গল্প






 একটি মৃত্যুর পর আবার জীবন ফিরে পেয়ে সমাজে উচ্চ স্থান পেয়ছিলেন, রোমাঞ্চকর ঘটনা পড়ুন।

                                                                            = পুনরুজ্জীবন =

                                                                                   

জরাসন্ধ ছিলেন মগধের রাজা ও বৃহদ্রথ রাজবংশের সদস্য। তিনি মহাভারতে মহাবীর ও মহারথী বলে পরিচিত। তাঁর জন্মবৃত্তান্ত এক কৌতুহলোদ্দীপক ও রহস্যজনক। তিনি দ্বিখণ্ডিত ও মৃত অবস্থায় জন্ম গ্রহন করেন। জরাসন্ধ জন্মের পিছনে যে গল্প থাক না কেন তিনি যে মৃত অবস্থায় জন্মগ্রহন করেছিলেন তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। রাজা বৃহদথ মৃত সন্তানকে বনের শ্মাশানে ফেলে দিয়ে আসতে আদেশ দেন। এই বনে জরা নামক এক রাক্ষসী বসবাস করতো। সে দুইটি অর্ধাংশ দেখতে পেল এবং অর্ধাংশ দুইটি জুড়ে পুনরুজ্জীবিত করে । অর্থাৎ জরা বাচ্চাটাকে বাঁচিয়ে ছিল ও বাচ্চাটিকে রাজার কাছে নিয়ে গিয়ে ফেরত দিয়ে দেয়। জরা বাচ্চাটির দুইটি অংশ জুড়ে দিয়েছিলো, তাই বাচ্চাটির নাম রাখা হলো জরাসন্ধ।

 কংস এই জরাসন্ধের জামাতা। কংস তাঁহার দুই কন্যাকে বিবাহ করিয়াছিলেন। কৃষ্ণের দ্বারা কংসবধের পর তাঁর বিধবা কন্যাদ্বয় জরাসন্ধের নিকট গিয়ে পতিহত্যার প্রতিশোধের প্রার্থনা করেন। জরাসন্ধ কৃষ্ণকে শিক্ষা দিতে সৈন্যসামন্ত নিয়ে মথুরা অবরোধ করেন। জরাসন্ধের অসংখ্য সৈন্যের তুলনায় যাদবদিগের সৈন্য অতি অল্প। তথাপি কৃষ্ণের সেনাপতিত্বগুণে  যাদবেরা জরাসন্ধকে পরাজিত করেছিলেন। কিন্তু জরাসন্ধকে আটকাতে পারেন নি। কেন না, জরাসন্ধের সৈন্য অগণ্য। অতএব জরাসন্ধ পুনঃপুনঃ মথুরা অবরোধ করতে লাগলেন।  যাদবদের ক্ষুদ্র সৈন্য বারে বারে যুদ্ধের কারণে কমতে থাকে । এইরূপ সতরো বার আক্রান্ত হওয়ার পর, যাদবেরা কৃষ্ণের পরামর্শে মথুরা ত্যাগ করে দুর্গম প্রদেশে দুর্গ নির্মাণ করে বাস করবার সিন্ধান্ত  নেন। যে কৃষ্ণের মতো ব্যক্তিত্ব ও মহারথীকে বারে বারে পর্যুদস্ত করেন তিনি কত বলশালী ছিলেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ছদ্মবেশে কৃষ্ণ, অর্জুন ও ভীম মগধে গিয়ে তাকে হত্যা করেন।

আমার এক দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে যারা শৈশবে বা বাল্যকালে শারীরিক অসুবিধা বা কষ্টভোগ করেছেন, তারা বড় হয়ে বিখ্যাত হয়েছেন আর যারা আয়েশে কাটিয়েছন তারা পরের দিকে দুঃখ পেয়েছেন। ধরুন আলবার্ট আইনস্টাইন তিনি শৈশবে কথাই বলতে পারতেন না। এছাড়া তাঁর আত্মমগ্নতা রোগ ছিল। এইরূপ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বাবা সাহেব আম্বেদকর, এ পি জে আব্দুল কালাম আরও কত কে। জীবন সুখ ও দুঃখ দুটি সুতোয় বোনা।

           “সুখ দুখ দুটি ভাই? সুখের লাগিয়া যে করে পিরীতি,. দুখ যায় তার ঠাঁই।“

জরাসন্ধের মতো মৃত অবস্থায় জন্মগ্রহন করে পুণর্জন্ম পেয়ে বিখ্যাত হয়েছেন এমন এক মানুষকে আমি নিজে দেখেছি সেই ঘটনাটা বলি। এই যে ঘটনার কথা বলতে যাচ্ছি সেটা প্রায় পঁয়ষট্টি বছর আগের কথা। আমাদের গ্রামে বেশীর ভাগ পরিবার কৃষক হলেও গ্রামে বিভিন্ন জীবিকার পরিবার বাস করতেন যেমন নাপিত, কামার, কুমোর, ধোপা ইত্যাদি।

একটিই পরিবার ছিল নাপিত। পরিবারের কর্তা ছিলেন মদন বারিক। তার তিন ছেলে। তারা গ্রামের লোকের চুল দাড়ি কাটতো ও পুরুষ, মহিলাদের নখ ও কাটতো। এর জন্য প্রত্যেক পরিবার থেকে বার্ষিক ধান পেত। কোনো পরিবারের বিয়ের অনুষ্টান হলে বা মৃত্যু হলে ঐ কাজের জন্য আলাদা পারিশ্রমিক পেত। এভাবে তার সংসার চলতো।

মদন বারিকের তৃতীয় সন্তানের যখন জন্ম হয়েছিল, তখন আমার জন্ম হয় নি। তার জন্মের কথা মায়ের কাছ থেকে আমি শুনেছিলাম। মদন বারিকের তূতীয় সন্তান মাঘ মাসের কোনো একদিন সকালে জন্ম হয়। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শিশু না কাঁদে না নড়াচড়া করে। লোকেরা মনে করে শিশুটির মৃত অবস্থায় জন্ম হয়েছে। সেই সময় গ্রামাঙ্গলে কোনো ডাক্তার পাওয়া যেত না। তাই শিশুটি জীবিত না মৃত জানার কোন উপায় ছিল না। তারা শিশুটিকে গ্র।মের বাইরে শ্মশানে ফেলে দিয়ে আসে। গ্রামের এক বিধবা বুড়ি যে ধাই এর কাজও করতো মাঠে গোবর কুড়াচ্ছিল। সে শিশুটির কাছে যায় ও দেখে তার মনে হয় শিশুটি জীবিত আছে। যেহেতু সে ধাই এর কাজ করে তার পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে শিশুটিকে সুস্থ করার চেষ্টা করে। খোলা আকাশের নীচে ঠাণ্ডা হাওয়া ও সূর্যের তাপে শিশুটির সংজ্ঞা ফিরে আসে। শিশুটিকে কোলে নিয়ে মায়ের কাছে হাজির।

“হ্যাঁ গো, তোমরা কেমন লোক গো, জ্যান্ত বাচ্চাটাকে ফেলে দিয়ে এয়েছো। নাও একে দুধ খাওয়াও।“

“ এ কি গো, সকলে দেখলো কান্নাকাটি করে না, নড়ে না চড়ে না। আমাকে দেখতে দিয়েছে নাকি ?”

“ কাকে দিয়ে ধাইর কাজ করালে ?”

“ ওই তো দে পাড়ার বৃন্দা মাসি।“

“ ও আবার কবে ধাই হলো রে ? আমাদের তো বলবে না। আমি না থাকলে তো বাচ্চাটাকে শিয়াল শকুন খেয়ে নিতো ।“

নারায়ণ তাকে রক্ষা করেছেন মনে করে তার নাম রাখা হয় “নারায়ণ”। নারায়ণের বয়স যখন বার তেরো তখন সে তার দাদার সঙ্গে আমাদের বাড়ীতে আসতো। আমার বয়স তখন দশ এগারো হবে তাই তার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যায়। নারায়ণের বয়স যখন ষোল সতের বছর শুনলাম সে কাজ করতে কলকাতা গেছে। বছর খানেক পরে একদিন পথে নারায়ণের সঙ্গে দেখা।   “কিগো নারানদা কবে এলে ?”                                                                        “এই তো কাল এসেছি ।“                                                                  

“ তুমি কলকাতায় কি কর গো ?”

নারানদা বলতে আরম্ভ করলো “ একজনের বাড়ীতে ফাইফরমাশ মতো কাজ করি। বিরাট বড়লোক, প্রাসাদের মতো বাড়ী। তাঁর একটি ছেলে, আমেরিকায় থাকে। কর্তা ব্রাহ্মণ, সংস্কৃততে কত কি ডিগ্রী আছে। তিনি বড় বড় দূর্গা পূজো, কালী পূজো, বিয়ের অনুষ্টান করেন। তিনি নামকরা জ্যোতিষী, বাড়ীতে লোকের লাইন পড়ে যায়।“             

“ নারানদা তুমি তো ভাল জায়গায় আছ গো ।“

নারানদা ফিক্ করে হেসে বললো “ কর্তা ও গিন্নিমা আমাকে খুব ভালোবাসেন। বাড়ীতে আসতে দিতে চান না। তিনি আমাকে পড়াশুনা করাবেন বলছেন।“

 

“তাঁরা জানেন, তুমি যে নাপিত ?”

“ হ্যাঁ হ্যাঁ, সব খুলে বলেছি।“

 

তারপর বছর তিনেক তার আর দেখা নাই। হঠাৎ নারানদার সঙ্গে গ্রামের চা দোকানে দেখা। খালি গায়ে বসে চা খাচ্ছে। দেখলাম তার চেহারার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ফর্সা ছিল কিন্তু আরো অধিক ফর্সা হয়েছে। গলায়  পৈতা পরেছে। চেহারায় এক লালিত্য এসেছে।

 আমাকে দেখে বললো “ আয়, আয়, বস চা খা।“

“ কি গো, তুমি তো রাজকুমার হয়ে গেছ।“

নারানদা মুচকি হেসে চুপ করে থাকলো।

আমি বললাম “ পড়াশুনা আরম্ভ করেছ ?”

“ বাংলা তো জানতাম, কর্তা আমাকে ভালো করে সংস্কৃত পড়িয়েছেন।আমি গীতা ও পূজা মন্ত্র মুখস্থ করছি। বাড়ী বাড়ী গিয়ে ছোটো খাটো পূজাও করছি।“

“তুমি নাপিত হয়ে ব্রাহ্মণের কাজ করছ। এটা আমাদের সমাজে চলে নাকি ?”

“ আমি কর্তাকে এ কথা বলেছিলাম। তিনি বললেন আমার গায়ে কি নাপিত লেখা আছে নাকি। বেদ উপনিষদ যুগে ব্রাহ্মণরাই শিক্ষক হতে পারতেন I কিন্তু বর্তমান সব বর্ণের লোকই শিক্ষকতা করছেন। আগের যুগের মুচিরা চামড়ার কাজ করতো। এখন সব বর্ণের মানুষ চামড়ার ব্যবসা করে। ক্ষত্রিয় ছাড়াও অন্য বর্ণের মানুষ সৈন্যবাহিনীতে কাজ করছে। তবে যিনি ব্রাক্ষণের কাজ ভালোভাবে শিখতে পারেন তবে তারা পুজা করতে পারবেন না কেন ? অনেক ব্রাক্ষণ আছেন তাঁরা ঠিক মত মন্ত্র উচ্চারণ করতে পারেন না। যিনি যে কাজে পারাদর্শী এবং যে কাজ করেন সেই অনুসারে তার বৈশ্য বর্ণ হবে। যদি কোনো ব্রাক্ষণ ব্যবসা করেন, তিনিও বৈশ্য । গীতায় ভগবান বলেছেন:-

                       “চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ৷

                         তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম্৷৷.”

 

 মানুষের গুণ এবং কর্ম অনুসারে ঈশ্বর  মনুষ্য সমাজে চারটি বর্ণবিভাগ করেছেন। কর্ম গুণ অনুসারে মানুষদের চারটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। জন্ম অনুসারে নয়। যার কারণে গাদির পুত্র বিশ্বামিত্র ক্ষত্রিয় হয়েও ব্রাহ্মন  হয়েছিলেন । আবার শুদ্রের পুত্র রত্নাকর ব্রহ্মজ্ঞান অর্জন করে হয়েছিলেন ব্রাহ্মন। তার নাম হয়েছিল ঋষি বাল্মিকি এবং রচনা করেছিলেন রামায়ণ। ঋষি বেদব্যাস বেশ্যার মেয়ের উদরে কুমারী সময়ে   জন্ম হয়েও শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ঋষি বলে পরিচিত হন। তাঁর গায়ের রঙ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ ও চেহারা ছিল কদাকার। তিনিই মহাভরত রচনা করেছিলেন। রাজর্ষি জনক বৈশ্য ও শূদ্রের কাজ কৃষিকাজ করতেন।

 এখানেই প্রমাণিত হয় যে ক্ষত্রিয়, বৈশ্য বা শুদ্রের ছেলেও ব্রাহ্মন হতে পারে। মানব জাতি নামে একটি মাত্র জাতি আছে,  কিন্তু তাদের বিভিন্ন পেশার কারণে বর্ণ বিভাজন দেখা দেয়"। মহাভারতও ঘোষণা করেছে  যে বর্ণের কোনও পার্থক্য নেই। এই সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্ম। এটি পূর্বে ব্রহ্মা দ্বারা সৃষ্ট হয়েছে, কর্ম দ্বারাই বর্ণ বিভাগ করা হয়েছে। ঋষভ যখন সমাজের সেবা করার জন্য অস্ত্র সংগ্রহ করেছিলেন এবং রাজার ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন তখন ক্ষত্রিয় বর্ণের উদ্ভব হয়েছিল , অন্যদিকে বৈশ্য ও শূদ্র বর্ণের উদ্ভব হয়েছিল বিভিন্ন জীবিকা নির্বাহের মাধ্যমে যেখানে তারা যে জীবিকা গ্রহন করতেন । মনুস্মৃতিতে বর্ণ চারটি সামাজিক শ্রেণীকে বোঝায় ।“

“ আরে বাঃ বাঃ, তুমি কতকিছু জেনে গেছ গো।“

“ শুধু পড়লে হয় না, তাকে আত্মস্থ করতে হয় ও স্মৃতিতে ধরে রাখতে হয়। বৈজ্ঞানিক জ্ঞান যেখানে শেষ আধ্যাত্মিক জ্ঞান সেখান থেকে শুরু। অনেক তত্ত্ব আছে বিজ্ঞান সবে মাত্র আবিষ্কার করেছে, সেইসব মুনি ঋষিরা হাজার হাজার বছর আগে বলে গেছেন।“

“  নারানদা, আমার একটা কৌতুহল আছে। অনেককে সনাতন ধর্ম অনুযায়ী আত্মা শাশ্বত এবং চৈতন্যস্বরূপঅনেককে জিজ্ঞাসা করেছি কিন্তু ঠিক উত্তর পাই নি। কেউ বলে এটা তো অন্যে বলে ওটা।

আচ্ছা, আত্মা কি ?”

নারাণদা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর গম্ভীরভাবে বললো

 “ বড় কঠিণ প্রশ্ন। সবটা এই স্বল্প পরিসরে আলোচনা সম্ভব নয়। তাই সংক্ষেপে বলি  আত্মা বলতে সাধারণত এমন এক সত্ত্বাকে বোঝানো হয়, যারা অদৃশ্য এবং মানুষের শরীর ভিতরে থাকে। যখন ভ্রুন সৃষ্টি থেকে মানুষের মধ্যে প্রবেশ করে এবং মরা পর্যন্ত থাকে।  আর মৃত্যুর সময় আত্মা দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। হিন্দুরা বিশ্বাস করে "আত্মা" হলো চিৎকণা, যা প্রত্যেক জীবের মধ্যে পরিব্যাপ্ত থাকে।   জীবাত্মা পরমাত্মার অংশ। পরমাত্মা হল পরমেশ্বর ভগবান। প্রতিটি জীবের হৃদয়ে জীবাত্মা বতর্মান। জীবাত্মার কারণে দেহে চৈতন্য লাভ করে। মানুষরা জীবাত্মার কৃতকর্ম অনুযায়ী কর্মফল স্বর্গ-নরক ভোগ করে, অর্থাৎ জন্মান্তরের মাধ্যমে বিভিন্ন যোনি ভ্রমণ করে বিভিন্ন শরীর ধারন করে সুখ-দুঃখ ভোগ করতে থাকে । কিন্তু পরমাত্মা কর্মফল দাতা, তিনি কোনো ফলভোগ করে না। সনাতন ধর্ম অনুযায়ী আত্মা শাশ্বত এবং চৈতন্যস্বরূপ । খ্রিস্ট ধর্মও একেই ধারনা পোষন করেন।

 ইসলাম ধর্মে আত্মাকে রুহ বলে। আল্লাহ মৃত্যু্র সময় রুহ নিয়ে নেয় এবং কবরে আবার সেটা ফেরৎ দেন ও পাপ-পুণ্য অনুযায়ী জান্নাত বা জাহান্নামে যায়। বৌদ্ধরা আত্মা ও পরমাত্মা বিশ্বাস করে না ।  কিন্তু বিজ্ঞান কি বলে প্রশ্ন হলো একটা কথা সত্য হলে সকলে সেটা মেনে নেবে এবং বিজ্ঞানের দ্বারা প্রমাণ করা যাবে কিন্তু এই দুটৌর কোনোটাই হয়নি। তারপর যারা আত্মাকে চিৎ শক্তি বা জীবনী শক্তি বলছেন, তাঁদের মতে আত্মা শুধু মানুষের মধ্যে থাকে। তবে কেন অন্যান্য জীবের মধ্যে থাকবে না। গীতায় ভগবান বলেছন:

                        “ সর্বযোনিষু কৌন্তেয় মূর্তয়ঃ সম্ভবন্তি যাঃ ।

                       তাসাং ব্রহ্ম মহদ্ যোনিরহং বীজপ্রদঃ পিতা II” 

অর্থাৎ “ প্রকৃতির গর্ভে সকল জীবজন্তুর জন্ম হয়, এবং আমি, পরমেশ্বর, সেই জীবের বীজ এবং পিতা।“

 বিজ্ঞান আত্মা আছে তার প্রমাণ করতে পারে নি। প্রত্যেক জীবের জীবনীশক্তি আছে প্রমাণিত। কোনো কিছুকে সচল করতে শক্তির প্রয়োজন। যেমন পাখা চালাতে হলে হয় পেশীশক্তি বা বৈদুতিক শক্তির প্রয়োজন। এই সব জড়কে চালাতে বাহির থেকে শক্তি দিতে হয়। আবার শক্তি দিলেও পাখা চলে না অর্থাৎ এর কোনো এক যন্ত্রাংশ খারাপ আছে। জড়কে নড়াচড়া করাতে হলে বাহির থেকে শক্তির যোগান দিতেই হয় কিন্তু জীব তার শরীরে শক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরী করতে পারে। খাদ্য, জল ও অক্সিজেন দিয়ে তার কোশে শক্তি উৎপাদিত হয়। এর একটির অভাব হলে জীব মরে যায়। আবার শক্তি উৎপাদিত হচ্ছে কিন্তু জীবদেহের এমন এক অঙ্গ খারাপ হলো তার জন্য শক্তিকে কাজে লাগাতে পারছে না তবে সেই জীব মরে যাবে। মরে যাওয়ায় পর পুণরায় সচল করার বিদ্যা এখনো মানুষ জানে না তাই পুনরুজ্জীত করতে পারেনা। আমার মনে হয় এই জীবনীশক্তিকে অনেকে আত্মা বলে।

“ আচ্ছা নারানদা ভগবান কি সত্যি আছেন”

“ভগবান আছেন কিনা, তা একটি দার্শনিক ও ধর্মীয় বিতর্কের বিষয়, যার উত্তর বিভিন্ন বিশ্বাস ও দর্শনের ওপর নির্ভর করে। কেউ কেউ একেশ্বরবাদী ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে, আবার কেউ কেউ তা অস্বীকার করে বা অন্য কোনো ধারণায় বিশ্বাস করে। বিজ্ঞান ঈশ্বরের অস্তিত্বের কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ দিতে পারে না, আবার তিনি যে নাই তাও প্রমাণ করা যায় না। তাই এটি বিশ্বাসের বিষয় হিসেবেই রয়ে যায়। আমার মনে হয় ঈশ্বর এক শক্তি। এই ব্রহ্মাণ্ডে বহু শক্তি আছে এবং প্রত্যেক শক্তির আলাদা আলাদা কাজ আছে। যেমন তড়িৎচুম্বকীয় শক্তি আছে আমরা জানতাম না। ম্যাক্সওয়েল ১৮৬৪ সালে তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রের জন্য সমীকরণ তৈরি করেছিলেন,। অনেক পরে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন হান্স হার্জ। এর আবিষ্কারের ফলে বিরাট ক্ষেত্র খুলে যায়। এরফলে আজ আমরা রেডিও শুনতে পাচ্ছি। বহু দুরে যোগাযোগ করতে পারছি। আমার বিশ্বাস এক অত্যাশ্চর্য  শক্তি আছে যা ব্রহ্মাণ্ডে সব স্থানে অদৃশ্য ভাবে আছে। গীতায় ঈশ্বর সমন্ধে বলা হয়েছে:-

                          “ ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জুন তিষ্ঠতি ।
                            ভ্রাময়ন্ সর্বভূতানি যন্ত্রারূঢ়ানি মায়য়া ॥“

                           “ যো মাং পশ্যতি সর্বত্র সর্বং চ ময়ি পশ্যতি ।
                            তস্য়াহং ন প্রণশ্য়ামি স চ মে ন প্রণশ্যতি ॥

যিনি সর্বত্র ঈশ্বরকে  দেখেন এবং ঈশ্বরেই সমস্ত বস্তু দর্শন করেন, ঈশ্বর কখনও তাঁর দৃষ্টির অগোচর হন না  ঈশ্বর সব শক্তির উপরে। এই শক্তি ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন।  সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কোনো সৃষ্টি হয় না I আমার মনে হয় ঈশ্বরের সঙ্গে মনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। তিনিই মনের মাধ্যমে বিচার, বুদ্ধি, বিচার ও বিবেচনা ইত্যাদি মানসিক প্রবৃত্তিগুলো দিয়ে থাকেন I

“ নারানদা তুমি উঠে দাঁড়াও। আমি তোমাকে একটা প্রণাম করি।“

“ চল, বাড়ী যাই।“

এরপর নারানদার সঙ্গে আর দেখা হয় নি। কিছু বছর পরে শুনেছিলাম যে নারানদা সংস্কৃতে উচ্চ শিক্ষা লাভ করে কোনো এক বৈদিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হয়েছে।

“ভগবান তোমার কি লীলা:”

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কবিতা বুদ্ধিজীবী - সকলে নিজেকে ভাবেন বুদ্ধিজীবী কিন্তু আসলে কে বুদ্ধিজীবী, কবিতাটি পড়ে জানুন।

কানীন (কর্ণ ছিলেন কানীন)