"জমিদারের উইল" গল্প জমিদার হলেও মানুষকে লোভ কতটা নিচে নামাতে পারে এবং পাপের ঘড়া পূর্ণ হলে পতন নিশ্চিত, এই গল্পে পাবেন।

 

 

 

                                               জমিদারের উইল

ভারত স্বাধীনতা উওরকালীন বাংলায় হরিশচন্দ্রপুর গ্রামে অভিরাম রায় নামে এক জমিদার ছিলেন। তার জমিদারী ছোট হলেও তার সততা, বুদ্ধি ও প্রজাবাৎসলতার জন্য জমিদারীর আয় ভালোই ছিল। তিনি বিপদে আপদে প্রজাদের পাশে থাকতেন। সকল প্রজা তাঁকে সম্মানও করতো। যেহেতু অন্যায়, অবিচার ও অত্যাচার ছিল না প্রজারা জমিদারের খাজনা সময়ে দিয়ে দিত। জমিদারও ইংরেজের রাজস্ব সয়ম মতো মিটিয়ে দিতেন। এই জমিদারীটি দূরবর্তী মফস্বলে অবস্থিত হওয়ায় বাইরের খবর এই অঞ্চলে খুব একটা ঢুকতো না। জনসাধারণর চাষ করেই সময় কেটে যেত। দেশের স্বাধীনতার সময়েই জমিদার মারা গেলেন। তাঁর দুই ছেলে, জয়রাম বড় ও বাবুরাম ছোটো।

মরার আগে দুই ছেলেকে কাছে ডেকে বার বার বলতেন “দেখ, আমি কষ্টে জমিদারীর উন্নতি করেছি। তোমরা একসঙ্গে থাকবে ও প্রজাদের জুলুম করবে না।“

অভিরাম বাবুর স্ত্রী, ননীবালা আগেই মারা গেছেন।

বড় জয়রামবাবু ধার্মিক, সৎ, ন্যায়নিষ্ট ও প্রজাবৎসল ছিলেন। অপরদিকে ছোটো বাবুরাম ধূর্ত, লোভী, নির্মম ও স্বার্থপর। দূইভায়ের বিপরীত স্বভাবের জন্য বাবা মারা যাওয়ার পর প্রায়ই ঝগড়াাঝাটি, অশান্তি লেগেই থাকতো। এদিকে ভারত স্বাধীন হলো। দেশের চারদিকে উল্লাস কিন্তু তার আঁচ এই অঞ্চলে তেমন ভাবে লাগলো না। স্বাধীনতার তিন চার বছর পর জমিদারী প্রথা বিলোপ হয়। এতদিন যারা জমি চাষ করতো, তারা জমিদারকে খাজনা দিত এবং জমিদাররা সময়  মতো ইংরেজ সরকারকে রাজস্ব দিত। জমিদারী প্রথা বিলোপের পর জমিদারের খাজনা আদেয়ের ক্ষমতাও থাকলো না।

এই পরিস্থিতিতে জয়রামবাবু এক সরকারী আদেশনামা পেলেন যে জমিদারদের জমির খাজনা আদায়ের ক্ষমতা বন্ধ করা হলো। সেই অনুসারে জয়রামবাবু ঘোষনা করেন প্রজাদের আর জমিদারকে খাজনা দিতে হবে না। খাজনা এখন থেকে সরকার আদায় করবে। এই ঘোষনায় দুই ভাই এর দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠলো এবং দুই ভাই আলাদা হয়ে গেল। এরপর বাবুরামের আসল চরিত্র সকলের কাছে পরিস্কার হতে লাগলো। তার লোকজন জোর করে প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করতে লাগলো। না দিলে নির্যাতন, অত্যাচার চলতে থাকলো। বেশ কিছু প্রজা জয়ররামের কাছে এসে কেঁদে কেটে বললো “ হুজুর, আপনি খাজনা না দেওয়ার ঘোষনা করেছিলেন কিন্তু ছোটবাবু জোর করে খাজনা আদায় করছেন। না দিলে অত্যাচার করছেন। তিনি কারো কারো গরু বাজেয়াপ্ত করছেন, কারো ধান নিয়ে চলে আসছেন। কাউকে কাউকে মেরে আধমরা করছেন। তাঁর অত্যাচারে আমরা ভীত ও অতিষ্ট। বড়বাবু আপনি কিছু একটা করুন। না হলে আমরা সর্বশ্রান্ত হয়ে যাব। আমাদের ছেলেমেয়েরা না খেয়ে মারা যাবে।“

“ দেখো, আমি দুঃখিত ও মর্মাহত। কিন্তু আমার কিছু করার নেই। ছোটো যা করছে এটা বেআইনি। তোমরা সংঘবদ্ধ হয়ে এর প্রতিবাদ কর। সকলে একসঙ্গে থাকলে কেউ কিছু করতে পারবে না। যদি অত্যাচার করে পুলিশে অভিযোগ কর। আমি পুলিশের কাছে তোমাদের হয়ে সাক্ষী দেব।“

পুলিশ থানা ওখান থেকে বেশ খানিকটা দুরে তবুও অল্প প্রজা গিয়ে থানায় জানানো সত্ত্বেও কোনো কাজ হলো না। প্রজারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়ালো ও খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দিল। এরজন্য ছোটোর সমস্ত রাগ গিয়ে পড়লো দাদার উপর। এমনি দাদাকে সে সহ্য করতে পারতো না। তার মনে একটা সন্দেহের গাছ শিকড় বিস্তার করছিল। তার মনে হতো বাবা দাদাকে বেশী ভালোবাসেন ও মরার আগে গোপনে বেশকিছু ধনরত্ন দিয়ে গেছেন। লোভ বড়ই বিষম রিপু। মানুষকে অমানুষে পরিনত করতে তার সময় লাগে না। বাবুরামের হৃদয় পাষান, সম্পদের লোভে মত্ত, হিতাহিত জ্ঞান রহিত। তার কাছে সম্পদই বড়।

একদিন বাবুরাম দাদার কাছে এসে ধমক চমক আরম্ভ করলো “ তুই এ কাজটা ভালো করছিস্ না। দাদা হয়ে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিস্।“

জয়রামবাবু শান্তভাবে বললেন “ আমি কি করলাম ? সরকার জমিদারী প্রথা বিলোপ করে দিয়েছে।”

“ তুই প্রজাদের আমার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিস্ নি “ ওরা তোর কথায় প্রতিবাদে নেমেছে। পুলিশের কাছে অভিযোগও করেছে। এর আমি শেষ দেখে ছাড়বো, বলে গেলাম।“

বলেই ও দ্রুতগতিতে বেরিয়ে গেল। বাবুরামের উচ্চকণ্ঠে তর্জন গর্জন শুনে জয়রামবাবুর স্ত্রী, মধুমতী  ভিতর থেকে এসে চুপচাপ দাঁডিয়ে শুনছিলেন। তিনি প্রায় কুড়ি বছর এ ঘরে এসেছেন। ছোটোর চন্ডাল রাগের কথা ভালোই জানেন। বড়বাবু তাঁর স্ত্রীকে খুব ভালোবাসেন। মধুমতী খুব সুন্দরী না হলেও গুণে লক্ষ্মী। সাংসারিক কাজকর্মে পারদর্শী। বিশেষত তাঁর হাতের রান্না  কেউ যদি খায়, সে জীবনে ভুলতে পারে না। দাসীরা থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজেই দুবেলা রান্না করেন।

তিনি স্বামীকে বলেলন “ ছোটোর কথায় কিছু মনে করো না। জানতো ছোটবেলা থেকে ও এই রকম।

“ তুমি আর ওকে মাথায় তোলো না, তা বলে দাদার সঙ্গে এই রকম ব্যবহার করবে?”

“ ছাড় তো, পরে ঠিক্ বুঝবে।“ বলেই ঘরের মধ্যে চলে গেলেন।

জয়রামবাবু ভাবছেন প্রজারা খাজনা দিচ্ছে না বলে ছোটো খুব রেগে আছে। কারো উপর রেগে গেলে ওর হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। যেকোনো অনৈতিক ও বেআইনি কাজ করতে পারে। বাবা মারা যাওয়ার আগে ভাইদের মধ্যে জমিজমা ভাগ করে যান নি। এখন ছোটো কি আবার ঝামেলা করে কী জানি।

বাবুরাম মতলব খুঁজতে থাকে কি করে দাদাকে জব্দ করা যায়। সে সদরে ধূর্ত উকিলের সঙ্গে পরামর্শ করলো কি করে বাবার একটা উইল করা যায়। উকিল দেখলো বড় মাছ জালে উঠেছে। তাই সে বললো “ ভায়া, টাকায় কি হয় না? বাঘের দুধও পাওয়া যায়।“

মোটা টাকার বিনিময়ে সবকিছু করে দিতে উকিল রাজী হয়।

মাস ছয়েক পরে কোর্টের এক নোটিশ পেলেন জয়রায় বাবু। তাতে জানানো হয়েছে যে বাবুরাম রায় কোর্টে বাবা অভিরাম রায়ের একটি উইল কেভিয়েটের জন্য পেশ করেছেন। তাঁকে কোর্টে হাজির হতে বলা হচ্ছে। জয়রামবাবু খুব দুশ্চিতায় পড়লেন। পরের দিন সকাল সকাল কোর্টে ছুটলেন।

হাকিম জিজ্ঞাসা করলেন “ আপনার ছোটোভাই আপনার বাবার একটি উইল পেশ করেছেন তাতে আপনার বাবা ছোটোভাইকে সমস্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি দিয়ে গেছেন। আপনার কিছু বলার আছে?”

জয়রামবাবুর মনে হলো তাঁর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। তিনি হাত জোড় করে কাঁপা স্বরে বললেন “ হুজুর, বাবা এমন কোনো উইল করে যান নি। এটা জাল।“

“ কোর্ট সই পরীক্ষা করছে। আপনি প্রমান করতে পারবেন যে এই উইল জাল। সাক্ষীরাও একেই কথা বলেছেন।“

জয়রাম বাবু হতভম্ব। কোর্টকক্ষের চারদিক বিহ্বল দৃষ্টিতে দেখছেন পরিচিত কেউ আছে কিনা। এক জায়গায় তাঁর ছোটভাই ও এই অঞ্চলের চার পাঁচজনকে একসঙ্গে দেখতে পেলেন। তিনি ভাবছেন ভাইও ভাইকে সর্বস্বান্ত করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে। লোকে ভাই ভাই এর সম্পর্ক সবচেয়ে মধুর বলে থাকে। কিন্তু ভাইএর একন মুখে ক্রূর হাসি দেখতে পাচ্ছেন। হায় ভগবান: তোমার একি লীলা। তাঁর চোখ থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো। তিনি কোর্ট থেকে বেরিয়ে বিভ্রান্ত অবস্থায় বাড়ী ফিরলেন। মধুমতী স্বামীকে এই অবস্থায় দেখে কোনো প্রশ্ন করলেন না। একগ্লাস জল দিলেন এবং পাশে বসে হাওয়া করতে লাগলেন। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে জয়রামবাবু বললেন “ বড়বৌ, আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। ছোটো বাবার সই জাল করে স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি নিজের নামে করে নিয়েছে তারপর সমস্ত ঘটনা বললেন। শুনেই মধুমতী কোনো কথা না বলে ঠাকুর ঘরে গিয়ে ভেঙে  পড়লেন ও কাঁদতে শুরু করলেন।

জয়রামবাবু ধীরে ধীরে ঠাকুর ঘরে গিয়ে বললেন “ তুমি চিন্তা করো না। ঠাকুরের উপর ভরষা রাখো, সব ঠিক হয়ে যাবে।“

জয়রামবাবু পরের দিন আবার সদরে গিয়ে এক উকিলের সঙ্গে দেখা করে সমস্ত কথা জানালেন।

উকিলবাবু বললেন- সবই তো বুঝলাম। কিন্তু কেসটার আদেশনামায় কাল সই হয়ে গেছে। এখনতো এই আদালতে কিছু হবে না। কলকাতায় হাইকোর্টে আপিল করতে হবে। সেখানে গিয়ে উকিল ধরতে হবে। তারপর তারিখের পর তারিখ পড়বে। জলের মতো টাকা খরচা হবে। তবে আপিল করতে হলে আদেশনামাও লাগবে। আপনি কি এত কিছু করতে পারবেন?“  জয়রামবাবুর কলকাতা বার বার যাওয়া আসা করে এতকিছু করাা সম্ভব নয় মনে করলেন।  তিনি আর কি করেন ভগ্নমনোরথ হয়ে বাড়ী ফিরলেন। মধুমতী জল দিয়ে পাখা করতে করতে জিজ্ঞাসা করলেন “ কিছু খাবার দেব?”

জয়রাম বাবু বললেন “ না,খিদে নেই। দেখ, বড়বৌ, ছোটো জাল করে সমস্ত জমিবাড়ী তার নামে করে নিয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে সে সব দখল নেবে। আমি ভাবছি আমরা থাকবো কোথায় ও সংসার নির্বাহ হবে কি করে? বড়বৌ, বড়ই চিন্তায় পড়েছি।“

“ তুমি বেশী চিন্তা করো না তো। ঠাকুর ঠিক পথ দেখাবেন। বিপদের সময় উতলা হতে নেই। ঠাকুরের উপর বিশ্বাস রাখলে, তিনিই উপায় করবেন। মানুষকে ভগবান দুঃখ দিয়ে পরীক্ষা করেন। রাজা হরিশচন্দ্র , নল দময়ন্তী ও পাণ্ডবদের কথা নিশ্চয় মনে আছে। দেখ সব ঠিক হয়ে যাবে। সত্য একদিন সূর্যের মতো প্রকাশিত হবে। শুধু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা।“

“ তুমি বলতে চাইছ ওদের মতো আমরা ঘর ছেড়ে অন্য কোথাও থাকি। আমরা কাছাকাছি কোথাও থাকতে পারবো না। লোকে ছি ছি করবে। আর তোমাকে ও এই ছোটো ছেলেকে ছেড়ে কোথাও আমি একা থাকতে পারবো না”।

“ না না, তোমাকে একা আমি ছাড়বোও না। যেখানে যাব, সকলে একসঙ্গেই যাব।“

“ তাইতো ভাবছি কোথায় যাওয়া যায়? এমন জায়গায় যেতে হবে, কেউ আমাদের চিনবে না।“

“ চল, কোনো বড় শহরে চলে যাই।“

“ এমন জায়গা চাই যেখানে কিছু কাজকর্মের ব্যবস্থা করা যাবে। আমি ভাবছি কলকাতায় যাই।“

“ তুমি তো কলকাতা সমন্ধে অপরিচিত। গিয়ে কোথায় থাকবে ভেবেছ?”

“ দেখি খবরাখবর নিই। তুমি একটা কাজ কর। তোমার গহনাগুলো গুছিয়ে রাখ। ওগুলো তো নিয়ে যাওয়া যাবে না। এখানে বিক্রি করে কিছু টাকা হাতে নিয়ে যেতে হবে।“

মধুমতী কোনো প্রতিবাদ না করে সম্মতি দিলেন।

 

সপ্তাহখানেক পরে জয়রাম বাবু সরকারী নোটিশ পেলেন তাতে বলা হয়েছে সাত দিনের মধ্যে বাড়ী খালি করে দিতে হবে।

জয়রাম বাবু মধুমতীকে বললেন “ শোন, আজ তো রবিবার, আমরা বুধবার ভোরে রওনা হবো। লোকে বলে না -                  ‘ মঙ্গলের ঊষা বুধে পা

                                            যথা ইচ্ছা সেথা যা।‘

আমি কলকাতায় থাকে একজনের ঠিকানা জোগাড় করেছি, তারই কাছে প্রথমে যাব। তুমি তৈরি হয়ে নাও।“

মঙ্গলবার ওঁরা রাত চারটা সময় ওঠে স্নান ও খাওয়াদাওয়া করে কাকভোরে রওনা হলেন। যাওয়ার সময় জয়রামবাবু বার বার ফিরে বাড়ীটাকে দেখছেন এবং চোখ থেকে আপনা আপনি জল গড়িয়ে পড়ছে। ঐখানেই তার শৈশব, কৈশোর ও যৌবন কেটেছে। বাবা মায়ের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই মাটিতে। এর মায়া ছাড়তে হৃদয় ভেঙে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। যেন মা, মাটি ডাকছে “ যাস্ না খোকা আমাকে ছেড়ে।“ এ ডাক সকলে শুনতে পায় না। যার মনে মায়া, মমতা, ভালোবাসা আছে, সেই শুনতে পায়। বোঝে না আনজনে। কিছু পথ এগোতে জয়রামবাবু দেখলেন অনেক প্রজা রাস্তায় জড়ো হয়েছে। তিনি ভাবছেন ওরা কি করে জানলো, উনি তো কাউকে কিছু বলেন নি।

প্রজারা হাতজোড় করে বললো “ বড়বাবু, আপনি যায়েন না, আমরা বিপদে কার কাছে যাব? আমরা আপনাদের খাওয়া থাকার ব্যবস্থা করবো।“

প্রজাদের চোখে জল দেখে জয়রাম বাবু মর্মাহত হয়ে বললেন “ তোমরা চিন্তা কর না। আমরা কিছুদিনের মধ্যে ফিরে আসবো।“

প্রজারা তাঁর কথায় আশ্বস্থ হলো কারণ বাড়বাবুকে তারা দেবতা জ্ঞান করতো।

জয়রামবাবুরা কলকাতা যার ঠিকানা নিয়ে গেছিলেন সেখানে পৌঁছালেন। সেই জায়গাটা বড় রাস্তা থেকে অনেকটা গলির ভিতরে একটা ছোটো জায়গায় পাশাপাশি প্রায় একশ ছোটো ছোটো ঘর। সবগুলো প্রায় দড়মা দিয়ে তৈরি, কালো রঙের কাপড়ের মতো কি দিয়ে ছাউনি। অপরিছন্ন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। এখানে যে মানুষরা থাকতে পারে কেউ কল্পনা করতে পারে না। একদিকে বাহুল্য ও ঐশ্বর্যের সমারোহ, অন্যদিকে মানুষ গরুর খোঁয়াড়ের মতো ঘরে বাস করে। এর চেয়ে গ্রামাঞ্চলে পরিবেশ বহুগুণ ভালো। উন্মুক্ত মাঠ, খোলা আকাশ, পরিশুদ্ধ বাতাস. গাছের ফল জমির ফসল, মনোরম পরিবেশ। জয়রামবাবু খোঁজ নিয়ে জানলেন ঝন্টু কাজে গেছে ছয়টার দিকে ফিরবে। ওঁরা বাড়ী থেকে নিয়ে আসা খাবার খেয়ে অপেক্ষা করলেন। ঝন্টু প্রায় সন্ধ্যা ছয়টা দিকে ফিরলো। বড়বাবুর সপরিবারে দেখে সে অবাক। জয়রামবাবু সংক্ষেপে ঘঠনাটা জানালেন।

ঝন্টু বললো “ বাবু, আপনারা আমার এই থাকতে পারবেন না। কিছুদিন যদি ছোটোখাটো হোটেলে থাকেন, তারমধ্যে কি করা যায় দেখতে হবে। আপনাদের কিছু আয়ের ব্যবস্থা তো করতে হবে।“

মধুমতী বললেন “ বাবা, একটা রান্নার কাজ দেখ না।“

ঝন্টু অবাক হয়ে বলে “ মা, আপনি লোকের বাড়ীতে রান্না করবেন?”

“ কেন নয়। কোনো কাজই ছোটো নয়। সময় পড়লে করতে হয়। ভগবান কাকে কখন কি কাজ দেন, তা তিনিই জানেন।“

জয়রামবাবু কি বলবেন বুঝে উঠতে পারলেন না। তাদের একটা আয়ের পথ দরকার। তিনি নিজে কিছু কাজ যে পাবেন তার কোনো স্থিরতা নেই। তারপর ছেলেটার পড়াশুনা ব্যবস্থা তো করতে হবে।

ঝন্টু বড়বাবুকে চুপ থাকতে দেখে ভাবলো এই সময় তাদের কিছু তো করতে হবে। তখন তার মনে পড়লো একজন তাকে রান্নার লোকের কথা বলেছিলেন। একবার খোঁজ করে দেখবে। তাই সে বললো “ ঠিক আছে মা, আমি দেখছি কি করা যায়। এখন চলুন হোটেলটা দেখি। অনেক দুর থেকে এয়েছেন। ওখানে একটু বিশ্রাম নেন।“

সে কাছাকাছি একটা হোটেল ব্যবস্থা করে বাসায় ফিরলো। পরের দিন যিনি রান্নার লোকের কথা বলেছিলেন তাঁর বাড়ী গেল। তিনি হাইকোর্টের বড় উকিল, সনাতন সামন্ত। তিনি লোককে নিয়ে আসতে বললেন। যদি ভালো লাগে তবে কথাবার্তা বলবেন। দুদিন পর ছন্টু মধুমতীকে নিয়ে গেল। সঙ্গে জয়রামবাবু এবং ছেলেও গেল। হোটেল থেকে কাছাকাছি একটি দোতলা বাড়ীর সামনে গিয়ে ওরা থামলো।

ঝন্টু আমতা আমতা করে বললো “ বাবু, আপনি ছেলেকে নিয়ে এখানে অপেক্ষা করুন, আমি মাকে নিয়ে ভিতরে যাচ্ছি। সামন্তবাবুর উকিলের চোখ, দেখেই তাঁর ঠিকই লাগলো তাই কাল থেকে আসতে বললেন আর বললেন সাতদিন পর মাইনা ব্যাপারে কথা বলবেন। মধুমতী পরের দিন থেকে কাজে যোগ দিলেন। দোতলা ছিমছাম বাড়ী। তাঁর একছেলে লন্ডনে থাকেন। এই বুড়োবুড়ি দুজন। সমস্ত কাজের লোক আছে। এতদিন সামন্ত গিন্নিই রান্নাটুকু করতেন কিন্তু এখন বয়স হয়ে গেছে, আর পারেন না।

দিন সাত আঠ পর সামন্তবাবু মধুমতীকে বললেন “ তোমার রান্না আমাদের ভালো লেগেছে। তুমি চিন্তা করো না। তোমাকে উচিত মতো মাইনা দেব।“

মধুমতীর বাড়ীটা খুব ভালো লেগেছে। দুজনই অমায়িক। তার থাকা খাওয়ার খোঁজখবর নেন। সামন্তবাবুর বাড়ীতে সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বললো, শাঁখ বাজলো। মধুমতী শুধু রান্নার জন্য থাকলেও তিনি ঘরদোর পরিষ্কার পরিছন্ন করেন। বিছানাপত্র গুছিয়ে রাখেন ও দুজনের দেখভাল যত্নআর্তি করেন। সামন্তগিন্নি মনে মনে ভাবেন এই রকম যদি তাঁর ছেলের বৌ হতো, কি আনন্দে তিনি থাকতেন। তাঁর ছেলে লণ্ডনে এক মেমকে বিয়ে করেছেন। ভাবলে তিনি উদাস হয়ে যেতেন।

 এদিকে জয়রামবাবু একটা দোকানে কম মাইনায় কাজ পেয়েছেন ও ছেলেকে স্কুলে ভর্ত্তিও করিয়েছেন। মাঝে মাঝে মধুমতীর সঙ্গে দেখা করেন। কষ্টেশিষ্টে দিন গড়িয়ে চললো।

 

মাস তিনেকের পর এক রবিবার দুপুরে সামন্তবাবু ও সামন্ত গিন্নি খাচ্ছেন এবং মধুমতী পরিবেশন করছেন। হঠাৎ সামন্তবাবু বললেন “ মধু, তোমার রান্নার হাত অপূর্ব। আচ্ছা, তোমার সমন্ধে কিছু জানা হয় নি। এত কাজে ব্যস্ত থাকি। তোমার দেশ কোথায় ও এখানে তোমার কে কে থাকে খুলে বলতো।“

মধুমতী সব বলার পর তিনি বললেন “ আরে ব্যাস, তুমি জমিদার গিন্নি। ভাগ্যের কি পরিহাস; তুমি আমাদের বাড়ীতে রান্না করছো। আচ্ছা তোমাদের কাছে কোর্ট রায়ের কপি আছে?”

“ হ্যাঁ আছে স্বামীর কাছে।“

“ তুমি একটা কাজ কর। আমি একটা কাগজ দেব। রায়ের কপি এবং কাগজটাতে স্বামীর সই করিয়ে আমাকে দেবে। তারপর ব্যাটাকে জেলের ভাত খাওইয়ে আনবো।“

 

এরপর জয়রামবাবুকে অনেকবার কোর্টে যেতে হয়েছে। ভাইর সঙ্গে দেখাও হয়েছে কিন্তু কেউ কথাবার্তা বলে নি। প্রায় মাস ছয়েক পর সামন্তবাবু ডাকলেন “ মধু, পরশু তুমি আর তোমার স্বামী আমার সঙ্গে কোর্টে যাবে। সেদিন রায় ঘোষনা হবে। তাঁরা সকাল সকাল হাইকোর্টে গেলেন। এজলাসে গিয়ে জয়রামবাবু দেখলেন ভাই বসে আছে, তার মুখ ফ্যাকাসে। দাদাকে দেখে চোখ নামিয়ে নিল। হাকিম এসে রায় ঘোষনা করলেন। বাবুরামের ছয় বছর জেল ও পঞ্চাশ হাজার জরিমানা জয়রামবাবু পাবেন। বাবুরাম এসে দাদার পা ধরে হাউমাউ করে কেঁদে বললো “ আমাকে মাফ করে দে  দাদা, আমি ভুল করেছি।“ কিছুতে পা ছাড়ছেন। ভাইর অবস্থা দেখে তিনি স্থির থাকতে পারলেন না। যতই হোক, নিজের ভাই তো।

জয়রামবাবু সামন্তবাবুকে অনুনয়বিনয় করে বললেন “ কিছু করা যাবে, স্যার?”

“ এখন কিছু করার নেই, রায় ঘোষনা হয়ে গেছে। পাপের ফল তো ভুগতেই হবে।“

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কবিতা বুদ্ধিজীবী - সকলে নিজেকে ভাবেন বুদ্ধিজীবী কিন্তু আসলে কে বুদ্ধিজীবী, কবিতাটি পড়ে জানুন।

কানীন (কর্ণ ছিলেন কানীন)