গল্প "পঞ্চপাণ্ডবের কীর্তি" পাঁচজন কর্মঠ ছেলে থাকা সত্ত্বেও বিধবা মা এর কি করুন পরিণতি পড়ুন। সত্যি ঘটনা অবলম্বনে লেখা কাহিনী।
পঞ্চপাণ্ডবের
কথা আমরা সকলে জানি।
হস্তিনাপুরের রাজা পাণ্ডুর দুই স্ত্রী, কুন্তী ও মাদ্রী।
কুন্তীর তিন ও মাদ্রীর দুই পুত্র।
এই পাঁচজনকে পঞ্চপাণ্ডব বলা হয়।
ঋষি কিন্দম অভিশাপ দেন যে পাণ্ডু স্ত্রী মিলন করলেই তাঁর মৃত্যু হবে।
ঋষি অভিশাপে বিচলিত হয়ে প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য তিনি তাঁর রাজ্য ধৃতরাষ্ট্র এর হাতে দিয়ে বনে নির্বাসনে যান। সেখানে তিনি স্ত্রীদের সাথে তপস্বীর মত জীবনযাপন করতে থাকেন।
একদিন বসন্তকালে মাদ্রীকে দেখে মোহিত হয়ে তিনি অভিশাপের কথা ভুলে যান । মোহের বশে মাদ্রীর সাথে মিলন করতে গিয়ে তার মৃত্যু হয়। মাদ্রী তাঁর পতির সাথে সহমরণে যান। কিন্তু কুন্তী সন্তানের লালন পালন করার জন্য সহমরণে যাননি। কুন্তী তাদের নিয়ে হস্তিনাপুরে ফিরে আসেন। তিনি পূণ্যের চেয়ে সন্তান প্রতিপালন বড় কর্ত্তব্য্ মনে করেছিলন। পাণ্ডুর পাঁচ পুত্রগণের জননী রূপে তাদের স্নেহ আদরে বড় করে তোলেন। দুর্যোধনের অত্যাচার পাণ্ডবদের সঙ্গে নিজেও
নির্যাতন সহ্য করেছন। পাণ্ডবদের জতুগৃহে পুড়িয়ে মারার সময়ে তিনিও ছেলেদের সঙ্গে ছিলেন। পাণ্ডবদের বনবাস কালীন মা কুন্তী তাঁদের সঙ্গে ছিলেন। পাঁচ ভাই মায়ের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতন। তাঁর নির্দেশেই ভীম হিড়িম্বা রাক্ষসকে হত্যা করে রাক্ষসী বোন হিড়িম্বিকে বিবাহ করেন এবং ঘটোৎকচের জন্ম
হয়। কুন্তীর আদেশে ভীম বকাসুর বধ করেন। মাতা কুন্তীর ভুল আদেশ সত্ত্বেও পাঁচ ভাই মিলে দ্রৌপদীকে বিয়ে করেন। তিনি নিজ পুত্রদের সর্বদা প্রজাদের মঙ্গলসাধনের উপদেশ দিতেন।
পাঁচ ভাই তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন তাই মনে করা যায় পাঁচভাই কুন্তীকে কতটা শ্রদ্ধা ভক্তি ও সম্মান করতেন এবং তাঁর কথা মান্য করতেন।
আমি
যে পাঁচ ভাই এর কথা বলতে যাচ্ছি তারা মায়ের সঙ্গে কি কীর্তি করেছিল সেই ঘটনা।
সোলাপোতা গ্রামে জয়ন্ত সেন নামক এক ব্যক্তি বাস করতেন।
তিনি ছিলেন অভিজ্ঞ, বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ।
তিনি গ্রামে গণ্যমান্য ছিলেন।
গ্রামের ভালো মন্দ কাজে অংশ গ্রহণ করতেন।
কারো কোনো সমস্যা হলে তাঁর কাছে উপদেশ চাইতেন বা কোনো বিবাদ বিসংবাদ হলে মিমাংসার জন্য তাঁকে ডাকা হতো তাই সারাদিন থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকতেন।
তাঁর পাঁচ ছেলে।
কিন্তু ছেলেদের দেখাশুনা, পড়াশুনা বা অভাব অভিযোগ সবই মা, সীমাদেবীই দেখতেন।
তাঁদের কিছু জমিজমা ছিল সেইগুলো মুনিষ দিয়ে চাষ করে সংসার চালে।
চাষবাসের কাজও সীমাদেবী দেখাশুনা করতেন।
সীমাদেবী ছিলেন কড়া ধাতের মহিলা কিন্তু ধার্মিক ও বুঝদার।
তাঁর শাসনে ছেলেরা কেঁচো হয়ে থাকতো।
বড়ছেলে উচ্চ মাধ্যমিক, মেজো দশম শ্রেণীতে, সেজো অষ্ঠম শ্রেণীতে, ন ষষ্ঠ শ্রেণীতে ও ছোট চতুর্থ শ্রেণীতে পড়াশুনা করছে।
এইভাবে
দিন চলছিল।
হঠাৎএকরাতে জয়ন্ত বাবুর বমি হয় এবং তার মধ্যে রক্ত দেখা গেল।।
সকালে সীমাদেবী বললেন “ যাও, শহরে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে এসো।“
“ ছাড় তো, পেট হয়তো
গরম টরম হয়েছে।
তুমি একটু মিশ্রী ও মউরি জলে ফেলে দাও।
আমি একটু ঘুরে আসছি, এলে খাব।“ এরপর যেমন চলছিল,
তেমনই চলতে লাগলো।
এই ঘটনাকে কেউ গুরুত্ব দিল না।
মাঝে মাঝে জয়ন্তবাবুর সামান্য সামান্য পেটব্যথা করে কিন্তু তিনি গ্রাহ্য করতেন না।
কিছুদিন পর দেখা গেল লিভারের উপর ফোঁড়ার মতো ফুলে উঠেছে।
তখন জয়ন্ত বাবু শহরে গিয়ে হাসপাতালে দেখালেন।
ডাক্তার তাঁকে ভর্তি করে নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা করলেন।
রিপোটে
লিভার ক্যান্সার ধরা পড়লো।
ডাক্তাররা অপারেশন করার ঠিক করলেন।
কিন্তু দুঃখের বিষয় তাঁকে বাঁচাতে পারলেন না।
পরিবার অকুল সাগরে পড়লো ।
পনের
কুড়ি দিন সীমাদেবী শোকে মুহ্যমান ছিলেন।
একদিন তিনি ভাবলেন
শোক করে দিন কাটিয়ে
দিলে ছেলেদের ভবিষ্যৎ অন্ধাকার হয়ে যাবে।
ওদের জন্য তাঁকে বুক বাঁধতে হবে।
সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য তাঁকেই
সংসারের হাল দৃঢ়ভাবে ধরতে হবে।
ভগবান যা করেন, মঙ্গলের জন্য করেন । তিনি
যদি মারা না যেতেন তবে তাঁর চিকিৎসার জন্য্ জমিবাড়ী সব বিক্রি হয়ে যেত তবুও ক্যান্সাররোগীকে বাঁচানো যেত না কিন্তু পরিবারটা একবারে শেষ হয়ে যেত এবং ছেলেগুলো
ভিখারী হয়ে ঘুরে বেড়াতো । মৃত্যু
প্রকৃতির এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া । এ পৃথিবীতে চিরদিনের জন্য কিছুই থাকে না।
জন্মালে তো মরতে হবেই।
এতে মানষের হাত নেই।
আমরা যখন কিছুই
করতে পারি না তখন এ ব্যাপারে শোক বা চিন্তা করে মন ও শরীর নষ্ট করা বোকামী ছাড়া কিছু না । পুরাতন গেলে নুতনের আগমন । মৃত্যু যখন স্বাভাবিক ও অনিবার্য
তখন মৃত্যুর জন্য মুহ্যমান হয়ে লাভ তো নেই বরং ক্ষতি । বাস্তবের মাটিতে হাঁটতে হবে।
আবেগকে
প্রশয় দিলে দুঃখই বাড়বে । মানুষকে
নিজের কর্তব্য কর্মে মনোনিবেশ করাই উচিত।
এই চিন্তা করে বুকে বল এনে দুগু্ণ উৎসাহে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
এই
জন্য বলে মেয়েদের
দশটা হাত , মা দূর্গার
মতো দুটি হাত নিয়ে দশ হাতের কাজ করতে পারে । সীমাদেবী সমস্ত কাজ একাই করতে লাগলেন । চাষবাসের দেখাশুনা, রান্নাবান্না করা, রান্নার জন্য কাঠপাতা জোগাড় করা,
বলদ গরুর রক্ষণাবেক্ষণ করা, গাই গরু
থেকে দুধ সংগ্রহ করা, ধান সেদ্ধ
করে চাল করা, মুড়ি ভাজা ইত্যাদি একা হাতে
করতে লাগলেন । ছেলেদের পড়ার ব্যাপারে তাঁর নজর ছিল তীক্ষ্ণ ।ছেলেদের
পড়ার ব্যাপারে কোন খামতি রাখতেন না ।
বড়ছেলে
উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে অনার্স নিয়ে কলেজে ভর্তি হলো । তাকে কলেজের কাছাকাছি
থাকের ব্যবস্থা করলেন । মেজো উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর তাকে প্যারামেডকেল পড়ানোর
ব্যবস্থা করলেন । বড়ছেলে বি এ পাশ করার পর বছর খানেকের মধ্যে একটা চাকরী ও পেয়ে গেল । মেজো এক শহরের নার্সিংহোমে কাজ করতে লাগলো
। সীমাদেবী ভাবলেন যাক্ বাবা, আর কয়েক
বছর কাটিয়ে দিলে এ খাটনি থেকে কিছুটা রেহাই পাওয়া যাবে।
দু তিন জন ছেলে বিয়ে করাতে পারলে নিশ্চিন্তি।
বছর
তিনেক পর তিনি বড়ছেলের বিয়ে দেবেন মনস্থির করেন।
সেজো ছেলে পড়াশুনায় মন নেই । বাপের মতো গ্রামে ঘুরে বেড়ায় । বাপের মতো জ্ঞান, বুদ্ধি বা বিচক্ষণতা নেই কিন্তু গ্রাম বেড়ানো নেশাটা আছে । ঘরে থাকে না, ঘরের কোনো কাজও দেখে না । সকালে খেয়ে বেরিয়ে যায় আবার দুপুরে এসে স্নান ও খাওয়া দাওয়া করে বেরিয়ে যায় । মা মনে করলেন বড় হলে সংসারের জোয়াল কাঁধে পড়লে ঠিক হয়ে যাবে । পড়াশুনা না করলে না করুক। জমিজমা, ঘরবাড়ী দেখাশুনা করার জন্য একজন তো দরকার। তিনি তাঁর সোনারূপার গহনা বিক্রি করে বসতবাড়ীটাকে বড় করলেন কারণ পাঁচ ছেলের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।
সীমাদেবী বড়ছেলের দেখেশুনে বিয়ে দিলেন। বৌমা ভালো,
শাশুড়ীর নজর খাতির করে। শাশুড়ীর কাজেও সাহায্য করে। সীমাদেবী খুব খুশি। বছর খানিক পরে ছেলে বাড়ী এসেছে। একসময় ছেলে মাকে বললো “ মা,
আমার কিছুদিন হলো পেটটা ভালো যাচ্ছে না, মাঝে মাঝে পেট ব্যথাও করে।“
পেটব্যথার কথা শুনে মনটা হু হু করে উঠলো।
“ ডাক্তার দেখিয়ে ছিলি ?”
“ হ্যাঁ মা, ডাক্তার বললেন ঘরোয়া খাবার খেতে হবে। বাহিরের খাবার চলবে না ।“
“ রান্না করে খা না ।“
“ আমি কি রান্না করতে পারি নাকি । কাজে যাব না রান্না করবো ।“
“ তাহলে কি করবি ?”
“ আমি বলছেলাম কি মাধুরীকে কিছুদিনের জন্য নিয়ে যাই ।“
মা আর কি বলবেন “ ঠিক আছে, নিয়ে যা ।“
বড়বৌমা চলে যাওয়ায় তাঁর খাটনি আবার বেড়ে গেল। কষ্ট হলেও ছেলেদের জন্য তো করতে হবে। বয়স বাড়ছে,
নানা রোগ শরীরে বাসা বেঁধেছে। কিছু কিছু কাজ করতে বড়ই কষ্ট হয়। চোখে জল এসে যায়। তবুও পরিবারের জন্য করতেই হয় । তিনি মেজছেলের ও বিয়ে দেন কিন্তু ছেলে তার বৌকে প্রথম থেকে তার কাজের জায়গায় নিয়ে যায়। তাই সীমাদেবী সেজছেলের জন্য মেয়ে দেখতে শুরু করলেন। মেয়েও পাওয়া গেল,
দেখতে ভালো,
রঙ ফর্সা। বিয়েও হয়ে গেল। সীমাদেবী ভাবলেন এ ছেলে তো চাকরী করে না তাহলে বৌ ঘরেই থাকবে। সেজ বৌ প্রথম প্রথম কোনো কাজই করতে চাইতো না। জোর করলে অসন্তুষ্ট হয়ে কোনো মতে করতো । এরমধ্যে ন ও ছোটো কলকাতায় গেছে পড়তে। বড় ও মেজ বাড়ীতে আসা কমিয়ে দিয়েছে। সেজো বৌ এর সঙ্গে শাশুড়ীর খিটিমিটি ক্রমাগত বেড়ে চলেছে । বাড়ীর মধ্যে ছোটখাট কিছু করে কিন্তু পরিশ্রমের কাজ যেমন ধান সেদ্ধ করা,
মুড়ি ভাজা,
লেতা দেওয়া ও গোয়ালের কাজ কিছুতেই করবে না। উপরন্তু শাশুড়ী বলে গ্রাহ্যই করে না। যাকে পাঁচ ছেলে যমে মতো ভয় পেত, তাকে এখন কেউ সমীহই করতে চায় না। চার ছেলে বাইরে , ঘরে খুব কমই আসে। মা যে কেমন থাকলো তার কেউ খোঁজ রাখে না। সীমাদেবী মুখ বুজে করে চলেছেন । সেজ বৌ এর সক্ষে বাগবিতন্ডা ও হয়।
একরাতে সীমাদেবীর মনে হলো জ্বর জ্বর ভাব,
গা হাত পা ব্যথা। সকালা ওঠার সামর্থ নেই । ভাবছেন একটু বেলা হলে উঠবেন। এমন সয়ম বৌমার গলা শোনা গেল।
“
আজ বুড়ির কি হলো। চুপটি করে শুয়ে আছে। গোয়ালের কাজ কি করে হবে,
তার চিন্তা নেই। ঠিক আছে, খাওয়া পায় কোথা থেকে দেখি
?”
সীমাদেবী দুপুর পর্যন্ত শুয়ে থাকলেন। ছেলে তো এখনো ফেরে নি। গরুগুলো গোয়াল থেকে বের করেছে কিনা কি জানি। খিদেও পেয়েছে। তাই তিনি কষ্ট করে উঠলেন এবং দেখলেন গরুগুলো বের করেছে কিন্তু গরুর মুখে খড়কুটো কিছুই দেয় নি। গরুগুলো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। গোয়াল ও পরিষ্কার করে নি। তিনি কোনোরকমে গরুদের এক আঁটি খড় দিয়ে ভাবলেন এখন খেতে গেলে কুরুক্ষেত্র বেঁধে যাবে। এই অবস্থায় ঝগড়াঝাটি ভালো লাগে না । তাই তাঁর বাড়ীর কাছে একটি চা দোকানে গিয়ে বসে বললেন
“ বাবা, আমার জ্বর, মুড়ি ভাজতে পারি নি। কিছু মুড়ি দিবি,
আমি পরে দাম দিয়ে দেব।“
“
না জেঠিমা,
তোমকে দাম দিতে হবে না। তুমি খাও তো। আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।“
দোকানদার তাঁকে ভালো করে খাওয়ালো এবং দুটো টেবলেট দিল। সীমাদেবী খেয়ে শরীরে বল পেলেন। পরের দিন সুস্থ হয়ে তিনি আবার যতটা পারেন কাজ করতে শুরু করলেন।
কিছুদিন পরে বড় ছেলে একা দিনদুয়েকের জন্য বাড়ী এসেছে। সীমাদেবী ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন
“ খোকা, ঘরের কাজকর্ম কি করে হবে রে “
“ কেন, কি হলো ?”
“ আর গতরে দিচ্ছে না বাবা, এত কাজ এই বয়সে করতে পারি। বড্ড কষ্ট হয়।“
“ কি এত কাজ কর গো ?”
“
দেখ, কাজ কি কম
? গোয়াল গরুর কাজ, ধান সেদ্ধ করে চাল করা,
মুড়ি ভাজা এ গুলো কি কম খাটনির কাজ নাকি ? এ বয়সে কি সয় ?”
“ কেন, তোমার সেজ ছেলে কি করে ?”
‘ ও বাড়ীতে থাকে কোথায় ? সারাদিন গ্রামে কি সব কাজ থাকে, করবে কখন?”
“ ঠিক আছে, দুপুরে বাড়ী আসুক, কথা বলি।“
দুপুরে খাওয়ার পর মা আর দুই ভাই আলোচনায় বসেছে।
“ কিরে, তুই মায়ের কাজগুলো করতে পারিস্ না ?”
“ মায়ের কাজ কি আমি পারি ? ধান সেদ্ধ, মুড়ি ভাজা।“
“ তাহলে লোক রেখে দে।“
“
এসব করার লোক গ্রামে পাওয়া যায় না। তাছাড়া তোরা চারজন বাইরে চলে গেলি। মাসের শেষে কেউ একটা পয়সা ও পাঠাস্ না। জমি চাষ করে এখন কোনো লাভ নেই।“
“
এই জমি চাষ করে মা তো পাঁচজনকে মানুষ করলো। আমরা তো জমি তোকে ছেড়ে দিয়ে গেছি। তার ভাগ তো নিচ্ছি না।“
“ ও তখন ছিল, সে যুগ আর নেই। নিজে না খাটলে চাষ করে কোনো লাভ হয় না। সব কিছুর দাম বেড়েছে।“
“ দেখ, কি ভাবে কি করা যায় ?”
“
গরু রক্ষণাবেক্ষণ করা খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার
, আমি বলি কি, গরুগুলো বিক্রি করে দিই। তাহলে মায়ের কষ্ট অনেকটা কমবে।“
মা বললেন “ না না তা হয় না।, গরু না হলে লাঙ্গল করবে কে ? জৈব সার কোথা থেকে পাবি ?”
“
এখন আর গরুতে লাঙলে কেঊ চাষ করে না। ট্রাক্টর এছে গেছে। জৈব সারও কেউ ব্যবহার করে না , রাসায়নিক সার ব্যবহার করে ।“
বড় ছেলে বলল “ তাহলে বিক্রি করে দে।“
মা ভাবলেন “ যাক্ বিক্রি করে দেওয়াই ভালো। আমি সেবা করতে পারছি না। খেতে না পেলে অভিশাপ দেবে। চোখের আড়ালে যে ভাবে থাকবে থাকুক। আমি তো আর দেখতে যাচ্ছি না।“
কোনো সমাধান ছাড়াই আলোচনা শেষ হলো। বড়ছেলে পরের দিন সকালা ফিরে গেল।
সীমাদেবী যতটা পারেন কাজ করে থাকলেন। এইভাবে দশ পনেরদিন পর সেজ বললো :
“ মা, গরু চারটির দামদর হয়ে গেছে। পরশু লোক আসবে ও গরুগুলো নিয়ে যাবে।“
সকালে তিনজন গরু নিতে এল। সীমাদেবী গিয়ে গরুদের নাম ধরে ডেকে আদর করলেন।
তারা যাওয়ার সময় বার বার পিছন ফিরে তাকাচ্ছে, ডাক দিচ্ছে। লোকগুলো তাদের মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছে।
তাঁর চোখ দিয়ে নিস্তব্ধে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো। তিনি দাওয়ায় গিয়ে বসলেন। মনে পড়চ্ছে পুরনো দিনের কথা। ওখানে নুতন বলদ কেনা হলে পূজো করে গোয়ালে ডোকানো হয়। তিনি কত বার বড় কাঁসার থালায় হলুদ মেশানো জলে দূর্বা দিয়ে বলদ এলে পা ধুয়ে দিতেন তারপর পূজো করে কিছু খাইয়ে গোয়ালে ঢোকাতেন। এরপর ওর সঙ্গে এক ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হতো। তাঁর চারটি বলদই খুব বাধ্য ছিল। তিনি তাদের আলাদা নাম দিয়েছিলেন। যার নাম ধরে ডাকতেন, সেই মুখ তুলে তাকাতো। চোখের আড়ালে থাকলে “হাম্বা” বলে ডেকে জানান দিত। বলদ গ্রামের দিকে মর্যাদার প্রতীক মনে করা হতো। বলদের সংখ্যা দেখে বোঝা যেত কে কতটা অবস্থাপন্ন। বলদ বেশী হলে লাঙল বেশী। লাঙল বেশী অর্থাৎ জমি বেশী। যার যত বেশী জমি বেশী সে তত অবস্থাপন্ন। আজ তাঁর মনটা হু হু করছে। একটা কথা আছে জমি গরু ও ধানকে সব সময়ে নজরে নজরে রাখতে হয়। পশুপাখিরা মানুষের আবেগ অনুভূতি
বুঝতে পারে। বিশেষ করে গরু কুকুর বিড়াল ঘোড়া বানর ইত্যাদি। এইতো আমাদের গ্রামের
মনা দাস একটি বানর ও কুকুর পুষছে। ও বেরলে পিছনে কুকুর ও ঘাড়ে বানর থাকবেই। গরুকে
আদর যত্ন করলে ওরা ভালো থাকে। ওদের নিয়ে গেল,
কিভাবে
রাখবে কি জানি ?
দিন যেতে থাকলো। সীমাদেবী লক্ষ্য করলেন সংসারে অভাব অনটন
ক্রমাগত বাড়ছে। আজ এটা নেই, কাল ওটা নেই। সেজবৌর সঙ্গে মনোমালিন্যও বাড়ছে। বেশী কিছু হলে তিনি দোকানের
কাছে রাস্তার ধারে বসে থাকেন। কখনো কখনো দোকান থেকে মুড়ি এনে খান। লোকে জিজ্ঞাসা
করে
“ খুড়ি মা, আপনার পঞ্চপান্ডব থাকতে আপনি রাস্তায় ?”
সীমাদেবী চুপ করে
থাকেন,
কাউকে কিছু বলেন না। লোকজন যাওয়া আসা করে, তাদের
সঙ্গে কথাবার্তা বলেন। দোকানদার ছেলেটা ভালো। মাঝে মাঝে একটু চা দেয়। ওর সঙ্গেও
ভালোমন্দ কথা হয়। সময়টা কেটে যায়। বাড়ীতে থাকলে নানান গালিগালাজ শুনতে হয়, শুনে চুপ করে থাকতে
পারেন না। এক কথা থেকে চার কথা হয়,
অশান্তি বাড়ে। ঘরে তো মাত্র দূটি প্রাণী। বড় একা একা লাগে।
চার ছেলে বাড়ীতে আসেই না। মা যে কেমন আছে কেউ খবরই রাখে না।
অনিয়মত খাবার ও ঠিক মতো চিকিৎসার অভাবে সীমাদেবীর জীবনীশক্তি ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে।
শরীর ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে মন দুর্বল হচ্ছে।
মাঝে মাঝে তাঁর বালিকা বেলার কথা মনে আসে। বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে তাই বড়
আদরের ছিলেন তিনি। ধারধোর করে বাবা জাঁকজমক করে তাঁর বিয়ে
দিয়েছিলেন। তখন তাঁর বয়স কতই বা হবে চৌদ্দ পনের। সেই যে এ বাড়ীতে ঢুকেছেন, সংসারের জন্য বাপের বাড়ী দু চারদিন বেশী থাকেন নি। শশুরমশাই
আগেই মারা গিয়েছিলেন। শাশুড়ী তাঁকে নিজের মেয়ের মতো রাখতেন। স্বামী ও কখনো অসম্মান
করেন নি। আগে শাশুড়ী চলে গেলেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে তাঁর দুর্ভাগ্য নেমে
এল। মানুষের
ভাগ্য সমান যায় না। গ্রামাঞ্চলে হিন্দু বিধবাদের যে কি নির্যাতন সহ্য করতে হয় তিনি সেটা
হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। মাসে চার পাঁচদিন নির্জলা উপোস, সাদা বস্ত্র পরিধান করতে হবে,
কোনো সাজসজ্জা করা বা অলঙ্কার পরা যাবে না। কোনো উৎসব অনুষ্টানে যোগ দেওয়া যাবে না,
এমন কি মন্দির বা ঠাকুর স্থানে যাওয়া যাবে না। জীবনে আনন্দ ফুর্তি বলে কিছু থাকে না।
এই দুর্বল শরীরেও ধান সেদ্ধ ও মুড়ি ভাজাটা করেই চলেছেন কারণ
সেজ বৌমা এসব কাজ তো জানে না, শেখার ইচ্ছাও নেই। এখনকার মেয়েরা পরিশ্রমই করতে চায় না। হয়
যে কোনো উপায়ে টাকা আনতে হবে নাহয় পরিশ্রম করতে হবে। কর্মই প্রত্যেক জীবের ধর্ম । বসে থাকলে মুখের খাওয়ার কোথা
থেকে আসবে
? ভাত, পান্তাভাত ও মুড়িই গ্রামের মানুষের প্রধান খাদ্য। তাই চাল
ছাড়া জীবন অচল। একদিন বিকাল বেলা দোকানের ছেলেটা দেখল সেজ বৌমা সীমাদেবীর হাত ধরে প্রায় টেনে
টেনে রাস্তার দিকে নিয়ে আসছে। ছেলেটা উটে এই দিকে দৌড়ে যেতে যেতে বললো “ আরে কি করছ বৌদি ? পড়ে যাবে তো। এই কথা শুনে সেজ বৌমা যেই হাতটা ছেড়েছে, সীমাদেবী মাটিতে পড়ে গেলেন। ছেলেটা তাঁকে কোনো রকম তুলে
দোকানে নিয়ে আসে এবং মুখে চোখে জল দেয়। এক গ্লাস গরম দুধ খেতে দেয়। তারপর
ও তাঁকে সুস্থ বলে মনে হলো না। ঘণ্টাখানেক পর ছেলেটা বললো “ জেঠি, চল তোমাকে ঘরে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আসি।“
“ নারে বাবা, আমি এখানে বসে আছি। সেজছেলে আসুক, তার সঙ্গে চলে যাব।“
“ ওতো রাত করে ফেরে। তুমি কতক্ষণ বসে থাকবে ? একটা কাজ কর, আমার দোকানের পিছনে একটু জায়গা আছে, আমি বিছানা করে দিচ্ছি, তুমি শুয়ে পড়,সেজদা আসা পর্যন্ত আমি আছি।“ সে বিছানা করে দিয়ে শুইয়ে দিল। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক গেল, সেজ এল না। দোকানের ছেলেটা বেঞ্চে বসতে বসতে সে ঐ
বেঞ্চে শুয়ে পড়ল। সেজদার ডাকাডাকিতে তার ঘুম ভাঙলো। তারা সীমাদেবীকে ডাকতে
গিয়ে দেখল তাঁর কোনো
সাড়া নেই। গ্রামে তাঁর মৃত্যু কথা রটে গেল । বহু লোক এসে জড়ো হলো। ছেলেদের আনতে
লোক ছুটলো। পরদিন সকালে সকল ছেলে এসে হাজির হলো। পুড়িয়ে আসতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে
গেল। পঞ্চপাণ্ডব স্নান করার পর খাওয়াদাওয়া করে বসলো হিসাব করতে কাজকর্ম ক্রিয়াদি
করার খরচ কে দেবে ও জমিজমা কিভাবে ভাগ বাঁটোয়ারা হবে এই ব্যপারে কথা কাছকাটি হতে
হতে ঝগড়াঝাটিতে রূপান্তরিত হলো।
ভাগের মা গঙ্গা পায় না।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন