এখন ভোলা এই ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করে একে
ভুতের কাজ বলে বিশ্বাস করে না। মৃত্যুর কারন অন্য হতে পারে। তখন মরে গেলে ডাক্তার না
থাকায় মৃত্যুর কারন ধরা যেত না।
ভোলার
রবীন্দ্র্নাথ ঠাকুরের কবিতা মনে এলো:-
“ যেথা তুচ্ছ আচারের মরু-বালু-রাশি
বিচারের স্রোতঃপথ ফেলে নাই গ্রাসি “-
·
খুড়ি মা
সেই থেকে একাই থাকেন। প্রথম প্রথম খুড়িমা একা একা রান্না করতেন। এখন পাড়া প্রতিবেশী
ওঁর ভার নিয়েছে। গ্রামের প্রায় পরিবার পাশাপাশি থাকে। কারো বসতের চারপাশে প্রচীর তো
ছিল না এমন কি বেড়াও থাকতো না। অধিকাংশ পরিবার ছিল যৌথ পরিবার। চার পাঁচ ভাই একসঙ্গে
ও এক বাড়ীতে থাকতো।যৌথ পরিবারে অনেক
সুবিধা ছিল। মনে একাকত্ব আসার কোনো সুযোগ ছিল না। হৈ হৈ বা ঝগড়া করে দিন কেটে যেত।
সংসারের দুঃখ কষ্ট বিপদ সকলে ভাগ করে নিত। যে কোনো ব্যাপারে গ্রামের লোকরা
সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত। গ্রামের যে কেউ যে কোনো বাড়ীতে অবাধে যেতে পারতো।
সকালে বা সন্ধ্যায় গেলে দই ও অন্যান্য সহযোগে মুড়ি আর দুপুরে গেলে ভাত খাওনোর পর পান
দেওয়া হতো। এক ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ
সম্পর্ক ছিল।
এই
কীর্তন গ্রামের সকলকে আন্দোলিত করতো। সারাদিন কীর্তন তন্ময় হয়ে শোনায় গ্রামবাসীরা দৈনন্দিন
দুঃখ কষ্ট ভুলে এক নুতন অনুপ্রেরনায় উজ্জীবিত হতো। ভক্তির তন্ময়তার এক উপযোগিতা আছে।
ভক্তি একটি যোগ। জ্ঞানযোগ, কর্মযোগ, রাজযোগ করতে অসমর্থ হলে ভক্তিযোগ অনুশীলনের দ্বারা শারীরিক, মানসিক
এবং
আধ্যাত্মিক
উপকার
আসতে
পারে। গ্রামবাসীরা অশিক্ষিত তাই ভক্তিই তাদের সরল
ও সহজ পথ এবং এতে পাপ পুণ্যের পরিষ্কার ধারনা মনে গেঁথে থাকে। প্রতিদিনের ভক্তি হল
একটি
আধ্যাত্মিক
শৃঙ্খলা
যা
আমাদের
সত্য ও
জীবনের
ঝড়ের
মাঝে
প্রতিদিনের
আশ্রয়
হিসেবে
কাজ
করে। ভোলার সংস্কৃত স্যার ক্লাসে একদিন বলেছিলেন
“শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ আরম্ভের আগে
বলেছিলেন সকল ধর্ম পরিত্যাগ করে শুধু ঈশ্বরের শরণাগত হলে তিনি সমস্ত পাপ মুক্ত করবেন।
ঈশ্বরের প্রতি প্রকৃত ভক্তি থাকলে সে পাপ কর্ম করতে বিরত থাকে”। হয়তো এই জন্যই গ্রামবাসীরা দুষ্কর্ম করতে সাহস করে না।
ভোলা প্রায় দুপুর পর্যন্ত কীর্তন শুনলো। তারপর বাড়ী
গিয়ে মধ্যাহ্ণ ভোজন করে আবার মন্ডপে হাজির হলো। তখন কীর্তনের অন্য দল গান করছে –
“ভজ গৌরাঙ্গ কহ গৌরাঙ্গ লহ গৌরাঙ্গের নাম রে
যে জন গৌরাঙ্গ ভজে সে হয় আমার প্রাণ রে “।
বিষয়ে বলি শোন। বৈষ্ণব দর্শনের
মূল
কথা
আত্মার
সাথে
পরমাত্মার
মিলন
এবং
এই
একাত্মতারকিছুক্ষন পর সে ঠাকুর মশায়ের কাছে গেল। সকালের পুজো হয়ে গেছে
আবার সন্ধ্যায় পূজো ও আরতি হবে। ঠাকুর মশাই ভোলাকে স্স্নেহে বললেন “এসো বাবা আমার কাছে বসো। তোমার এই বয়সে জানার
আকাঙ্খা দেখে আমার খুব আনন্দ হয়েছে। আমি বৈষ্ণব
জন্য যে
পথ হয় তা
হলো,
কেবলমাত্র
প্রেম
ও
ভক্তি
এবং
সম্পূর্ণরূপে
অহিংসা অবলম্বন করা । বৈষ্ণব দর্শনে
পরমাত্মার
উপাসনার
জন্য
সকল
প্রকার
জাগতিক
গুন
বর্জন
করে
নির্গুণ
হয়ে
পরমাত্মার
সাথে
একাত্ম
হওয়ার
উপদেশ
রয়েছে। রাস পূর্ণিমা একটি
স্বর্গীয়
উদযাপন
যা
বৈষ্ণব
ঐতিহ্যে
অপরিসীম
তাৎপর্য
বহন
করে।
কার্তিক
মাসের
পূর্ণিমার
রাতে
এই
উৎসব
পালিত
হয়। রাস পূর্ণিমা একটি আনন্দদায়ক উপলক্ষ
যা
বৃন্দাবনের
পবিত্র
ভূমিতে
গোপীদের
সাথে
ভগবান
কৃষ্ণের
ঐশ্বরিক
নৃত্যকে
চিহ্নিত
করে। এই ষড়ভুজ বিগ্রহ হলেন তিন অবতার-শ্রীরাম, শ্রীকৃষ্ণ
ও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভূর মিলিত রুপ । ভগবান ত্রেতা যুগে রাম অবতার, দ্বাপরে কৃষ্ণ অবতার
ও কলিযুগে চৈতন্য অবতারে আবির্ভূত হয়েছেন।“
আত্মা ও পরমাত্মা কি ?
“ সহজ কথায় বললে ঈশ্বরের শক্তিই পরমাত্মা ও প্রত্যেক জীবের মধ্যে শক্তির যে
অংশ থাকে তাকে জীবাত্মা বলে।“
“ এই দুই শক্তির কি করে মিলন সম্ভব ?”
“ কেন ? ধর, তোমার পুকুর থেকে একটি বোতলে জল তুলে আনলে, জল তখন বোতলের জল হয়ে
গেল। দুদিন পরে বোতলের জল পুকুরে ঢেলে দিলে। সেই জল পুকুরের জলে মিলে গেল। বোতলের জল
পুকুরে জলে মিশে যাওয়ার আগে কিছু কাজ করতে হয়। বোতলকে পুকুর পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়।
বোতলের ছিপি খুলে পুকুরে ঢালতে হয়। কিছু কর্ম না করলে তার প্রতিকর্ম পাওয়া যায় না।
ঈশ্বরে ভক্তি হলে মন নির্মল ও একাগ্র হয়। মনের শক্তি বহু গুণ বেড়ে যায়। পরমাত্মার
ও জীবাত্মার মিলনে হলে জীব মুক্ত হয়ে যায় “।
“ঈশ্বর এক কিন্তু প্রকৃতি অনেক রাধা ও গোপীরা
পরমাত্মার ও জীবাত্মার মিলনেই মোক্ষকে ধরা
মোক্ষ হল মায়া এবং অজ্ঞানতা
হতে
মুক্তিলাভ
ঈশ্বরপ্রেমের
দ্বারা আসে প্রকৃত জ্ঞানের উত্তাপ
প্রেমাবতার
চৈতন্যের আবির্ভাবে পায় সম্পুর্ণতা
সারা ভারতে
ছড়াল ভক্তি ও প্রেমের ভাব কথা II”
ভোলার আরও কিছু জিজ্ঞাসার ছিল কিন্তু ঠাকুর মশাই পুজোর কাজে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায়
ভোলা আর সুযোগ পেল না। দেখতে দেখতে কৃষ্ণযাত্রার দিন এসে গেল।
দুপুরের আগেই যাত্রার কুশীলবরা এসে গেল। গ্রামের একজনের বাড়ীতে ওদের থাকার ব্যবস্থা
হয়েছে। ভোলা সন্ধ্যের পরেই খাওয়াদেওয়া শেষ করে মন্ডপে হাজির হলো। সেখানে দেখলো চারটা
খুঁটি পুঁতে সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। কালু ও এসে গেছে। দুজনে মিলে সাজঘরের দিকে গেল।
ত্রিপল টাঙিয়ে সাজঘর করা হয়েছে।
ওরা উঁকি দিয়ে দেখলো, সত্যিই তিনজন মহিলাকে সাজানো হচ্ছে। একজন বয়স্কা আর দুজন অল্প
বয়সের। দুজনের মধ্যে একজনের বয়স চৌদ্দের মতো হবে। পরমা সুন্দরী। দুধে আলতা গায়ের রঙ।
মুখশ্রী অতীব আকর্শনীয়। মাথার চুল বেশ ঘন ও লম্বা। মুখে কি এক যাদু আছে। চোখ দুটি টানা
টানা।গন্ডদেশ সুডোল। কথা বলার সময় একটা মোহনীয় হাসির রেখা ঠোঁটে কোনে ফুটে উটে। সে
যেন সমস্ত দুঃখ কষ্ট মনে চেপে রেখে হাসতে পারে।
দুঃখ কষ্ট ওকে স্পর্শ করতে পারে না।বোধহয় এই মেয়েটি রাধা হবে। ভোলার মনে হলো এই মেয়েটি
তার অনেক দিনের চেনা। ভোলার চোখ মেয়েটা থেকে সরতেই চায় না।
·
অন্য
মেয়েটির বয়স পনের কি ষোল হবে। গায়ের রং শ্যামল বর্ণ। মাথার চুল কোঁকড়ানো ও ঘাড় পর্যন্ত
। সামান্য লম্বা। অন্য মহিলা বয়ষ্কা। ভোলা ওখানে আটকে আছে দেখে কালু তার হাত ধরে টানতে
টানতে মন্দির প্রাঙ্গনে নিয়ে গেল। ভোলার কিন্তু মন পড়ে আছে। সে ভাবছে তার এমনটা হলো
কেন। এ কি বয়সের দোষ না পূর্বজন্মের কোনো সম্পর্ক আছে ? ভোলা আবার পূর্বজন্ম ও পরজন্ম
বিশ্বাস করে না । তবে বয়সের জন্য হয়েছে। সে সুকান্ত ভট্টাচার্যের বিখ্যাত কবিতা ” আঠারো
বছর বয়স “ মনে পড়লো। সতের আঠারো বয়ঃসন্ধির কাল। এই কবিতা পড়াতে গিয়ে বাংলা স্যার এই
বয়সের বৈশিষ্টের কথা আলোচনা করেছিলেন। বয়ঃসন্ধিকাল সেই
ক্রান্তিকালকে বোঝায় যখন একটি ছেলে বা মেয়ের মধ্যে
মানসিক
ও
সামাজিক
পরিবর্তন
ঘটে।
শরীর এই সময় প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে রূপান্তরিত হয় এবং প্রজননের সক্ষমতা লাভ
করে। বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে-মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন খুব দ্রুত ঘটে। এই সময় ছেলে ও মেয়ে উভয়ের মধ্যে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি শারীরিক ও মানসিক আকর্ষণ তৈরি হয় ও প্রেমের
সম্বন্ধ গড়তে চায়। এটা স্বাভাবিক, শরীরে হরমোনের প্রভাবে নানান পরিবর্তন হয়।
তবে ভোলা বুঝতে পারে না কেন এক বিশেষের প্রতি প্রথম দেখাতে আকর্ষিত হয়।“প্রথম
দর্শনে প্রেম” এর কথা শুনেছে। প্রথম দেখায় কিন্তু ভালোলাগা বা আকর্ষণ হয়, প্রেম হয়
না। প্রেমের সম্পর্ক দীর্ঘকালীন মানসিক বন্ধন। প্রথম ভালোলাগার পর যদি যোগাযোগ
বাড়তে থাকে তবে প্রেমে পরিণত হয়। তবে প্রথম দেখায় একজন ভালোলাগে কেন ? ভোলার মনে
হয় প্রত্যেকের মনে একটি ভালোলাগার চেহারা অবচেতন মনে সুপ্ত ভাবে থাকে, সেই চেহারা
সঙ্গে সামনের চেহারার মিল হলে আকর্ষিত হয়। এ এক প্রকার আবেগ। আবেগ এমন একটি মানসিক অবস্থা যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে উদ্ভূত হয় এবং এটি শারীরিক ও মানসিক উভয় অবস্থাকে প্রভাবিত করে।
ভোলা ও কালু সামনের সারিতে
বসার জায়গা করে বসে গেল যাতে ঐ মেয়েকে ভালো ভাবে দেখতে পায়।ভোলা কালু পাশাপাশি বসলো।
সকলে জড় হতে লাগলো। আজকার পালার নাম “ মাথুর”।যাত্রাপালা শুরু হলো। ভোলা অপেক্ষায় বসে
আছে ঐ মেয়েটা কখন আসবে। প্রথমে বয়স্কা মহিলা “বৃন্দা” গান করতে করতে মঞ্চে প্রবেশ করে
“গৌরচন্দ্রিকা” গান করলেন ।
তারপর রাধা ঢুকতেই ভোলার বুকে
কে যেন এক হাতুড়ীর ঘা দিল। বুকটা ঢিপ ঢিপ করতে লাগলো। শ্রীকৃষ্ণ কংসকে বধ করতে মথুরা
গেছেন। কৃষ্ণের বিরহে রাধা দুঃখে কাতর। রাধার তৃষিত প্রাণ দিবস রজনী শ্যাম দরশন আশে আকুল। জীবন অহরহ হুতাশন প্রায় জ্বলছে। চণ্ডীদাসের লেখা বিরহ
সম্বন্ধে একটি পদ মনে এল-
“রাধার কি হৈল অন্তরের ব্যাথা |
বসিয়া বিরলে
থাকায়ে একলে
না শুনে কাহারো কথা ||
সদাই ধেয়ানে
চাহে মেঘ-পানে
না চলে নয়ান-তারা |
বিরতি আহারে
রাঙাবাস পরে
যেমত যোগিনী-পারা ||”
পালা চলাকালীন দুজনের মাঝেমধ্যে
চোখাচোখি হচ্ছে। চোখে চোখ পড়লেই ভোলার হৃৎপিণ্ডের
গতি বেড়ে যাচ্ছে। শরীর ঘেমে যাচ্ছে। এক শিহরণ শরীরে খেলা করচ্ছে। ভোলা ভাবছে এ আবার
কি রোগ রে বাবা। এমন হচ্ছে কেন ? ও মেয়েটার কি একই রকম হচ্ছে নাকি। ভোলা কোনো বইতে
পড়েছিল, মনের এক তরঙ্গ আছে। এই তরঙ্গ গিয়ে অন্য মনে প্রতিক্রিয়া করে ? ভোলা ভেবেও কোনো
সিন্ধান্তে পৌঁচতে পারল না। যাত্রাপালা শেষ হলো। ভোলা বাড়িতে গিয়ে শুয়ে পড়লো। মাথা
ঔ মেয়েটার চিন্তা কিছুতে বেরচ্ছে না। এই সব চিন্তা করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে বুছতে
পারে নি। সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরী হলো কিন্তু মাথায় একই চিন্তা বসেই আছে। কোনোক্রমে
মুখ ধুয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো যাত্রা দল যার বাড়ীতে আছে সেখানে উপস্থিত হলো। বাড়ীর সামনে
গিয়ে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ পর ঐ মেয়েটি বেরিয়ে এসে একটু দুরে অধোবদনে দাঁড়লো। দুজনে চুপ
করে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটি কোনো কথা বলছে না, চোখও তুলছে না। ভোলার অস্বস্তি বাড়ছে। তাই
সে জিজ্ঞাসা করলো:-
“ তোমরা কোথা থেকে এসেছ ?”
“ এখান থেকে প্রায় কুড়ি মাইল
উত্তরদিকে আমাদের বাড়ী। কার্তিক মাসে পর থেকে আমরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে যাত্রা অনুষ্টান
করি “।
“ তুমি কি দলে মাসিক মাহিনায়
কাজ কর ?”
“ না। এ দলটা আমার বাবা। তিনিই
সমস্ত দেখাশুনা করেন। তিনি আমাদের সঙ্গে থাকেন :”
“ তোমাদের ওখানে মেয়েদের যাত্রায়
অভিনয়ে বাধা নেই ?”
“ আমাদের গ্রাম শহর ঘেঁসা,
তাই এ রকম কোনো বাধা নিষেধ নেই। আমাদের অবস্থা খুব ভালো নয়। এই কয় মাস এইভাবে উপার্জন
করি “
“ তোমার অভিনয় করতে ভালো লাগে
?”
“ অভ্যাস হয়ে গেছে “
এমন সময় বাড়ী থেকে ডাক শুনা
গেল “ মা মাধুরী কই গেলি “
“ বাবা ডাকছেন, আমি যাই” বলে
মেয়েটি ধীর গতিতে চলে গেল। ভোলা মেয়েটার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে ও ভাবছে ওর মধ্যে
এক মুগ্ধতা আছে । শান্ত, ধীর কথার মধ্যে এক মিষ্টতা আছে। ভোলা ভাবতে ভাবতে বাড়ীর পথে
পা বাড়ালো। মেয়েদের মধ্যে যদি মেয়েলি গুণ না থাকে তবে তাকে মেয়ে বলা যায় ? ভোলা শরৎচন্দ্রের
কয়েটি উপন্যাস পড়ে ফেলেছে। মাকে কাছ দেখেছে, তাঁর স্নেহ, মমতা, ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস
ও কর্মদক্ষতা লক্ষ্য করেছে। সে বা তার বাবা অসুস্থ হলে মায়ের সেবাও তার নজর এড়ায় নি।
সৃষ্টিকর্ত্তা পরিকল্পনা করেই ব্রহ্মান্ড তৈরী করেছেন। এতে কিছু বৈচিত্র ও ব্যাতিক্রম
থাকবেই।
বাড়ী গিয়ে ভোলা স্থির করলো
আজ বিকালা সে স্কুল বোড়ং এ চলে যাবে। আবেগকে বাড়ালে বাড়তে থাকবে। এখানে থাকলে যোগাযোগ
বাড়বে। দুরে থাকলে আবেগকে দমন করা যাবে।
৩য় পরিচ্ছেদ
সেই সময়ে প্রত্যন্ত গ্রামে বিনোদন বলে তেমন কিছু ছিল না।
মহিলা, পুরুষ, কিশোর ও কিশোরী সকলে মুখের খাবার জোগাড়ের জন্য বার ঘন্টা পরিশ্রম করে।
বিনোদনের সময় কোথায় ? কিন্তু সারা বছর ঘরে ঘরে ছোটোখাটো অনুষ্টান লেগে থাকে। তাতেই
একঘেয়েমি জীবনে একটু বৈচিত্রের বাতাস লাগে। তখন গ্রামে ইংরাজী কেলেন্ডার ব্যবহৃত হতো
না। বৈশাখ মাসের পয়লা নববর্ষ পালিত হয়। তেমন কোনো অনুষ্টান হতো না। পুকুর থেকে বড় মাছ
ধরা হতো। দু চার রকম পদ রান্না হতো। কয়েক জন বন্ধুবান্ধব আসতো। দিনটা একটু হৈচৈ করে
কাটতো।
ভাদ্র সংক্রান্তিতে মনসা পূজোর দিন পালিত হতো
'অরন্ধন'।
এই
অরন্ধনটিতে ভাদ্রের শেষদিন রেঁধে আশ্বিনে খাওয়ার চল ছিল ।
ভাদ্র সংক্রান্তির আগের দিন রান্না
করে,
সংক্রান্তিতে
মা
মনসাকে
উৎসর্গ
করে
তবে
খাওয়া
হতো।
প্রাচীন
রীতি
অনুসারে
পরের দিন
বাসি
খাবার খাওয়া হতো। আগের রাতে বিভিন্ন ভাজাভুজি,
নানা তরকারী ও ভাত হওয়ার পর ভাতে জল ও বেশী করে নারকেল কোরানো মিশিয়ে রেখে দেওয়া
হতো। এই নারকেল পান্তাভাত ভোলার খুব প্রিয় ছিল। দুটি তরকারী অবশ্য করতে হতো, সজনে
পাতার শাকভাজা ও লাউ তেঁতুলের চাটনী, একে” সাকরা” বলা হতো। পরের সকালে উনুন
পরিস্কার করে গোবর ও সাদা মাটি মিশিয়ে লেতা দেওয়া হতো।
ভোলা এখন দশম শ্রেণীতে পড়ে। সে একদিন আগে বাড়ী
এসেছে। মা সকাল সকাল স্নান করে উনুনের পরিষ্কারের কাজ করছেন। সে দিন রান্না বন্ধ
রেখে উনুনকে পূজো করতে হয়। ভোলার দিদিমা এসেছেন। আজ মামাও আসার কথা। দিদিমা নাতির
গল্প হচ্ছে।
ভোলা দিদিমাকে জিজ্ঞাসা করলো “তুমে ভুত দেখিছ ?”
দিদিমা সেকালের মানুষ, ভুতে সংস্কার তো থাকবেই। “ কেতে থর দেখিছি। সিয়ে প্রায় দুই
বরস আগে, মু রাতিরে বাহারকু যাইছি, সেদিন জ্যোৎস্না রাতি। আম ঘর ধাররে যে বন অছি,
সইঠি সাদা সাদা ধুতি পরি ঘুরুচি। মু ঘরকু আসি শুই গলি”
“আচ্ছা দিদা আজি অরন্ধন হয় কেনে ? “
“কেতে দিনরু হেয়ি আসুছি, কেনে হয় মু জানে নি “।
দিদিমা অক্ষর জ্ঞান শূণ্য। গ্রামে কেউ জানে না যে
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় অরন্ধনের ডাক দেওয়া হয়েছিল। অরন্ধন একদিকে ভালো।
মহিলারা একদিন রান্না থেকে ছুটি পান। দেখা গেল কালু আসছে। নিশ্চয় কোনো না কোনো খবর
নিয়ে আসছে। তার হাঁটু পর্যন্ত কাদায় ভর্তি। সে আঙিনায় দাঁড়িয়ে বললো “ ভজুর বাবাকু
কাল রাতিরে সাপ কামড়িছি, ওঝা আসিছি।‘ ভোলা কালুকে বল “ যা পুখরিরু গুড় ধুই আয়”
কালু চলে গেলে ভোলা ভাবতে লাগলো অশিক্ষার জন্য গ্রামাঞ্চলে কত কত কুসংস্কারকে বহন
করে চলেছে। কেউ ভাবে না এগুলো ঠিক না ভুল, যুক্তি দিয়ে বিচার করে না। যেটা চলে আসছে,
তাকে অন্ধের মতো অনুসরন করে। আষাঢ় মাস গ্রামাঞ্চলে সাপের উপদ্রব বেড়ে যায়।
কাছাকাছি কোনো হাসপাতাল নেই, তাই লোকেরা ওঝার সাহায্য নিতে বাধ্য হয়। গভীরভাবে
চিন্তা কেউ করে না।
এর মধ্যে কালু ফিরে এসেছে। মামাও এসে পৌঁচালেন।
ভোলা মামাকে হাঁটু গেড়ে প্রনাম করলো। দেখাখেখি কালু ও প্রনাম করলো। কেউ বড়রা
বাড়ীতে এলে প্রনাম করার রীতি। এরপর তার পা ধোয়ার জন্য একটি চৌকি, এক বালতি জল ও গামছা, একটি ঘটি দেওয়া
হয়। পা ধোয়ার সময় ঘটিতে জল নিয়ে পায়ে ঢেলে দিতে হয়। তারপর গামছা দিয়ে মুছে দিতে
হয়। ভোলা তাই করলো। সেই সময় “ অতিথি দেবো ভব”। অতিথিকে খুব সম্মান করা হতো।
ভোলার মা উনুন পূজো পর মনসা পুজো করে এলেন। ভোলার
বাড়ীর উত্তরদিকে চৌহদ্দির কাছে এক ফণী মনসার গাছ ছিল। সেই গাছকে মনসা বলে পূজা করা
হতো। সাপের ভয় থেকে রক্ষা পেতে মনসার পূজা হতো কিন্তু ভোলা বুঝে পেল না এই গাছ
মনসা কি করে হলো।
ভোলা ও কালু নারকেল পান্তাভাত খাওয়ার পর কালুকে
বললো সাপেকাটা লোকের বাড়ী যাওয়ার কথা। তারা ভজুর বাড়ী গিয়ে দেখলো কয়েকজন লোক
দাঁড়িয়ে। উঠানে ওঝা তার চিকিৎসা করছে। ভোলা ব্যাপারটা ভালো ভাবে পর্যবেক্ষন করলো।
তারপর ওঝাকে সাপে কাটা জায়গাটা দেখাতে বললো। জায়গাটা ভালো দেখে বুঝলো ওখানে চারটি
দাঁতের দাগ রয়েছে। সে জোরে জোরে বললো “ভয়র কিছি নাই। যে সাপ কামড়িছি তার বিষ নাই”।
ভোলা বইতে পড়েছে বিষধর সাপ কামড়ালে দুটি দাঁতের স্পষ্ট ও গভীর দাগ দেখা যায়। এখানে
তেমন কিছু নেই। বিষধর কামড়ের অন্য লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। বিষধর সাপ কামড়ালে ওঝার
কিছু করার থাকে না। বইতে অনেক কিছু জানার বিষয় থাকে কিন্তু অনেকে পড়ে, কেউ মনে
রাখে না তাই প্রয়োগ করতে পারে না। এমন কেন হয় ভোলা জানে না। এর মধ্যে রোগী উঠে
বসেছে। এতক্ষণ সাপের কামড়ের জন্য মরায় ভয়ে মুষড়ে পড়েছিল।
এরপর আশ্বিন মাসের শেষদিন অর্থাৎ সংক্রান্তির দিনে একটি প্রথা পালিত হতো৷ এইসময় ধানগাছে ফসল আসার সময়, ধানগাছে ফুল হয়, ধানগাছ গর্ভবতী হয়। আর ধানের ভেতরের অংশটি একেবারে দুধের মতো থাকে। যেটি পরবর্তী পর্যায়ে চালে পরিণত হয়। এই নরম মিষ্টি দুধ অংশটি পোকামাকড়ের খুব প্রিয়। ফলে ধানের উপর পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে যায়। এরা ধানের দুধ অংশটি শুষে নেয়। ধানের পুষ্টি হয় না। ধান থেকে চাল পাওয়া যায় না, সব আগড়া হয়ে যায়। ফলে কৃষকের সর্বনাশ। কৃষক পরিবারগুলি দুঃখের সীমা থাকে না।
ফসল বাঁচাতে কৃষকরা এক টোটকা অবলম্বন করতেন। কৃষকরা ধান গাছকে পোকার আক্র্রমন থেকে রক্ষা করতে এই পদ্ধতি
অবলম্বন করতেন। আশ্বিনের মাস শেষের আগের দিনে নল গাছ কেটে আনা হত। চাষীরা নিম, কালমেঘ, তুলসী, ওল, আদা, ভেট , বয়েড়া, মানকচু, চাল কুমড়ো খাড়া, নটে খাড়া, কেতকী, বেলপাতা, শশা গাছ ইত্যাদি, দশ বার রকমের ভেষজ খুব ছোটো ছোটো করে কুচি করতেন। তারপর আতপ চাল মিশিয়ে নেওয়া হত। এরপর ঐ মিশ্রণটিকে বড় পাতায় দিয়ে মুড়ে নলগাছে পাট দিয়ে বাঁধা হতো। বাঁধার সময় মুখে কোনো কথা বলা যেত না। সারা গ্রামের চাষীরা রাত জেগে যে যার বাড়ীর উঠোনে নল বাঁধার কাজ করতো। সংক্রান্তির দিন ভোরে সূর্যের আলো ফোটার আগেই এই মিশ্রণবাঁধা নলগুলে নিয়ে জমিতে ঈশান কোণে পুঁতে দেওয়া হত। বলতে হতো :-
“নল পড়িল ভুঁয়ে
যা শনি তু উত্তর মুয়ে।”
ও
“এতে অছি সরিষা কাঁকুড়ি নাড়ি
যা রে পুক ধানকু ছাড়ি ।
এতে অছি শুকতা
ধান ফলিবো মুকতা ।
এতে অছি কেঁউ
ধান হব সাত বেঁউ” ।
এতে আছে হলদি
ধান ফলবে জলদি ।
এতে আছে ওল
মহাদেবের ধ্যান করে বল হরিবোল।“
কীটনাশক ঔষধ বা রাসায়নিক সারের আবির্ভাব ঘটেনি। কীটপতঙ্গের হাত থেকে ফসল কে রক্ষা করার জন্য এই পদ্ধতিটি তৈরি করা হত, এটি তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ যুক্ত ছিল যে পোকামাকড় সহজেই আর ফসলের এলাকায় আসত না। ভোলা ও অনেক বার নল বেঁধেছে ও নল পুঁততে
গিয়েছে। খুব সকালে না খেয়ে নুতন কাপড় পরে নলগোছাকে পূজা করে জমিতে যেতে হতো। সেদিন
ঘরে পায়েস বা চাল সিদ্ধ হতো। চালের সঙ্গে ছোলা, গোটা মুগ, বাড়ীর জমিতে ফলানো
সোয়াবিন ও নারিকেল কুচি দিয়ে চাল সেদ্ধ করা হতো। অপুর্ব এর স্বাদ।
এই গ্রামে সর্বজনীন পূজা বলে কিছু হতো না। শুধু জমিদার বাড়ীতে ধুমধাম করে কালীপূজা
হতো। জমিাদার তেমন বড় জমিদার নয়। গ্রামে সকলের চেয়ে কিছু জমিজমা বেশী ছিল। তাই সকলে
তাঁকে জমিদার ভাবতো। নাম বটকৃষ্ণ সামন্ত। বড়ই সজ্জন মানুষ। বয়স ৪৭/৪৮ হবে। তাঁর একটি
মাত্র সন্তান। সে শহরে থেকে পড়াশুনা করছে। সামন্ত বাবুই গ্রামের মাথা। তিনি গ্রামে
বিবাদ বা কোথাও গন্ডোগোলের সমাধা করেন। গ্রামে পঞ্চায়েত ছিল। তবে সদস্যরা নির্বাচিত
নয়, মনোনিত। সামন্তবাবুই অন্য সদস্যের মনোনিত করতেন। মাসে দুতিন বার মহাদেব মন্দিরে
সভা বসতো। গ্রামের সুবিধা অসুবিধা আলোচনা হতো ও সমাধান করা হতো। গ্রামের সকলে এই সিদ্ধান্ত
একবাক্যে মেনে নিত।
গ্রামে একটি বড় উৎসব, তাঁর বাড়ীর কালী পূজো। তাঁর
বাড়ী মাটির দুমহলা। তাঁর দালানে পনেরো দিন আগে থেকে ঠাকুর তৈরী হতে আরম্ভ হতো। কচি
কাঁচারা ঠাকুর তৈরী করা দেখতে জড়ো হতো। ভোলাও আগে অনেক বার গেছে। কিভাবে খড় দিয়ে
কাঠামো তৈরী হয়, তারপর মাটি দেওয়া হয়। শুকালে রঙ পড়ে। গ্রামের মধ্যে চারদিকে জল ও
মাঝখানে একটি ছোট্ট একটি দ্বীপ। সেখানে মা
মঙ্গলার ছোট মন্দির। মন্দির বলতে ছয় ফুট মাটির দেওয়ায় দিয়ে ঘেরা ও খড়ের ছাউনি।তার
ভিতরে একটি মাটির উঁচু স্থান। তাতে একটি পাথর বাসানো। গোটা পাথরটা সিঁদুর মাখনো। মা নাকি খুবই জাগ্রত।
আকুলভালে তাঁর কাছে যে প্রকৃত প্রার্থনা
করে, তিনি তাঁর মনস্কামনা পুরন করেন। গ্রামে কান পাতলে মায়ের প্রভাব কতটা বোঝা
যায়। ভোলা ও মায়ের কাছে বিভিন্ন কামনা করে।
ভোলার একটি সত্য ঘটনার অভিজ্ঞতা আছে। বছর দুয়েক
আগে ভোলা মা পুকুর ঘাটে বাসন মাজছিলেন, সেই সময় মায়ের বিয়ের আংটিটি জলে পড়ে যায়।
অনেক খোঁজ করেও হদিস পাওয়া যায় না। ভোলার মায়ের মন খারাপ । সোনার পরিমান কমই ছিল
কিন্তু এক গরীবদের ঘরে এইটুকু সোনাই মহার্ঘ, আংটিটি বিয়ের একমাত্র সোনার নিদর্শণ।
দু তিন পর ভোলার মা স্নান করে ভোলাকে বলেছিলেন মায়ের কাছে যাচ্ছেন । বেশ কিছুক্ষন
পরে ফিরে এসে তিনি পুকুরে নামেন। কিছুক্ষন পরে তিনি চিৎকার করে উটলেন “পাইছি. জয়
মা মঙ্গলা”। ভোলা সেই সময় এ বিষয়ে কোনো
চিন্তা করে নি। পরে এই ব্যাপারে চিন্তা করেছে ও বিভিন্ন বই পড়েছে।
প্রার্থনা করার মূল্য পৃথিবীর সব ধর্ম সম্প্রদায় মান্যতা দেয়। এর রহস্য ব্যাপারে
স্বামী বিবেকানন্দের কথায় বলা যায় যে মনের ক্ষমতা অসাধারন। একাগ্র মনে প্রার্থনা
করলে এটা অবচেতন স্তরে পৌঁছালে এই প্রার্থনা পুরুন হয়। মনের তিনটি ভাগ রয়েছে।
সচেতন, অবচেতন ও অতিচেতন । মনের উপর স্তর সচেতন, তারপর অবচেতন ও শেষে অতিচেতন।
মনকে সাগরে ভাসমান বরফ খন্ডের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। সাগরে যখন এক বরফ খণ্ড ভেসে
থাকে। তার নয় অংশের এক অংশ দেখা যায়। আঠ অংশ জলের ভিতরে থাকে। বরফের উপরিভাগ সচেতন
মন, জলের ভিতর অংশটি অবচেতন। সমুদ্রের জলই অতিচেতন। অতিচেতন মনই সকলের মনের সমষ্টি
বা ঈশ্বরের মন। সচেতন মনের তরঙ্গ আছে । কোনো ইচ্ছা অবচেতন মনে পৌঁছে দিতে পারলে,
সেটা সফল হয়। কারন অবচেতন মনের সঙ্গে অতিচেতনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকে। মন একাগ্র হলেই অবচেতন মনে যাওয়া যেতে পারে। মন
বড়ই চঞ্চল। তাকে একাগ্র করা কঠিন কিন্তু অতি ভক্তি বা অতি ভয়ে মন অবচেতনে চলে যায়।
তখনই অলৌকিক ঘটনা ঘটে। কেউ ভুত দেখে, আবার কেউ দেবতা দেখে। মনের শক্তি অবচেতন মনে
লুকিয়ে থাকে।
কালী পূজোর দিন মঙ্গলা মায়ের সামনে জোড়া পাঁঠা বলি দেওয়া হতো। অনেক দিনের রীতি।
কালী পূজোর সকাল এক প্রহরের মধ্যে স্নান করে, কিছু না খেয়ে গ্রামের মানুষজন মন্দিরে
জড়ো হয়। পূজো ও অঞ্জলীর পর বলি হতো। পাঁঠাদুটোকে স্নান করিয়ে মায়ের সিন্দুর পরানো হতো।
একটিকে বলি কাঠে দিয়ে একজন পিছনের পা দুটো টেনে ধরে রাখতো। যে বলি দিত, তার মালকোঁচা
মারা, কোমরে গামছা বাঁধা, কপালে সিঁদুর, চোখ দুটি জবাফুলের মতো রাঙা। জল্লাদের মতো
দেখতে। গ্রামে একটি রটনা আছে যে বলি দেয়, তার সেদিন মায়ের ভর হয়। বলি দেওয়ার আগে ঢাক ঢোল কাঁসি বাজতে আরম্ভ হয় ও লোকেরা ‘মা’ ‘মা’ বলে
চিৎকার করতে থাকে এবং নিরীহ জীবের শেষ আর্তনাদ এই কোলাহলে ডুবে যায়। হাতের খড্গ নিমিষে উপরে ওঠে সজোরে নামে, ও বলির কাটা মাথা ও গলা থেকে বেরনো রক্ত মাটি তে ভেসে যায়। তখন আর একটি ছাগ কাছে দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকে। তারপর
বলি প্রদত্ত মাংস গ্রামের প্রত্যেক বাড়ী বন্টন হয়। ভোলা বলি দেখতে যেত না এবং মাংসও
খেত না। ছাগদের দেখে ভোলার বড়ই করুণা হতো। তার বিবেকানন্দের বাণী মনে পড়তো যে সব জীবেই
ঈশ্বর থাকেন। ভোলার মন বলতো এ প্রথা বন্ধ হওয়া দরকার। আগে কত না নিষ্ঠুর প্রথা
ছিল। তার মধ্যে সতী দাহ প্রথা সব চেয়ে হৃদয় বিদারক। কত না অভাগিনীকে স্বামীর চিতায়
জ্যান্ত অবস্থায় পুড়ে মরতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। কুঁড়ি থেকে ফোটার আগে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যেতে হতো।
রাজা রামমোহন রায় অনেক লড়াই করে এই প্রথা বন্ধ করেছিলেন। আর একটা ছিল কৌলিন্য প্রথা।
কুলীন ব্রাহ্মণ মেয়েকে কুলীন ব্রাহ্মণ পাত্রকেই বিয়ে দিতো। কুলীন পাত্রের অভাবে পনেরো
কুড়িটি বিয়ে করতো বুড়ো হয়ে মরার আগে পর্যন্ত বিয়ে করে যেত। এ মারা যাওয়ার সেই সব মেয়েদের
অসহনীয় জীবন কাটাতে হতো সমাজে অনেক প্রথা নির্মূল হয়েছে। এখনো অনেক বাকী। প্রকৃত শিক্ষার আলো ছড়িয়ে না পড়লে এ কুসংস্কারের অক্টোপাস
থেকে মুক্তি নেই।
এ বছর ভোলা পুজোর ছুটিতে বাড়ী এসেছে। তার এখন একটু সাহস বেড়েছে। তাই
সে সিন্ধান্ত নিয়েছে বলি দেখবে এবং ভর হলে কি হয় জানবে। দেখতে দেখতে কালী পুজোর
দিন এসে গেল। কালী পুজোর আগের দিন শোনা গেল যিনি বলি দিতেন তিনি খুব অসুস্থ ।
সামন্ত বাবু কয়েক জনের সঙ্গে আলোচনা করে আর একজনকে নিয়োগ করেন এবং আগের লোকের কাছে
পাঠানো হয়েছে আদব কায়দা শিক্ষা নেওয়ার জন্য। পরের
দিন যথারীতি পুজো আরম্ভ হলো। ভোলাও স্নান করে হাজির হয়েছে । গিয়ে দেখে বহু
লোক জমা হয়েছে। দুটি ছাগ খুঁটিতে বাঁধা। সামন্তবাবু এসে চেয়ারে বসে। ভোলাকে দেখে
বলেন “পড়াশুনা কেমন চলছে ? দেখ বাবু তুমি গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করবে তো ? তোমার
দিকে গ্রাম শুদ্ধ লোক তাকিয়ে আছে”। ভোলা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো। ঢাক ঢোল কাঁসি বাজছে। দেখতে দেখতে বলি দেওয়ার জ্ন্য
নিয়োজিত বিশু কাকা এসে গেল। সে লাল কাপড় মালকোঁচা করে পরেছে, মাথায় লাল কাপড়
বাঁধা। বিশু কাকাকে ভোলা ছোটো থেকে চেনে। বিশু কাকা একটু লম্বা, ছিপ্ ছিপে, মায়ায়
ঝাঁকড়া চুল। একটা বড় গোঁফ আছে। ছোটোরা ওকে দেখলে ভয়ে ছুটে পালায়। একটু বেশী সাহসী।
ভোলা ভাবলো সামন্ত বাবুর পছন্দ আছে। সে সাপ মারতে ওস্তাদ। সাপ দেখলে ওর ডাক পড়তো।
ভোলার মনে পড়ে সে যখন ছোটো
তার পাশের বাড়ীতে একবার রাতে এক গোখরা কুঁড়েঘরের মধ্যে দেখা গেল গোল হয়ে পড়ে আছে।
সাপটা বেশ বড়। দেওয়াল সেঁটিয়ে কন্ডলি দিয়ে পড়ে আছে ঐ ঘরের মাটির দেওয়ালে বেশ বড় বড়
ফাটল, কেউ লাঠি চালাতে সাহস পাচ্ছে না যদি ফাটলে ডুকে পড়ে। লোক মুখে প্রায় শোনা
যায় সাপকে আঘাত করলে সে যদি বেঁচে চলে যায় তবে সে এর প্রতিশোধ নেয়। এ ছাড়া লম্ফের
আলোয় ভালো করে দেখাও যাচ্ছে না। তাই কেউ কাছে যেতে পেল না। তখন একজন বিশু কাকাকে
খবর দিল। বিশু কাকা এসে দেখলো সাপটা বেয়াড়া জায়গায় আছে, লাটি চালানো যাবে না। তাই
সে লাঠি দিয়ে আলতো ভাবে সাপ টোকা দেষ। সাপটা তড়িৎ গতিতে এক ফাটলে ঢুকতে আরম্ভ
করলো। বিশু কাকা লাফিয়ে তার লেজটা ধরলো ও একজনকে বললো সে সাপটাকে টেনে আনার সঙ্গে
সঙ্গে লাঠি দিয়ে জোরে সাপের মাঝে আঘাত
করতে। তাহলে সাপটার মেরুদন্ড ভেঙে যাবে ও নড়াচড়া করতে পারবে না। লোকটা শক্ত লাটি
নিয়ে পাশে দাঁড়ালো। বিশু কাকা সাপটার লেজ ধরে টানতে লাগলো। যেই সাপটা পুরোটা
বেরিয়ে এল, লোকটা সজোরে লাঠি চালালো। ভাগ্যিস আঘাতটা ঠিক জায়গায় পড়েছিল, না হলে কি
যে হতো ভাবা যায় না। সাপটাকে মেরে পুড়িয়ে দেওয়া হলো। গ্রামে সাপ মারলে পুড়িয়ে
দেওয়া হয় কারন ফাঁকা জায়গায় ফেলে দিলে বাতাস লেগে যদি বেঁচে যায় তবে প্রতিশোধ নিতে
ছাড়বে না।
আজ বিশু কাকাকে একটু অন্য রকম লাগছে । চোখ দুটি
লাল, মনে হচ্ছে নেশা করেছে। পূজোর পর পুষ্পাঞ্জলী হয়ে গেল। বিশু কাকা আজ কেমন গুম
মেরে আছে। সেও পুষ্পাঞ্জলী দিল। তার মাথায় সিঁদুর দেওয়া হলো। একজন একটা ছাগ নিয়ে
এসে হাঁড়িকাঠে ঢোকালো। ছাগটা ম্যাঁ ম্যাঁ ভীব্র আর্তনাদ করছে। সমবেত জনতা “মা মঙ্গলার
জয়” ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত। ঢাক ঢোল কাঁসির সংমিশ্রণে বলির ঘটনা দেখার জন্য সকলে উৎগ্রীব। বলির সময় কোনো মহিলা ও শিশুকে মন্দিরে
আসতে দেওয়া হতো না। বিশু কাকা খড়্গ দুহাতে ধরে হাঁড়িকাঠের পাশে দাঁড়িয়ে বলির জন্য
প্রস্তুত। ভোলা বিশু কাকার দিকে ভালো ভাবে লক্ষ্য করে দেখলো তার হাত দুটি একটু
কাঁপছে। ঠাকুর মশাই মায়ের সামনে থেকে বেরিয়ে এসে বলি দেওয়ার ঈঙ্গিত করলেন। বিশু
কাকার খড়্গ উপরে উঠে ছাগের ঘাড়ে পড়লো কিন্তু সকলে ভীত হয়ে দেখলো ছাগ গলা থেকে
দ্বিখন্ডিত হয় নি। অর্ধেকটা কেটে সামনের দিকে ঝুলে আছে এবং সামনের দিকে ফিনকি দিয়ে
রক্ত ছুটছে। বিশুকাকা মাটিতে পড়ে থরথর করে কাঁপছে। সে একটি ভয়াবহ দৃশ্য । জনতা বিস্ময়ে বিহ্বল।
সামন্ত বাবু বিশু কাকার কাছে
এসে চিৎকার করে বললেন “ ওরে কেউ বিশুর চোখে মুখে জল দে।“
কেউ কেউ ছুটে এসে জল দিল ও বাতাস করতে থাকলো। আর
একটি ছাগকে বলি দেওয়া হলো না। সকলে আতঙ্কিত। সকলে ভাবচ্ছে কিছু একটা অঘটন ঘটবে।
এদিকে বিশু কাকা চোখ খুলছে। কিছুক্ষণ পরে বিশু কাকা উঠে মাথা নীচু করে চুপ করে
বসে।
সামন্ত বাবু বিশু কাকাকে জিজ্ঞাসা করলেন “ বিশু কি হয়েছিল খুলে বল তো
?”
বিশু কাকা ধীরে ধীরে বলতে আরম্ভ করলো। “ মু তো রানা দা কতকি যাই
থিলি। রানা দা মতে কহিথিলা সকালে ন খাই গা ধুইতে তারাপর কিছি ভাঙ খাই নিতে। ভাঙও
সে মোতে দেই থিলা। সকালা গা ধুয়ে খালি পেটরে ভাঙ খাই থিলি। মু তো কেভে ভাঙ খাই
নাহি। নিশা খুব বেশী হয়ি যাই থিলা। মোর আঁখি প্রায় আন্ধকার হেই যাই থিলা। মোর দেহ
থরু থুলা। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে সে অধোবদনে চুপ করে বসে রইল।
গ্রামবাসীদের মুখে কোনো কথা নেই। সকলে ভীত, একটা অঘটন কল্পনায় । ভোলা
বুঝতে পারলো, ভর হওয়ার রহস্যই ভাঁঙ। সে ভাবলো বলি প্রথাকে বন্ধ করার সুযোগ। সমস্ত
ঘটনার পিছনে বৈজ্ঞানিক কারন থাকে। যে কোনো ঘটনা অলৌকিক হতে পারে না। ঘটনাটা
পুঙ্খানুপঙ্খ অনুসন্ধান করলে কারন পাওয়া যাবেই। কোনো এক বইতে ভোলা পড়ে ছিল “Ex
nihilo nihil fit” । এটা বৈজ্ঞানিক সত্য। কুসংস্কারগ্রস্ত মনে চিন্তা করলে প্রকৃত
কারণ পাওয়া যায় না। শিক্ষার দ্বারা মনকে স্বচ্ছ করতে হয়।
ভোলা ধীরে ধীরে সামন্ত বাবুর
কাছে গিয়ে বললো “ এই ঘটনার মধ্যে কোনো অস্বাভিকতা নেই। আগে যে দিত, তার ভাঙ খাওয়ার
অভ্যাস ছিল তাই কাজটা গুছিয়ে করতে পারতো কিন্তু বিশু কাকু আজই প্রথম ভাঙ খেয়েছে।
বোধ হয় একটু বেশী মা্ত্রায় খেয়েছে, নুতন
বলি দিচ্ছে তাই মনে ভয়ও ছিল এবং নেশা চড়ে যাওয়ায় অপ্রকৃস্থ হয়ে গিয়েছিল”।
সামন্ত বাবু গভীর চিন্তা করতে করতে বললেন “ সবই তো বুঝলাম কিন্তু এখন
করা যায় কি ?”
“ কাকু আমি বলি কি, বলি প্র্থা বন্ধ করে দেন । মা কখনো সন্তানের বলি
চায় না। বিবেকানন্দ বলেছেন “জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর”। তিনি নিরাকার ও এক শক্তি। হিন্দু ধর্মে
বহু দেবদেবীর ধারনা আছে। কিন্তু ইসলাম, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান ধর্মে এই দেবদেবী নেই।
বিভিন্ন ধর্মে বিভিন্ন সংস্কার আছে। যে গুলো সত্যি, সব ধর্ম তাকে মান্যতা দেবে।
আমি একটা বইতে পড়েছিলাম ষড়রিপুকে বলি দিতে হয়। কাকু, অন্য ছাগটার বলি দেন না ও
যেটার অর্ধ বলি হয়েছে, যারা চায় তারা এর মাংস খেয়ে নিক। আপনি ঘোষনা করে দেন এবার
থেকে বলি বন্ধ।“
সামন্ত বাবু কিছু একটা চিন্তা করলেন তারপর জনতার উদ্দেশ্যে বললেন “
ভোলার কথা সকলে শুনলে, তোমরা কি বল ?”
জনতার মধ্য থেকে যাদব জেঠু বলেন “মাও তাই চান, তা না হলেৃ এসব ঘটনা
হতো না।“
সকলে বলে উঠলো
“ ঠিক, ঠিক “। তবুও জনতার চোখ থেকে আতঙ্ক গেল না । শুধু ভোলার মন খুশিতে ভরে গেল। ভোলা ভাবছে যে সে একটা কুসংস্কার
বন্ধ করা গেছে। একনো কুসংস্কার ভুতের সঙ্গে অনেক লড়াই করতে হবে। অযথা মানুষের মনে নানান্
অন্ধ বিশ্বাস বাসা বেঁধে আছে। পূজা শেষ হতে সকলে ঘরে ফিরে গেল। রাতে আবার সামন্ত বাবুর
বাড়ীতে কালী পূজো। সেখানে সকলে যাবে। সারা রাত থেকে সকালে ভোগ খেয়ে বাড়ী ফিরবে। কিন্তু
মাস খানেক ধরে আলোচনা হতেই থাকলো “ মা বলি নিলেন না কেন ?”
সেই থেকে আর বলি হয় না।
৪র্থ পরিচ্ছেদ
কার্তিক মাস থেকে গ্রামে এক ছন্দ আসে। এই মাস ধর্ম মাস। বিভিন্ন
ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলে ঘরে ঘরে। কারো কারো ঘরে শ্রীমৎভাগবত পাঠও হয়। গ্রামের কারোর হাতে
বিশেষ কিছু কাজ থাকে না। অগ্রহায়ন মাসে নুতন ধান আসবে ঘরে। যে যেমন পারে নবান্ন অনুষ্ঠান
করবে। বিশেষত লোকে হরি সংকীর্তনের জন্য অপেক্ষা করে থাকে। কার্ত্তিক মাস বিশ্রামের
মাস। অগ্রহায়ন মাসে ধান কাটা ও ঘরে তোলার সময়। সকাল থেকে অধিক রাত পর্যন্ত ধান সংগ্রহের
কাজ চলে। জমিতে একটি ফসল ‘আমন ধান ‘ই হয়।
পৌষ মাস এলেই খেজুরের রস ও নলেন গুড়ের গন্ধে গ্রাম শুদ্ধ
ম ম করতো। ভোলাকে তার বাবা ধান তোলার কাজে সাহায্য করার জন্য বাড়ীতে থাকতে বলেছিলেন।
তাই সে অগ্রহায়ন মাসের মধ্যিখানে বাড়ী এসেছে। যদিও এ বছর তার মাধ্যমিক পরীক্ষা তবু
তার তেমন কোনো ভয় নেই, সে সারা বছর মন দিয়ে পড়াশুনা করে, পরীক্ষার সময় রাত জেগে পড়তে
হয় না। শিক্ষার একটা আয়দা আছে, যে এই কায়দা রপ্ত করতে পারে তাকে পরীক্ষার চিন্তার দরকার
হয় না। প্রথম থেকে যেকোনো বিষয় মনোযোগ দিয়ে পড়তে হয়। মন বড়ই চঞ্চল, মন চঞ্চল থাকলে
সাধনা হয় না। মনকে একাগ্র না করে পড়লে সেই বিষয় মস্তিষ্কে যায় না তাই মনে রাখা ও প্রয়োগ
করা কঠিন হয়। মহাভারতে কর্ণের যে অবস্থা হয়ে ছিল। গুরু পরশুরামের অভিশাপে কার্যকালে
অধিগত বিদ্যা প্রয়োগ করতে পারেন নি। মন দিয়ে পড়ার পর ওই বিষয়কে নির্দিষ্ট সময়কালের
মধ্যে ঝালিয়ে নিতে হয় ও মনে মনে স্মরণ করতে হয়। এই কাজ অভ্যাস হয়ে গেলে বিদ্যা আয়ত্ব
করা সহজ হয়ে যায়। সাগর মন্থন করে যেমন নানা রত্ন পাওয়া গেছিল, সেরূপ পুস্তক মন্থন না
করলে কিছুই পাওয়া যায় না। বিষয় নিয়ে যত চিন্তা করা হবে ততই বিষয়টা সহজ হবে। মেধা ও
স্মৃতি সকলের সমান নয়। ভোলার ক্লাসে স্যার একদিন এই বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। মানুষের মধ্যে মেধা ও স্মৃতিশক্তির ভিন্নতা স্বাভাবিক, যা বিভিন্ন কারণে
হয় যেমন - জিনগত বৈশিষ্ট্য, পরিবেশ, শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে। শিক্ষা, অভিজ্ঞতা
ও সঠিক অনুশীলনের মাধ্যমে মেধা ও স্মৃতিশক্তিকে উন্নত করা যেতে পারে।
স্মৃতি,ও মেধা বাড়ানোর কৌশল হলো একাগ্রতা, নিয়মিত
অনুশীলন ও গভীর চিন্তন। এরদ্বারা মস্তিষ্কে অতিরিক্ত কোষ তৈরী হয়।স্মৃতি আর মেধা নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। মেধা বা বুদ্ধিমত্তাকেও
সঠিক শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও প্রেরণার দ্বারা উন্নত করা যায়।
একদিন খুব ভোরে এসে কালু বলে “খেজুর রস খাবু ?”
খেজুর রসের কথা বলতে ভোলার ছোট বেলার কথা মনে পড়লো।
সে তখন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়তো। সে, কালু ও মাধু খুব ভোরে উঠে রস চুরি করে খেত। গ্রামের
বাইরে একটি পুকুর আছে। অন্যান্য গাছের সঙ্গে অনেকগুলো খেজুরগাছও আছে। গ্রামের এক শিউলি
সন্ধ্যায় গাছে কলসি বেঁধে দিয়ে আসতো। এরা পরের দিন ভোরে পুকুরের পাড়ে গিয়ে পুকুর থেকে
শাপলা ডাঁটা নিয়ে খেজুর গাছে উঠে ডাঁটার একদিক
কলসির মধ্যে ফেলে দিত ও অন্যদিক দিয়ে শুষে রস খেয়ে বাড়ী এসে ঘুমিয়ে যেত। একদিন ওরা
রস খেতে গেছে। সেদিন ঘন কুয়াশা, কাছের জিনিস ভালো ভাবে দেখা যাচ্ছে না। ওরা যথারীতি
গাছে উঠে রস খাচ্ছে। হঠাৎ জোরে একটা শব্দ হলো সঙ্গে সঙ্গে খনখনে গলায় বলে উঠলো “এঠি
এসব কিয়ে রে, মু যাউচি রক্ত চুষি খামি” যেই শোনা মাধু ভয়ে গাছ থেকে নীচে পড়লো। ভোলা
ও কালু নেমে দেখলো মাধুর শরীর রক্তাক্ত, খেজুর গাছের কাটা ডাল লেগে কয়েক জায়গায় গভীর
ক্ষত। ওরা কি করবে ভাবছে। এমন সময় দেখলো কুয়াশার মধ্য দিয়ে ভুতের মতো কে একজন ওদের
দিকে আসছে। ওদের ভয়ে গলা শুকিয়ে গেছে এবং ওরা কাঁপতে শুরু করছে। কাছে আসতে দেখা গেল
ওই শিউলি।
“ ও তুমে মেনে রস খাউ থাউ না ? মু তো ভয় দেখিয়েইতে
এইটা করি থিলি, ইয়ে গছরু খসি পড়িব কিয়ে জানে ?”
সে তখন তাড়াতাড়ি রক্ত বন্ধ করার জন্য মাঠে পাওয়া যায়
এক রকম ঔষধি ঘাস ছিড়ে হাতে দলে রসটা কাটা জায়গাগুলোতে লাগিয়ে দিল ও মাধুকে তুলে বাড়ী
পৌঁচে দিল। সেইদিন থেকে আর তারা রস চুরি করতে যায় নি। তাই রস খাওয়ার কথা বলতে সে যাবে
না বললো।
“ না রে, মো ঘরে রস অছি, খাবু তো লেই আসিবি”
“ঠিক অছি, লেই আয়”
কালু রস নিয়ে এল। ভোলা রস খেয়ে দেখলো রসের স্বাদ এখনোও
ঠিক মতো আসে নি। যত শীত পড়বে ততই এর স্বাদ ও গন্ধ উন্নত হবে। ধান তোলার কাজ আরম্ভ হয়ে
গেছে। বাবার সঙ্গে ভোলাও মাঠে যায়। প্রথম পাকা ধানগাছ কাস্তে দিয়ে কেটে আঁটি তৈরী করে
ফেলে রাখা হয়। আঁটি শুকালে সন্ধ্যার পর বাঁধা হয় এবং বাঁকে বা মাথায় করে এনে গাদা করে
রাখা হয়। সেদিন সন্ধ্যার পর আঁটি বাঁধা হচ্ছে।
বেশ কিছু চাষী মাঠে আছেন। আকাশে চাঁদ না থাকায়
মাঠ অন্ধকার। তবু অন্ধকারে থাকলে চোখ খাপ খাওয়ে নেয় এবং অন্ধকারে কিছুটা দেখা যায়।
শীতকালে সাপ শীতঘুমে থাকে বলে চাষীরা মাঠে নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারে।
ভোলা সেদিন মাঠে বাবার সঙ্গে ছিল। এক প্রহরের শিয়ালের
ডাক কিছু আগে হয়ে গেছে। ভোলা দেখলো মাঠের দুরে দুরে এক আলো দেখা যাচ্ছে, আলো জ্বলচ্ছে আবার নিভে যাচ্ছে । আবার অন্য জায়গায়
দেখা যাচ্ছে। আগে ভোলা এই আলো দেখেছে। লোকে বলে এই আলো ভুতের ভালো। এখন ভোলা জানে এই
আলোকে “আলেয়া” বলে। মাঠে যেখানে জলা জায়গা থাকে, সেখানে মার্শ নামে এক রকম গ্যাস নির্গত হয় এবং বাতাসের সংস্পর্শে
জ্বলে ওঠে। আলেয়া কোনো ভৌতিক
ব্যাপার
নয়।
তবুও
গ্রাম
বাংলার
অধিকাংশ
মানুষ
বিশ্বাস
করে
এটি
অশরীরীদের
কাজ।
রাতের মাঠে দুই ধরনের শিয়াল দেখা যেত, শিয়াল ও খেঁকশিয়াল। খেঁকশিয়াল আকারে ছোটো কিন্তু লেজ বেশ মোটা ও লোমোশ।
রাতের আঁধারে ঘুরে বেড়ানো শিয়ালেরা কাঁকড়া শিকার করে এক অদ্ভুত কৌশলে। জলার ধারে থাকা কাঁকড়ার গর্ত খুঁজে বের করে এর ভেতরে লেজ ঢুকিয়ে বসে থাকে। কাঁকড়া লোমশ লেজটাকে শত্রু মনে করে ছিপকাঠির মতো শক্ত হাত দিয়ে চেপে ধরে। আর ঠিক তখনই শিয়াল তার লেজটাকে দ্রুত কাঁকড়াসহ গর্ত থেকে বাইরে বের করে নিয়ে আসে। তারপর লেজ ঝাঁকিয়ে ওটাকে মাটিতে ফেলে মজা করে খায়। খেঁকশিয়ালের সবচেয়ে চোখে পড়ার মত অঙ্গটি হল এর বড় ঝাঁকড়া লেজ। লেজ ধূসর ও লেজের উপরিভাগ লালচে। লেজের আগা কালো। এরা সর্বভুক
প্রাণী। মাঠে ধেড়ে ইঁদুর যারা ধান খায় শিয়ালের প্রিয় খাদ্য।
ধানের কাজ প্রায় শেষ। মা ভোলাকে আর চার পাঁচ দিন
থেকে যেতে বললেন। পৌষে নলেন গুড় দিয়ে নানান ধরনের পিঠে হয়। যেমন দুধপুলি, নকশী পিঠা, ঝিনুক পিঠা, ক্ষীরকুলি, পাটিসাপটা,
ছাঁচপিটা, নারকেল ও নলেন গুড়ের পুর দিয়ে ভাপানো পিঠা ইত্যাদি । পিঠের মরসুম দুটি,
একটি শ্রাবন-ভাদ্র মাসে তালের পিঠে। ভোলার মা তালের মন্ড ও চালের গুড়ো মিসিয়ে সাদা
ধোসার মতো এক পিঠে তৈরী করেন। এ পিঠে কিন্তু ধোসার মতো শক্ত নয়, তুলে তুলে নরম। এ
পিঠে যে খাবে জীবনে ভুলবে না। সেদিন বিকালা পিঠে হচ্ছে। ভোলা কালুকে পিঠে খাওয়ার
জন্য ডেকেছে। কালু বিকালা এসেছে। মায়ের পিঠে তৈরী। নলেন গুড়ের গন্ধ বাড়ী মধ্যে
ঘুরছে। ভোলা ও কালু পিঠে খাচ্ছে।
“ঘরে
ঘরে পিঠাপুলির তৈরীতে করে গমগম
হৈমন্তিক
ধানগুঁড়ো ও খেঁজুরগুড়ের সঙ্গম I
নিয়ে
আসে স্বর্গের অমৃতের নান্দনিক স্বাদ
আবালবৃদ্ধবনিতা
মেতে ওঠে কেউ নয় বাদ I
নানা
রকমের পিঠাপুলির মাসভর সমারোহ
শীতকাল
জুড়ে চলে ঐতিহ্য উৎসব অহরহ I
পাটিসাপটা,,ভাপাপিঠার
নাই কোনো তুলনা
নলেনগুড়
পায়েস ক্ষীরমুরলী বছরভর ভুলি না I
কলাপিঠা
চন্দ্রপুলি দুধপুলি জিভে আনে জল
নকশি পিঠা পোড়াপিঠা বাঙলার
রসলো ফসল”II
খেতে খেতে কালু
বললো “ হারুকাকার ঝিয়কু ভুত লাগচি। তার বয়স তেরো চৌদ্দ হব। সকালে তার খিঁচুনি শুরু
হয়, হাত গুড় পথর হেই যাই থিলা, মুহ দিই ফেন বাহারুথিলা, আউ দাঁত লাগ যাই থিলা। গটে
গুণি আসি থিাল, কিছি করি পারিলা নাহি।
বিকালা আউ গটে গুণি আসিব”।
ভোলা বললো “ হউ খাই সারি যিবা। ভুত বলি কিছি
নাহি, সবু কুসংস্কার, কিছি রুগ হেই থিব”।
খাওয়া শেষ করে দুজনে হারু কাকুর বাড়ীতে গিয়ে
দেখলো মেয়েটা দাওয়ায় শুয়ে আছে এবং এর পাশে এক গুণিণ বসে। কিছু প্রতিবেশী মহিলা জড়ো
হয়েছে। ভোলা গুণিণের পাশে বসে জিজ্ঞাসা করলো কি হয়েছে।
গুণিণ বললো “ বাবা, এ ভুত সাধারন নয়, এ বড় কঠিন
ভুত”।
“আচ্ছা, আপনি তো ভুত বিশারদ, কত রকম ভুত আছে
বলবেন?”
তিনি বলে চললেন “ তোমার ভয় করবে নাতো? এই সব
অঞ্চলে যে সব ভুত দেখতে পাওয়া যায়, সেগুলো হলো- শাঁকচুন্নি, চোরাচুন্নি, পেঁচাপেঁচি,
মেছোভূত,
দেও,
নিশি,
পেত্নী,
কানাভুলো
ভূত,
মামদো
ভূত,
ব্রহ্মদৈত্য
ইত্যাদি। মৃত্যুর সময় অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে বা দুর্ঘটনা, রোগে মারা গেলে ভুত হয়ে পৃথিবীতে
ঘুরে বেড়ায়। খুব সাঙ্ঘাতিক ভূত পেঁচাপেঁচি।
মানুষের মাংস ওদের খুব প্রিয়। এই মেয়েটিকে এই পেঁচাপেঁচিই ধরেছে। তবে ভয়ের কিছু নেই,
আমি এই রকম কত ভুতকে সোজা করেছি । দেখছ না আমাকে দেখে চুপচাপ পড়ে আছে”।
ভোলার কোথায় পড়া একটি কবিতা মনে পড়লো-
ভুত পেত্নি দৈত্যদানা শাঁকচুন্নির অনেক ছানা
গেছোভুত গাছে থাকে মেছোভুত মাছ খায় রাতে
নিশি ভুত যদি ডাকে নাম ধরে
যাকে ডাকে সে যায় পরপারে
ব্রহ্মদৈতি পৈতে
পরে চোরাচুন্নি রাতে চুরি করে
জলে থাকতো দেও
ভুত দেখতে সে বড়ই কিম্ভূত
জলের মধ্যে যদি
পায় মানুষকে সে ডুবিয়ে খায়
মামদো ভুতের লম্বা
হাত ওদের থাকে বড় বড় দাঁত
স্কন্ধকাটার নেইকো
মাথা তবু ওরা বলতে পারে কথা
কেনোভুত মাঠে বেড়ায় মানুষকে সে পথ ভুলায়”I ”
“
ভোলা উঠে কাকীমার কাছে গেল। ঘটনা ও লক্ষণ শুনে তার মনে পড়লো জীববিজ্ঞানের স্যার
ক্লাসে একবার মৃগী রোগের কথা আলোচনা করেছিলেন। এই রোগের প্রথম দিকে গ্রামাঞ্চলে ভুতে
ধরেছে মনে করা হয়। প্রথমে খিচুনি দিয়ে শুরু হয়।
খিঁচুনি হলে হঠাৎ
করে
চেতনা
হ্রাস,
অস্বাভাবিক
ঝাঁকুনি দাঁতে দাঁত লেগে যাত্তয়া বা
অন্য
কোনো
অস্বাভাবিক
আচরণ দেখা
দিতে
পারে। বারবার খিঁচুনির ঘটনাকে মৃগীরোগ বলা হয়, যা একটি স্নায়বিক রোগ। এই লক্ষন দেখা দিলে সর্বপ্রথম
রোগীর চারদিকে ভিড় না করা, রোগীকে চেপে না ধরা, মুখ খুলতে জোর না করা ও রোগীকে
ফাঁকা জায়গায় রাখাই বিধেয়। ভোলা কাকীমাকে বললো যে মেয়ের একটি রোগ হয়েছে। গুণিণ
কিছু করতে পারবে না। শহরে গিয়ে ডাক্তার দেখাতে হবে।ভালো হয়ে যাবে, কিছু চিন্তা
করবেন না ।
এরপর ভোলা স্কুল বোড়িং এ ফিরে যায়। তাকে আবার
চৈত্র মাসের শেষ দিন একদিন হলেও আসতে হবে। চৈত্র মাসের শেষদিন গ্রামের সবচেয়ে বড়
উৎসব “চড়ক” হয়। ভোলা চড়কের আগের দিন বাড়ী এসেছে। ঐ দিন বিকাল থেকে শিব মন্দির
প্রাঙ্গনে ছোটো একটি মেলা বসে। মেলায় সস্তার জামা কাপড়, হাতে তৈরী লোহার জিনিস,
নানা রকমের তেলেভাজা, ভিজানো ছোলাভাজা ও বিড়ি বিক্রি হয় । গ্রামে চায়ের চল ছিল না। সাতদিন আগে থেকে আঠ দশ জন
গ্রামবাসী ভক্ত হতেন। তাদের সহজে চিহ্নিত করা সহজ ছিল। ওঁদের কাঁধে সাদা একগাছা
সুতো ঝুলতো আর যিনি প্রধান ভক্ত তাঁর গলায় অর্ধেক সাদা সুতো ও অর্ধেক লাল সুতো
ঝুলতো। ওঁকে পাঠভক্ত বলা হতো ও ওঁর কথা সব ভক্তদের মান্য করতে হতো। সব ভক্তের হাতে
একটি বেতের লাঠি থাকে। ভক্তরা এই কয় দিন নিরামিশ ও দিনে একবার আহার করেন। ঐ দিন
দুপুরে বাঁশের পালকির মতো একটি কাঠামো তৈরী হয়। তাতে রঙিন কাগজ ও নানা রঙের ফুল
দিয়ে সাজানো হয়। বিকালা শিবঠাকুরের তিনকোনা পতাকা নিয়ে ছেলে ও যুবকরা গ্রামের
চারধার ফেরি করার পর পুকুর পাড়ে জড়ো হয়। আস্তে আস্তে গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা
পুকুরের ধারে জড়ো হতে থাকে। ভক্তদের মধ্য থেকে চার পাঁচজন ও গ্রামের তিন চার জন
যুবক লোহার তৈরী হাতার মতো যার ধরার দিকে
ছুঁচের মতো ছুঁচালো, কোমরের দুধারে চামড়াতে গেঁথে দেওয়া হয় ও এক ফুটের মতো দুটি
ত্রিশূল তার নীচের ছুঁচালো দিকটা জিভে গেঁথে দেওয়া হয়। ত্রিশূলের তিনটি ফলাতে ফুল
গেঁথে কপালে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়। দুপাশের দুটি হাতাকে জড়ো করে তার মধ্যে
শুকনো আম ও চন্দন কাঠ দিয়ে আগুন ধরানো হয়। ঐ দুটি বাঁ হাতে ধরে ডান হাতে ধুনো
ছিটাতে ছিটতে ও নাচ করতে করতে মন্দিরে যাওয়া হয় । সন্ধ্যার পর পর কিছু বাজি পুড়ানো
হতো। পুকুর থেকে শিব মন্দির পর্যন্ত প্রায় অর্ধ ক্রোশ রাস্তা শোভাযাত্রা করে যাওয়া
হয়। কাঁটা মারার হয়ে গেলে শোভাযাত্রা আরম্ভ হতো।
প্রথমে সাজানো পালকীর চারদিক জলন্ত প্রদীপ দেওয়া
হয়। এর দুদিকে দুটি বাঁশ বেঁধে চারজন শক্ত সমর্থ যুবক কাঁধে নিয়ে শোভাযাত্রার
প্রথমে নাচতে নাচতে ধীরে এগোতো। তারপর পৈতাধারী ভক্তরা থাকতেন। তাদের পিছনে বান
শলাকাধারীরা আগুনে ধুনো ছিটাতে ছিটাতে নেচে নেচে এগোতো। নাচের ধকলে জিভের
ত্রিশূলের ছুচালো দিকটা জিভের নীচে বেরিয়ে আসতো ও জিব থেকে ক্রমাগত লালা বেরিয়ে
নীচে গড়িয়ে পড়তো। ওদের পিছনে ঢোল. খোল ও কাঁশর বাজনাদার গান করতে করতে যেত। সবার
পিছনে সমবেত জনতা শিবের উদ্দেশে জয়ধ্বনী করতে করতে চলতো।
কিশোর কিশোরদের মেলামেশা বা গল্প করা সমাজে ভালো
চোখে দেখা হতো না কিন্তু ঐ দিনের জন্যে কোনো বাধা থাকতো না। এত ভীড়ের মধ্যে ওরা
গল্প গুজব, হাসি তামাসা করে মনের সাধ পুরন করত। প্রায় ঘন্টা দেড়েক পর শিবমন্দির
প্রাঙ্গনে পৌঁচে মন্দিরকে তিনবার প্রদক্ষিন করা হতো। এবারে শলাকা খোলার পর ওরা
মন্দিরের সামনে ধুলোতে গড়াগড়ি দেয় ও ওদের ঘনঘন মঞ্চামৃত খায়ানো হয়। আশ্চর্যের
ব্যাপার ওরা যখন স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন
তাদের কোমরের দুধারে ও জিভে কাঁটা ফোটার কোনো চিহ্ন থাকে না। ওদের কাউকে কষ্ট হয়েছে
কিনা জিজ্ঞাসা করলে, সে বলতো তার কি হয়েছে যে কষ্ট হবে। গ্রামের সকলে বলে শলাকা
গাঁথার পর তাদের উপর শিবঠাকুরের ভর হয় তাই তারা কিছু বুঝতে পারে না। ভোলা একথা এখন
বিশ্বাস করে না। তার মনে হয় যারা শলাকা মারে তারা সারাদিন উপোস থাকে এবং বিকালা
সিদ্ধিটিদ্ধি খায় তাই অপকৃতিস্থ থাকে।
এরপর চড়কগাছে দোলা আরম্ভ হয়। ঐ দিন সকালা একটি
বেশ লম্বা গাছের গুড়ি শক্ত করে মাটিতে পোতা হয়, তার উপরে একটি গরুগাড়ির চাকার মতো
একটি চাকা লাগানো থাকে ও একটি লম্বা দড়ি চাকা থেকে মাটি পর্যন্ত ঝোলানো থাকে।
চাকাতে পাঁচ ছয়টা ছোটো ছোটো শক্ত দড়ি বেঁধে ও দড়ির নীচে ছোটো ছোটো বাঁশ বাঁধা
থাকে। এই গাছকে চড়ক গাছ বলে। ঐ বাঁশে বসলে নীচে একজন দড়ি ধরে ঘোরে । তার ফলে উপরের
লোকগুলো বনবন করে ঘোরে।
এ বছর যথারীতি শোভাযাত্রা এসে মন্দির প্রাঙ্গনে
আসার পর শলাকা খোলা হলো। সকলে কিছুক্ষণের মধ্যে প্রকৃতিস্থ হয়ে গেল। মাত্র একজন
গড়াগড়ি খাচ্ছে আর আবোল তাবোল বকচ্ছে। ভক্তরা পঞ্চামৃত খাওয়াচ্ছে ও গায়ে ডালচ্ছে।
লোকজন তার চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে শিবঠাকুরের জয়ধ্বনী দিচ্ছে। ভোলা ভাবচ্ছে এ কি
তামাসা করচ্ছে নাকি। যাইহোক বেশ খানিকটা পরে সে স্বাভাবিক হয়ে গেল। লোকজন চড়ক
গাছের চারদিকে জড়ো হলো। এ বারে কালুও গাছে ঘুরবে। সে এক নুতন গামছা পরেছে, অপর
একটি মাথায় বেঁধেছে। গোটা কপাল চন্দনে ভর্তি। কালুর সঙ্গে সঙ্গে আরও পাঁচজন
চড়কগাছে উঠলো। নীচে আলোআঁধরি পরিবেশ। ভোলা মুখ তুলে দেখছে। হঠাৎ পাশ থেকে সুরালো মিষ্টি
সুরে বললো “ ভোলাদা কবে এলে ?”
ভোলা পাশে ফিরে দেখলো এক শাড়ী
পরা মেয়ে পাশে দাঁড়িয়ে। বয়স তেরো বা চৌদ্দ হবে। মাঝারি গড়ন। টুকটুকে ফর্সা মাথার চুল
অসাধারণ ঘন ও লম্বা। রাধার সৌন্দর্য আর এই মেয়ের সৌন্দর্য আলাদা । রাধা ছিপছিপে শান্ত,
শিষ্ট সাধিকা ও দুঃখ কষ্ট সহিষ্ণু আর এই মেয়েটার
সামান্য মেদবহুল, রুপের চটক আছে, বনের হরিণীর মতো চঞ্চল, চোখের দ্বারা অনেক কথা বলতে
পারে।
“তুই সহদেব কাকার মেয়ে মাধবী
না, অনেক দিন আগে দেখেছিলাম, বেশ বড় হয়ে গেছিস্।
“তাহলে মনে আছে দেখছি, গ্রামের
তুমি তো হিরো, সকলের মুখে তোমার নাম। অনেকদিন তোমার সঙ্গে দেখা করবো ভাবচ্ছি কিন্তু
সুযোগ আর পাই না। ছোটবেলায় তোমার সাথে কত না খেলা করেছি। পুকুরের পাড়ে কত দিন দোল খেয়েছি।
যাক্ সে কথা, তোমার পড়াশুনা কেমন চলছে ?”
“ চেষ্টা তো করছি, দেখি কি
হয়।“
“ কি নিয়ে পড়বে, ঠিক করেছ
?”
“ তেমন কিছু ভাবিনি, ইচ্ছা
আছে ডাক্তারী পড়ার “
“ তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে
“।
ভোলা বুঝতে পারলো মাধুরী কি
বলতে চাইছে, এখন কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে গেলে, গ্রামে তো বদনাম হবেই, তার ভবিষ্যৎ ও নষ্ট
। আবেগ এক বিষম বস্তু। প্রশয় দিলে বাড়তে থাকে। মারতে চাইলে মরে যায়। ভোলা তাই ওখান
ধেকে সরে যাওয়ার বাহানা করে, বলে “ মার সঙ্গে একটু দরকার আছে, দেখি কোথায় আছে “ বলেই
সে সেখান চলে যায়।
মন্দির প্রাঙ্গনের পাশে যাত্রার
জন্য সাজঘর তৈরী হয়েছে। ভোলা শুনেছে যাত্রাপালার নাম “ মহাদেবের বিয়ে “। ভোলা সাজঘরে
উঁকি দেয়। দেখতে চায় কে কি সাজছে। বহু বাচ্চা সাজঘরের চারদিকে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছে।
একজন লাটি হাতে বাচ্চাদের তাড়া করছে কিন্তু ভোলাকে কিছু বললো না বরং একটু জায়গা করে
দিল সাজঘরের দৃশ্য দেখার জন্য। ভোলা দেখলো মাধব কাকা মহাদেব হয়েছে । বেশ মানিয়ে তাকে,
এমনি মহাদেবের মতো চেহারা তার। বেশ একটা ভুঁড়ি, তাকে ছাইর মতো কিছু গোটা শরীরে মাখানো
হয়েছে। মাথায় একটি জটা পরানো হয়েছে, কোমরে বাঘছালের মতো একটি কাপড় পরানো হয়েছে। হাতে
একটি বাঁশ দিয়ে তৈরী ত্রিশূল, কাঁধে কাগজের তৈরী দুটো সাপ জড়ানো। কিন্তু দূর্গা কে
দেখতে পাচ্ছে না। বাইরের লোককে জিজ্ঞাসা করায় সে বললো “দীনু”। নাম শুনে ভোলার খুব হাসতে
ইচ্ছা করছে কিন্তু মুখে হাতে দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলো দীনুকাকা একটি মেয়ে সেজেছে। কোনো
মেয়েকে যাত্রায় অভিনয় করতে দেওয়া হতো না।পুরুষরাই মেয়ের অভিনয় করে, তা বলে দীনু কাকা;
ওর বয়স তো পঞ্চাশের বেশী, ছুতার মিস্ত্রি, ছোটো খাটো মানুষ, কোমলতার চিহ্নই নাই, ও
আবার দূর্গা । তবে দীনুকাকার কিন্তু মেয়েলি গলা তাই হয়তো এই চরিত্র দেওয়া হয়েছে। মেয়েলি
গলার উপযুক্ত পুরুষ পাওয়াও মুশকিল।
ভোলা মন্দিন প্র্রাঙ্গনে এসে
দেখলো ভীড় কমে গেছে লোকরা বাড়ী গেছে রাতের খাবার খেয়ে যাত্রা দেখতে আসবে। ভোলা দেখে
মন্দির প্রাঙ্গনের মাঝখানে চারটি বাঁশ পুঁতে শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে ও তার চারদিকে খড়
পাতানো হয়েছে। ভোলার পড়াশুনা আছে, তাকে কাল সকালা বোড়িং এ যেতে হবে তাই রাত জাগবে না
সিন্ধান্ত নিল এবং কিছুটা দেখে বাড়ী চলে যাবে।
৫ম পরিচ্ছেদ
ভোলার মাধ্যমিক পরীক্ষা হয়ে যাওযার পর বাড়ীতে আছে। পরীক্ষার
ফল তিন মাসের মধ্যে প্রকাশ হবে। ভোলার আশা ফল ভালোই হবে তারপর তাকে প্রি-ইউ কোর্সে
ভর্তি হতে হবে। প্রি-ইউতে বিজ্ঞান, কলা ও কমার্স যেকোনো একটি শাখা বেছে নিতে হয়। ভোলা
ঠিক করেছে বিজ্ঞান নিয়ে পড়বে। কিন্তু মুসকিল হলো কাছাকাছি এরকম কলেজ নেই। প্রায় পঞ্চাশ
মাইল দুরে কাঁথি শহরে যেতে হবে। সেখানে ভর্তি খরচ, বই কেনার খরচ ও থাকার খরচ জোগাড়
করতে পারবে কি করে সেই চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
কয়েকদিন পর সে মাকে সব খুলে বললো। মা বললেন-
“ বাবু, তু চিন্তা কর না, মা মঙ্গলার কৃপারে সবু ঠিক হেই
যিব। মু ভাবুচি মোর গটে সোনার বলা অছি। গটে যে বরস ঘর হেলা সেই বরস বিক্রি হই যাইচি।
আউ গটে অছি সেটা বিক্রি হেনে তোর কাম হেই যিব। মুটে চিন্তা করতে হব নি “।
ভোলার মন খারাপ হয়ে গেল। তার পড়ার জন্য মায়ের গহনা বিক্রি
করতে মন সায় দিচ্ছে না।
তখন সময়টা ছিল ফাল্গুনমাস। ঐ মাসে দোল পূর্ণিমার হোলি খেলা
হয়। গ্রামে হৈ হৈ করে রঙ নিয়ে হোলি খেলা হয় না। কোনো মহিলাও দোল খেলায় অংশ গ্রহন করেন
না। বলতে গেলে সেভাবে হোলি খেলা হয় না। মাত্র কয়েকজন খোল নিয়ে সারা গ্রাম কীর্তন করতে
করতে ঘুরে বেড়ান। তাদের কাছে থাকতো লাল রঙের গুড়ো। এগুলো আবির না সিঁদুর ঠিক বোঝা যেত
না। ওরা সামনে যাকে পেত বড় হলে পায়ে দিয়ে প্রনাম করে, ছোট হলে কপালে রঙ পরিয়ে দেয়।
দুপুরের আগে ওরা কীর্তন বন্ধ করে বাড়ী চলে যেত। কিন্তু দোল পূর্ণিমার দিন বাচ্চা বাচ্চা
ছেলেরা সন্ধ্যার পর ‘বুড়ি ঘর’ পোড়ায়। তারা বকুল ডাল কেটে মাঠের একজায়গায় কুঁড়ে ঘরের
মতো বানায়। তার উপর কুচো খড় বিছিয়ে দেয়। সন্ধ্যের পর পর এই ঘরটায় আগুন ধরিয়ে দেয়। তার
ভিতর আলু ও রাঙালু দিয়ে দেয়। আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতো,আর বাচ্চারা আগুনের চারদিকে চিৎকার
করতে করতে ঘুরতো। আগুন নিভে গেলে সেদ্ধ আলু রাঙালু খেয়ে বাড়ী চলে যেত।
· এ বছর দোল পূর্ণিমার
দিন ভোলা সকালে উঠে দাওয়ায় বসেছে। সুন্দর দক্ষিনা বাতাস বইছে। সুন্দর এক ফুলের গন্ধ
নাকে আসছে। ভোলা ভাবছে এটা কি ফুলের গন্ধ? তার বাড়ীর চারপাশে প্রচুর গাছপালা। এর মধ্যে
ফুলের গাছও আছে। বসন্তে প্রকৃতির রূপ রঙ আলাদা হয়ে যায়। সামনে একটি পলাশ গাছ, গোটা গাছ লাল ফুলে ভরে গেছে। তার
উপর উদীয়মান সূর্যের সোনালী আলো এসে পড়ছে, যেন গোটা গাছটা জ্বলছে । গাছের ডালে ডালে উঁকি দিচ্ছে নতুন পাতা, নতুন
কুঁড়ি। বসন্তের আগমনে নবপত্রপল্লবে শোভিত হয়ে উঠছে বনরাজি, ফুলের বাগান। সোনারঙের কনকচাঁপার থোকা ধরা ফুল দুটি গাছে ফুটে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে। ‘স্বর্গভোলা পারিজাতের গন্ধ এসে খ্যাপা হাওয়ায় বুকের ভিতর ভেসে ভেসে ফিরছে।’সুমধুর সুগন্ধ ভেসে আসছে বসন্তের আরেক দুর্লভ ফুল মাধবীলতা ও কাঠগোলাপ থেকে। গ্রামে এই সব নানা ধরনের ফুলের গাছ সর্বত্র দেখা যায়।
· কাছাকাছি দুতিনটা কোকিল
ডাকছে। কত ধরনের পাখির ডাক যে ভেসে আসছে তা আন্দাজ করা কঠিন। শালিকের দল, টিয়ে, ময়না,
ফিঙে, মাছরাঙা, সরালি, রবিন, দোয়েল, বুলবুলি, ঘুঘু, বসন্ত বৌরি, আরও কত কি। সকলের ডাকের
মধ্যে কোকিলের ডাক আলাদা করা যায়। তাই কোকিলকে বসন্তের দুত বলা হয় ।কোকিল মূলত বসন্তে
ডাকে কারণ এটি তাদের প্রজনন মৌসুম। পুরুষ কোকিল তার মধুর সুরের ডাক দিয়ে স্ত্রী কোকিলকে
আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে । ভোলার ৭ম শ্রণীতে পড়া যতীন্দ্রমোহন
বাগচীর
লেখা “জন্মভূমি{“কবিতাটি মনে পড়ে:
“যত
দেশের
যত
পাখী
ঐ
গাঁয়ে
কি
আছে!
ঝোপে-ঝাড়ে
বেড়ায়
উড়ে
বাসার
কাছে
কাছে;”
গ্রামে বসবাস করার অ্নেক সুবিধা আছে- বিশু্দ্ধ বাতাস শরীরে ঢুকলে প্রাণশক্তি
সঞ্চার করে তাই লোকেরা রাতদিন খাটতে পারে। এছাড়া অফুরন্ত মাছ, গাছের টাটকা ফল ও সবজি,
পাথির ডাকে ঘুমিয়ে পড়ে পাখির ডাকে জাগে। গ্রামের সকলে সহজ সরল, ধর্মভীরু, অতিথি পরায়ন,
সহমর্মী কিন্তু হাতে নগদ টাকার অভাব, শিক্ষার অভাব ও কুসংস্কারের ভুত গ্রাম্য জীবনকে
অভিশপ্ত করে তোলে। ভোলা ভাবতে ভাবতে কালু এসে হাজির।
“ ভোলা তোর মনে অছি বুড়ি ঘর
পুড়িইবা কথা। আজি সেই দিন, মাঘী পূর্ণিমা। আজ তু আম সাথরে যিবু। বহুত মজা হব।“
এই সময় মা ঘরের ভিতর থেকে
বললেন “ কালু ও তু আয়, খাইবু”
তারা দুজনে গিয়ে খেতে বসলো।
গ্রামে মুড়ি দিয়ে প্রাতরাশ হয়। প্রত্যেক বাড়ীতেই মুড়ি ভাজা হতো। মুড়ি ও ভাত ছিল গ্রামের
প্রধান খাদ্য। মা তাদের জামবাটি ভর্তি মুড়ি, ঘরে পাতা দই ও খেজুর গুড় দিয়েছেন।
খাওয়ার পর কালু বললো “ বকুল
ডাল কাটতে যাউছি, তু যিবু ?”
ভোলা বললো “ চল”
তারা গ্রামের বাহিরে গিয়ে
মাঠের রাস্তা ধরলো। ভোলা দেখলো দুরে রাস্তার ধারে মাঠে শত শত শকুন জড়ো হয়েছে। কালুকে
জিজ্ঞাসা করায় সে বলে গ্রামে নির্দিষ্ট শ্মাশান
আছে কিন্তু নির্দিষ্ট ভাগাড় নেই। গরুটরু মরলে লোকে মাঠে ফেলে দেয় আর যেখানে ফেলা হয়
সেই মাঠে ফসল ভালো হয়। ওখানে কেউ মরা গরু ফেলে গেছে। শকুনরা খুব উচুঁতে ওড়ে এবং উপর
থেকে দেখতে পায় তাদের খাদ্য কোথায় আছে। কথা বলতে বলতে তারা ভাগাড়ের কাছাকাছি এসে গেছে।
আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ভোলা দেখলো শকুন ছাড়া শিয়াল ও কুকুরও আছে। ওরা ভয়ানকভাবে লড়াই করছে
আর চেঁচাচ্ছে। ভোলা এতদিন সামনা সামনি কোনোদিন শকুন দেখে নি। দীর্ঘ চঞ্চুযুক্ত ও বিশাল আকারের পাখি। মাথা ও গলা পালকহীন । ভয়ঙ্কর,দেখলে ভয়
করে। ভোলা কালুকে বললো “মতে ভর লাগুছি”
কালু বললো “চল অন্য রাস্তায়
যিবা ”
তারা ও অনেক কচি কাঁচারা বকুল
ডাল কেটে এনে মাঠে জড়ো করলো ও সন্ধ্যার পর সকলে বুড়ির ঘর পুড়িয়ে বাড়ী ফিরে এলো।
সেদিন রাতে ঘুমিয়ে ভোলা ভাবছে
যদি পরীক্ষার ফল একটু ভালো হয় তবে পড়া চালিয়ে নিয়ে যেতে অসুবিধা হবে না। এই সময় সেই
ক্যাচর ক্যাচর শব্দটা শুনতে পেল। মনোযোগ দিয়ে বুঝতে পারলো এটা একটি নিশাচর পাখির ডাক।
এই সাধারন একটি নিশাচর পাখির ডাক থেকে এক সর্বনেশে কুসংস্কারের ভুত সৃষ্টি হয়েছে।
দেখতে দেখতে ফল প্রকাশের দিন
এসে গেল । আর পাঁচদিন পর ফল প্রকাশ হবে।
ভোলার যে একটা চাপা উত্তেজনা
নেই তা নয়। বুকটা ঢিপ ঢপি করছে, যদি ফল খারাপ হয় তবে জীবনটা মাটি। বাবা মায়ের এই বিষয়ে
কোনো দুর্ভাবনা নেই। তাদের চিন্তা বেশী পড়াশুনা করলে ভবিষ্যতে মাঠে কাজকর্ম করতে পারবে
কিনা। ফসল না ফলালে খাবে কি? তাদের এইটুকু জানা নেই যে কতলোক ফসল না ফলিয়ে আরামে দিন
নির্বাহ করা যায়।
ফল প্রকাশের দিন ভোলা স্নান
করে খাওয়া দাওয়া পর তৈরী হচ্ছে স্কুল যাবে বলে, এমন সময় দেখলো তাদের স্কুলের পিওন বাড়িত
এসে উপস্থিত।
“ আমাকে হেডস্যার পাঠিছেন
তোমাকে নিয়ে যেতে। তোমার পরীক্ষার ফল খুব ভালো হয়েছ। মেদিনীপুর জেলায় প্রথম হয়েছ। তুমি
রাতে স্কুল বোড়িং এ থাকবে কাল সকালে তোমাকে সভা করে প্রাইজ দেওয়া হবে “ কথাগুলো এক
নিঃশ্বাসে বলে গেল। ভোলা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো
তাহলে মনে হয় মায়ের গহনায় হাত দিতে হবে না। মা বললেন “ যিয়ে স্কুলরু আসিচন, তাঁকু লেই
আয়, কেতে দুররু আসিচন, কিছি খাই কি যিবে”। ভোলা জোর করে তাঁকে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল।
মা তাঁকে জামবাটিতে মুড়ি, দই, খেজুর গুড় ও নারকেল কোরানো দেয়েছেন। লোকটি মাকে বললেন
“ আপনার ছেলে রত্ন , আপনি তো মা রত্নগর্ভা। এর জন্য স্কুলের প্রত্যেক শিক্ষক গর্বিত।“
মা কিছু বুঝলেন কিনা জানা গেল না, তিনি চুপ করে থাকলেন । ভোলা ও পিওন স্কুলের দিকে
রওনা দিল। স্কুলে পৌঁচে ভোলা দেখলো সব শিক্ষক জড়ো হয়েছেন ও যারা মাধ্যমিক দিয়েছিল,
তারাও ও উপস্থিত। ভোলাকে দেখে সকলে তাকে ঘিরে
ধরলো। হেড মাস্টার মশাই বললেন “ ভোলা আমাদের
বিদ্যালয়ের গর্ব। স্কুলের ইতিহাসে এমন ফল আর কেউ করে নি। ও আমাদের বিদ্যালয়ের মুখ উজ্বল
করেছে “। ভোলাকে বললেন “ তুমি আজ স্কুল বোড়িং এ থেকে যাও । কালকে সভায় প্রাইজ নিয়ে
বাড়ী যেও।
পরের
দিন সকালা সভা শুরু হলো। জেলার কিছু সরকারী আধিকারিক উপস্থিত হয়েছেন। প্রথমে প্রধান
শিক্ষক বিদ্যালয় ও এ বছরের ফল সম্বন্ধে বিস্তারিত বললেন। তারপর মহকুমা কর্মকর্তা ভোলার
প্রশংসা করলেন এবং আরও বললেন ভোলা উচ্চ শিক্ষার যাতে অসুবিধা না হয় সরকার সেটা দেখবে।
প্রধান শিক্ষক ভাোলাকে বললেন “ তুমি এবারে সকলকে বল কিভাবে পড়াশুনা করলে ভালো ফল করা
যায় “।
ভোল
মঞ্চে উঠে কিছুটা ঘাবড়ে গেল কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে বলতে শুরু করলো। “ উপস্থিত গুরুজনদের
আমার সশ্রদ্ধ প্রনাম। আমার এই ফলের জন্য আমার বিদ্যলয়ের সমস্ত শিক্ষকের অবদান প্রচুর।
ওঁনাদের ঐকান্তিক সাহায্য ছাড়া এরকম ফল সম্ভব হতো না। ওঁদের আমার কৃতজ্ঞতা জানাই। কি
ভাবে ভালো ফল করা যায় তা আমি জানি না তবে আমি যে ভাবে পড়াশুনা করেছি সেটা বলি। সারা
বছর পড়াশুনা না করে শুধু পরীক্ষার সময় পড়লে ভালো ফল হয় না। প্রত্যেক দিনের পড়া ভালো
ভাবে রপ্ত করতে হয় এবং সমস্ত বিষয়ের এক একটি অধ্যায় মগ্ন হয়ে চিন্তা করতে হবে যতক্ষন
অধ্যায়টা পুরোপুরি আয়ত্ব না হয়। স্মৃতিতে ধরে রাখতে বারে বারে ঝালিয়ে নেওয়া দরকার ।
আগের বিষয় আয়ত্ব না হলে পরের বিষয় বুঝতে পারা অসুবিধা হয়। স্মৃতিকে বারে বারে পড়ে বাড়ানো
যায় এবং মগ্নতার সঙ্গে বিষয়কে চিন্তা করে গভীরে পৌঁচালে বুদ্ধিও বাড়ে। পড়াশুনা একরকম
সাধনা, ধ্যানমগ্ন হয়েই এগোতে হবে।“ এই বলে ভোলা বক্তব্য শেষ করলো।
প্রত্যেক
শিক্ষক বিভিন্ন বিষয়ের একটি করে বই উপহার দিলেন। ভোলার বই পড়তে ভালোবাসে তাই সে খুব
খুশি। প্রাধান শিক্ষক পিওনকে বললেন “তুমি যাও, ভোলা ছেড়ে দিয়ে এসো। ও একা এত জিনিস
নিতে পারবে না”। আর ভোলাকে বললেন কোনো অসুবিধা হলে তাঁকে জানাতে। ভোলা বাড়ী ফিরে এল।
দু
চার দিন পরে একদিন সকালা পরান কাকা তার বাড়ীতৈ এলেন ও ভোলা বললেন- “ বাবু, ততে মোর
কিছি কথা কহিবার অছি “।
“
হঁ, কাকা কুহ”
“
মো ঝিঅ এই আঠ মাস হেলা। তাকু কিয়ে শুকিবা বান
মারিচি। সিয়ে দিনকু দিনকু শুকি যাউছি। মু গুণি দেখেইলি কিন্তু কিছি হউ নাই “।
“বান
কিস কাকা ?”
“যিয়ে
মন্ত্রতন্ত্র জানে, সিয়ে মন্ত্র দেই কিছি করি দিয়ে। যাহাকু করে সিয়ে শুকি শুকি মরি
যায় ।“
“
হউ কাকা চল।“
ভোলা
যাওয়ায় সময় ভাবছে মন্ত্র দ্বারা কারো ক্ষতি করা যায় ? সে বা কেন এই বাচ্চার ক্ষতি করবে
? এটা বিশ্বাস করা যায় না। ভাবতে ভাবতে তারা পরানের বাড়ীতে এসে গেল। ভোলা দেখলো যে
বাচ্চা এক প্রায় অন্ধকার ঘরে রাখা হয়েছে। ভোলা কাকীমাকে বললো তাকে বাহিরে আনতে। শিশুটাকে
দেখে ভোলা দশম শ্রেণীতে জীবন বিজ্ঞানে পড়া রিকেট রোগের কথা মনে পড়লো। সে কাকীমাকে জিজ্ঞাসা
করলো “ ইহাকু কি খরার দেই থিল ?”
“
না, সেরকম বাহারকু আনা হয় নি। “
ভোলা
তাদের বললো “ এর গটে রুগ হেইচি, বান মারা বিশ্বাস
করা ঠিক না।গটে কাম কর, ইহাকু সকালে সুরিস তেল মাখেই খরার দিও, আউ দুধ ও অধে কদুল খুয়াও।
কাকীমাও দুধ, কদুল ও বেথুয়া শাগ বেশী বেশী খাও। মাসে পরে দেখতে হব উন্নতি হউচি কিনা।
ভয়র কিছি নাই।“
এই
বলে সে বাড়ী চলে যায়। ভর্তি হতে তাকে কলেজে যেতে হবে। মা বলে দেয়েছেন-
“
মঙ্গলে ঊষা বুধে পা,
যেথা ইচ্ছা সেথা যা ।“
তাই
সে বুধবার খুব ভোরে কলেজে রওনা হলো ঘন্টা দেড়েক পৌঁচে সে জানতে সরাসরি কলেজে যাওয়ার
বাস নেই। বাস পরিবর্তন করে যেতে হবে। কলেজে পৌঁচাতে দুপুর গড়িয়ে গেল। বিরাট মাঠের উপর
কলেজের তিন তলা টানা বিল্ডিং। সে অফিসে গেল ও একজন কর্মচারীকে বললো সে ভর্তি হতে এসেছে।
“
ঐ যে ওই টেবিলে বড়বাবু বসে, ওর কাছে যাও।“
ভোলা
ঐ টবিলে গিয়ে বললো “স্যার আমি ভর্তি হব “। বড়বাবু চোখ
না তুলে বললেন “ নাম কি ?”
“
ভোলানাথ দে”
“
ও ভোলানাথ “ বলেই তিনি চোখ তুলে তাকালেন।
“
তুমি বস “ ভোলা সামনের চেয়ারে বসলে, তিনি বললেন-
“
তোমার ব্যাপারে সরকারী সম্মতি কলেজে এসে গেছে। তোমাকে ভর্তির জন্য কোনো ফি দিতে হবে
না এবং সিলবাসের সমস্ত বই ফ্র্রিতে পাবে। তোমার এখানে থাকা খাওয়ার জন্য মাসিক বৃত্তিও
পাবে। এরপর গ্রন্থাগারে প্রচুর বই আছে, পড়তে
পার। আর ভর্তির পর অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করে যেও।”এই বলে এক টেবিলের দিকে তাকিয়ে বললেন
“ তপন একে ভর্তি করে নাও।“ ভোলা ভর্তি হওয়ার পর অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করতে গেল। অধ্যক্ষ
তাকে কলেজের মুখ যাতে উজ্জ্বল হয় সেইভাবে পড়াশুনা করতে উপদেশ দিলেন।
ভোলাকে
বাড়ী ফিরতে হবে তাই বাস রাস্তার দিকে ছুটলো । বাড়ীতে পৌঁচাতে রাত হয়ে গেল। বাড়ীতে ঢুকেই
মাকে খাবার দিতে বললো তার সকাল থেকে খাওয়া হয় নি। মা তাকে পান্তাভাত, আলু ঢেঁড়স ভাজা
ও মাছের পাতুরি দিলেন। ভোলা গোগ্রাসে খাওয়া শেষ করে শুয়ে পড়লো।
সকালে
উঠে তার একমাত্র চিন্তা কলেজের শহরে একটা সস্তায় থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে
বৃত্তির টাকায় কুলিয়ে যায়। ভোলা জানে বাড়ী থেকে টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। আর কুড়ি দিন পর
ক্লাস আরম্ভ হবে। এর মধ্যে একটা ব্যবস্থা করতে হবে। এর মধ্যে ভোলা একদিন স্কুলে গেল
খোঁজ নিতে কে কে এই কলেজে ভর্তি হয়েছে। সে জানতে পারলো আরো দুজন ছাত্র ঐ কলেজে ভর্তি
হয়েছে এবং এক শিক্ষক ঐ শহরে থাকে তাঁর জানাশুনা একজনের নাম ঠিকানা দিলেন।
ভোলা
দুই বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করে একদিন কলেজে গেল। প্রথমে স্কুলের শিক্ষক যার সঙ্গে দেখা
করতে বলেছলেন, তাঁর সঙ্গে দেখা করলো। তিনি সব শুনে বললেন “ তোমরা কিছুক্ষন পরে এসো,
আমি যোগযোগ করে দেখছি ।“
ওরা
কলেজে এল। ওরা সলেবাসের বইর তালিকা সংগ্রহ করলো। ভোলা কলেজ থেকে কিছু বই সংগ্রহ করলো।
এই ছুটির মধ্যে কিছুটা এগিয়ে রাখবে। ওরা কলেজ থেকে ঐ ভদ্রলোকের গেল। ভদ্রলোক বললেন
“ একটা ঘর পাওয়া গেছে। ভাড়া কম কিন্তু বৈদ্যুতিক আলো নেই। যদি দেখতে চাও,, দেখতে পার।“
তারা
ঘর দেখতে গেল। ঘরটা শহরের বাহিরে, পরিবেশ ভালো তাই তারা রাজী হয়ে গেল। তারপর তারা বাড়ী
ফিরে গেল।
কলেজে
ক্লাস আরম্ভ হতে দশদিন বাকি আছে। এই সময়ে কলেজ থেকে আনা বইগুলো পড়তে আরম্ভ করলো বিশেষ
করে বিজ্ঞান বিষয়ক বইগুলো। কলেজে যাওয়ার আগের দিন সে পরান কাকার বাড়ী গেল মেয়েটা কেমন
আছে জানতে। কাকীমাকে জিজ্ঞসা করে জানলো মেয়েটা অনেক ভালো আছে। ভোলা ভাবছে সে রোগটা
ঠিকই ধরেছে। রিকেট রোগকে মানুষ কালা জাদু মনে করে।
পরের
দিন বুধবার ছিল, ভোলা ভোরে বেরিয়ে পড়লো, বিশ্বাস না থাকলেও মায়ের কথা মানতেই হবে। ভোলা
সঙ্গে বেশ কিছু মুড়ি ও বিছানা জামা কাপড় নিয়ে নিল। ভাড়া ঘরে গিয়ে ঘরটা পরিষ্কার করলো।
আর দুজন আজ বা কাল আসবে।
ক্লাস
আরম্ভ হলো। ক্লাসে মেয়ের সংখ্যা খুবই অল্প। মেয়েদের অশিক্ষাও কুসংস্কারের ভুত লোকের
ঘাড়ে চেপে বসে আছে । এ ভুতকে হারাতে না পারলে দেশের উন্নতি নেই।
চারদিন
পরে নবীন বরণ উৎসব হলো। গান, আবৃত্তি ও নাচ সবই হলো। ভোলার অনুষ্টান খুব ভালোই লাগলো।
এ রকম অনুষ্টান সে কোনোদিন এর আগে দেখে ছিল না। অনুষ্টানে একটি মেয়ে নেচেছিল। ঐ মেয়েকে
ভোলার ভালো লাগলো। মেয়েটার মধ্যে এক মগ্ধতা আছে। গায়ে রং ফরসা কিন্তু দুধে আলতা নয়,
চন্দ্রবদনী, গড়ন মাঝারি, হাসি সুন্দর, মাতার চুল খুব লম্বা নয় কিন্তু ঘন।মেয়েটা কোন
ক্লাসে পড়ে ভোলা জানে না । আগে কখনো দেখেনি। ভোলা ভাবে প্রাকৃতিক নিয়ম ও সৃষ্টির কারনে
যৌবন আরম্ভ থেকে বিপরীত লিঙ্গের মধ্যে এক আকর্ষন থাকবেই। শুধু মানুষের নয়, সমস্ত জীবের
এ এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এ চিরদিন চলবে কিন্তু বিশেষ একজনের প্রতি বেশী হয় কেন সে
সিন্ধান্ত নিতে পারে নি।
পরের
দিন কলেজে আসার সময় গেটের কাছে মেয়েটার সঙ্গে দেখা। ভোলা বলে- “ কাল নাচ খুব ভালো হয়েছে।“
মেয়েটা
লজ্জা পেয়ে চুপ করে থাকলো।
“
তোমার কোন ক্লাস?”
মেয়েটা
মুখ না তুলে যেতে যেতে বললো “ প্রি ইউ প্রথম বর্ষ।“
“আমার
ও তাই, তোমাকে তো ক্লাসে দেখি নি। সকলকে এখনো চিনে উঠতে পারি নি।“ ওরা কথা বলতে বলতে
শ্রেণী কক্ষ এসে গেল।
এর
পরে কলেজে দু চার কথা হয়েছে দু জনের।
সময়
এগোতে লাগলো। ভোলা অন্য বিষয় চিন্তা না করে পড়ায় ব্যস্ত থাকলো। আর বছর দেড়েক পরে ফাইনেল
পরীক্ষা, তার সঙ্গে সে মেডিকেল জয়েন্টে বসবে। ফল তো ভালো করতেই হবে। নিজকে অনুপ্রেরণা
দেওয়ায় জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসগরের কথা মনে করে। তাঁর প্রখর মেধাশক্তি ও স্মৃতিধর
হওয়া সত্বেও রাত জেগে পড়ার জন্য টিকিতে দড়ি বেঁধে রাখতেন। কষ্ট ছাড়া কৃষ্ণ পাওয়া যায়
না। ভোলার পড়ার নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। যখন
ইচ্ছা হয়, তখনই পড়তে বসে।
“’যখনি জেগেছে চিত্ত শুনেছ বাণী,
তখনি এসেছে প্রভাত ।
যাও তোমার ব্রতপালনে ।“
সাধনা
ও কর্ত্তব্যে কোনো সময় হয় না।
সে
তার যথাসাধ্য চেষ্টা করতে লাগলো।
দেখতে
দেখতে ষান্মাসিক পরীক্ষা এসে গেল। ফল ও বেরলো । ফল দেখে ক্লাস শুদ্ধ অবাক । অধ্যক্ষ
ও অধ্যাপক ভোলার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এঁরা অনেক দিন এ রকম ফল খুব কম দেখেছেন। কলেজে ভোলার
নাম মুখে মুখে ঘুরতে লাগলো । ভোলার জেদ আরো বাড়লো। সে পড়াশুনায় সময় বাড়য়ে দিল। বাড়ী
মাঝে মাঝে একদিনের জন্য যায় বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা করে আসে।
একদিন
কলেজে ওই মেয়েটি ভোলার কাছে এসে বললো
“ তুমি তো কলেজে হিরো হয়ে গেলে “।
“
কেন ? এমন কি হলো ?”
“
তোমার রেজাল্ট নিয়ে সকলের মুখে মুখে ঘুরছে ।“
“
তাতে আমি কি করে হিরো হলাম ? আমি নিজের জন্যই পড়াশুনা করেছি।“
“
সকলে তো পড়াশুনা করে কিন্তু ভালো রেজাল্ট করতে পারে না কেন ?”
‘
এটা আমি কি করে বলবো ? হয়তো কোথাও খামতি আছে। বিষয় রপ্ত হলে বেশীর ভাগ প্রশ্নের উত্তর
দেওয়া যায়। তোমার নামটা জানা হয় নি ।“
“
আমার নাম মাধুরী বর “
“
কোথায় বাড়ী ?”
“
রামনগরের পূর্বে, সমুদ্রের কাছাকাছি “।
এ
দিকে ক্লাসের ঘন্টা পড়ল । ক্লাস আরম্ভ হবে। ওরা ক্লাসের দিকে চললো।
ক্লাসের
মধ্যেও দুজনের ঘন ঘন চোখে চোখ পড়ে । ভোলা ওর চোখের ভাষা বুঝতে পারে তাই সতর্ক থাকে।
কিছুদিন
পর ভোলা কলেজ থেকে বাড়ী ফিরছে, হঠাৎ শুনতে পেল পিছন থেকে তাকে কে ডাকছে। পিছনে ঘুরে
দেখলো, মাধুরী।
মাধুরী
কাছে এসে বললো “ তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে “।
“
বল “
“
রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা যায় নাকি ? লোকে কি ভাববে।“
“
তাহলে ?”
“
এদিকে চায়ের দোকান নেই ?”
“
আছে কিন্তু রাস্তার ধারে ষেমন হয় “
তারা
রাস্তা ধরে এগলো। সামনে একটি চা দোকান পেল। দোকানে বেশী ভিড় নেই। ওরা একটি বেঞ্চে বসলো।
ভোলা বললো বলল “ বলো”
“আরে,
বাবাঃ, তোমার বেশী সময় নষ্ট করবো না”
“
ঠিক আছে, বল না “
“
আমি এক জেলে পরিবারের মেয়ে। বাবা মাছের ব্যবসা করেন। ভাই আমার ছোট, পড়াশুনা করে। আমাদের
সমাজে বেশীর ভাগ মেয়েদের ছোটবেলায় বিয়ে হয়ে যায়। আমি পড়াশুনা করতে চাই। আমাদের বাড়ীর
পাশে এক মাধ্যমিক স্কুল আছে তাই মাধ্যমিক পাশ করতে পেরেছি। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর আমার
বিয়ে ঠিক হয়ে গেছিল। আমি লড়াই করে বিয়ে বন্ধ করেছি “।
ভোলা
বলে “ খুব ভালো করেছ। শিক্ষা তো আলো “।
“আমি আরও পড়তে চাই। তোমাকে দেখে আমার মনে হয়েছে,
তুমিই আমাকে সাহায্য করতে পারো “।
“
বলো, কি সাহায্য করতে পারি ?
“ কিভাবে পড়াশুনা করলে আমি এগোতে পারবো ? “
“
দেখ, আমি তো বিষেশজ্ঞ নই, তবে আমি যে ভাবে পড়ি সেটা তোমাকে বলতে পারি “
“
ঠিক আছে, তাই বলো, আমি চেষ্টা করে দেখবো “
“
দেখ, যে কোনো অধ্যায় প্রথম দুতিন বার একাগ্র মনে পড়তে হবে ও গভীর ভাবে চিন্তা করতে
হবে। মন্থন না করলে রত্ন পাবে না। এটা রপ্ত করে অন্য অধ্যায়ে যেতে হবে। আমাদের স্মৃতিতে
চিরস্থায়ী করতে গেলে, ওই অধ্যায় প্রথমে দশদিন, তারপর একমাস, তিন মাস, ছয়মাস ও এক বছর
অন্তর ঝালিয়ে নিতে হবে। তাই সিলেবাস একবছরের হয় “
“ও
তাই, দেখি হয় কিনা “
“
এ বারে যাই “
“
আর একটু বস না, তোমার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে “
“
আজ না আর একদিন হবে “ বলে সে উঠে বাসার দিকে পা বড়লো। তারও যে ভালো লাগছিল তা অস্কীকার
করার উপায় নেই। কিন্তু এ ভুতকে প্রশয় দিলে মাথায় ওঠে। আমাদের শরীরে ছয়টি ভুত বাস করে।
কাম, ক্রোধ, লোভ, মদ, মোহ ও মাৎসর্য। এরা আমাদের মনকে প্রভাবিত করে দুষ্কর্ম করিয়ে
নেয়। এদের মধ্যে কাম, ক্রোধ, লোভ ভুত তিনটি খুবই ভয়ঙ্কর যৌবনে কামই প্রেমের ছদ্মবেশে
আসে। কাম চরিতার্থ করতে প্রেমই টোপ। এই টোপে প্রলুব্ধ হয়ে সকলে কামের কবলে পড়ে। মুনি,
ঋষি, যোগী কেউই এর থেকে নিস্তার পান নি। ভোলার ক্লাসে বৈষ্ণব সাহিত্য পড়ানো হচ্ছে ।
বাংলার অধ্যাপক সুন্দরভাবে বৈষ্ণব সাহিত্যে প্রেম সমন্ধে আলোচনা করেছিলেন। বৈষ্ণব সাহিত্য
অনুযায়ী প্রেম পাঁচ প্রকার- শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য, মুধুর । এই সব প্রেম বা ভালোবাসা
সকল মানুষের মধ্যে দেখা যায়। এর মধ্যে মধুর প্রেম শ্রেষ্ঠ, কারন এই প্রেমে আকর্ষণ অত্যধিক
ও দুর্দমনীয় কিন্তু প্রদীপের নীচে যেমন অন্ধকার থাকে, মধুর প্রেমে আছে কলুষতা ও কলঙ্ক
। মধুর প্রেম দুই ধরনের- স্বকাম যাতে কামনা বাসনা থাকে ও নিষ্কাম যাতে কোনো প্রত্যাশা
থাকে না। শারীরিক সম্পর্কের চেয়েও
গভীর,
আধ্যাত্মিক
এবং
নিঃস্বার্থ
ভালোবাসার
প্রকাশই নিষ্কাম প্রেম বলে।
“
আত্মেন্দ্রিয় প্রীতিইচ্ছা ধরে কামনাম
কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতিইচ্ছা ধরে প্রেম নাম। “
মধুর
প্রেম শুধুমাত্র ঈশ্বরের প্রতি হতে পারে, এ প্রেম ও পূজা সমার্থক। যৌবনে বিপরীত লিঙ্গের
প্রতি যে আকর্ষন তাকে মহান বলে অভিহিত করা হয় কিন্তু এতো কামনার আবেগ থেকে উৎপত্তি
ও শারীরিক সম্পর্কের জন্য কামভুতের কারসাজি।
এই
ভুতের সঙ্গে লড়াই তো করতেই হবে। নিজেকে সংযত করতে হবে।
ভালোবাসা
তো মানুষের মধ্যে থাকবেই কিন্ত বাস্তবের মাটিতে হাঁটা উচিত। এইসব কথা ভাবতে ভাবতে তার
একটা কথা মনে এল। ও যেখানে ভাড়া থাকে সেখানে ঘরের মালিক ও আরো দুজন ভাড়া থাকেন। তার
মধ্যে একজন পবন বাবু, বয়স ছাব্বিশ বা সাতাশ হবে।মাঝারি চেহেরা, উস্ খুসকো চুল, কারো
সঙ্গে তেমন মেশেন না। মনে হয় তিন চার বছর আগে বিয়ে হয়েছে। বছর খানেক একটি ছেলে আছে।
প্রত্যেক
রাতে এই ঘর থেকে রাতে চিৎকার, চেঁচামেঁচি, নারী ও বাচ্চার কান্না গভীর রাত পর্যন্ত
শোনা যেত। ভোলা রাত জেগে পড়াশুনা করতো বলে এইসব শুনতে পেত কিন্তু তার সেভাবে অসুবিধা
হয় না কারন সে একাগ্র মনে পড়াশুনা করে বলে অন্য শব্দ কানে যায় না I কিন্তু অন্যান্যরা
এই নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিল তাই তারা ঘরের মালিকরের কাছে গিয়ে বললো “ কাকু, পবন বাবুর ঘর থেকে
প্রত্যেক রাতে ঝগড়া ঝাটি, চিৎকার চেঁচামেঁচি, কান্নাকাটির শব্দ শোনা যায়। আমাদের খুব
অসুবিধা হয়।“
কাকু
বললেন “ শোন পবনের কথা। পবনের ও ওর বৌ এর বিয়ের আগে চার পাঁচ বছরের প্রেম ছিল। জাত
এক নয় বলে মেয়ের বাড়ী থেকে এই বিয়েতে আপত্তি ছিল। মেয়েটা একবার আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল,
পবন ছাড়া ও বাঁচবে না। তারপর মেয়েটা পালিয়ে এসে মন্দিরে বিয়ে করে। বছর খানেক ঠিকঠাক
ছিল। ত।রপর শুরু হয়েছে কেত্তন। পবন নেশা করে এসে বৌটাকে পেটায়। বৌউটার তো বাপের বাড়ী
সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। ওর ওই ছোটো ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার জায়গা নেই। কাঁহাতক এসব সহ্য
করা যায় ? আমি অনেক বার ওদের বুঝিয়েছি। কোনো ফল হয় নি। এবার তাহলে কড়া কিছু করতে হবে।“
ভোলা শুনে ত থ, এ রকম আবার
হতে পারে নাকি ? ভালোবাসা এত ঠুনকো, বালির বাঁধের মতো সহজে ভেঙ্গে যায়। ভোলার এ সম্বন্ধে
কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। ভালোবাসার অনেক গল্প পড়ছে- লায়লা মজনু, সেলিম আনারকলি, এই প্রেমের
জন্য ট্রয় নগর ধ্বংস হয়েছিল। কাব্যে এই প্রেমকে আলাদা মূল্য দেওয়া হয়েছে কিন্তু বাস্তবে
মূল্যহীন। যেমন চুম্বকের বিপরীত মেরুর মধ্যে একসময় প্রচন্ড আকর্ষন থাকে, মিলিত হলে
আকর্ষন মিলিয়ে যায়। যৌবনের প্রেমও শারীরিক মিলনে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। কামাবেগের ও
পরিপক্কতা এবং প্রজ্ঞার
অভাবে অনেকে ভুল
পথে চলে যায়
যার
জন্য
পরবর্তী
জীবনে
তাদের
অনেক
বড়ো
দাম
দিতে
হয়।
ভোলা ও মাধুরীর দেখা সাক্ষাৎ ও
কথাবার্তা হয়। দুজনের দুজনকে ভাল লাগে। কিন্তু তারা কখনো সীমা লঙ্ঘন করে নি।
৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ
ভোলার প্রি ইউ পরীক্ষা ও মেডিক্যাল জয়েন্ট শেষ হয়েছে। সে
দিন দুই হলো বাড়ী এসেছে। যদি জয়েন্টে রেঙ্ক হয় তবে কোথায় পড়তে হবে সে জানে না। রেঙ্ক
অনুযায়ী কলেজ পাওয়া যাবে। আর না হলে ঐ কলেজে অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়ে পরের বছর জয়েন্টের
জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। মাধুরী ভোলাকে বলেছিল সে শিক্ষিকা হতে চায়। হয়তো সে ঐ কলেজে পড়বে।
ভোলা পরানের বাড়ী গেল তার মেয়েটা কেমন আছে জানার জন্য । বাড়ী
ঢোকার আগে পরানের সঙ্গে দেখা। সে গরুর জন্য খড় কাটছিলা ভোলাকে দেখে জিজ্ঞাসা করল-
“ ভোলা কেভে আইলু “
“ এই দিন দুই হেলা “
“ পড়া সরি গলা ?”
“ না, না, পড়ার শেষ নাহি । ইয়ে চালিব । তুম ঝিয় ভল ? “
“ হঁ, তু তাকু বঁচেই দেলু , নহেনে মরি জান্তা “
“ হউ কাক, এই অন্ধ বিশ্বাসগুলা মনরু বাহারিব কেমিতি ?”
“ এই বিশ্বাসগুলা আম বাপ গুসবাপ আমলরু চালিচি, ভল ভাবরে বুঝেইনে
আস্তে আস্তে কাটি যিব “
“ হউ, মু আসুছি কাকা “ এই বলে সে সামন্ত কাকার বাড়ীর দিকে
গেল । সামন্ত বাবু বাড়ীতেই ছিলেন । ভোলা গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করলো। সামন্ত বাবু
ভোলাকে বসতে বললেন ও পাশে বসলেন।
“ কবে এলে ভোলা ?”
“ এই দুদিন হলো”
“ তোমার পরীক্ষা কেমন হলো ?”
“ পরীক্ষা তো ভালো হয়েছে। তবে রেজাল্ট না বেরনো পর্যন্ত কিছু
বলা যাবে না।“
“ তুমি তো ডাক্তারী পড়বে স্থির করেছ ?”
“ তাই তো জয়েন্ট দিয়েছি। সিট খুব অল্প । কি হবে জানি না।“
“ডাক্তারীটা পড়া খুব দরকার। ডাক্তারের অভাবে মানুষের দুর্দশার
শেষ নেই।“
“ হ্যাঁ কাকু, শিক্ষা ও চিকিৎসার অভাবে গ্রামে কুসংস্কার
ভুত গেড়ে বসেছে। আমি আপনার কাছে এসেছি একটি প্রস্তাব নিয়ে।“
“ বল, কি প্রস্তাব।“
“ আমি তো মাস দুয়েক থাকবো। এর মধ্যে সন্ধ্যার পর মহাদেব প্রাঙ্গনে
গ্রামের লোকদের জড় করে কুসংস্কারের অপকারিতা সমন্ধে বলা যায় তাহলে কিছুটা উপকার হয়।“
“ এতো খুব ভালো প্রস্তাব।“
“ আপনার সাহায্য ছাড়া হবে না।“
“ আরে আমি তো আছি, তুমি আরম্ভ করে দাও। ভোলা তুমি যখন এসেছ
তোমাকে
একটা কথা বলার আছে।“
“ বলুন কাকু।“
“ তোমার বিপিন পাত্রের কথা মনে আছে।“.
“ হ্যঁ, উনি তো মারা গেছেন।“
এমন সময় সামন্ত কাকীমা ভেতর থেকে ডাকলেন “ একটু আসবে, দরকার
আছে।“
“ ভোলা, দু একদিনের মধ্যে একবার একবার এসো, তখন বলবো।“
“ আচ্ছা, কাকু।“
ভোলা উঠে বাড়ীর দিকে চললো। যাওয়ার সময় ভাবলো কাকু কি বলতে
চান। বিপিন কাকুর বাড়ী গ্রামের একেবারে উত্তরে, তার বাড়ী থেকে একটু দুরে কিন্তু গ্রামে
সকলের খবর সকলে রাখে। ভোলার মনে আছে বিপিন কাকুর আলসার হয়েছিল। বছর চার পাঁচের আগে
চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন। খুব অমায়িক লোক ছিলেন। শান্ত ভদ্র সরল স্বাভাবের। সকলকে
সম্মান দিয়ে কথা বলতেন। তাঁর জমিজমা ছিল না, শুধু ভিটেটুকু। তিনি দিনমজুরি করে সংসার
চালাতেন। তার বিয়ের বছর চারেক পর তাঁর এক মেয়ে হয়। তা পর থেকে তার শরীর ভলো যাচ্ছিল
না। বছর আঠ পরে তাঁর আলসার ধরা পড়ে। ঠিক মতো চিকিৎসার অভাবে একবছরের মধ্যে তিনি মারা
যান। কাকীমা ও মেয়েটি অকুল সমুদ্রে পড়ে। মেয়েটি তখন পাঠশালায় পড়ে। ভোলা শুনেছে মেয়েটা
পড়াশুনায় খুব ভালো ছিল। কেউ কেউ বলতো মেয়েটা নাকি ডাইনি, ওই তার বাবাকে খেয়েছে। ভোলা
তখন সপ্তম কি অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে ও স্কুল বোড়িং এ থাকে তাই ব্যাপারে কোনো চিন্তা ভাবনা
মাথায় আসে নি। এখন ভাবছে এক বাচ্চা মেয়ে কি ডাইনি হতে পারে ও মানুষকে খাওয়ার জন্য মেরে
ফেলতে পাবে, যত সব আজগুবি। মানুষ কতটা কুসংস্কারাছন্ন হলে ঐ সব মাথায় আসতে পারে। ওদের
এই অসময়ে সামন্ত কাকু তাদের সাহায্য করে ছিলেন। পরে পাত্র কাকীমা লোকের বাড়ীতে মুড়ি
ভেজে, ধান সেদ্ধ বা অন্যান্য কাজ করে দিন নির্বাহ করেন। মেয়েটি প্রাথমিক পরীক্ষায় খুব
ভালো করেছিলা তার আরও পড়াশুনা করার আগ্রহ ছিল কিন্তু কাছাকাছি স্কুল না থাকায় এখন ঘরেই
থাকে। ঘরের সমস্ত কাজকর্ম ও রান্নাও করে। মাকে কোনো কাজ করতে দেয় না। অবসর সময়ে যেখানে
যে বই পায় সেইসব বার বার পড়ে আয়ত্ব করার চেষ্টা করে। ঘরের বাইরে বেরোয় না। গ্রামের
সকলে এখন বলে “গুণে সরস্বতী রূপে লক্ষ্মী “। যারাই তাকে ডাইনি বলেছিল তারাই মেয়েটার
প্রশংসায় পঞ্চমুখ। মানুষের চরিত্র বোঝা বড়ই দায়, বিশেষত মেয়েদের। তারা পড়াশুনার অভাবে
বাইরের আলো দেখতে পায় না তাই বিচার বিবেচনা ছাড়া মন্তব্য করে দেয়। পাত্র কাকীমা মেয়ের
বিয়ের ব্যাপারে খুব চিন্তায় আছেন। মেয়ে বড় হয়ে গেছে, এখন পাত্র পক্ষের যা চাহিদা তা
পুরন করা অসম্ভব। যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় তারা বিয়ের খরচা ব্যবস্থা করা বামন হয়ে
চাঁদ ধরার সমান। তাই মার হয়তো বিনিদ্র রাত কাটচ্ছে।
কিন্তু সামন্ত কাকু কি বলতে চাইছেন ? ভোলা কিছুই আন্দাজ করতে
পারে না। ভোলা ঠিক করলো যে সামন্ত কাকুর সঙ্গে কাল দেখা করতে হবেই। কুসংস্কার ভুতের
সঙ্গে লড়াইর পরিকল্পনা ও বিপিন কাকুর সম্বন্ধে কি বলতে চাইছেন জানতে হবে।
ঘরে গিয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করলো “ বিপিন কাকুর কি খবর?”
“ তার বৌ লুক ঘরে কাম করি খায়। তার ঝিয় ঘরর সবু কাম করে,
ঝিয়টা দেখতে দূর্গা প্রতিমা। মুতো ভাবুচি তাকু বৌ করি আঁলিবি’”।
“ তুমে রুহ তো। পড়াশুনা করতে দেব নি “।
ভোলা ওখান থেকে চলে গেল। ভাবলো তার কানে যা এসেছে সেগুলো
সত্য। গোবরে ও পদ্ম ফুলও ফোটে । সুযোগ না পেয়ে কত প্রতিভা অকালে নষ্ট হয়ে যায়। পরের
দিন সকালা ভোলা সামন্ত বাবুর বাড়ী গেল। তাঁকে প্রনাম করে বললো “ কাকু আসতে বলেছিলেন
“।
“ হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে একটা আলোচনা আছে। এ কথা আমি কাউকে এখনো
বলি নি। সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। চল ঘরে গিয়ে বসি ।“
তারা একটি ঘরে গেলে “ ভোল বসো, তুমি জান আমার একমাত্র ছেলে
মেদিনীপুর শহরে থেকে পড়াশুনা করছিল। এবারে সে বি এ, অনার্স নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। খোকা একমাসে আগে বাড়ী এসেছিল।
সাত আঠদিন ছিল। সে কখনো বিপিনের মেয়েকে কোনোদিন দেখেছে ও তার মায়ের কাছে তার প্রশংসা
করেছে। মনে হয় তার পছন্দ হয়েছে।“
“ আপনার ছেলের বয়স কত হলো ?”
“ এইতো চব্বিশ চলছে”।
“ আর ঐ মেয়ের ?”
“ ওর পনের হবে”।
“ তারপর শোন না, আমি এমনি ওর বাড়ীতে বিপিনের স্ত্রীর সঙ্গে
দেখা করতে গেলাম। আমার ইচ্ছা মেয়েটাকে দেখি, তাকে সেই ছোটোবেলায় দেখেছিলাম। মেয়েটা
আবার বাড়ীর বাইরে বেরোয় না। দেখলাম মেয়েটা সত্যিই সুলক্ষণা ও সুন্দরী। রান্না ও ঘরের
সমস্ত কাজ জানে। সভ্য, ভদ্র ও স্থির ধীর। সে তার মনের ইচছা জানিয়েছিল। সে পড়াশুনা এগিয়ে
নিয়ে যেতে চায়। সে পাঠশালার শিক্ষকের কাছ থেকে
বিভিন্ন ক্লাসের পুরুনো বই সংগ্রহ করে বাড়ীতে পড়াশুনা করে। আমার তো পছন্দ হয়েছে। কিন্তু
সমস্যা হলো একেতো তারা নিঃস্ব অপরদিকে আমাদের থেকে জাতে কম। এই পরিস্থিতিতে আমি কাউকে
কিছু না বলতে পারছি না কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি। কি করা যায় বল তো ভোলা ?“
“ দেখুন কাকু, আপনার চিন্তা দুটি। ওরা গরীব ও জাতে আপনাদের
চেয়ে নীচু। লক্ষ্মী চঞ্চলা। কখন আসে, কখন চলে যায়। আমীর গরীব হয়, গরীব আমীর। ধন সম্পত্তি
সমাজের মানদন্ড হতে পারে না। ভগবান সমাজের প্রয়োজনে ধনী গরীব সৃষ্টি করেছেন। সকলে যদি
ধনী হতো তাহলে পরিশ্রমের কাজের কি হতো, কারা ফসল ফলাতো, কারা ধনীর অট্টালিকা তৈরী করতো,
কারা রাস্তা তৈরী করতো। মানবিকতাই মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। ঈশ্বরচন্দ্র, রামকৃষ্ণ, স্বামী
বিবেকানন্দ এরা গরীরের ঘরে জন্মেও নিজ গুণে পৃথিবীতে শ্র্রেষ্ঠ আসন পেয়েছেন। ধনী দরিদ্র
সামাজিক বন্ধনের মাপকাটি হতে পারে না।
“ যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে,
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।”
যদি জাতের কথা বলেন, হিন্দুদের মধ্যেই এত জাতিভেদ দেখা যায়।
অন্য ধর্মের মধ্যে এই নিষ্টুর প্রথা নেই। হিন্দুধর্মের নান ধরনের নিষ্টুর নিয়ম আছে।
নিষ্টুরতার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল সতীদাহ প্রথা। কতটা নৃশংস হলে এক যুবতী মেয়েকে জ্যান্ত
পুড়িয়ে মারতে পারে। ভাগ্যিস ইংরাজরা এসেছিল, নাহলে ওই ভুত ঘাড়ে বসে থাকতো। হিন্দুধর্মের
ধর্মের নামে অধর্মের জন্য কত অত্যাচারিত মানুষ অন্য ধর্ম গ্রহন করেছেন তার সঠিক ইতিহাস
অজানা।মধ্য
যুগে সবচেয়ে বেশী দলিত ও নিম্নবর্গীয় মানুষ বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিল।
আমি বিবেকানন্দের
লেখায় পড়েছিলাম প্রথম দিে হিন্দুধর্মে বর্ণপ্রথা হয়েছিল গুণ ও কর্মের ভিত্তিতে । যারা
পূজাঅর্চা করতেন ও জ্ঞানী তাদের ব্রাহ্মণ, যারা রাজকার্য ও যুদ্ধে পারাদর্শী তারা ক্ষত্রিয়,
যারা ব্যবসা করতেন তারা বৈশ্য ও যারা অন্যান্য সেবামূলক কাজ করতেন তাদের শুদ্র বলা
হতো। প্রত্যেক বর্ণের লোক আলাদা আলাদা গুণের
অধিকারী হতেন। কালক্রমে এটা জন্মগত হয়ে যায়। এখন আবার বিভিন্ন বর্ণের লোক বিভিন্ন কর্ম
করছে। যেমন সৈন্যবাহিনীতে সব বর্ণের মানুষকে দেখা যাবে এবং সব বর্ণের মানুষরা ব্যবসাও
করছে।সমাজ যেভাবে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য এবং শূদ্রের
বিভাগ করে , আমার মনে হয় এ একটি কলিযুগীয় কুসংস্কার। তাই কাকু, আমি জাতিভেদের বিরুদ্ধে
“ সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।“ স্বার্থসিদ্ধির জন্য
জাত-কুল-ধর্ম-বর্ণ তৈরী করা হয়েছে। এক দল আরেক দলকে ঘৃণা করে, পরস্পর হানাহানিতে লিপ্ত হয়ে
মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এই ব্যবস্থা মেনে নেওয়া যায় না। সব চেয়ে বড় কথা
গ্রামের সকলে মেয়েটির প্রশংসা করছে। যদিও মানুষের স্বভাব যখন তখন পালটে যায়। যাইহোক
আপনি যে দুটি বাধার কথা বললেন তার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আপনি বরং ছেলের মত স্পষ্টভাবে
নেয় এবং মেয়ের মতামত নেয় তারপর সিন্ধান্ত নেন ।“
“
তোমার কথা শুনে আমার দুশ্চিন্তা কেটে গেছে।
ছেলে তো আমার সঙ্গে সামনা সামনি এ ব্যাপারে কথা বলবে না, ওর মাকে বলবো কথা বলতে।
কি হলো তোমাকে জানাবো। ভোলা, তোমার কাকীমা এখানে দুপুরে খেয়ে যেতে বলেছেন।“
“
কাকু, আমাদের সভার ব্যবস্থা কবে করবেন ?”
“
হ্যাঁ, আমি এই চিন্তায় ছিলাম। দুএক দিনের মধ্যে করে ফেলবো।“
ভোলা
তাড়াতাড়ি খেয়ে বাড়ী ফিরলো। মাকে বলা হয় নি, মা চিন্তায় থাকবেন।
তিন
দিন পর মহাদেব মন্দির প্রাঙ্গনে
অনেকে জড় হয়েছে। সামন্ত বাবু এসেছেন।
তিনি
প্রথমে বলতে শুরু করলেন। “ তোমাদের এখানে ডেকেছি কিছু কথা বলার জন্য । আমরা কিছু কিছু
অন্ধ বিশ্বাসের কাজ করে থাকি যার ফলে আমাদের প্রচুর ক্ষতি হয়। গ্রামে অধিকাংশ লোক পড়াশুনা
তেমন ভাবে করেন না। শিক্ষার অভাবে আমরা কোনটা ভালো কোনটা মন্দ বুঝতে পারি না। মাধ্যমিক
স্কুল আমাদের গ্রাম থেকে দশ বার মাইল দুরে তাই মেয়েরা পাঠশালার পর পড়া বন্ধ করে দেয়।
আমরা চেষ্টা করবো একটা মাধ্যমিক স্কুল করা যায়। ভোলাকে তোমরা সকলে ভালো করে জান। ও
এই বছর হয়তো ডাক্তারী পড়তে ভর্ভি হবে এবং আমাদের গ্রামের নাম উজ্জ্বল করবে। ও তোমাদের
কিছু কথা বলবে। তার কথা ভালো করে শোন ও মেনে চলার চেষ্টা কর।“
ভোলা
বলতে শুরু করে “ আমি জ্ন্ম থেকে এই গ্রামে বড় হয়েছি। ছোটো বয়সে এত কিছু বুঝতাম না।
যখন থেকে বুঝতে পেরেছি তখন থেকে আমি আতঙ্কিত হয়ে দেখেছি অন্ধবিশ্বাসের ফলে আমরা নানা
বিপদে পড়ি। এই অন্ধবিশ্বাসকে কুসংস্কার বলে, একে সমাজের অভিশাপও বলা যায়। যুক্তিহীনতা আর শিক্ষার অভাব থেকেই কুসংস্কার
এর জন্ম ও আমাদের ঘাড়ে ভূতের মতো চেপে বসে আছে । যেমন কোনো অসুখ হলে মনে করি
ভুতে ধরেছে বা সাপে কাটলে আমরা ওঝা ও গুণিণের কাছে যাই, ভাক্তারের কাছে যাই না।“
এমন
সময়ে সমীর কাকু জনতার মধ্য থেকে চিৎকার করে বলেন “ তু তো তিন চারজন কু বঁচেইচু।“
ভোলা আবার বলতে শুরু করল “ এই ভুতের সঙ্গে
লড়াই করে তার হাত থেকে রেহাই পেতে হবে। সব অন্ধ বিশ্বাস যে ক্ষতি কারক তা আমি বলছি
না। আমরা মঙ্গলা মায়ের পূজা করি তা থেকে ভক্তি ভাবের উদয় হয় কিন্তু তাঁর সামনে ছাগ
বলি দেওয়া অবৈজ্ঞানিক ছিল। এ বন্ধ হওয়ায় আমাদের কিছু ক্ষতি হয়েছে কি ? ডাইনিবিদ্যা, বান
মারা, তন্ত্রমন্ত্র, ঝাঁড়ফুক, গাছে ভূত থাকে, অমবস্যার রাতে ভূত বের হয়, ভূত প্রেত, জিন ইত্যাদিকে বিশ্বাস করবেন না I মেয়েকে কম বয়সে বা বড়োর সঙ্গে
বিয়ে দিবেন না I সব মানুষই এক, জাতিভেদ প্রথা মানুষের সৃষ্টি I এই প্রথা মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে ও আমাদের
ক্ষতি করে। যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই সেসব কুসংস্কারের এই জগদ্দল পাথরটিকে মন থেকে সরানো যদিও খুব একটা সহজ কাজ নয়, তারপরেও
সর্বস্তরের মানুষদের মনের এই অন্ধকার বিশ্বাস দূরীকরণে এগিয়ে আসতে হবে। ধর্মবিশ্বাস বা ঈশ্বরবিশ্বাসের বিরোধী নন৷ কিন্তু
এই বিশ্বাসের কালোবাজারি করে যাঁরা মানুষকে ঠকান, শোষণ করেন, তাঁদের
সম্পর্কে সমাজকে সচেতন করাই তার লক্ষ্য I এমন অনেক তথাকথিত সাধুবাবা, তান্ত্রিক আছেন যাঁরা নানা
ছলচাতুরি ও কালো ম্যাজিকের ব্যবসা ফেঁদে দিব্যি থাকেন I হিন্দু নারীরা নানা উপলক্ষ্যে দিনের পর দিন উপবাস পালন করতে গিয়ে
রক্তাল্পতার শিকার হন I নিজস্ব
বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন, যদি
সেটা সমাজের বা অন্য কারোর ক্ষতির কারণ না হয় I এই লক্ষ্যে পর্যাপ্ত শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। আমরা সমস্ত অন্ধ বিশ্বাসের কথা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ধীরে ধীরে আলোচনা করবো I সামন্ত কাকু আমাদের সঙ্গে আছেন, আমরা শিক্ষার
ব্যবস্থা করবই যদি আপনারা সঙ্গে থাকেন। অন্ধবিশ্বাস রূপ ভুতের সঙ্গে লড়াইতে আমরা
জয়ী হবোই।“
সকলে
চিৎকার করে বললো “সাথরে অছি ।“
পরের
দিন বিকালা ভোলা গ্রামে ঘুরে বাড়ীতে আসতেই মা বললেন “ তোর গটে খামর চিঠি আসিছি ।”
ভোলা
খামটা খুলে দেখলো মাধুরী লিখেছে। ভোলার মনে এক আনন্দের ঢেউ খেলে গেল । “ মাধুরীর আমাকে
মনে আছে দেখছি ।“
মাধুরী
লিখেছে “ ভোলা দা, ভালো আছ নিশ্চয় । মা ও বাবাকে প্রানাম জানাবে। আমার এখানে একা একা
ভালো লাগচ্ছে না। তোমার কথা শুনতে খুব ইচ্ছা করচ্ছে। এই কয়দিনে মনে হচ্ছে অনেক যুগ
তোমাকে দেখি নি। তোমার উপদেশ মতো পড়াশুনা করায় আমার অনেক উন্নতি হয়েছে। পরীক্ষাও এতটা
ভালো হবে আশা করি নি। এরপর ও আমি যেকোনো ভাবে পড়াশুনা চালিয়ে যাব। তোমাকে বলেছি কিনা
জানি না আমি শিক্ষিকা হতে চাই।
যদি
যোগাযোগ রাখতে চাও তবে চিঠি দেবে। ঠিকানা দিলাম।
গ্রাম
– কাসেমপুর
পোষ্ট
– জামিনদা
জেলা
– পূর্ব মেদিনীপুর , ইতি, মাধুরী
চিঠি
সংক্ষিপ্ত কিন্তু ভোলা এর মধ্যে অনেক কিছু পড়তে পারচ্ছে। ওর ইচ্ছা, অভিপ্রায়, আবেগ
অভিমান সব স্পষ্ট লেখা আচ্ছে। মেয়েদের আবেগ অনেক বেশী তাই তারা স্বপ্নে ভেসে বেড়ায়।
বাস্তবের মাটি যে কত কঠিন তারা বুঝতে চায় না। ভোলা ভাবে তাকে তো আবেগে ভাসলে হবে না।
আবেগের মধ্যেই ছয় রিপু থাকে।
“ আবেগই নাচায়
মনকে তা থৈ তা থৈ
নিয়ে
ফেলে দেয় জলে অথৈ I”
সারথি বুদ্ধিকে দিয়ে আবেগকে দমন করতে হয়। তাদের বসে
না আনতে পারলে বিপদে পড়তেই হবে।
“ মন রজ্জুতে
বাঁধা ছয় রিপু অশ্ব তাহে
ক্রোধ,
লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য ও কাম
দুরন্ত
দুর্জয় দুর্দমনীয় ছয় অশ্বের এ নাম
সারথি
অনভিজ্ঞ হলে, অশ্ব বাগে থাকে না”
ভোলা
এখন ভালো ডাক্তার হতে চায়, আবেগকে প্রশয় দিতে চাইলো না তাই সে চিঠি দেবে না স্থির করলো।
দিন
সাত পর বিকাল মদন কাকু ভোলাকে বললো “ততে সামন্ত বাবু দেখা করতে কহিচন ।“
ভোলা
তার পরের দিন সকালা সামন্ত বাবুর বাড়ী গেল । সামন্ত বাবুকে প্রমান করে বললো
“ কাকু আমাকে ডেকেছেন ?”
“
বস, একটা ভালো খবর আছে । আমার ছেলে রাজী হয়েছে । তোমার কাকীমাকে নিয়ে বিপিনের বাড়ী
গিয়েছিলাম। কথা বলতে মা ও মেয়ের সেকি কান্না। বলে তারা গরীব, এই একটুখানি ভিটে ছাড়া
আর কিছু নেই। তার যতটুকু গয়না ও বাসন কোসন ছিল বিপিনের চিকিৎসায় সব বিক্রি করতে হয়েছিল। মেয়েকে যে একখানা
শাড়ী কিনে দেবে তার পয়সা ও নেই। সে ভেবেছিল মেয়ের বিয়ে আর দিতে পারবে না। আমি অনেক
করে বোঝালাম। বললাম আমরা গ্রামের সকলে আছি। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তোমাকে কিছু ভাবতে
হবে না। মেয়ে ভিতরে কোথাও ফোঁপাচ্ছিল, আমাদের সামনে এসে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলো। তোমার
কাকীমা তাকে ধরে এনে পাশে বসালেন ও চোখের জল মুছে দিলেন। কিছুক্ষণ পর আমি জিজ্ঞাসা
করলাম “ মা তোমার নাম কি ? নীচু গলায় মাথা না তুলে বলে “ভারতী পাত্র “ আমি জিজ্ঞাসা
করলাম “ভারতী মানে কি জান ?” বললো সরস্বতী ।
“তোমার
নামকরন সার্থক না ব্যর্থ ?”
কি
উত্তর দিল জান “আজ পর্যন্ত, ব্যর্থ সুযোগ পেলে সার্থক ও হতে পারে।“
আমি
বললাম “ কি রকম সুযোগ চাও ?”
সে
মাথা না তুলে বললো “ আমি তো সব ক্লাসের পুরনো বই জোগাড় করে পড়ছি। আমার মনে হয় প্রাইভেটে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিলে পাস করে যাব। এইভাবে পড়াশুনা
এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। আমার আর একটা ইচ্ছা আছে। পড়ার শেষে গ্রামে শিক্ষা বিস্তারে ব্রতী
হতে চাই। “ আমি বললাম “ ঠিক আছে, আমি দেখছি কি করা যায়।“
ভোলা
বললো “ কাকু আপনি মহান কাজ করছেন। এই কাজ করতে বুকের পাটা দরকার।“
“
ভোলা, আমি এখনো এ কথা প্রকাশ করি নি। তোমার তো এক মাস পরে ফল বেরতে আরম্ভ হবে। তুমি
ব্যস্ত থাকবে, তাবে আমার কাজটা সমাধা হবে কিকরে ?”
“
আপনি আশীর্বাদটা এর মধ্যে সেরে ফেলুন, টুকটুক করে অন্য কাজ গুছিয়ে নেয়। আমি বিয়ের সময়
যেখানে থাকি উপস্থিত থাকবো। আপনার এ কাজ সকলের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আপনি না থাকলে
এ মেয়েটার জীবন কতটা দুর্বিষহ ভাবে কাটতো চিন্তা করুন। কত মেয়ে দারিদ্রতা ও শিক্ষার
অভাবে নরকপ্রায় জীবন অতিবাহিত করে তার ইয়ত্তা নেই। “
ভোলা
মনে মনে বললো “ সৃষ্টিকর্ত্তা এই অভাগীদের পৃথিবীতে এনেছেন অসহনীয় দুঃখ কষ্ট ভোগ করার
জন্য।“
৭ম পরিচ্ছেদ
ভোলার প্রি ইউ এর ফল বেরিয়েছে । সে যেদিন কলেজে যাবে ফল জানতে
তার আগের রাতে ঘুমানোর সয়ম কিছুতেই মুঘ আসছে না। মনের মধ্যে এক আশঙ্কা ছিলই। তারপর
মাধুরীর সঙ্গে যদি দেখা হয় তবে কি বলবে ? মাধুরীর চিঠির জবাব পর্যন্ত দেয় নি । এতটা
অবজ্ঞা করা কি ঠিক হয়েছে ? নিজের স্বার্থের জন্য মাধুরীকে অবহেলা করা উচিৎ কিনা বুঝতে
পারলো না। আবার ভাবলো শুধু যদি বন্ধুত্বের সম্পর্ক হতো তবে চিন্তার ছিল না কিন্তু মধ্যে একটা প্রেমের
সুপ্ত বীজ লুকিয়ে আছে। প্রেমের কি কোনো মূল্য আছে ? প্রেম কি প্রচ্ছন্নভাবে কামনা চরিতার্থ
করার পথ ? বাস্তবে না হলেও কাব্যে, সাহিত্যে প্রেমের যশগাথা সর্বজনবিদিত। ভোলা ভাবছে
এর রহস্য কি I শারীরিক আকর্ষণ প্রাথমিক পর্যায়ে প্রেমের সৃষ্টি করে। তবে
দীর্ঘমেয়াদী হয় কিনা সন্দেহ আছে। কামনা ফুরালে প্রেমের পরিণতি হয়। চিরকালীন
সম্পর্কের জন্য মানসিক সম্পর্ক ও বোঝাপড়া বেশি জরুরি কারন শারীরির আকর্ষন ধীরে
ধীরে কমতে শুরু করে। ভোলা প্রি ইউ ক্লাসে হরমোনের ভূমিকার কথা সবিস্তারে
পড়েছে। প্রেমের অনুভূতি তৈরীতে অক্সিটোসিন হরমোন বড় ভূমিকা গ্রহন করে। তাই একে লাভ
হরমোন বলা হয়। এই হরমোন ছেলে ও মেয়েদের আলাদা আলাদা বয়স থেকে শুরু হয়। সাধারনত
বয়ঃসন্ধির পর মেয়েদের ১২-১৩ ও ছেলেদের
১৫-১৬ বয়স থেকে শরীরের পরিবর্তন শুরু হয়। স্বাভাবিক ভাবে এই বয়স থেকে মিলনস্পৃহা
দেখা দেয় ও প্রেমের উৎপত্তি হয়। এটা আমাদের আয়ত্তাধীন নয়। আপন নিয়মে পরিবর্তন হতে
থাকে। । প্রজনন জীবের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য
এরদ্বারা জীবের বংশবৃদ্ধি ও ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। প্রজননের জন্য শারীরিক
মিলন প্রয়োজন। তাই মিলনের জন্য বিপরীত লিঙ্গের আকর্ষন স্বাভাবিক। কিন্তু মনকে দৃঢ়
সংকল্প ও অভ্যাসের দ্বারা এই আবেগকে নিজের বসে রাখা যায়। মন যা চাইবে, তাই করতে
হবে এটা অন্যায় অনৈতিক। জীবনে প্রত্যেক কাজের নির্দিষ্ট সময় থাকে। তাই জীবনকে
চারভাগে ভাগ করা হয়েছে। ব্রহ্মচর্য,
গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ এবং সন্ন্যাস। ব্রহ্মচর্য কাল জ্ঞান
অর্জনের সময়। শিক্ষাকে জলাঞ্জলী দিয়ে আবেগের বসে গার্হস্থ্য জীবনে চলে যাওয়া সমীচিন
নয়। বিদ্যা অর্জনের সময় প্রেম আবেগকে দমন করাই বিধেয়।ছাত্র ছাত্রীদের সতর্ক
থাকা উচিত বলে ভোলা মনে করে। প্রেম করার জন্য জীবনে অনেক সময় পাওয়া যাবে। প্রেম মানসিক চাপ এবং সম্পর্কের
জটিলতা তৈরি করতে পারে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ভোলা
এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছে।
পরের
দিন সকালে মা বাবাকে প্রনাম করে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। কলেজে গিয়ে দেখলো অনেক
ছাত্র ছাত্রী জড়ো হয়েছে। তারা নোটিশবোর্ডের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে, ভোলা জায়গাই
পাচ্ছে না ফল কি হয়েছে দেখার। সে একটু দুরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। এই সময় এক
অধ্যাপক ঐ দিক দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ভোলা দেখে বললেন “ ভোলানাথ, তুমি আমার সঙ্গে
এসো, কথা আছে “
ভোলা তাঁর পিছন পিছন গিয়ে
স্টাফ রুমে ঢুকলো। তাকে ঢুকতে দেখে অন্যান্য অধ্যাপক বলে উঠলেন “ আরে ভোলানাথ এসে
গেছ, আমরা তোমার অপেক্ষায় ছিলাম। তুমি এই চেয়ারে বসো।“
ভোলা
সকলকে পা ছুঁয়ে প্রনাম করে বসলো। অধ্যাপকরা তার কাছাকাছি জড়ো হয়ে বসলেন। অঙ্কের
অধ্যাপক উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেল “ ভোলানাথ তো কামাল করে দিয়েছে। আমাদের কলেজে এমন
রেজাল্ট আগে কেউ কখনো করে নি। তুমি আমাদের কলেজে তো প্রথম হয়েছ, মেদিনীপুর জেলাতে
ও প্রথম হয়েছ, তোমার রাজ্যে দশের মধ্যে নাম থাকবে। আমরা সকলে তোমার জন্য গর্বিত।“
জীববিজ্ঞানের
অধ্যাপক জিজ্ঞাসা করলেন “ এরপর কি নিয়ে পড়বে ঠিক করেছ?
“আমার স্যার ডাক্তারী পড়ার ইচ্ছা আছে। আমি মেডিকেলে জয়েন্ট
দিয়েছি।“ খুব ভালো, দুতিন দিনের মধ্যে জয়েন্টের
রেজাল্ট বেরোবে, তুমি তিনদিন পর কলেজে চলে এসো, আমরা তোমাকে গাইড করে দেব। রামলাল ভোলানাথের
মার্কশিটটা বড়বাবুর কাছ থেকে এসো । ভোলানাথ অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করে যাবে।“
ভোলা মার্কশিট নিয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে করলো। তিনি বললেন “ ভোলানাথ
আমি খুব খুশি হয়েছি। তোমার স্টাইপেন্ড বাড়ানো সুপারিস করছি। যাও, বাড়ী যাও। আরো ভালো
কর।“ বেরিয়ে দেখলো ভীড় পাতলা হয়ে গেছে। মনে মনে চারদিক দেখলো মাধুরী আছে কিনা। কোথাও
দেখতে পেল না। সে নোটিশবোর্ডের কাছে গিয়ে মাধুরী নম্বর মিলিয়ে দেখলো খুব ভালো নম্বর
পেয়ে পাশ করেছে। বাড়ী ফেরার জন্য বাস রাস্তার দিকে এগলো। সকালের পর থেকে তার আর খাওয়া
হয় নি, সে ঘুগনি রুটি খেয়ে বাসে উঠলো। বাসে ভাবচ্ছে মাধুরীর সঙ্গে দেখা হয় নি ভালো
হয়েছে। দেখা হলে কথাবার্তা মান অভিমান করে বাড়ী যেতে মধ্য রাত হতো ও ওর প্রেমটা জাগিয়ে
উঠতো।। বাড়ীতে ঢুকতে মা জিজ্ঞাসা করলেন “ কিস হেলা রে, পাশ করিচু ?” “ হঁ মা, পাশ হেইচি”
“তোর সে ডাক্তর পড় হব না ?”
“ তার ফল বাহারি নি “
“ হউ, তু খাইতে আয়”
তিনদিন পরে ভোলা আবার কলেজে গেল। সে জীববিজ্ঞানের অধ্যাপকের
সঙ্গে দেখা করলো। স্যার বললেন “ ভোলানাথ, তোমার মেডিকেলে ভালো রেঙ্ক হয়েছে। মনে হয়
তুমি মেডিক্যাল কলেজে সুযোগ পেয়ে যাবে। তবে হস্টেলে থাকার ব্যবস্থা হতে দেরী হবে। তোমার
কলকাতায় থাকার কোনো জায়গা আছে ?”
“ না স্যার, আমার সে রকম জানাশোনা নেই ।“
“ তবে তুমি একটা কাজ কর। সাত আঠদিন পর মেডিকেল কলেজে যাও।
সেখানে যোগাযোগ করে জান কিভাবে ভর্তি হবে। আর আমি একটা ঠিকানা দিচ্ছি, সে মেডিকেল কলেজের
কাছে মেসে থেকে পড়াশুনা করে। ওর সঙ্গে দেখা কর। ও যদি কিছুদিন থাকার ব্যবস্থা করতে পারে।“
“ ঠিক আছে স্যার “ বলে সে বাড়ী ফিরলো।
ভোলা একটু দুশ্চিন্তায় পড়লো। সে কোনোদিন কলকাতায় যায় নি।
জানে কলকাতা পশ্চিম বঙ্গের রাজধানী। ইংরাজ আমলে ভারতের রাজধানী ছিল। শুনেছে বিরট শহর।
সেখানে একা একা গিয়ে ঠিকানা খুঁজে পাবে তো। ভোলা কিছু জামা কাপড় গুছিয়ে নিল। ষাওয়ার
আগের রাতে বাবা দুশত টাকা দিয়ে বললেন “ এটা জোগাড় করছি । সাবধানরে রহিবু।“
গ্রামে লোকের হাতে কাঁচা টাকা প্রায় থাকে না। ব্যবসা বা কেনা
বেচা কম হয়। তারপর মা পঞ্চাশ টাকা হাতে দিয়ে বললেন “ এইটা রখি থা। আউ ম পাখরে নাই।
কেতে দিনরু গটে গটে রখিথিলি।“ ভোলা মায়ের চোখে জল দেখতে পেল। তারও দুই চোখ থেকে কান্নার
বন্যা বেরিয়ে আসতে চায়। ভোলা কোনোক্রমে নিজেকে সামলালো।
পরের ভোরে ভোলা বেরিয়ে পড়লো অজানার সন্ধানে। খড়্গপুরে গিয়ে
লোকাল ট্রেনের টিকিট কেটে প্লাটফর্মে দাঁড়ালো। সে কোনদিন ট্রেন দেখে নি । অন্য লাইন
দিয়ে ট্রেন মালগাড়ী ছুটছে। ভোলা অবাক হয়ে ভাবছে আরে বাবারে, কত বড়: দেখতে দেখতে খালি
লোকাল ট্রেন এসে দাঁড়ালো। ভোলা উঠে জানলার ধারে হাওড়ার দিকে বসলো। একটা তীক্ষ্ণ হুইসেল
দিয়ে ছুটতে আরম্ভ করলো। শহরটা পেরোতে গ্রামবাংলার অপরূপ রূপ দেখে চোখের পাতা পড়ে না।
“অবারিত মাঠ, গগনললাট চুমে তব পদধূলি,
ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি।
পল্লবঘন আম্রকানন রাখালের খেলাগেহ,
স্তব্ধ অতল দিঘি কালোজল-- নিশীথশীতল স্নেহ।
বুকভরা মধু বঙ্গের বধূ জল লয়ে যায় ঘরে--
মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে।“
লাইনের ধারের জলাশয়ে পদ্মের
সমারোহ। মাঝে মাঝে গ্রামের পাশ দিয়ে ট্রেন ছুটছে লোকেরা কাজ করছে, মহিলারা কলসি করে
জল নিয়ে যাচ্ছেন। কখনো হাটের পাশ দিয়ে যাচ্ছে। “ উচ্ছে বেগুন পটল মুলো” বিক্রি হচ্ছে
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ভোলার একটি কবিতা মনে পড়লো।
“দূরে
দূরে
গ্রাম
দশ
বারোখানি
, মাঝে
একখানি
হাট
সন্ধ্যায়
সেথা
জ্বলে
না
প্রদীপ,
প্রভাতে
পড়ে
না
ঝাঁট।
বেচাকেনা
সেরে
বিকেলবেলায়
যে
যার
সবে
ঘরে
ফিরে
যায়;”
ভোলা তন্ময় হয়ে দেখছে। হঠাৎ ট্রেনের গতি মন্থর হয়ে
গেল। একটু চলে একটু দাঁড়ায়। যাত্রীরা বলছে হওড়া এসে গেছে। ধীরে ধীরী ট্রেনটি প্লাটফর্মে
দাঁড়ালো। স্রোতের মতো লোক নামতে শুরু করলো। ভোলাও নেমে অবাক। হাওড়ায় নেমে গেল ঘাবড়ে।
কত বড় ষ্টেশন তবু তিল ধারনের জায়গা নেই। লোকে লোকারণ্য্। কোনদিকে যাবে জানে না। লোকের
স্রোত যেদিকে যাচ্ছে, সে তাদের সঙ্গে চললো। এক সময় ষ্টেশনের বাইরে এসে গেল। দেখলো প্রচুর
বাস দাঁড়িয়ে। একজনকে জিজ্ঞাসা করে একটা বাসে উঠে পড়লো। টিকিট কাটার সময় কন্ডাক্টরকে
বললো “ আমি মেডিকেল কলেজে যাব, যেখানে নামতে একটু নামিয়ে দেবেন। কন্ডাক্টার মাথা নাড়লো।
সেন্ট্রাল এভিনিউ আসতে কন্ডাক্টর বললো “ এখানে নেমে রাস্তা পেরিয়ে সোজা চলে যাও “
ভোলা নেমে দেখলো গাড়ী পর গাড়ী পিঁপড়ের সারির চলছে,
পেরবে কি করে। বেশ কিছুক্ষণ পরে দুপাশে গাড়ী থেমে গেল। ভোলা এক নিঃশ্বাসে দৌড়ে রাস্তা
পেরিয়ে সোজা হেঁটে মেডিকেল কলেজে গেল। অফিসে গিয়ে জানলো যে তার যে রেঙ্ক আছে ঐ কলেজে
ভর্তি হতে পারবে। তাকে একটি ফর্ম পুরন করিয়ে ভর্তি করা হলো। পনেরোদিন পরে ক্লাস আরম্ভ
হবে। দু তিন মাসের পরে কলেজ হোস্টেলে শিট পাওয়া যাবে। ওখান থেকে বেরিয়ে কিছু খেয়ে ছেলেটির
মেস খোঁজা শুরু করলো। ছেলেটির সঙ্গে দেখা করে স্যারের কথা বললো। ছেলেটা বললো “ তুই
তো আজ ফিরতে পারবি না। আমি দেখি মেসে কেউ আজ নেই। তুই ওইখানে রাত কাটিয়ে কাল সকালা
বাড়ী ফের। আমি দেখবো দু তিন মাস কোথাও রাখা যায় কিনা।“ ভোলা তারপর দিন বাড়ী ফিরলো।
খওয়া দেৃওয়া করার পর মা জিজ্ঞাসা করলেন “ কি হেলা রে, চালিয়াইলু ?”
“
ভর্তি হেই যাইচি, কলেজ খুলতে পনের কুড়ি দিন বাকী অছি । মা লিয় তুমর পঞ্চাশ টকা, রখি
দিয়। তুমে সারা জীবন এইটিকে রখিছ। মোতে ডাক্তার হেইতে দিয়। তুমর কিছি অভাব রহিব নি।“
এরমধ্যেই
গ্রামে রটে গেছে যে সামন্ত বাবুর ছেলের সঙ্গে ভারতীর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, আশীর্বাদও
হয়ে গেছে। এই বিয়ে গ্রামের মানুষের কাছে অভিনব কারণ এ একটি অসম বিবাহ। মেয়ে দরিদ্র
নিঃস্ব ও জাতে ছোটো। আমাদের গ্রামে মিত্র,
গুহ, দত্ত, দে, রায়, দাস, পাত্র,কামিলা, বারিক, সামন্ত পদবীর লোক বাস করে। সকলেই কৃষিজীবী।
এরা চারবর্ণের মধ্যে শূদ্র বলে পরিচিত কারণ এরা ফসল ফলিয়ে উচ্চ তিন বর্ণের সেবা করেন।
কিন্তু ভাবনার বিষয় শূদ্রের মধ্যে উচ্চ নীচের ভেদাভেদ এল কি করে। আমাদের সংবিধানে
৩৬৬(২৪) অনুচ্ছেদে এদের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত আর্থসামাজিক জনগোষ্ঠী তপসিতি জাতি বলে স্বীকৃত
হয়েছে । ইংরাজ আমল থেকে এরাই নিপীড়িত নির্যাতিত হয়েছে ও হচ্ছে। এদের মধ্যে ভাগ করে
এক্যবদ্ধ হওয়ার অন্তরায় সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য এবং জাতিভেদ প্রথা শুরু হয়েছিল। ক্রমে পেশার ভিত্তিতে
জাতিভেদ আরম্ভ হয় এবং জন্মসূত্রে তা চলতে থাকে। যেমন মেথরের ছেলে মেথরই হবে সে ভিন্ন
কাজ বা বিদ্বান হলেও। একেই বর্ণের মধ্যে কিছু জাতি অন্যদের চেয়ে উচ্চ বা নিম্ন অবস্থানে
থাকতে আরম্ভ হয়। জাতিগত সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য অন্ত্যবিবাহ
বা স্ববর্ণে বিবাহের প্রথা চলতে থাকে। এই অন্ধ বিশ্বাস সমাজের প্রভূত
ক্ষতি করে আসছে।
এইরূপ জাতিভেদের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই কিন্তু
বংসানুক্রমে চলে আসা বিশ্বাস মনের গভীরে শিকড় ছড়িয়েছে। তাই সহজে মেনে নেওয়া কঠিন ছিল
কিন্তু সেইরূপ প্রতিবাদ হলো না। ভোলা ভাবলো এই বিয়ে দিয়েই ভুতের সঙ্গে লড়াই শুরু হলো।
আরও অনেক পথ এগোতে হবে।
এক
স্থানে রই এক ভাষায় কথা কই
ব্যাপৃত
রহেছি একেই কাজে।
একসাথে
খেলা করি, পাঠশালা যাই
বিভেদ
কেন সমাজের মাঝে।।
পরের
দিন সকালা ভোলা গেল সামন্ত বাবুর বাড়ী। ভোলাকে সামন্ত বাবু বললেন “ ভোলা বসো,
তোমার সঙ্গে কথা আছে।“ ভোলা বসলে তিনি বলেন “ বিয়ের দিন ধার্য হয়ে গেছে, আর
কুড়িদিন পর। তুমি তারপর কলকতা যেও। ভারতীকে আমি মাধ্যমিকের বই কিনে দিয়েছি। যতদিন
আছ ওকে একটু দেখিয়ে দাও। ফর্ম ফিলাপ হয়ে গেছে আর তিন মাস পর পরীক্ষা। আর ভারতীর
বাড়ীতে যেসব অনুষ্টান হবে,তার দেখাশুনা তুমি করবে।‘ ভোলা আগ্রাহ্নিত হয়ে বললো “ঠিক
আছে, কাকু।“
দেখতে দেখতে বিয়ের দিন এসে গেল। এর মধ্যে
ভোলা ভারতীর বাড়ী কয়েকবার গেছে তার পড়শুনা কেমন চলছে দেখার জন্য। মেয়েটির মেধা আছে, স্মৃতিশক্তি প্রখর, একাগ্র
চিত্ত, যে কোনো বিষয় দ্রুত রপ্ত করতে পারে।
গ্রামাঞ্চলে বাঙালি বিবাহ হল সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের
উদযাপন। এই আচার-অনুষ্ঠানগুলি প্রাণবন্ত আচার-অনুষ্ঠান এবং রীতিনীতির চমৎকার সংমিশ্রন । সমস্ত বাঙালি বিবাহের
আচার-অনুষ্ঠান মিলন ও ভাববিনিময়ের জন্য একটি দুর্দান্ত আনন্দের মুহূর্ত। বংশবিস্তারে নারী পুরুষের মিলন একান্ত প্রয়োজন। প্রজনন
জীবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বিবাহ একজন নারী ও একজন পুরুষের মিলিত হওয়ার ছাড়পত্র। অগ্নি
ও বিয়ের সময়ে উপস্থিত ব্যক্তিকে সাক্ষী রেখে মিলনে স্বীকৃতি দেওয়ার সামাজিক অনুষ্ঠান।
“পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা।“গ্রাম-গ্রামে পথ বলতে কিছু ছিল না। তাই গাড়ী ঘোড়ার দেখা পাওয়া যেত না। বাংলার
হাজার বছরের প্রাচীন বিয়ের ঐতিহ্য পালকি। এ বাহনে চড়া দারুণ মজা। বিয়ে উৎসবে পালকির
কদর ছিল সবচেয়ে বেশি। এই সময়ে বিয়েতে পালকিই
ছিল একমাত্র বাহন। বিয়ের জন্য পালকি ছিল খোলামেলা, নস্কা করা বিভিন্ন রঙের ও দুপাশে দুটি চেয়ার বর কনে বসার জন্য থাকতো। গ্রামীণ
আঁকা-বাঁকা মেঠো পথে, কখনও আলপথে বর-কনে পালকি চড়ে উভয়ের শ্বশুর বাড়িতে আসা-যাওয়ার
আনন্দঘন মুহূর্ত । গ্রামের পথে পালকিতে করে নববধূকে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে গাঁয়ের
সব ধরনের মহিলা ও উঠতি বয়সের চঞ্চল মেয়েরাও রাস্তার ধারে জড়ো হতো। পালকি মানুষের ঐতিহ্যবাহী
প্রাচীন বাহন ছিল। বরকে পালকিতে নিয়ে বেহারারা নির্দিষ্ট ছন্দের তালে তালে, তাল মিলিয়ে সুর করে দ্রুত গতিতে চলতো। তার সঙ্গে বরযাত্রি ও ঢোলক,
কাঁসর, কম দামের সেক্সোফোনের
মতো বাজনাদার যেত। বরযাত্রীরা পায়ে হেঁটে বরের পালকির সামনে পিছনে যেত
ও পরের দিন বর কনের সঙ্গে ফিরতো। রাত্রি যাপনের কনের বাড়ীতে করতেন। গোবর নিকানো উঠানে চারটি বাঁশ পুঁতে তৈরি হত ছাতনাতলা। হ্যাজাক লণ্ঠন জ্বেলে রাতের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হতো। একসময় বর নিয়ে বরযাত্রীর দল বিয়ের আসরে ঢুকলেই শঙ্খধ্বনির
সঙ্গে বর বরণ করা হতো । গ্রামাঞ্চলে মূলত পুরোহিতরা ঘটকালির কাজ করতেন। যজমানির সুবাদে তাঁরা বিভিন্ন গ্রামে ঘুরতেন। তাই পাত্র কিংবা পাত্রীর খোঁজখবর থাকত তাঁদের নখদর্পণে। পাত্রপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী পাত্রী কিংবা পাত্রীপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী পাত্র যোগাড়ের অন্যতম মাধ্যমই ছিলেন ওইসব ঘটকেরা। কুষ্টি মিলিয়ে রাজযোটক বিয়ে সংঘটিত করার জন্য পাত্র-পাত্রী উভয় পক্ষের কাছেই ভালো রকম পারিশ্রমিক পেতেন। বন্ধু বান্ধবকে বিয়ের
নিমন্ত্রন করতে বাড়ীর কোনো সদস্য গিয়ে সুপারি দিয়ে আসতে হতো।
মনুসিংহতায় সেকালের অবস্থা অনুসারে ৮ ( আট) রকমের বিবাহ-
পদ্ধতির বর্ণনা আছে। যেমনঃ-
১। ব্রাহ্ম বিবাহ ২। প্রজাপত্য বিবাহ ৩। আর্য্য বিবাহ ৪। দৈব বিবাহ ৫।
অসুর বিবাহ বা আসুরিক বিবাহ ৬। গন্ধর্ব
বিবাহ ৭। পিশাচ বা পৈশাচিক বিবাহ ৮। রাক্ষস বিবাহ। তখন সমাজে প্রজাপত্য বিয়েরই প্রচলন ছিল।মহাভারতে রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে
গন্ধর্ব মতে বিয়ে করছিলেন উল্লেখ আছে। বিয়ের প্রথম অনুষ্ঠান আইবুড়ো ভাত। ছেলে ও মেয়ের
বাড়ী ও আত্মীয় বাড়ীতে নুতন কাপড় পরিয়ে নানা ব্যঞ্জনসহ খাওয়ানো হতো। বিয়ের দিন ছেলে
মেয়ে দুজনে উপোস করে থাকতো ও সকালে সারা শরীরে হলুদবাটা মাখিয়ে পাঁচজন এয়োস্ত্রী মিলে
স্নান করাতো। মেয়ের বাড়ীতে সারা রাত ধরে অনুষ্ঠান চলতো।ব্রাহ্মণ ছাদনা তলায় বিয়ের আসর
বসাতেন ও নাপিত তাঁর সহযোগী থাকতেন। আমকাঠ দিয়ে যজ্ঞকুন্ড হতো। ব্রাহ্মণ বিভিন্ন মন্ত্র
পাঠ করতেন। প্রধান দুটি মন্ত্র থাকতোই:-
“ ওম শ্রীম হ্রিম ক্লীম শ্রীম ক্লীম বিশ্বেশ্বরায় নমঃ “
" যদিদং হৃদয়ং তব/তদিদং হৃদয়ং
মম"
ছাদনাতলায় প্রথমে বর কনে সামনা সামনি
বসতো Iশুভ দৃষ্টি সবচেয়ে সুন্দর বিবাহের রীতিনীতিগুলির মধ্যে
একটি, যখন বর এবং কনে
তাদের বিয়ের দিনে প্রথমবারের মতো একে অপরকে দেখেন। কনে দুইচোখে পান পাতা দিয়ে মুখ
ঢেকে রাখতো এবং পান পাতা সরিয়ে চার চোখের মিলন হতো। বর ও কনে যজ্ঞাগ্নির চারপাশে সাতবার প্রদক্ষিণ
করতো। বিশ্বাস করা হয় যে এই মুহূর্তটি সৌভাগ্য এবং সুখ বয়ে আনে। তারপর হতো
মালা বদল। তখন বর কনে পাশাপাশি
বসার সুষোগ হতো। ঐ সময় কনের বাড়ীর ছোটো ছেলেরা আড়াল থেকে বরের পিঠে ঢিল মারতো
ঢপাঢপ। তাদের কিছু টাকা দিলে ঢিল মরা বন্ধ হতো। বর কনের কপালের সিঁথিতে সিঁদুর
পরিয়ে দিত। শেষের অনুষ্ঠান খই পুড়ানো। মেয়ের ভাই বা দাদা বর কনের হাতে খই দিত,
তারা যজ্ঞ কুন্ডে উৎসর্গ করতো। ভারতীর ভাই ছিল না বলে, ভোলা এই কাজটি করছিল। বিয়ে
হতে হতে প্রায় ভোর। বর কনেকে খেতে দাওয়া হতো। খাওয়ার পর তারা ও বর কনের বন্ধুরা
বাসর জাগতে যেত। পরের দিন, নববধূর পরিবার তাকে বিদায় জানায়
যখন সে তার বরের সাথে নতুন জীবনের জন্য তার পিতামাতার বাড়ি থেকে রওনা হয়। ঐ সময়
কনে বাড়ীর ও প্রতিবেশী মহিলারা নানা কথা সুর করে উচ্চস্বরে কাঁদতে থাকেন। পুরো
পরিবেশ দুঃখ ও আনন্দের মিশ্র আবেগে ভরে
ওঠতো।
কনে যত কাঁদে তার শতগুণ
কাঁদে মা, আত্মীয় পরিজন।
মেয়ের বাড়ীর অনুষ্টান শেষ এবং শুরু হয় ছেলের বাড়ীর অনুষ্ঠান। বর বৌ ছেলের
বাড়ী পৌঁচালে প্রথম হয় বধুবরণ। ছেলের মা বা মাতৃসমান মহিলা নববধুকে কাঁসার থালায়
ধান দূর্বা প্রদীপ শঙ্খ নিয়ে বরণ করেন।পরের দিন কালরাত্রি পালন হয়। ঐদিন বর বৌর
দেখা সাক্ষাৎ করা নিষেধ তাই বৌ প্রতিবেশী কারোও বাড়ীতে সারাদিন লুকিয়ে থাকে। কার
বাড়ীতে আছে বরকে জানানো হয় না। ঐদিন বিকালে যখন বৌ স্নান করে তখন হয় কাদাখেলা।
পুকুর থেকে কাদাপাঁক তুলে একে অপরে মাখায়।এখানে বলে রাখি গ্রামে কারোও বাড়ীতে
অনুষ্ঠান তাদের বন্ধুবান্ধব আত্মীয় স্বজন তিন চার দিন আগে থেকে অনুষ্টানের শেষ
পর্যন্ত বাড়ীতেই থাকতেন। তাই প্রচুর লোক কাদা নিয়ে একে অপরের পিছনে ছোটে, ধরে কাদা
মাখায়। সেকি হৈ হুল্লোড়। কারো লুকিয়ে থাকার উপায় নেই। ঘন্টা দুয়েক পরে দেখা যায়
সকলে সারা শরীর কাদায় ভর্তি ভুতের মতো ঘুরে বেড়ায়।পরের দিন বৌভাত ও রাতে লোকজনকে
খাওয়ানো ও ফুলসজ্জা। পরের দিন থেকে অষ্টমঙ্গলা আগের দিন পর্যন্ত বিকালা বর বৌকে
নিয়ে মহিলারা কড়ি খেলা হয় । কড়ি খেলা যে কি আনন্দের হয় তা খেলা না দেখলে ভাষায়
প্রকাশ সম্ভব নয়। কড়ি খেলা বৌ এর মন খারাপ থেকে এবং সকলের সঙ্গে পরিচিত হতে
সাহায্য করে।
সমস্ত অনুষ্ঠার ভালোয় ভালোয় মিটে গেল। গ্রামের প্রায় লোক ভারতীর মাকে কিছু
কিছু সাহায্য করে কাজ সমাধা করেছে। কাজ মিটে গেলে ভোলা কলকাতা গেল।
৮ম পরিচ্ছেদ
ভোলা
কলকাতায় কিছুদিন অন্য জায়গায় থেকে কলেজ হোস্টোলে আসন পেয়ে সেখানে থাকতে গেল। হোস্টলের
নামে তার এক আতঙ্ক ছিল। সে শুনেছিল কলেজ হোস্টলে রেগিং হয়। কিন্তু সে রকম কিছু দেখলো না। তিন চার দিন পর পাঁচ
জন সিনিয়র ছাত্র্র ঘরে এসে আড্ডা দিয়ে বলে গেল তারা পরিচয় করার জন্য এসেছিল এবং কিছু
দরকার হলে তাদের জানাতে। ভোলার প্রিয় বিষয় ছিল ডাক্তারী এইটা পেয়ে সে খুব খুশি তাই
জান প্রাণ দিয়ে পড়াশুনা করচ্ছে। ছয় সাত মাস পর বাড়ী গিয়ে জেনেছে ভারতী মাধ্যমিক প্রমথ
বিভাগে পাশ করেছে ও প্র্রি ইউতে ফর্ম জমা করে দিয়েছে । সে কলা নিয়ে পড়ছে। ভোলা ভারতীর
সঙ্গে দেখা করতে গেলে সে ভোলাকে প্রনাম করে ও
নিজের দাদার মতো ব্যবহার করে। বলে “ দাদা, আমি শশুর মশাইকে বলেছি একটা স্কুল
খোলার কথা । তিনি রাজী হয়েছেন।। আমি শিক্ষার প্রসারে ব্রতী হবো।“ ভোলা বললো “ তুমি এগিয়ে যাও, আমি পাশে আছি।“
ভোলাকে কলকাতায় চার থেকে পাঁচ
বছর থাকতে হবে। এই এক বছরে প্রাণ হাঁপিয়ে উঠেছে। প্রকৃতি এখানে অদৃশ্য। সবরকম বৈষম্য
এখানে সবখানে দৃশ্যমান। যে ফুটপাতে অভুক্ত অর্ধউলঙ্গ শিশু কিশোর কিশোরী বুড়ো বুড়িি
পড়ে আছে. সেই ফুটপাতের ধারে রাজকীয় প্রাসাদ, জৌলুসের বাহার খাবারের সমারোহ। মূল্যবোধ স্নেহ, শ্রদ্ধা, ভালবাসার স্পর্শ নেই।
কোথাও নেই সবুজের চিহ্ন । কয়লা উনুনের ধোঁয়া, শব্দ, কোলাহল, কোথাও কোথাও পুঞ্জীভুত
ময়লা বৃষ্টির জলে পচে দুর্গন্ধে ভরিয়ে দিচ্ছে। ময়লার জল রাস্তায় জমে জায়গাকে নরকে পরিণত
করেছে। এক পশলা বৃষ্টিতে রাস্তা, গলি, বস্তিতে জল দাঁডিয়ে যাচ্ছে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ।
মানুষের নৈতিক, চারিত্রিক অধপতন মনকে ব্যথিত করে। অসাধু ব্যবসায়ী, চোর গুন্ডা, ঠক বাটপাড়,
নষ্ট চরিত্রের মহিলা পুরুষদের আখড়া, সহমর্মিতা, সুহানুভূতি প্রভৃতি সুকুমার বৃত্তিগুলো
মন থেকে উধাও। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে,
শহরে
যানজট
লেগেই থাকে । কথা নেই বার্তা নেই মিছলের
পর মিছিল চলছে পিলপিল, জনজীবন বিপর্যস্ত । ভোলার পড়া শেষ হলে গ্রামে ফিরে যাবে ঠিক
করেছে।
প্রায় বছর দেড়েকের পর সে বাড়ী
গেছে। পরদিন সকালা সামন্ত বাবুর বাড়ী গেল খবরাখবর নিতে। ভারতী ভোলাকে দেখে খুব খুশি।
বলে “ জান দাদা, শশুরমশাই দুবিঘা জমি দিয়েছেন স্কুল করার জন্য। গ্রামের লোকেরা তিনটা
ঘর মাটির দেওয়াল তুলে দেবে। বর্ত্তমান খড়ের চাউনি দিয়ে কাজ চালানো হবে। সরকারের স্বীকৃতি
পেলে স্কুলকে বড় করার পরিকল্পনা হবে। কি বল দাদা ?”
“ ঠিকই বলেছ। আমি ও পড়া শেষ
হওয়ার পর গ্রামে চলে আসবো। তোমাদের সঙ্গে কাজ করবো। কুসংস্কার ভুতকে তাড়াতেই হবে।“
“
দাদা, একজন বিজ্ঞানের শিক্ষক দরকার। আমার এই বছর গ্রেজুয়েশান হবে যাবে। তারপর শুরু
করে দেব।“
“
কাকু কই ?”
“
উনি গ্রামের কারোর বাড়ীতে গেছেন।“
“
ঠিক আছ, আমি এখন আসি “
ভোলা
সাতদিন পর কলকাতায় ফিরলো। তার খুব ভালো লাগছে। স্কুলটা হয়ে গেলে খুব ভালো হবে। শুধু
গ্রামের নয় পার্শ্ববর্তী গ্রামের ছেলে মেয়েরাও পড়তে পারবে। ভোলা খঙগপুরে লোকাল ধরলো।
ট্রেন যাত্রা তার বেশ আকর্ষণীয়। গ্রাম বাংলার প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ
করা যায়। প্রকৃতি আমাদের জন্য তার সৌন্দর্য সাজিয়ে অপেক্ষা করে, শুধু দেখার চোখ
চাই। খোলা জমিতে চাষবাস, মাঝে মাঝে তাল, খেজুর, কাশফুলের বন এবং অচেনা গাছের ভিড়। খোলা আকাশে কত রকম পাখি ওড়ে বেড়ায়।
‘ “ “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায়
ভালোবাসি।“
প্রকৃতির দৃশ্য দেখতে দেখতে ট্রেন মেছেদায় থামলো।
লোক নামছে উঠছে। ভোলার চোখ একটা মেয়ের মুখে আটকে গেল। মাধুরী না, এ তো মাধুরী। ভোলার
মন হঠাৎ উদাস হয়ে গেল। কতদিন ওকে দেখে নি। ভোলার কামরায় সে উঠে সামনের সিটে বসলো। ভোলার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই ভোলার শরীরে
এক বিদ্যুৎ তরঙ্গ প্রবাহিত হয়ে গেল। এই তরঙ্গের একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। ভাবলে
মানুষের মাথায় এক তরঙ্গ তৈরী হয়। যদি সেটা কারোর প্রতি ভালোবাসার তরঙ্গ হয় তবে সেটা
বাইরে বেরিয়ে ভলোবাসার মানুষের শরীরে এসে ঢোকে । একেই হয়তো টেলিপ্যাথি বলে। মাধুরী
সেই যে চোখ নামালো আর তুললো না। তার মুখে এক অভিমানে ছায়া ভোলা দেখতে পেল। অনুরাগ থাকলে
অভিমানে সৃষ্টি হয়। মাধুরী কিছুতেই মুখ তুলছে না। ভোলা ভাবছে প্রচন্ড রেগে গেছে। রাগ
ও অভিমানের মধ্যে পার্থক্য আছে। শত্রুর উপর রাগ হয় কিন্তু বন্ধুর প্রতি অভিমান। মাধুরী
মেয়েটা ভালো "মাধুরী"
শব্দের অর্থ হলো মিষ্টত্ব, কমনীয়তা,
সৌন্দর্য এবং করুণার সংমিশ্রন। এটি "মধুরা" শব্দ
থেকে এসেছে । নামের সঙ্গে ওর চারিত্রিক
বৈশিষ্ট্যের মিল আছে। সুন্দরী, কথার মধ্যে মাধুর্য আছে। দয়া, মমতার প্রতিমূর্তী ও বুদ্ধিমতী।
এতদিনের পরও ওর ভালোবাসার ভাটা পড়ে নি। আবেগ হলে উবে যেত। ভোলার মনে হয় মাধুরীর প্রতি
তার আকর্ষণ বেড়েছে। ভাবতে ভাবতে ট্রেন হাওড়া ষ্টেশনে ঢুকল। মাধুরী সারা রাস্তা মুখ
নীচু করে বসে ছিল। ট্রেনের মধ্যে মান ভঞ্জন করা চাপের ছিল। সম্স্ত যাত্রী এই নাটক উপভোগ
করতো। ভোলা ট্রেন থেকে নামলো, পিছনে পিছনে মাধুরীও নামলো। ভোলার পাশাপাশি সে হাঁটছে।
ভোলা কোনো কারণে থামলে সেও থামছে। যাতায়াতের রাস্তায় কথা বলা শোভনীয় নয়। ভোলা এসে সাধারণদের
অপেক্ষা করার ফাঁকা জায়গায় দাঁড়ালো। মাধুরীও ভোলার পাশে দাঁড়ালো। ভোলা মাধুরী চোখে
তাকাতে দেখলো, জলে পরিপূর্ণ , এখুনি ভাসিয়ে দেবে সবকিছু।
ভোলা
জিজ্ঞাসা করে “কেমন আছ ?” কোনো উত্তর নেই।
“ দেখ মাধুরী, তোমাকে এড়িয়ে
যাওয়ার ইচ্ছা আমার নেই। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিটা তোমাকে জানতে হবে। আমার মেয়ে বন্ধু
বলতে একমাত্র তুমি। আমার মনের মধ্যে তুমি আছ ও থাকবে। প্রত্যেক কাজের এক নির্দিষ্ট
সময় আছে। আমার স্থির বিশ্বাস ছিল তোমার সঙ্গে ঠিক সময়ে দেখা হবে, দেখ, তাই হলো।“
মাধুরী এ বার বলতে আরম্ভ করে
“ প্রায় আড়াই বছর হয়ে গেল, বল কেমন লাগে?”
“ কোনো শুভক্ষণের জন্য ধৈর্য
ধরত হয়। আবেগ বসত কোনো কাজ করলে পরে পস্তাতে হয়। এবার বলো কি করছ?”
“ আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে
পদার্থবিদ্যায় এম এ সি করছি “
“ বাবা, সোনার মেয়ের সোনার
ক্যারিয়ার, তোমার সঙ্গে কথাই বলা যাবে না।“
“ তোমার কিছু খবর রাখি না
মনে করেছ? তুমি কলিকাতা মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ছ।“
“ তুমি গোয়েন্দা নাকি? খবরের
সোর্স কি?”
“ ইচ্ছা থাকলে সবই হয়। জীবনবিজ্ঞানের
অধ্যাপকের কাছ থেকে জেনেছি।।“
“ আমার ব্যাপারে আগ্রহ দেখে
খুব আনন্দ পেলাম। শোনো তোমার সঙ্গে জরুরী কথা আছে। তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ে আস আমি মেডিকেল
কলেজে থাকি। এত পাশাপাশি থাকি তবুও আমাদের দেখা হয় না। এই হচ্ছে কলকাত। তুমি একটা কাজ
করবে। কলেজ হোস্টলের নীচ তলায় গিয়ে বলবে আমাকে ডেকে দিতে। তোমাকে নিয়ে আমি বেরবো এবং
একটা কোথাও নিরিবিলি জায়গায় বসে আমার জমানো কথাগুলো বলবো। তোমার আপত্তি নেই তো?”
“ আপত্তি থাকলে যাব না। এটা
ক্রমশ প্রকাশ পাবে।“ বলেই মুচকি হাসলো। এই হাসির মধ্যে অনেক কিছু লুকিয়ে আছে ভোলা বুছতে
পারলো। “সাবধানে যেও।“ এরপর তারা বাস স্ট্যান্ডের দিকে চললো।
প্রত্যেকদিন
ভোলা ভাবে আজ নিশ্চয় মাধুরী আসবে। এইভাবে প্রায় এক সপ্তাহ গেল। ভোলা ভাবলো মাধুরী আর
আসবে না, হয়তো মত পাল্টেছে। তার দুতিন পর হোস্টেল বয় এসে ভোলাকে বললো “স্যার, আপনাকে
নীচে এক দিদিমণি ডাকচ্ছেন।“ ভোলা ড্রেস করে নীচে নামতেই মাধুরীর সেই রহস্যময়ী হাসি,
বলতে চাইছে দেখ অপেক্ষা করার কত জ্বালা। তারা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়েলে গিয়ে একটা ফাঁকা
বেঞ্চে বসলো।
ভোলা বললো “ জান, আমি ভুতের সঙ্গে লড়াই করছি।“ শোনার সঙ্গে সঙ্গে
মাধুরীর মুখটা ফাকাসে হয়ে গেল। “ সে আবার কি ?” “ভয় পেও না, আমাদের গ্রামাঞ্চলে অনেক কুসংস্কার
ও অন্ধবিশ্বাসের ভুত মানুষের মাথায় বসে আছে, আমি লড়াই করে তাদের তাড়াতে চাই। আমি একা
নয়, গ্রামে আমার এক বোন আছে, ভারতী, সে ইংরাজী অনার্স নিয়ে পড়ছে। সে বিবাহিত, তার শশুরমশাই
গ্রামে এক বিদ্যালয় করছেন, মাস ছয়েকের মধ্যে ক্লাস আরম্ভ
হয়ে যাবে। তারপর সমস্ত ঘটনা খুলে বললো। তুমি কি আমাদের সৈনিক হবে ?”
“ আমাকে কি করতে হবে?”
“ তুমি আমাদের পাশে থাকবে।“
“আমি ওখানে শিক্ষকতা করতে পারবো”
“আমি পড়ার পর গ্রামেই থাকবো। তুমি শিক্ষকতা করতেই পার কিন্তু মাইনা পাবে না
যতক্ষণ স্কুলটা স্বীকৃতি পায় কিন্তু তোমার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। তোমাকে এখন
সিন্ধান্ত জানাতে হবে না। তুমি আমাদের গ্রামটা ঘুরে আসতে পার।“ “তাই হবে, তোমার সঙ্গে তোমার গ্রামে যাব। কবে নিয়ে
যাবে ?”
মাধুরীকে ভোলা তার গ্রামে
নিয়ে গিয়েছিল। তখন স্কুলের কাজ শুরু হয়ে গেছে। মাধুরী ভারতীর কাছে সাতদিন ছিল।
এরমধ্যে তাদের বন্ধুত্ব জমে উঠেছে। কলকতা ফেরার আগের দিন ভারতী ভোলাকে বললো “ দাদা
মাধুরী খুব ভালো মেয়ে। সে আমাদের স্কুলে কাজ করতে রাজি হয়েছে। দাদা, একটা কথা
বলবো, তুমি রাগ করবে নাতো। মাধুরী তোমাকে প্রচন্ড ভালবাসে। তোমার জন্যই তো এই
ধড়ধড়ে গোবিন্দপুরে থাকবে ঠিক করেছে। মেয়েরা প্রথম যাকে হৃদয় আসনে বসিয়ে দেয় তাকে
আর সরাতে পারে না। সে তার মনের কথা সামনা সামনি বলতে পারছে না।
“ আমার ওতো একেই অবস্থা।
ভাবতাম যদি কিছু মনে করে।“
“ তোমাদের ভালো ছেলেদের এই
একটা রোগ; তোমাদের বেটে খাওয়ে দিতে হয়।“
ভোলা ডাক্তারী পাস করে
গ্রামে প্রাকটিস করে, কাছের শহরেও যায়। প্রসার খুব জমে উঠেছে। মাধুরী স্কুলে
শিক্ষকতা করে। স্কুলের সরকারী স্বীকৃতি হয়ে গেছে। স্কুল বড় করার কাজ চলছে। গ্রামে
অন্ধ বিশ্বাস ধীরে ধীরে কমছে। লোকে আর গুণিণ ওঝার কাছে যায় না, ভোলার কাছে চিকিৎসা
করায়। স্কুলে প্রচুর ছেলে মেয়ে পড়াশুনা করছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার চেষ্টা
চলছে।
ইচ্ছা থাকলে উপায় এমনি আসে। লড়াই করে ভুতকেও পরাজিত
করা যায়।
********************

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন